আজ ২৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ‘থিয়াগা দীপম’ থিলিাপনের আত্মত্যাগের ৩৯তম বার্ষিকী। ইলাম তামিলদের জন্য এটি গভীর শোকের একটি দিন। অথচ অত্যন্ত দুঃখজনক হলেও সত্যি যে, তামিলনাড়ুর সহ বিশ্বেবাসীর কাছে অনেকেই জানেন না এর প্রকৃত কারণ কী ছিল। আর তামিলনাড়ুর বাইরে ভারত ও বিশ্বের খুব কম মানুষই এই দিনটির গুরুত্ব বা তাৎপর্য অনুধাবন করতে পারেন।
১৯৮৭ সালের ২৬ সেপ্টেম্বর, এলটিটিই (LTTE)-র রাজনৈতিক নেতা ‘থিয়াগা দীপম’ থিলিাপন (২৯ নভেম্বর ১৯৬৩–২৬ সেপ্টেম্বর ১৯৮৭) আমরণ অনশনের মাধ্যমে আত্মাহুতি দেন। বিশ্বে এমন ঘটনা বিরল। একটি জাতির অধিকার আদায়ে অনশন করে নিজের জীনব উৎসর্গ করা সত্যিই বেদনা দায়ক। বিশ্বে নিজেদের দাবি আদায়ে প্রতিদিনই ঘটছে অনশন ধর্মঘটের অসংখ্য ঘটনা। কেউ লোক দেখানা আর কেউবা সত্যিকারের অনশনের পথ বেছে নেন।
কিন্তু ২৬সেপ্টেম্বর ১৯৮৭ থিয়াগা থিপাম থিলিপানের আত্মত্যাগ ছিল বিশ্বে বিরল একটি ঘটনা। জাফনার উরেলু গ্রামের এক ধর্মপ্রাণ হিন্দু পরিবারে জন্ম নেওয়া থিলিাপনের জীবন ও আত্মত্যাগ রাজনৈতিক প্রতিরোধ এবং আধ্যাত্মিক ত্যাগের এক অনন্য সংমিশ্রণ—যে গ্রামের ভূ-প্রকৃতি রাম ও সীতার যাত্রাপথের পৌরাণিক ও সভ্যতাগত স্মৃতির সাথে গভীরভাবে জড়িয়ে আছে। ১৯৮৭ সালের ১৫ সেপ্টেম্বর, তামিল বিশ্বের অন্যতম পবিত্র শৈব তীর্থস্থান নাল্লুর কান্দাস্বামী মন্দিরের প্রবেশপথে থিলি পান তাঁর অনশন শুরু করেন। হিন্দু দর্শনের ‘তপস্যা’ ও ‘ত্যাগ’-এর আদর্শ মেনে তিনি অন্ন ও জল—উভয়ই বর্জন করেন এবং নিজের শরীরকেই নৈতিক প্রতিরোধের এক প্রতীকে পরিণত করেন। তাঁর এই পদক্ষেপ কোনো হতাশাগ্রস্ত মানুষের কাজ ছিল না; বরং এটি ছিল দুটি দেশের সরকারের বিবেকের কাছে এক সচেতন আবেদন। এর ঠিক দুই মাস আগে, ১৯৮৭ সালের ২৯ জুলাই, তৎকালীন ভারতের প্রধানমন্ত্রী রাজীব গান্ধীর নেতৃত্বাধীন ইন্ডিয়ান ন্যাশনাল কংগ্রেস সরকার এবং শ্রীলঙ্কার প্রেসিডেন্ট জে. আর. জয়বর্ধনের ইউএনপি (UNP) সরকারের মধ্যে ‘ভারত-শ্রীলঙ্কা চুক্তি’ স্বাক্ষরিত হয়েছিল। কাগজে-কলমে এই চুক্তিটি তামিলদের মর্যাদারক্ষার নামে স্বাক্ষরিত হলেও, বাস্তবে তা হয়ে ওঠে বিশ্বাসঘাতকতারই আরেকটি অধ্যায়।
থিলিাপনের পাঁচটি দাবি ছিল সহজ, ন্যায়সংগত এবং সেই চুক্তির আওতায় প্রতিশ্রুত অধিকারের ওপর ভিত্তি করে প্রতিষ্ঠিতঃ
১. তামিল এলাকাগুলো থেকে সিংহলি সেনাবাহিনী ও পুলিশ ক্যাম্প প্রত্যাহার। ২. কঠোর ‘সন্ত্রাসবাদ দমন আইন’-এর আওতায় আটক তামিল রাজনৈতিক বন্দিদের মুক্তি। ৩. তামিল ভূমিতে সিংহলি রাষ্ট্র-পৃষ্ঠপোষকতায় বসতি স্থাপনের (উপনিবেশায়নের) অবসান। ৪. তামিল অঞ্চলগুলোর উন্নয়ন ও পুনর্বাসন কার্যক্রম তামিলদের নিজেদের দ্বারা পরিচালনা। ৫. তামিল মাতৃভূমির জন্য একটি অন্তর্বর্তীকালীন প্রশাসনিক পরিষদ গঠন। উভয় সরকারই তাঁকে উপেক্ষা করেছিল। ভারতীয় কংগ্রেস সরকার, যারা গ্যারান্টার হিসেবে দাঁড়ানোর দাবি করেছিল, তারাও মুখ ফিরিয়ে নিয়েছিল। শ্রীলঙ্কার ইউএনপি সরকার, যারা ইতোমধ্যেই অসংখ্য প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করেছিল, তারা কোনো পদক্ষেপ নিতে অস্বীকার করে।
*১২ দিন ধরে খাদ্য ও জল ছাড়া থাকার পর, থিলেপান ১৯৮৭ সালের ২৬শে সেপ্টেম্বর, মাত্র ২৩ বছর বয়সে একটি জাতির অধিকার আদায় করতে গিয়ে জীবন উৎসর্গ করেন। তাঁর মৃত্যু কেবল রাজনৈতিকই ছিল না, বরং ছিল গভীর আধ্যাত্মিক — এমন এক কাজ যা সত্য ও ন্যায়ের জন্য হিন্দুদের আত্মত্যাগের সভ্যতামূলক স্মৃতির প্রতিধ্বনি করে।* থিলেপানের অনশন কপটতার এক তীব্র অভিযোগপত্র হয়ে রয়েছে: কাগজে-কলমে চুক্তি স্বাক্ষরিত হলেও কাজে তা অস্বীকার করা হয়েছে; প্রতিশ্রুতি ঘোষণা করা হলেও তা কখনও রক্ষা করা হয়নি। তাঁর উত্তরাধিকার আজও টিকে আছে।


































































