বাংলাদেশ সীমান্তবর্তী এলাকায় মিয়ানমারে সেনাবাহিনীর বিমান হামলায় ৫০ জন নিহত এবং আরও অনেকে (যাদের মধ্যে অনেকের অবস্থা আশঙ্কাজনক) আহত হওয়ার খবরে জাতিসংঘ মঙ্গলবার গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে।
জাতিসংঘের একজন মুখপাত্র বলেছেন, মিয়ানমারে রাখাইন রাজ্যে চলমান সহিংসতা এটিই স্পষ্ট করে যে, শরণার্থী ও অন্যান্য বাস্তুচ্যুত মানুষের নিরাপদে মিয়ানমারে ফিরে যাওয়ার মতো পরিস্থিতি বর্তমানে সেখানে নেই।
নিউ ইয়র্কে জাতিসংঘের এক ব্রিফিংয়ে মুখপাত্র স্টিফেন ডুজারিক বলেন, “সাম্প্রতিক এই বিমান হামলা সেই বাস্তবতাকে আরও জোরালোভাবে সামনে নিয়ে এসেছে।”
জাতিসংঘের প্রধান আন্তোনিও গুতেরেসের উদ্ধৃতি দিয়ে তিনি বলেন, “মহাসচিব এই হামলার তীব্র নিন্দা জানিয়েছেন এবং সব পক্ষকে অবিলম্বে সহিংসতা বন্ধ, বেসামরিক নাগরিকদের সুরক্ষা নিশ্চিত এবং আন্তর্জাতিক আইনের অধীনে তাদের বাধ্যবাধকতা মেনে চলার আহ্বান জানিয়েছেন।”
মিয়ানমার সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে লড়াইরত সশস্ত্র গোষ্ঠী ‘আরাকান আর্মি’ জানিয়েছে, সোমবার বাংলাদেশ সীমান্তবর্তী কিয়াউকতাও শহরে চালানো বিমান হামলায় ৫০ জন নিহত এবং অন্তত ৫৮ জন আহত হয়েছেন। স্থানীয় ত্রাণকর্মী ওয়াই হুন অং এই হতাহতের সংখ্যা নিশ্চিত করেছেন।
ওয়াই হুন অং-এর সোশ্যাল মিডিয়ায় শেয়ার করা ছবি অনুযায়ী, মঙ্গলবার যেসব মৃতদেহ উদ্ধার করা হয়েছে, তার মধ্যে নারী ও শিশুরাও ছিল।
রাখাইন রাজ্যে গত ডিসেম্বরে একটি হাসপাতালে বোমা হামলায় অন্তত ৩০ জন নিহত হওয়ার ঘটনার পর কিয়াউকতাও শহরে চালানো এই বিমান হামলাটিই ছিল সবচেয়ে প্রাণঘাতী।
আরাকান আর্মির মুখপাত্র খাইন থু খা অভিযোগ করেছেন যে, সেনাবাহিনী “বিমান হামলার মাধ্যমে ইচ্ছাকৃতভাবে ঘনবসতিপূর্ণ বাজার, স্কুল, বেসামরিক নাগরিক এবং আবাসিক ভবনগুলোকে লক্ষ্যবস্তু করেছে।”
এ বিষয়ে মন্তব্যের জন্য অনুরোধ করা হলেও মিয়ানমার সরকারের কোনো মুখপাত্র সাড়া দেননি। সেনাবাহিনী এর আগেও দাবি করেছে যে, বেসামরিক নাগরিকদের ক্ষতি এড়াতে তারা সর্বোচ্চ সংযম প্রদর্শন করে থাকে।
২০২১ সালে সামরিক অভ্যুত্থানের পর থেকে মিয়ানমার দেশজুড়ে গৃহযুদ্ধে জড়িয়ে পড়েছে; সেখানে আরাকান আর্মি-সহ বিভিন্ন সশস্ত্র গোষ্ঠীর একটি জোট সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে লড়াই চালিয়ে যাচ্ছে।
দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার এই দরিদ্র দেশটিতে চলমান এই সংঘাতের ফলে এ পর্যন্ত প্রায় ১ লাখ মানুষ প্রাণ হারিয়েছেন এবং ৩৫ লাখেরও বেশি মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছেন।
মঙ্গলবার মালয়েশিয়া প্রায় ১,৫০০ মিয়ানমার নাগরিককে নিজ দেশে ফেরত পাঠিয়েছে; মিয়ানমারের সাথে সম্মত হওয়া প্রত্যাবাসন পরিকল্পনার এটি ছিল প্রথম ধাপ। মালয়েশিয়া দাবি করছে যে এই প্রক্রিয়াটি স্বেচ্ছায় সম্পন্ন হয়েছে, তবে মানবাধিকার সংস্থাগুলো এর তীব্র নিন্দা জানিয়েছে।
জাতিসংঘের মানবাধিকার বিষয়ক প্রধান ভলকার তুর্কের কার্যালয় থেকে দেওয়া এক বিবৃতিতে বলা হয়েছে, বিমান হামলায় হতাহতের সংখ্যা আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
বিবৃতিতে বলা হয়, “বিভিন্ন প্রতিবেদন অনুযায়ী, সোমবারের হামলাটি এমন এক ব্যস্ত সময়ে চালানো হয়েছিল যখন বাজারটিতে বিপুল সংখ্যক সাধারণ মানুষের উপস্থিতি ছিল। দুই শতাধিক দোকান নিয়ে গঠিত এই বাজারটি রাখাইন, রোহিঙ্গা, হিন্দু, ডাইংনেট ও অন্যান্য সম্প্রদায়ের মানুষের দ্বারা পরিচালিত হয়ে আসছিল।”
খাইন থু খা বলেছেন, সেনাবাহিনী এবং বেসামরিক নাগরিকদের ওপর বোমা হামলার ঘটনায় জড়িত যে কারও বিরুদ্ধে পাল্টা ব্যবস্থা নিতে আরাকান আর্মি তাদের হাতে থাকা সব ধরনের উপায় কাজে লাগাবে।
এছাড়া গুতেরেস সংঘাতের সব পক্ষের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন যেন তারা জাতিসংঘ ও অন্যান্য ত্রাণকর্মীদের মানবিক সহায়তা পৌঁছানোর লক্ষ্যে নিরাপদ, নিরবচ্ছিন্ন ও বাধাহীন প্রবেশের সুযোগ করে দেয়।

































































