ইরাকে দুই দশকেরও বেশি সময় ধরে চলা যুদ্ধের পর বুধবার মার্কিন বাহিনী তাদের মিশন সমাপ্ত করেছে। এই পদক্ষেপটি এমন এক নিরাপত্তা শূন্যতা তৈরির আশঙ্কা জাগিয়েছে যা ইরান-সমর্থিত শিয়া মিলিশিয়াদের আরও সাহসী করে তুলতে পারে এবং ‘ইসলামিক স্টেট’-কে পুনরায় সংগঠিত হওয়ার সুযোগ করে দিতে পারে।
মূলত আধা-স্বায়ত্তশাসিত কুর্দি অঞ্চলের ইরবিল বিমানঘাঁটি থেকে শেষ ব্যাচের সেনা প্রত্যাহারের ঘটনাটিকে তেহরান ও তার মিত্ররা বিজয় হিসেবে উদযাপন করেছে; তবে অনেক ইরাকিই উদ্বিগ্ন যে তাদের নিজস্ব নিরাপত্তা বাহিনী এর জন্য প্রস্তুত নয়।
প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনের আমলে ২০২৪ সালে এই সেনা প্রত্যাহারের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল এবং ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসন তা বাস্তবায়ন করেছে—এমনকি যখন তারা প্রতিবেশী ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ চালিয়ে যাচ্ছে।
যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বাধীন বাহিনী সাদ্দাম হোসেনের সরকারকে ক্ষমতাচ্যুত করার ২৩ বছর পর এই ঘটনাটি ঘটল; সাদ্দামের পতনের পর দেশটিতে দীর্ঘ সময় ধরে অস্থিরতা ও বিশৃঙ্খলা বিরাজ করছিল। ২০১১ সালের শেষের দিকে মার্কিন সৈন্যরা প্রাথমিকভাবে ইরাক ত্যাগ করলেও, ‘ইসলামিক স্টেট’ যোদ্ধারা ইরাকের এক-তৃতীয়াংশ এলাকা দখল করে নেওয়ার পর তিন বছরেরও কম সময়ের মধ্যে তারা সেখানে ফিরে আসে।
এই শতাব্দীতে আমেরিকার সবচেয়ে বড় যুদ্ধে ৪,৫০০-এরও বেশি মার্কিন সেনা প্রাণ হারিয়েছে, যা আফগানিস্তানের সমান্তরাল যুদ্ধের তুলনায় প্রায় দ্বিগুণ। ‘ইরাক বডি কাউন্ট’ প্রকল্পের তথ্যমতে, এতে ২ লাখেরও বেশি ইরাকি বেসামরিক নাগরিক নিহত হয়েছেন।
পেন্টাগন জানিয়েছে যে, যুক্তরাষ্ট্র এবং তাদের জোটসঙ্গীরা আনুষ্ঠানিকভাবে ‘অপারেশন ইনহেরেন্ট রিজলভ’ (Operation Inherent Resolve) সমাপ্ত করেছে এবং পেন্টাগন ইরাকি অংশীদারদের সুনির্দিষ্ট প্রশিক্ষণ ও গোয়েন্দা সহায়তা প্রদান অব্যাহত রাখবে।
ওয়াশিংটন ও তেহরান—উভয়েরই মিত্র দেশ ইরাকের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং ‘ইসলামিক স্টেট’-এর অবশিষ্টাংশকে দমন রাখার মূল দায়িত্ব এখন ইরাকিরাই পালন করবে বলে আশা করা হচ্ছে।
এক বিবৃতিতে ইরাকের প্রধানমন্ত্রী আলি ফালিহ আল-জাইদি বলেন, “আন্তর্জাতিক জোটের মিশনের সমাপ্তি মানে সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে আমাদের লড়াইয়ের সমাপ্তি নয়; বরং এটি ইরাকের এমন এক পর্যায়ে উত্তরণ যেখানে দেশটি তার নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতার পূর্ণ দায়িত্ব নিজের কাঁধে তুলে নিচ্ছে।”
সাদ্দামের পতনের পর থেকেই তেহরান বিভিন্ন সহযোগী গোষ্ঠীর (প্রক্সি) মাধ্যমে ইরাকে নিজেদের অবস্থান ক্রমশ শক্তিশালী করেছে।
যদিও ইরাকিদের মধ্যে মার্কিন বাহিনীর চলে যাওয়ার বিষয়টি ব্যাপকভাবে সমাদৃত, তবুও কারও কারও আশঙ্কা রয়েছে যে, যুক্তরাষ্ট্রের প্রশিক্ষণ ও অর্থায়নে গড়ে ওঠা নিরাপত্তা বাহিনী হয়তো এখনও দেশটিকে সুরক্ষা দিতে সক্ষম নয়। নিরাপত্তা বাহিনীর পরামর্শদাতা ও ইরাকি বিশ্লেষক জসিম আল-বাহাদলি বলেন, “গত দুই দশকের অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা হলো—নিরাপত্তা-শূন্যতা অত্যন্ত বিপজ্জনক হতে পারে।”
৪৫ বছর বয়সী হাই স্কুলের ইংরেজি শিক্ষক আদিল সালমান বলেন, ইরাকিদের উচিত নয় এই সেনা প্রত্যাহারের ঘটনায় “অতিরিক্ত উচ্ছ্বাস প্রকাশ করা”।
তিনি বলেন, “এখনও রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণের বাইরে বিভিন্ন মিলিশিয়া গোষ্ঠী কার্যক্রম চালাচ্ছে এবং ‘ইসলামিক স্টেট’-এর অস্তিত্বও পুরোপুরি বিলীন হয়ে যায়নি। আমার আশঙ্কা, যুক্তরাষ্ট্রের এই প্রস্থানের ফলে অস্থিতিশীলতার একটি নতুন অধ্যায় শুরু হতে পারে। শেষ পর্যন্ত মানুষ এই সিদ্ধান্তকে একটি মানদণ্ডেই বিচার করবে—আর তা হলো, আগামী বছরগুলোতে নিরাপত্তা পরিস্থিতি স্থিতিশীল থাকে কি না।”
ইরান-সমর্থিত সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর পাশাপাশি মার্কিন বাহিনীর উপস্থিতির কারণে ইরাকও চলতি বছরের সংঘাতের মধ্যে জড়িয়ে পড়েছে।
ফেব্রুয়ারিতে ইসরায়েলের সাথে যৌথভাবে ‘অপারেশন এপিক ফিউরি’ (Operation Epic Fury) শুরুর পর থেকে এ পর্যন্ত নিহত ১৮ জন মার্কিন সেনাসদস্যের মধ্যে সাতজনই ইরাকে প্রাণ হারিয়েছেন। সর্বশেষ ঘটনায় জুলাই মাসে ইরবিলের কাছে একটি ঘাঁটিতে ড্রোন ধ্বংস করার সময় (নিয়ন্ত্রিত বিস্ফোরণের মাধ্যমে) এক সেনা সার্জেন্ট নিহত হন।
**বিজয়ী ইরান ও তার মিত্ররা**
পুরো মধ্যপ্রাচ্য থেকে মার্কিন বাহিনীকে হটিয়ে দেওয়াই তাদের চূড়ান্ত লক্ষ্য—ইরানের এমন দাবির প্রেক্ষিতে, ইরাক থেকে যুক্তরাষ্ট্রের এই প্রস্থানকে তারা পুরো অঞ্চলজুড়ে তাদের মিত্র সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর জোট বা ‘অ্যাক্সিস অফ রেজিস্ট্যান্স’-এর (প্রতিরোধ অক্ষ) বিজয় হিসেবে দেখছে।
বাগদাদ-ভিত্তিক রাজনৈতিক বিশ্লেষক আহমেদ ইউনুস বলেন, এই সেনা প্রত্যাহারের ফলে “পশ্চিমা সামরিক উপস্থিতি না থাকায় ইরানের প্রক্সি বা অনুগত গোষ্ঠীগুলো আরও শক্তিশালী হয়ে ওঠার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। রাষ্ট্রীয় নীতি নির্ধারণে নিজেদের ভূমিকা বাড়ানো এবং গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানগুলোর ভেতরে নিজেদের অবস্থান সুদৃঢ় করার চেষ্টা করতে পারে এই গোষ্ঠীগুলো।”
ফেডারেল সরকার এবং আধা-স্বায়ত্তশাসিত উত্তরাঞ্চলীয় কুর্দি অঞ্চল—উভয় জায়গারই কয়েকজন ইরাকি নিরাপত্তা কর্মকর্তা মনে করেন, যুক্তরাষ্ট্রের এই প্রস্থানের ফলে ‘ইসলামিক স্টেট’-এর যোদ্ধারা নতুন করে সক্রিয় হয়ে ওঠার ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। প্রায় এক দশক আগে তাদের স্বঘোষিত ‘খেলাফত’ বা খিলাফতের পতন ঘটলেও, তাদের গোপন নেটওয়ার্ক বা ‘স্লিপার সেল’গুলো এখনও টিকে আছে।
এর আগে যখন যুক্তরাষ্ট্র সেনা প্রত্যাহার করেছিল, তখন ইরাকি সেনাবাহিনী ‘ইসলামিক স্টেট’-এর মোকাবিলায় সম্পূর্ণ ব্যর্থ হয়েছিল; ২০১৪ সালে ইরাকের দ্বিতীয় বৃহত্তম শহর মসুল যখন জঙ্গিগোষ্ঠীটির দখলে চলে যায়, তখন ইরাকি সৈন্যরা তাদের ইউনিফর্ম খুলে ফেলে পালিয়ে গিয়েছিল।
২০১৭ সালে ইসলামিক স্টেটের স্বঘোষিত ‘খেলাফত’-এর পতনের পর থেকে মার্কিন বাহিনী ইরাকি নিরাপত্তা বাহিনীকে এই গোষ্ঠীর গতিবিধি সংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ গোয়েন্দা তথ্য প্রদান এবং আকাশপথে নজরদারি ও অনুসন্ধানের কাজে সহায়তা করে আসছে।
ইসলামিক স্টেটের বিরুদ্ধে যুদ্ধে একটি ব্রিগেডের নেতৃত্বদানকারী ইরাকি সেনাবাহিনীর অবসরপ্রাপ্ত জেনারেল মোহাম্মদ আল-জুবৌরি বলেন, “এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো, আন্তর্জাতিক জোটের উপস্থিতির পরবর্তী সময়ের জন্য ইরাকের নিরাপত্তা সংস্থাগুলো কোনো কার্যকর ‘প্ল্যান বি’ (বিকল্প পরিকল্পনা) প্রস্তুত করেছে কি না।”
তিনি আরও বলেন, “সবচেয়ে খারাপ পরিস্থিতির একটি হতে পারে ইসলামিক স্টেটের হাতে সশস্ত্র ড্রোন বা বিস্ফোরকবাহী ড্রোন চলে আসা—এমন এক সময়ে যখন এ ধরনের হুমকি কার্যকরভাবে মোকাবিলা করার মতো পর্যাপ্ত আকাশ প্রতিরক্ষা সক্ষমতা ইরাকের নেই।”

































































