১৯৮৩ থেকে ১৯৯০ সালের মধ্যবর্তী সময়ে ত্রিনকোমালি জেলায় বিভিন্ন সশস্ত্র বাহিনীর উপস্থিতি, জাতিগত সহিংসতা, বেসামরিক জনগোষ্ঠীর বাস্তুচ্যুতি এবং রাজনৈতিক বিক্ষোভের ঘটনা ঘটেছিল। এই সময়কার পূর্ণাঙ্গ ও সঠিক চিত্র কোনো একটি একক নথিতে পাওয়া যায় না। তবে একজন আন্তর্জাতিক আইনবিদের প্রতিবেদন, সমসাময়িক সাময়িকী, সুশীল সমাজের প্রতিবেদন এবং জাতিসংঘের নথিপত্র পর্যালোচনা ও তুলনা করলে গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক তথ্য-প্রমাণ উঠে আসে। এখানে উপস্থাপিত তথ্যের একাংশ সরকারিভাবে নথিভুক্ত প্রশাসনিক পদক্ষেপ সংক্রান্ত; অন্য অংশটি প্রত্যক্ষদর্শী বা বিভিন্ন সংগঠনের উত্থাপিত অভিযোগের ওপর ভিত্তি করে তৈরি। পাঠকদের এই দুই ধরনের তথ্যের মধ্যে পার্থক্য বুঝে নেওয়া উচিত। যেসব তথ্য মূল উৎসের মাধ্যমে যাচাই করা সম্ভব হয়নি, সেগুলো স্পষ্টভাবে চিহ্নিত করা হয়েছে।
১. ১৯৮৩: ত্রিনকোমালিতে নৌ–সেনাদের দ্বারা ‘অননুমোদিত তাণ্ডব’
১৯৮৪ সালের মার্চ মাসে প্রকাশিত ‘শ্রীলঙ্কা: আ মাউন্টিং
ট্র্যাজেডি অফ এররস’ (Sri Lanka: A Mounting Tragedy of Errors) শীর্ষক প্রতিবেদনে আইনবিদ পল সিগহার্ট উল্লেখ করেন যে, ১৯৮৩ সালে জাফনা ও ত্রিনকোমালিতে সংঘটিত সহিংসতায় নিরাপত্তা বাহিনীর কিছু সদস্য অংশ নিয়েছিল। ‘ইন্টারন্যাশনাল কমিশন অফ জুরিস্টস’ এবং এর ব্রিটিশ শাখা ‘জাস্টিস’ (JUSTICE)-এর প্রতিনিধি হিসেবে তিনি শ্রীলঙ্কা সফর করেছিলেন।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, ওই দুটি স্থানে নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যদের দ্বারা বেসামরিক নাগরিকদের মৃত্যুর যে সংখ্যা স্বীকার করা হয়েছিল, তা ছিল ৫১। এই সংখ্যাটি কেবল ত্রিনকোমালি জেলার জন্য প্রযোজ্য কোনো পৃথক হিসাব নয়। সিগহার্ট ত্রিনকোমালিতে নৌবাহিনীর কিছু সদস্যের আচরণকে সম্পূর্ণ অননুমোদিত তাণ্ডব হিসেবে বর্ণনা করেন। তিনি এ-ও উল্লেখ করেন যে, তাকে জানানো হয়েছিল—ওই ঘটনাগুলোর জেরে পরবর্তীতে ১২০ জন সৈন্য ও ১০৫ জন নাবিককে চাকরি থেকে বরখাস্ত করা হয়েছিল। চাকরি থেকে বরখাস্ত হওয়া আর ফৌজদারি অপরাধে দোষী সাব্যস্ত হওয়া এক বিষয় নয়; এই সংখ্যাগুলো তাকে দেওয়া তথ্যের ওপর ভিত্তি করেই উল্লেখ করা হয়েছে। উৎস-সংক্রান্ত তথ্য: পল সিগহার্ট, ‘শ্রীলঙ্কা: আ মাউন্টিং ট্র্যাজেডি অফ এররস’, ইন্টারন্যাশনাল কমিশন অফ জুরিস্টস এবং জাস্টিস (JUSTICE), মার্চ ১৯৮৪, পৃষ্ঠা ১৯, ৭০–৭১।
২. ১৯৮৭: সাতজন বেসামরিক নাগরিকের মৃত্যু এবং একটি প্রস্তাবিত কোর্ট মার্শাল
‘তামিল টাইমস’-এর ১৯৮৯ সালের জানুয়ারি সংখ্যায় প্রকাশিত একটি প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয় যে, ১৯৮৭ সালের ২১ নভেম্বর ত্রিনকোমালির কাছে ইন্ডিয়ান পিস কিপিং ফোর্সের (আইপিকেএফ) ২৭০ ইঞ্জিনিয়ার্স রেজিমেন্টের নায়েক বলদেব সিং তাঁর সরকারি রাইফেল দিয়ে গুলি চালিয়ে সাতজন বেসামরিক নাগরিককে হত্যা এবং আরও চারজনকে আহত করেন। প্রতিবেদনটিতে বলা হয় যে, সেনাবাহিনী কর্তৃপক্ষ ভারতীয় দণ্ডবিধির ৩০২ (হত্যা) ও ৩০৭ (হত্যার চেষ্টা) ধারার সাথে সংশ্লিষ্ট ‘আর্মি অ্যাক্ট’-এর ৬৯ ধারার অধীনে শ্রীলঙ্কায় তাঁকে ‘জেনারেল কোর্ট মার্শাল’-এর মাধ্যমে বিচারের মুখোমুখি করার প্রস্তাব করেছিল। এছাড়া, বিদেশে সংঘটিত কোনো কথিত অপরাধের জন্য শ্রীলঙ্কায় এ ধরনের বিচার প্রক্রিয়া পরিচালনার বিষয়ে তৎকালীন আইনি প্রশ্নগুলো নিয়েও এতে আলোচনা করা হয়েছিল। এই নথিটি একটি গুরুত্বপূর্ণ ইঙ্গিত দেয় যে, ভারতীয় সামরিক বিচার ব্যবস্থার আওতায় এই অভিযোগটি বিবেচনা করা হচ্ছিল। তবে প্রস্তাবিত বিচার প্রক্রিয়াটি সম্পন্ন হয়েছিল কি না, কী রায় দেওয়া হয়েছিল কিংবা কোনো সাজা ঘোষণা করা হয়েছিল কি না—তা এতে নিশ্চিতভাবে জানা যায় না। তাই সঠিক বর্ণনাটি হলো—কোর্ট মার্শালের প্রস্তাব করা হয়েছিল; অপরাধী হিসেবে দোষী সাব্যস্ত হওয়ার বিষয়টি বিচারিক প্রক্রিয়ায় নিশ্চিত করা হয়েছিল—এমনটা বলা যায় না।
উৎস: কানওয়ার সান্ধু, “আইপিকেএফ মেন ফেস কোর্ট মার্শাল” (IPKF Men Face Court Martial), তামিল টাইমস, জানুয়ারি ১৯৮৯, পৃষ্ঠা ১৫; ‘সানডে অবজারভার’, বোম্বে (১৮–২৪ ডিসেম্বর ১৯৮৮) থেকে পুনর্মুদ্রিত।
৩. ১৯৮৮: ত্রিনকোমালি মাদার্স ফ্রন্টের শান্তি বিক্ষোভ
সুশীলা গণেশনের অনশন কর্মসূচিটি ত্রিনকোমালিতে যুদ্ধের বিরুদ্ধে নারীদের রাজনৈতিক বিরোধিতার একটি বিরল সমসাময়িক দলিল হিসেবে কাজ করে।
‘তামিল টাইমস’-এর তথ্য অনুযায়ী, ত্রিনকোমালি মাদার্স ফ্রন্টের সদস্য সুশীলা গণেশন ১৯৮৮ সালের ১০ এপ্রিল ত্রিনকোমালির শিবন কোভিল প্রাঙ্গণে আমরণ অনশন শুরু করেন। তাঁর দাবিগুলোর মধ্যে ছিল—ভারত কর্তৃক শর্তহীন যুদ্ধবিরতি ঘোষণা, এলটিটিই (LTTE)-র অস্ত্র সমর্পণ এবং ভারত ও এলটিটিই-র মধ্যে একটি ন্যায্য সমাধানের লক্ষ্যে আলোচনা। তাঁর বিবৃতিতে উল্লেখ করা হয় যে, ৯ মার্চ থেকে শুরু হওয়া ২৪ ঘণ্টার পর্যায়ক্রমিক অনশন কর্মসূচিতে প্রায় ২০০ জন মায়ের পাশাপাশি তরুণ-তরুণী ও শিশুরাও অংশ নিয়েছিল। অংশগ্রহণকারীদের এই সংখ্যাটি সংগঠনের নিজস্ব হিসাব; এটি কোনো নিরপেক্ষ বা স্বাধীনভাবে যাচাইকৃত পরিসংখ্যান নয়। এই নথিপত্রটি প্রমাণ করে যে, সরকার ও সশস্ত্র আন্দোলনের পাশাপাশি ত্রিনকোমালির ইতিহাস গঠনে এমন সব নারী ও সাধারণ নাগরিকেরও ভূমিকা ছিল, যাঁরা যুদ্ধবিরতির দাবিতে স্বাধীন রাজনৈতিক কণ্ঠস্বর সোচ্চার করেছিলেন। উৎস: “Fast Unto Death — Mother Suseela Ganeshan”, Tamil Times, May 1988, p. 11.
৪. ১৯৮৯: ত্রিঙ্কোমালি থেকে ৬১৪ জন তামিল শরণার্থীর ভারতে চলে যাওয়ার বিষয়ে উল্লেখ — যাচাইকরণাধীন
এই সংকলনের জন্য প্রদত্ত তথ্যসূত্রটি ‘শ্রীলঙ্কা মনিটর’-এর ১৯৮৯ সালের অক্টোবর সংখ্যায় প্রকাশিত “Refugees Forced to India?” (বাধ্যতামূলকভাবে ভারতে পাঠানো শরণার্থী?) শিরোনামের একটি প্রতিবেদনকে নির্দেশ করে। প্রাপ্ত বিবরণ অনুযায়ী, ১৯৮৯ সালের ২৮ আগস্ট ‘আকবর’ (Akbar) জাহাজটি ৬১৪ জন তামিল শরণার্থীকে নিয়ে ত্রিনকোমালি থেকে ভারতের উদ্দেশ্যে রওনা হয়; এদের মধ্যে প্রায় ৪০০ জন ছিলেন সরকারি কর্মচারী ও তাঁদের পরিবারের সদস্য। এই যাত্রাটি পুরোপুরি স্বেচ্ছায় ছিল কি না, তা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। প্রাপ্ত তথ্যমতে, সরকারি কর্মচারীদের আশঙ্কা ছিল যে ভারতে থেকে গেলে তাঁরা চাকরি বা পেনশনের অধিকার হারাতে পারেন; অন্যদিকে, ‘ইরোস’ (EROS)-এর পক্ষ থেকে ভারতীয় গণমাধ্যমে অভিযোগ করা হয়েছিল যে, ত্রিনকোমালিতেই থেকে যেতে ইচ্ছুক হওয়া সত্ত্বেও কিছু মানুষকে ভারতে পাঠানো হয়েছিল। তবে, ‘নুলাহাম’ (Noolaham)-এর তালিকাভুক্ত ‘দ্য শ্রীলঙ্কা মনিটর ১৯৮৯.১০ (২.৭)’ কপির ২ নম্বর পৃষ্ঠায় এই প্রতিবেদনটির সত্যতা যাচাই করা সম্ভব হয়নি। তাই যাত্রার তারিখ, ৬১৪ জনের সংখ্যা, প্রায় ৪০০ জন কর্মচারী ও তাঁদের পরিবারের সদস্যের তথ্য এবং জোরপূর্বক পাঠানোর অভিযোগ—এসব বিষয়কে এখানে নিশ্চিত ঐতিহাসিক তথ্য হিসেবে উপস্থাপন করা হচ্ছে না। সংশ্লিষ্ট মূল সংখ্যা বা পৃষ্ঠাটি খুঁজে পাওয়ার পর এই এন্ট্রি বা তথ্যে সংশোধনের প্রয়োজন রয়েছে।
যাচাইযোগ্য তথ্যসূত্র: “Refugees Forced to India?”, Sri Lanka Monitor, No. 20, October 1989, p. 2। বর্তমানে এই তথ্যসূত্রটি ‘নুলাহাম’-এর কাছে থাকা কপির বিষয়বস্তুর সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।
৫. ১৯৯০: পুলমোত্তাই-তে ৪০ জন বাস্তুচ্যুত তামিল সম্পর্কিত একটি অভিযোগ জাতিসংঘে নথিভুক্তকরণ
সংক্ষিপ্ত বা খেয়ালখুশিমতো বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড বিষয়ক জাতিসংঘের বিশেষ র্যাপোর্টিয়ারের প্রতিবেদনে (E/CN.4/1991/36) ১৯৯০ সালের জুন মাসে দেশের উত্তরাঞ্চল ও পূর্বাঞ্চলে বেসামরিক নাগরিকদের হত্যার বিষয়ে প্রাপ্ত অভিযোগগুলোর উল্লেখ রয়েছে। প্রতিবেদনের ৪৭২(ঙ) অনুচ্ছেদে একটি অভিযোগ লিপিবদ্ধ করা হয়েছে যে, ১৯৯০ সালের ৩০ জুন ত্রিনকোমালির পুলমোত্তাই এলাকায় শ্রীলঙ্কার নৌবাহিনীর একটি জাহাজের গুলিবর্ষণে বাস্তুচ্যুত ৪০ জন তামিল নাগরিক নিহত হন।
এটি জাতিসংঘের একটি আনুষ্ঠানিক নথিতে লিপিবদ্ধ একটি গুরুত্বপূর্ণ অভিযোগ। এটি জাতিসংঘের কোনো তদন্তের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠিত বিচারিক সিদ্ধান্ত নয়। প্রতিবেদনে ঘটনাগুলোকে স্পষ্টভাবে ‘অভিযোগ’ হিসেবেই উল্লেখ করা হয়েছে। যদিও শ্রীলঙ্কা সরকারের জবাবে নিরাপত্তা পরিস্থিতি এবং তদন্তের ক্ষেত্রে বিদ্যমান জটিলতাগুলো নিয়ে সাধারণভাবে আলোচনা করা হয়েছে, তবুও সংশ্লিষ্ট অংশে পুলমোত্তাইয়ের এই ঘটনার বিষয়ে কোনো সুনির্দিষ্ট জবাব দেওয়া হয়নি। উৎস সংক্রান্ত তথ্য: জাতিসংঘ, সংক্ষিপ্ত বা খেয়ালখুশিমতো বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড বিষয়ক বিশেষ র্যাপোর্টিয়ারের প্রতিবেদন, E/CN.4/1991/36, অনুচ্ছেদ ৪৭১–৪৭২(ঙ), নথির পৃষ্ঠা ১১৫–১১৬।
উপসংহারঃ
এই নথিপত্রগুলো ১৯৮৩ থেকে ১৯৯০ সালের মধ্যে ত্রিনকোমালির ইতিহাসের পরস্পর-সংযুক্ত বিভিন্ন দিক উন্মোচন করে: নিরাপত্তা বাহিনীর বিরুদ্ধে অভিযোগ, অভ্যন্তরীণ জবাবদিহিতার সীমিত প্রচেষ্টা, যুদ্ধের বিরুদ্ধে নারীদের অবস্থান, শরণার্থীদের স্বাধীন সিদ্ধান্তের অধিকার সংক্রান্ত প্রশ্ন এবং জাতিসংঘের কাছে বেসামরিক মৃত্যুর অভিযোগ নথিভুক্তকরণ। সব তথ্যকে সমানভাবে প্রমাণিত বা প্রতিষ্ঠিত হিসেবে গণ্য করা যায় না। চাকরি থেকে বরখাস্তের খবর, প্রস্তাবিত কোর্ট মার্শাল, ‘মাদার্স ফ্রন্ট’এর নিজস্ব বিবৃতি, যাচাই-সাপেক্ষ শরণার্থী-প্রস্থান সংক্রান্ত তথ্য এবং জাতিসংঘের নথিতে থাকা পুলমোত্তাই-এর অভিযোগ—এগুলোর প্রমাণগত গুরুত্ব বা ভিত্তি ভিন্ন ভিন্ন। এই নথিপত্রগুলো উন্মুক্তভাবে ও সতর্কতার সাথে সংরক্ষণ করা একটি গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক কাজ; এটি নিশ্চিত করতে সহায়তা করে যে ত্রিনকোমালির মানুষের অভিজ্ঞতা যেন বিস্মৃতির অতলে হারিয়ে না যায়। বিভাগ: নথিপত্র — ত্রিনকোমালি। সময়কাল: ১৯৮৩–১৯৯০। ট্যাগ: ত্রিনকোমালি, পুলমোত্তাই, ভারতীয় শান্তিরক্ষী বাহিনী (IPKF), মাদার্স ফ্রন্ট, তামিল শরণার্থী, ১৯৮৩ সালের জাতিগত সহিংসতা, মানবাধিকার, নথিপত্র-ভিত্তিক ইতিহাস।
নথি সংকলন: ইলম মান্নিন সুভাদুগাল (Eelam Mannin Suvadugal)। পাঠকদের কাছে যদি এমন কোনো অতিরিক্ত সাক্ষ্য, নামের তালিকা বা মূল নথিপত্র থাকে যা বিদ্যমান তথ্যের সংশোধনে সহায়তা করতে পারে, তবে তাঁরা পূর্ণাঙ্গ তথ্যসূত্রসহ মন্তব্যের ঘরে তা শেয়ার করতে পারেন।


































































