ব্রিটেনে যুদ্ধ ও নির্যাতনের শিকার শরণার্থীদের জন্য নতুন নিরাপদ ও বৈধ অভিবাসনপথ চালুর উদ্যোগের অংশ হিসেবে দাতব্য সংস্থাগুলোর কাছ থেকে ‘লিড স্পনসর’ হওয়ার আবেদন গ্রহণ শুরু করেছে লেবার সরকার।
বৃহস্পতিবার (২৯ অক্টোবর) থেকে এ আবেদন প্রক্রিয়া চালু করেছে ব্রিটিশ হোম অফিস (স্বরাষ্ট্র মন্ত্রনালয়)। ব্রিটিশ স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী গত বছরের নভেম্বরে নতুন শরণার্থী পুনর্বাসনপথ চালুর প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। সেই প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের পথে এটিকে একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে।
আগামী বছরের শরৎকাল থেকে ‘নেমড কমিউনিটি স্পনসরশিপ’ এবং ‘রিফিউজি স্টাডি রুট’-এর আওতায় প্রথম শরণার্থীদের ব্রিটেনে আসার সুযোগ তৈরি হবে। নতুন এই উদ্যোগের মাধ্যমে শরণার্থীরা গ্রেটব্রিটেনে নিরাপদ আশ্রয় পাওয়ার পাশাপাশি পড়াশোনা, কর্মসংস্থানে অংশগ্রহণ এবং নতুন করে জীবন গড়ে তোলার সুযোগ পাবেন।
দাতব্য সংস্থা ও জাতিসংঘের শরণার্থী সংস্থা ইউএনএইচসিআর এ উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়েছে। এ ছাড়া শরণার্থীদের জন্য পৃথক একটি কর্মসংস্থানভিত্তিক অভিবাসনপথ চালুর পরিকল্পনা রয়েছে। ২০২৭ সালের সামারে ওই কর্মসূচির আবেদন গ্রহণ শুরু হবে।
নতুন কর্মসূচিটি কানাডার দীর্ঘদিনের বেসরকারি শরণার্থী স্পনসরশিপ ব্যবস্থার আদলে তৈরি করা হয়েছে। এর আওতায় হোম অফিসের স্বীকৃত ও তত্ত্বাবধানে থাকা লিড স্পনসররা স্থানীয় বিভিন্ন সংগঠন, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান, বিশ্ববিদ্যালয় এবং কমিউনিটি গ্রুপকে শরণার্থীদের স্বাগত জানাতে সহায়তা করবে।
লিড স্পনসর হওয়ার জন্য আবেদনকারী প্রতিষ্ঠানকে ব্রিটেনে নিবন্ধিত দাতব্য সংস্থা অথবা অলাভজনক প্রতিষ্ঠান হতে হবে। পাশাপাশি প্রতিষ্ঠানের সুনাম, প্রয়োজনীয় নিরাপত্তাব্যবস্থা, পর্যাপ্ত সম্পদ ও ব্যবস্থাপনার সক্ষমতা থাকতে হবে। লিড স্পনসরদের দায়িত্ব হবে স্থানীয় স্পনসর গ্রুপ গঠন ও পরিচালনায় সহায়তা করা, স্পনসরশিপের ব্যবস্থাগুলো যাচাই করা এবং পুরো প্রক্রিয়ার ওপর নিয়মিত নজরদারি রাখা।
এর মাধ্যমে ব্রিটেনে আসা শরণার্থীরা আবাসন, শিক্ষা, কর্মসংস্থান এবং স্থানীয় বিভিন্ন সেবা পাওয়ার ক্ষেত্রে সহযোগিতা পাবেন। ফলে নতুন পরিবেশে তাদের জীবন শুরু করা সহজ হবে।
সরকার জানিয়েছে, নতুন এই অভিবাসনপথগুলো নির্দিষ্ট সীমার মধ্যে এবং নিয়ন্ত্রিতভাবে পরিচালিত হবে। স্থানীয় কমিউনিটিগুলোর শরণার্থীদের স্পনসর করার সক্ষমতার ওপর ভিত্তি করেই কতজন শরণার্থী যুক্তরাজ্যে আসতে পারবেন, তা নির্ধারণ করা হবে। নতুন কর্মসূচি এবং বিদ্যমান ‘ইউকে রিসেটেলমেন্ট স্কিম’-এর আওতায় প্রাথমিক পর্যায়ে কয়েক শ শরণার্থীকে পুনর্বাসনের পরিকল্পনা রয়েছে।
পরবর্তী সময়ে অবৈধ অভিবাসনের মাত্রা কমলে এই সংখ্যা কয়েক হাজারে উন্নীত করা হবে। ব্রিটিশ সীমান্ত নিরাপত্তা ও আশ্রয়বিষয়ক মন্ত্রী আনা টারলি বলেন, দেশের বিভিন্ন এলাকার কমিউনিটিগুলো এখন যুদ্ধ ও নির্যাতন থেকে পালিয়ে আসা শরণার্থীদের স্বাগত জানানোর সুযোগ পাবে। এর মাধ্যমে তারা নতুন সমাজে নিজেদের অবস্থান তৈরি করতে এবং জীবন পুনর্গঠন করতে পারবেন।
তিনি বলেন, দাতব্য সংস্থা, কমিউনিটি গ্রুপ এবং বিশ্ববিদ্যালয়গুলো এই উদ্যোগের কেন্দ্রীয় ভূমিকা পালন করবে। যারা এগিয়ে আসবেন, তাদের সঙ্গে কাজ করার জন্য তিনি আগ্রহী।
আগামী কয়েক সপ্তাহের মধ্যে মন্ত্রী আনা টারলি এবং অভিবাসন ও নাগরিকত্ব বিষয়ক মন্ত্রী হোয়াইট বিভিন্ন দাতব্য ও অলাভজনক প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিদের সঙ্গে বৈঠক করবেন। নতুন কর্মসূচিগুলো সফল করতে তাদের মতামত ও অভিজ্ঞতা নেওয়া হবে।
সিটিজেনস ইউকের প্রধান নির্বাহী ম্যাথিউ বোল্টন বলেন, গির্জাভিত্তিক সংগঠন, সাবেক সেনাসদস্যদের সংগঠন, ফুটবল ক্লাব এবং দাতব্য প্রতিষ্ঠানসহ দেশের বিভিন্ন কমিউনিটি এ ঘোষণাকে স্বাগত জানাবে।
তিনি বলেন, ‘নেমড স্পনসরশিপ’ গ্রেটব্রিটেনের দীর্ঘদিনের মানবিক আশ্রয় প্রদানের ঐতিহ্যকে আরও এগিয়ে নিয়ে যাবে। এর মাধ্যমে স্থানীয় কমিউনিটিগুলো নিজেরাই অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়ানোর এবং তাদের জন্য একটি নিরাপদ আবাসস্থল গড়ে তোলার সুযোগ পাবে।
তার মতে, শরণার্থী পুনর্বাসনে কমিউনিটিকে সরাসরি সম্পৃক্ত করলে মানুষের জীবন বদলে দেওয়া সম্ভব। একই সঙ্গে দেশের শরণার্থী ব্যবস্থার প্রতি মানুষের আস্থা পুনর্গঠনের সুযোগ তৈরি হবে। সিটিজেনস ইউকে এ উদ্যোগে অংশ নিতে আগ্রহী স্থানীয় কমিউনিটিগুলোকে সহযোগিতা করছে।
কমিউনিটি স্পনসরশিপ অ্যালায়েন্সের (সিএসএ) যুগ্ম সভাপতি আমিনা খানম ও বেন স্টিলও নতুন উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়েছেন। তারা বলেন, কমিউনিটি স্পনসরশিপ ইতোমধ্যে প্রমাণ করেছে যে স্থানীয় জনগোষ্ঠী শরণার্থীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, দীর্ঘস্থায়ী সম্পর্ক গড়ে তোলা এবং নতুন সমাজের অংশ হতে সহায়তা করার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
নতুন লিড স্পনসরদের জন্য আবেদন উন্মুক্ত হওয়ায় আরও বেশি কমিউনিটির অংশগ্রহণের সুযোগ তৈরি হবে বলে তারা আশা প্রকাশ করেন। এ কর্মসূচিকে সফল ও দীর্ঘস্থায়ী করতে সরকার এবং সংশ্লিষ্ট অংশীদারদের সঙ্গে কাজ করার আগ্রহও জানিয়েছেন তারা।
এদিকে পাথওয়েজ ইন্টারন্যাশনালের গ্লোবাল ডিরেক্টর (স্পনসরশিপ অ্যান্ড নলেজ) হান্নাহ গ্রেগরি বলেন, বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ‘নেমড স্পনসরশিপ’ ব্যবস্থার ইতিবাচক ফলাফল দেখা গেছে। কানাডায় প্রায় ৫০ বছর ধরে বেসরকারি স্পনসরশিপ কর্মসূচির মাধ্যমে স্থানীয় মানুষ নতুন প্রতিবেশীদের স্বাগত জানিয়ে আসছেন।
গ্রেটব্রিটেনের নতুন কর্মসূচিও স্থানীয় জনগোষ্ঠীকে ক্ষমতায়িত করবে এবং নতুন আগত শরণার্থী ও তাদের স্বাগত জানানো মানুষের মধ্যে দীর্ঘস্থায়ী সম্পর্ক গড়ে তুলবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।
ব্রিটিশ নতুন শরণার্থী কর্মসূচি দেশটির দীর্ঘদিনের মানবিক আশ্রয় প্রদানের নীতির ধারাবাহিকতা। এর আগে সিরিয়ার গৃহযুদ্ধ, ইউক্রেনে রাশিয়ার আগ্রাসন এবং হংকংয়ের জনগণের প্রতি বিশেষ প্রতিশ্রুতির অংশ হিসেবে বিভিন্ন পুনর্বাসন উদ্যোগ গ্রহণ করেছে গ্রেটব্রিটেন।
এ ছাড়া নির্দিষ্ট মানবিক সংকট মোকাবিলায় বিশেষ ব্যবস্থাও অব্যাহত রয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে ইউক্রেন পারমিশন এক্সটেনশন স্কিমের মেয়াদ ২৪ মাস বাড়ানো, গাজা থেকে গুরুতর আহত শিশুদের চিকিৎসার জন্য ব্রিটেনে নিয়ে আসার ব্যবস্থা এবং গাজার চেভেনিং স্কলার ও সম্পূর্ণ অর্থায়নপ্রাপ্ত শিক্ষার্থীদের সহায়তা।
নতুন লিড স্পনসর আবেদন প্রক্রিয়া চালুর মধ্য দিয়ে ব্রিটেনে শরণার্থীদের জন্য নিরাপদ ও বৈধ পথে প্রবেশের সুযোগ সম্প্রসারণের উদ্যোগ আরও এক ধাপ এগিয়ে গেল। আগামী বছর থেকে নতুন কর্মসূচিগুলোর বাস্তবায়ন শুরু হলে স্থানীয় কমিউনিটি ও দাতব্য সংস্থাগুলোর অংশগ্রহণে শরণার্থী পুনর্বাসনের নতুন সুযোগ তৈরি হবে।

































































