প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রস্তাবিত ২৫০ ফুট উঁচু ‘ট্রায়াম্ফাল আর্চ’ (বিজয় তোরণ) নির্মাণের কাজ বন্ধ করার লক্ষ্যে, ওয়াশিংটন ডি.সি. এবং ভার্জিনিয়া অঙ্গরাজ্য শনিবার ন্যাশনাল পার্ক সার্ভিস ও স্বরাষ্ট্র বিভাগের বিরুদ্ধে একটি মামলা দায়ের করেছে। ট্রাম্প প্রশাসন জানিয়েছে, আগামী সপ্তাহ থেকেই এর নির্মাণকাজ শুরু হতে পারে।
এই নতুন মামলাটি ইতিমধ্যে চলমান আরও দুটি মামলার সাথে যুক্ত হলো। ওয়াশিংটন শহরকে নতুন করে সাজানোর ক্ষেত্রে ট্রাম্পের ক্ষমতার সীমা কতটুকু, তা নিয়ে যে আইনি লড়াই চলছে, এটি তার একটি নতুন সংযোজন।
প্রকল্পটিকে ‘সম্পূর্ণরূপে বেআইনি’ আখ্যা দিয়ে মামলাটিতে ‘কমেমোরেটিভ ওয়ার্কস অ্যাক্ট’ (স্মৃতিস্তম্ভ বিষয়ক আইন)-এর উল্লেখ করা হয়েছে। এই আইন অনুযায়ী, ওয়াশিংটন বা এর আশপাশের ফেডারেল জমিতে কোনো স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণের জন্য কংগ্রেসের অনুমোদনের প্রয়োজন হয়। এছাড়া, মামলাটিতে ‘অ্যাডমিনিস্ট্রেটিভ প্রসিডিউর অ্যাক্ট’, ‘ন্যাশনাল এনভায়রনমেন্টাল পলিসি অ্যাক্ট’ এবং ‘ন্যাশনাল হিস্টোরিক প্রিজারভেশন অ্যাক্ট’ লঙ্ঘনের অভিযোগ আনা হয়েছে। এতে বলা হয়েছে, প্রশাসন এই প্রকল্পের প্রভাবগুলো যথাযথভাবে মূল্যায়ন করেনি এবং আইন অনুযায়ী প্রয়োজনীয় পরামর্শ গ্রহণ করেনি।
ভার্জিনিয়ার অ্যাটর্নি জেনারেল জে জোন্স এবং ডি.সি.-র অ্যাটর্নি জেনারেল ব্রায়ান এল. শওয়ালব কর্তৃক দায়ের করা এই মামলায় বলা হয়েছে, “তোরণটির নির্মাণকাজ দ্রুত শুরু করার তাড়াহুড়োয় বিবাদীরা আইনি শর্তগুলো পালনের ক্ষেত্রে কেবল দায়সারা প্রচেষ্টা চালিয়েছে। সম্ভবত প্রকল্পটি যে আইনত টিকবে না তা বুঝতে পেরেই, বিবাদীরা বিচার বিভাগীয় পর্যালোচনার আগেই কাজ এগিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করছে।”
ওয়াশিংটন পোস্টকে দেওয়া এক বিবৃতিতে জে জোন্স বলেন, “এই পবিত্র স্থানের মর্যাদা রক্ষা করা আমাদের একটি গুরুদায়িত্ব এবং এতে আমাদের গভীর আগ্রহ রয়েছে। এর পবিত্রতা রক্ষা করতে এবং যারা সর্বোচ্চ আত্মত্যাগ করেছেন, তাদের স্মৃতির প্রতি সম্মান জানাতে আমরা আইনি লড়াই চালিয়ে যাব।”
ফেব্রুয়ারি মাসে দায়ের করা ‘লেমন বনাম ট্রাম্প’ (Lemmon v. Trump) নামক আরেকটি মামলার প্রেক্ষিতে ১৭ জুন ট্রাম্প প্রশাসন যুক্তি দিয়েছিল যে, ১৯২৫ সালেই কংগ্রেস এই এলাকায় নির্মাণের অনুমোদন দিয়েছিল। সে সময় ‘আর্লিংটন মেমোরিয়াল ব্রিজ’-এর পরিকল্পনা অনুমোদিত হয়েছিল, যার মধ্যে দুটি বিশাল স্তম্ভ নির্মাণের কথা ছিল। তবে সেই স্তম্ভগুলো কখনোই নির্মিত হয়নি।
‘লেমন’ মামলায় ভিয়েতনাম যুদ্ধের তিনজন প্রবীণ সৈনিক এবং একজন স্থাপত্য ইতিহাসবিদ যুক্তি দিয়েছেন যে, এই তোরণটি লিংকন মেমোরিয়াল এবং আর্লিংটন ন্যাশনাল সিমেট্রির মধ্যে ঐতিহাসিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ দৃশ্যপটকে বাধাগ্রস্ত করবে। বাদীদের দাবি, এই পরিকল্পনার জন্য কংগ্রেসের অনুমোদনের প্রয়োজন রয়েছে। এরপর ৮ অক্টোবর আর্লিংটন কাউন্টি বোর্ড একটি মামলা দায়ের করে। তাদের যুক্তি হলো, এই নির্মাণকাজ জরুরি পরিষেবার জন্য গুরুত্বপূর্ণ সড়কগুলোকে ব্যাহত করবে এবং আর্লিংটন ন্যাশনাল সিমেট্রির ওপর “উল্লেখযোগ্য ও ক্ষতিকর” প্রভাব ফেলবে।
এই মামলাগুলোর জবাবে এবং প্রকল্পটির জরুরি প্রয়োজনীয়তার সপক্ষে যুক্তি দিয়ে ট্রাম্প গত মাসে ঘোষণা করেন যে, প্রতিরক্ষা বিভাগের অনুরোধে তিনি পরিকল্পিত তোরণটির (আর্চ) মধ্যে একটি সামরিক কমপ্লেক্স অন্তর্ভুক্ত করতে সম্মত হয়েছেন; যার মধ্যে ড্রোন ও স্নাইপারদের জন্য প্রয়োজনীয় সুবিধাও থাকবে।
২৮ অক্টোবর আদালতে জমা দেওয়া শপথনামায় প্রতিরক্ষাসচিব পিট হেগসেথ এবং হোমল্যান্ড সিকিউরিটি সেক্রেটারি মার্কওয়েইন মুলিন পুনরায় দাবি করেন যে, জাতীয় নিরাপত্তার জন্য এই তোরণটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
হেগসেথ তাঁর শপথনামায় লিখেছেন, “ক্রমবর্ধমান এসব হুমকি মোকাবিলায় এই তোরণটি জাতীয় প্রতিরক্ষার ক্ষেত্রে একটি যুগান্তকারী সুযোগ।”
ফেডারেল পর্যালোচনা প্যানেল ‘ন্যাশনাল ক্যাপিটাল প্ল্যানিং কমিশন’ (এনসিপিসি) আগামী ৫ নভেম্বর তোরণটির স্থান ও নির্মাণ পরিকল্পনার চূড়ান্ত অনুমোদনের বিষয়টি বিবেচনা করবে। ওয়াশিংটন পোস্টের তথ্য অনুযায়ী, এই কমিশনে ট্রাম্পের নিয়োগ দেওয়া বেশ কয়েকজন সদস্য রয়েছেন এবং কমিশনের চেয়ারম্যান জানিয়েছেন তিনি এই প্রকল্পটিকে সমর্থন করার পরিকল্পনা করছেন।
এছাড়া, স্বরাষ্ট্র বিভাগকেও (ডিপার্টমেন্ট অব ইন্টেরিয়র) চূড়ান্ত অনুমোদন দিতে হবে এবং প্রয়োজনীয় বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করতে হবে। প্রশাসন আদালতকে জানিয়েছে, ৫ নভেম্বরের মধ্যেই এই প্রক্রিয়াগুলো সম্পন্ন করা সম্ভব এবং সেদিন থেকেই নির্মাণকাজ শুরু করা যেতে পারে।
শুক্রবার বিচার বিভাগ আদালতকে জানিয়েছে, উল্লিখিত ধাপগুলো সম্পন্ন হওয়ার পরপরই নির্মাণকাজ শুরু করা যাবে।
তবে মার্কিন ডিস্ট্রিক্ট জজ তানিয়া চুটকান এই তাড়াহুড়োর বিষয়ে সংশয় প্রকাশ করেছেন।
শুক্রবার ‘লেমন বনাম ট্রাম্প’ মামলার শুনানিতে বিচারক প্রশ্ন করেন, “সরকারের ৩-৪ মাস অপেক্ষা করতে সমস্যা কোথায়? এই তোরণটি স্থাপনের জন্য এত তাড়াহুড়ো কেন?”
বিচারক চুটকান মন্তব্য করেন যে বিষয়টি বেশ জটিল। তিনি জানান, সপ্তাহান্তের মধ্যে তিনি বাদীদের মামলার বৈধতা (স্ট্যান্ডিং) সংক্রান্ত বিষয়টি বিবেচনা করবেন এবং দ্রুত রায় দেবেন।
ট্রাম্পের অন্যান্য সংস্কার প্রকল্পের ওপর এই মামলাগুলোর প্রভাব কী হতে পারে? এই বিজয় তোরণটি (ট্রায়াম্ফাল আর্চ) ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদে ওয়াশিংটনকে নিজের পছন্দমতো নতুন করে সাজানোর পরিকল্পনার অংশগুলোর মধ্যে অন্যতম। এর মধ্যে আরও রয়েছে হোয়াইট হাউসের ইস্ট উইং ভেঙে সেখানে একটি বলরুম নির্মাণ, ঐতিহাসিক ইস্ট পোটোম্যাক গলফ কোর্সটি ১৫ মাসের জন্য বন্ধ রেখে সেটির ব্যাপক সংস্কার, এবং কেনেডি সেন্টারকে নতুন রূপ দিয়ে সেটির নাম পরিবর্তনের পরিকল্পনা।
শুক্রবার অনুষ্ঠিত শুনানিতে ডেপুটি অ্যাসিস্ট্যান্ট অ্যাটর্নি জেনারেল রবার্ট স্ট্যান্ডার সুপ্রিম কোর্টের আগস্ট মাসের ৫-৪ ব্যবধানের একটি রায়ের কথা উল্লেখ করেন। ওই রায়ে আইনি লড়াই চলাকালীন বলরুম নির্মাণের কাজ চালিয়ে যাওয়ার অনুমতি দেওয়া হয়েছিল। আদালতের সংখ্যাগরিষ্ঠ বিচারক মত দিয়েছিলেন যে, প্রশাসনই সম্ভবত শেষ পর্যন্ত জয়ী হবে; কারণ যারা এই নির্মাণের বিরোধিতা করছে, তারা এমন কোনো সুনির্দিষ্ট ক্ষতির প্রমাণ দেখাতে পারেনি যা মামলা করার জন্য প্রয়োজন।
স্ট্যান্ডার বলেন, “বিষয়টি একই।”
তবে বিচারক চুটকান মন্তব্য করেন যে, আইনি লড়াইয়ের এই দুটি ঘটনা প্রকৃতির দিক থেকে সম্পূর্ণ আলাদা।
“বলরুম সংক্রান্ত মামলাটি বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ দিক থেকে আলাদা,” তিনি বলেন। এ সময় তিনি উল্লেখ করেন যে, মামলার বাদীরা যান চলাচল ও জননিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন।
চুটকান প্রশাসনের দেওয়া জাতীয় নিরাপত্তার যুক্তি নিয়ে সংশয় প্রকাশ করেন। তিনি মনে করিয়ে দেন যে, ট্রাম্প যখন এই তোরণ (আর্চ) নির্মাণের ঘোষণা দিয়েছিলেন, তখন এর উদ্দেশ্য হিসেবে বলা হয়েছিল—এটি দেশের ২৫০তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উদযাপনের অংশ। তিনি বলেন, “এই প্রথম সরকার এই মামলায় জাতীয় নিরাপত্তার বিষয়টি সামনে নিয়ে এল।”
তোরণ নিয়ে এই বিতর্কটি প্রশাসনের নীতিগুলোর সপক্ষে বারবার ‘জাতীয় নিরাপত্তা’র দোহাই দেওয়ার বৃহত্তর বিতর্কেরই একটি অংশ।
হোয়াইট হাউসের বলরুম ও তোরণ নির্মাণের পক্ষে জাতীয় নিরাপত্তার যুক্তি দেওয়ার পাশাপাশি, ট্রাম্প প্রশাসন আরও বেশ কিছু ক্ষেত্রে জাতীয় নিরাপত্তার অজুহাত ব্যবহার করেছে। এর মধ্যে রয়েছে—সমুদ্রতীরবর্তী বায়ুবিদ্যুৎ প্রকল্প স্থগিত করা, সিএনএন (CNN), এমএসএনবিসি (MSNBC) ও পলিটিকো (Politico)-র সাংবাদিকদের হোয়াইট হাউসে প্রবেশে বাধা দেওয়া এবং মেক্সিকো উপসাগরে তেল ও গ্যাস উত্তোলনের কার্যক্রমকে ‘এন্ডেঞ্জারড স্পেসিস অ্যাক্ট’ (বিলুপ্তপ্রায় প্রজাতি সংরক্ষণ আইন)-এর কিছু বাধ্যবাধকতা থেকে অব্যাহতি দেওয়া।
গলফ কোর্স সংক্রান্ত মামলাটি কংগ্রেসের কর্তৃত্বের বিষয়েও একটি প্রশ্ন তুলেছে। বাদীদের যুক্তি হলো, ওয়াশিংটনে ফেডারেল সরকারি জমিতে কোনো কাঠামো নির্মাণ করতে হলে ফেডারেল আইন অনুযায়ী কংগ্রেসের সুনির্দিষ্ট অনুমোদনের প্রয়োজন।
আপাতত মূল প্রশ্ন হলো, আগামী সপ্তাহেই নির্মাণকাজ শুরু হওয়ার সম্ভাবনা থাকায়, তার আগেই কোনো আদালত এতে হস্তক্ষেপ করবে কি না।

































































