‘জাসদের মশাল নিভে যায়নি, নিভবে না: মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় অসাম্প্রদায়িক গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ পুনরুদ্ধারে ঐক্যবদ্ধ সংগ্রাম গড়ে তুলতে হবে’ হাসানুল হক ইনু, আমীর হোসেন আমু, রাশেদ খান মেননসহ সকল রাজবন্দির নিঃশর্ত মুক্তি, মব-সন্ত্রাস ও বিচারহীনতার অবসান এবং আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার দাবি।
জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল—জাসদের ৫৪তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে যুক্তরাজ্য জাসদ ও সর্ব ইউরোপীয় জাসদের যৌথ উদ্যোগে সোমবার, ২ নভেম্বর ২০২৬, সন্ধ্যা ৬টায় পূর্ব লন্ডনের ব্রিক লেনস্থ ক্যাফে গ্রিল রেস্তোরাঁর হলরুমে এক আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হয়।
১৯৭২ সালের ৩১ অক্টোবর প্রতিষ্ঠিত জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল—জাসদের ৫৪ বছরের রাজনৈতিক সংগ্রাম, আত্মত্যাগ, অর্জন ও ঐতিহাসিক ভূমিকা স্মরণ করে সভায় বক্তারা বলেন, স্বাধীনতা ও মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে অর্জিত বাংলাদেশের অসাম্প্রদায়িক জাতীয় পরিচয়, গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ, সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য এবং জনগণের মৌলিক অধিকার আজ গভীর সংকটের মুখোমুখি।
বক্তারা জাতীয় নেতা ও জাসদ সভাপতি বীর মুক্তিযোদ্ধা হাসানুল হক ইনু, প্রবীণ রাজনীতিক আমীর হোসেন আমু, রাশেদ খান মেননসহ সকল রাজবন্দির অবিলম্বে নিঃশর্ত মুক্তির জোর দাবি জানান। একই সঙ্গে রাজনৈতিক প্রতিহিংসা, হয়রানিমূলক মামলা, নির্বিচার গ্রেপ্তার এবং ভিন্নমত দমনের অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত ও অবসানের দাবি জানান।
সভায় বক্তারা দেশে মব-সন্ত্রাস, উচ্ছৃঙ্খল জনতার বিচারবহির্ভূত কর্মকাণ্ড, ভয়ভীতি, বিচারহীনতা এবং যেকোনো ধরনের স্বেচ্ছাচারী শাসনব্যবস্থার অবসান দাবি করেন। তাঁরা জনগণের জানমাল, সম্মান ও মর্যাদার নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা, বিচার বিভাগের পূর্ণ স্বাধীনতা এবং সকল নাগরিকের সমান সাংবিধানিক অধিকার নিশ্চিত করার আহ্বান জানান।
বক্তারা আরও বলেন, বাংলাদেশের স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব ও জাতীয় স্বার্থের পরিপন্থী যেকোনো বিদেশি চুক্তি বা সমঝোতা বাতিল করতে হবে। দেশের স্বার্থসংশ্লিষ্ট সকল আন্তর্জাতিক চুক্তিতে স্বচ্ছতা, জবাবদিহি এবং জনগণের কাছে দায়বদ্ধতা নিশ্চিত করতে হবে।
মহান মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস, স্বাধীনতার চেতনা, বাঙালির অসাম্প্রদায়িক জাতীয় পরিচয় এবং বাংলাদেশের বহুত্ববাদী সংস্কৃতি ধ্বংসের যেকোনো অপচেষ্টার বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ প্রতিরোধ গড়ে তোলার আহ্বান জানিয়ে বক্তারা বলেন, একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধ শুধু একটি ভূখণ্ডের স্বাধীনতার সংগ্রাম ছিল না; এটি ছিল শোষণ, বৈষম্য, সাম্প্রদায়িকতা ও পরাধীনতার বিরুদ্ধে বাঙালি জাতির ঐতিহাসিক মুক্তির সংগ্রাম।
যুক্তরাজ্য জাসদের কার্যকরী সভাপতি মুজিবুল হক মনির সভাপতিত্বে এবং ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক মোহাম্মদ শাহজাহানের সঞ্চালনায় অনুষ্ঠিত আলোচনা সভায় প্রধান অতিথি হিসেবে বক্তব্য রাখেন বীর মুক্তিযোদ্ধা মনিরুল হক মনি।
বিশেষ অতিথি ও আলোচক হিসেবে বক্তব্য রাখেন সর্ব ইউরোপীয় জাসদের সভাপতি মতিউর রহমান মতিন, যুক্তরাজ্য জাসদের সহসভাপতি আব্দুল হালিম চৌধুরী, যুক্তরাজ্য বঙ্গবন্ধু পরিষদের সাধারণ সম্পাদক আলিমুজ্জামান, লন্ডন মহানগর জাসদের সাধারণ সম্পাদক সাবুল শামছুজ্জামান, যুক্তরাজ্য জাসদের শিক্ষাবিষয়ক সম্পাদক মাহমুদুর রহমান শানুর, আওয়ামী লীগ নেতা আমিনুল হক জিলু, সাবেক ছাত্রনেতা নওশাদ নুরসহ অন্যান্য রাজনৈতিক, সামাজিক ও প্রগতিশীল নেতৃবৃন্দ।
আলোচনা সভায় বক্তারা জাসদের দীর্ঘ ৫৪ বছরের সংগ্রামী ইতিহাস, মুক্তিযুদ্ধে সংগঠনের প্রতিষ্ঠাতা নেতৃত্বের ভূমিকা, বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্রের আদর্শ, সামাজিক ন্যায়বিচার, শোষণমুক্ত সমাজ প্রতিষ্ঠার প্রত্যয় এবং গণতান্ত্রিক অধিকার প্রতিষ্ঠার আন্দোলনে জাসদের অবদান তুলে ধরেন।
বক্তারা দৃঢ় প্রত্যয় ব্যক্ত করে বলেন—
“জাসদের মশাল নিভে যায়নি, নিভবে না। মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে গড়ে ওঠা স্বাধীন বাংলাদেশের বীর মুক্তিযোদ্ধা ও সংগ্রামী রাজনৈতিক কর্মীদের নেতৃত্বে প্রতিষ্ঠিত জাসদ আজও তার আদর্শ, সংগ্রাম ও ঐতিহাসিক দায়িত্ব থেকে বিচ্যুত হয়নি। নানা প্রতিকূলতা, বিভাজন, নির্যাতন ও রাজনৈতিক সংকট অতিক্রম করেও জাসদের সংগ্রামী চেতনা আজও জীবন্ত।”
তাঁরা আরও বলেন, বাংলাদেশের বর্তমান সংকট উত্তরণে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের সকল গণতান্ত্রিক, অসাম্প্রদায়িক, প্রগতিশীল রাজনৈতিক শক্তি, সামাজিক সংগঠন, বুদ্ধিজীবী, সাংস্কৃতিক কর্মী, তরুণ প্রজন্ম এবং সর্বস্তরের জনগণের মধ্যে বৃহত্তর জাতীয় ঐক্য গড়ে তোলা সময়ের অপরিহার্য দাবি।
“আমাদের লক্ষ্য প্রতিহিংসা নয়—ন্যায়বিচার; বিভাজন নয়—জাতীয় ঐক্য; সাম্প্রদায়িকতা নয়—অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশ; স্বৈরাচার নয়—জনগণের গণতান্ত্রিক অধিকার ও সাংবিধানিক শাসন প্রতিষ্ঠা।”
বক্তারা মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ও ১৯৭২ সালের সংবিধানের মৌলিক রাষ্ট্রীয় আদর্শের ভিত্তিতে একটি গণতান্ত্রিক, ধর্মনিরপেক্ষ, মানবিক ও বৈষম্যহীন বাংলাদেশ পুনরুদ্ধার এবং পুনর্জয়ের লক্ষ্যে ঐক্যবদ্ধ, শান্তিপূর্ণ ও গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক সংগ্রাম গড়ে তোলার অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করেন।
আলোচনা সভা শেষে অনুষ্ঠানের দ্বিতীয় পর্বে উপস্থিত অতিথি, নেতাকর্মী ও শুভানুধ্যায়ীদের অংশগ্রহণে নৈশভোজের আয়োজন করা হয়। নৈশভোজ ও পারস্পরিক সৌহার্দ্য বিনিময়ের মধ্য দিয়ে জাসদের ৫৪তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর কর্মসূচির সমাপ্তি ঘটে।
জাসদের ৫৪তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর অঙ্গীকার—
মুক্তিযুদ্ধের চেতনা সমুন্নত রাখো, সকল রাজবন্দির মুক্তি নিশ্চিত করো, মব-সন্ত্রাস ও বিচারহীনতা রুখে দাঁড়াও, গণতন্ত্র ও আইনের শাসন পুনঃপ্রতিষ্ঠায় ঐক্যবদ্ধ হও।

































































