বাংলাদেশের পিরোজপুরে বীর মুক্তিযোদ্ধা মানিক পশারীর মৃত্যুর পর তাঁর রাষ্ট্রীয় সম্মান ও পারিবারিক কবরস্থানে দাফন নিয়ে বাধা সৃষ্টি এবং তাঁর বাড়ির সামনে বিক্ষোভের ঘটনার প্রতিবাদে যুক্তরাজ্যে বসবাসরত বীর মুক্তিযোদ্ধারা এক প্রতিবাদ সভা করেছেন।
১ নভেম্বর পূর্ব লন্ডনের ক্যাফে গ্রিল রেস্টুরেন্টে আয়োজিত এ সভায় বক্তারা একজন বীর মুক্তিযোদ্ধার মৃত্যুর পর তাঁর প্রাপ্য রাষ্ট্রীয় সম্মান ও মর্যাদার সঙ্গে শেষ বিদায়ের পথে বাধা সৃষ্টির ঘটনায় গভীর ক্ষোভ ও তীব্র নিন্দা প্রকাশ করেন।
প্রতিবাদ সভার শুরুতে ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধে আত্মোৎসর্গকারী সকল বীর শহীদের স্মৃতির প্রতি গভীর শ্রদ্ধা জানিয়ে উপস্থিত সবাই এক মিনিট দাঁড়িয়ে নীরবতা পালন করেন। এ সময় সদ্যপ্রয়াত তিনজন বীর মুক্তিযোদ্ধা মুহাম্মদ মোস্তফা উদ্দিন, সাঈদা কামাল (টুলু) ও মির্জা জামাল পাশাসহ একাত্তরের রণাঙ্গন থেকে শুরু করে এ পর্যন্ত মৃত্যুবরণকারী সকল বীর মুক্তিযোদ্ধার আত্মার মাগফিরাত কামনায় বিশেষ দোয়া পরিচালনা করেন বীর মুক্তিযোদ্ধা আব্দুর রহিম। সভায় সভাপতিত্ব করেন বীর মুক্তিযোদ্ধা ফয়জুর রহমান খান। সভা পরিচালনা করেন বীর মুক্তিযোদ্ধা লোকমান হোসেন।
প্রতিবাদ সভায় উপস্থিত বীর মুক্তিযোদ্ধারা হলেন আবু মুসা হাসান হাসান, মিফতাউল ইসলাম, আবদুল মান্নান, সাদ উদ্দিন, মোঃ আমির খান, আলা উদ্দিন, সৈয়দ গোলাম আলী, আফতাব উদ্দিন নাসির, আব্দুর রহিম, ড. আব্দুল মুবিন, আব্দুর রহমান, দেওয়ান, গৌস সুলতান, হুমায়ুন কবির ও কবির আহমদ।
সভায় বক্তারা বলেন, মহান মুক্তিযুদ্ধ বাংলাদেশের ইতিহাস, আত্মপরিচয় ও গৌরবের অবিচ্ছেদ্য অংশ। দীর্ঘ নয় মাসের রক্তক্ষয়ী সংগ্রাম, অসংখ্য শহীদের আত্মত্যাগ এবং মুক্তিযোদ্ধাদের বীরত্বের বিনিময়ে অর্জিত হয়েছে আমাদের স্বাধীনতা। সেই স্বাধীন দেশে একজন বীর মুক্তিযোদ্ধার মৃত্যুর পর তাঁর মর্যাদাপূর্ণ বিদায় ও দাফনে বাধা সৃষ্টি করা অত্যন্ত বেদনাদায়ক, অনাকাঙ্ক্ষিত এবং নিন্দনীয়।
তাঁরা বলেন, মুক্তিযোদ্ধারা কোনো বিশেষ রাজনৈতিক দলের সম্পদ নন; তাঁরা সমগ্র জাতির গর্ব ও অহংকার। রাজনৈতিক মতপার্থক্য কিংবা ব্যক্তিগত বিরোধের কারণে একজন মুক্তিযোদ্ধার রাষ্ট্রীয় সম্মান, মানবিক অধিকার ও ধর্মীয় মর্যাদা ক্ষুণ্ন করার কোনো সুযোগ নেই। বিশেষ করে মৃত্যুর পর একজন মানুষের মর্যাদাপূর্ণ দাফন নিশ্চিত করা সামাজিক, মানবিক ও ধর্মীয় দায়িত্ব।
বক্তারা আরও বলেন, মুক্তিযোদ্ধারা কোনো বিশেষ দলের রাজনীতি করেন না। তবে বঙ্গবন্ধু ও জয়বাংলার প্রশ্নে কোনো আপস নেই। কারণ বঙ্গবন্ধু, জয়বাংলা এবং বাংলাদেশের স্বাধীনতা ও মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস একে অপরের সঙ্গে অবিচ্ছেদ্যভাবে জড়িত। এই ইতিহাসকে অস্বীকার করার অর্থ বাংলাদেশের জন্মের ইতিহাস ও আত্মত্যাগকে অস্বীকার করা।
সভায় বীর মুক্তিযোদ্ধা মানিক পশারীর মৃত্যুর পর সৃষ্ট ঘটনার সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ তদন্ত, ঘটনার সঙ্গে জড়িতদের চিহ্নিত করে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ এবং ভবিষ্যতে কোনো বীর মুক্তিযোদ্ধাকে যেন এ ধরনের অসম্মানজনক পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে না হয়, সে জন্য রাষ্ট্রীয়ভাবে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণের দাবি জানানো হয়।
বক্তারা বলেন, মুক্তিযোদ্ধাদের সম্মান রক্ষা করা মানে বাংলাদেশের স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব ও গৌরবময় ইতিহাসকে সম্মান করা। যে জাতি তার শ্রেষ্ঠ সন্তানদের যথাযথ মর্যাদা দিতে ব্যর্থ হয়, সেই জাতির ইতিহাস ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে দায়বদ্ধতা থেকে যায়।
প্রতিবাদ সভায় যুক্তরাজ্যে বসবাসরত বীর মুক্তিযোদ্ধারা ঐক্যবদ্ধভাবে বীর মুক্তিযোদ্ধা মানিক পশারীর প্রতি অবমাননাকর আচরণের তীব্র নিন্দা জানান। একই সঙ্গে মহান মুক্তিযুদ্ধের চেতনা, শহীদদের আত্মত্যাগ এবং বীর মুক্তিযোদ্ধাদের মর্যাদা ও সম্মান অক্ষুণ্ন রাখার দৃঢ় প্রত্যয় ব্যক্ত করেন।

































































