দেশটা আমাদের। এই দেশটা কোনো লুটেরা, ঘুষখোর, দুর্নীতিবাজ কিংবা দখলদারদের নয়। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য—আমরা এখনো এই সহজ সত্যটি হৃদয়ে ধারণ করতে শিখিনি। আর এই অক্ষমতাকেই পুঁজি করে একটি শ্রেণি বছরের পর বছর ধরে —লুটপাট করে, দুর্নীতি করে, প্রতারণা করে, ঘুষ খায়, ব্যাংক জালিয়াতি করে এবং বিদেশে অর্থ পাচারের মতো অপরাধ করে যাচ্ছে। দেশটা আমাদের। কিন্তু বাস্তবতা হলো, আমরা এখনো এই কথার গভীর তাৎপর্য অনুধাবন করতে পারিনি। ফলে রাষ্ট্র ও সমাজের নানা স্তরে এক ধরনের নৈতিক শূন্যতা তৈরি হয়েছে, যা দুর্নীতি ও অন্যায়ের জন্য উর্বর ক্ষেত্র হিসেবে কাজ করছে। এই অচেতনতা এবং দায়বদ্ধতার অভাবকে পুঁজি করেই একটি সুবিধাভোগী গোষ্ঠী দীর্ঘদিন ধরে রাষ্ট্রীয় সম্পদ লুটে নিচ্ছে। তারা দুর্নীতিকে পেশা বানিয়েছে, ঘুষকে নিয়মে পরিণত করেছে এবং ব্যাংক খাতসহ বিভিন্ন আর্থিক প্রতিষ্ঠানে অনিয়মকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিয়েছে। দেশের অর্থ বিদেশে পাচার হওয়া এখন আর বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়; বরং এটি একটি ধারাবাহিক প্রবণতা হিসেবে দৃশ্যমান।
যখনই কেউ এই অন্যায় ও অনিয়মের বিরুদ্ধে কথা বলতে চায়, তখনই তার সামনে নানা প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করা হয়। কখনো সামাজিক চাপ, কখনো প্রশাসনিক জটিলতা, আবার কখনো সরাসরি হুমকি—এই সবকিছুর মাধ্যমে প্রতিবাদী কণ্ঠকে স্তব্ধ করে দেওয়া হয়। ফলে ধীরে ধীরে সমাজে একটি ভয়ের সংস্কৃতি গড়ে ওঠে, যেখানে অন্যায়ের বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়া একটি ঝুঁকিপূর্ণ কাজ হয়ে দাঁড়ায়। ফলে খুন,অপহরণ, ধর্ষন, হত্যা, আত্মহত্যা, মবসন্ত্রাস, কিশোর গ্যাং, মদক ব্যবসা, মাদকাসক্ত, সাম্প্রদায়ীক উস্কানী ও নির্যাতনের মতো অন্যায় যেন ধীরে ধীরে স্বাভাবিকতায় পরিণত হয়েছে—এটাই যেন আমাদের বর্তমান বাস্তবতা। দেশটা আমাদের এই সত্যটুকু বুঝার সামর্থ অর্জন করা জরুরী।
১৯৭১এর মহান মুক্তিযুদ্ধ থেকে শুরু করে সাম্প্রতিক গণআন্দোলনগুলো পর্যন্ত দেশের প্রতিটি গণআন্দোলনে আমাদের ভূমিকাই ছিল সর্বোচ্চ। আমাদেরই ছিল ত্যাগ, আমাদেরই ছিল রক্ত, আমাদেরই ছিল শ্রম ও জীবনবলিদান। কিন্তু দুঃখজনক সত্য আন্দোলনের সুফলটা সবসময়ই লুটে নিয়েছে একটি সুবিধাভোগী গোষ্ঠী। আর সাধারণ মানুষ বারবার শোষণের যাঁতাকলে পিষ্ট হয়েছে। বাংলাদেশের ইতিহাসের দিকে তাকালে দেখা যায়, এই দেশের মানুষ কখনোই অন্যায়ের কাছে মাথা নত করেনি। দুঃখজনকভাবে, ইতিহাস বলছে ভিন্ন কথা। আন্দোলনের পরপরই একটি প্রভাবশালী গোষ্ঠী সেই অর্জনের সুফল নিজেদের মধ্যে সীমাবদ্ধ করে ফেলেছে। আর সাধারণ মানুষ, যারা এই অর্জনের মূল চালিকাশক্তি ছিল, তারা থেকে গেছে প্রান্তিক অবস্থানে। অর্থনৈতিক বৈষম্য, সামাজিক অসাম্য এবং সুযোগের অভাব তাদের জীবনকে আরও কঠিন করে তুলেছে।
কে গরু খেল, কে শূকর খেল, আর মদ খেল এইসব অপ্রাসঙ্গিক বিতর্ক। আমাদের ব্যস্ত রাখা হয় তুচ্ছতায়, যাতে আমরা বড় প্রশ্নগুলো ভুলে যাই। কিন্তু আমরা যারা অনাহারী, কিছুই খেতে পেলাম না তাদের কথা সমসময়ই এড়িয়ে যাওয়া হয়। কিন্তু যারা অনাহারে দিন কাটায়, যাদের মুখে একবেলা খাবার জোটে না— তাদের কথা কি আমরা কখনো সত্যিই বলি? অথচ বাস্তবতা হলো—এই দেশের একটি বড় অংশ এখনো অনাহারে দিন কাটায়। অনেকের মুখে একবেলা খাবার জোটে না। কিন্তু তাদের কথা আমাদের আলোচনার কেন্দ্রে খুব কমই আসে। আমরা হয়তো বিতর্কে মুখর, কিন্তু নীরব থাকি প্রকৃত সংকটের সামনে। এখানে একটি কৌশল স্পষ্টভাবে কাজ করে—আমাদের প্রকৃত সমস্যা থেকে দূরে সরিয়ে রাখা। কে কী খেল, কে কী পরল, কে কোন মতাদর্শে বিশ্বাস করে ইত্যাদি—এইসব তুচ্ছ ও অপ্রাসঙ্গিক বিতর্ক সামনে এনে আমাদের ব্যস্ত রাখা হয়। আমরা যেন বড় প্রশ্নগুলো করতে ভুলে যাই—কেন দুর্নীতি হচ্ছে? কেন অর্থ পাচার বন্ধ হচ্ছে না? কেন বৈষম্য বাড়ছে? কেন সংখ্যালঘু নির্যাতনের মাত্রা দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে, কেন সামাজিক নিরাপত্তা হ্রাস পাচ্ছে?
এই প্রক্রিয়াকে টিকিয়ে রাখার জন্য একটি কৌশল সচেতনভাবে প্রয়োগ করা হয়—জনগণকে মূল সমস্যা থেকে দূরে সরিয়ে রাখা। সমাজে এমন সব বিতর্ক ছড়িয়ে দেওয়া হয়, যা আবেগপ্রবণ হলেও মৌলিক নয়। কে কী খেল, কে কোন জীবনধারা অনুসরণ করে, কে কোন মতাদর্শে বিশ্বাস করে—এইসব বিষয় সামনে এনে জনগণকে বিভ্রান্ত করা হয়। ফলে মানুষ প্রকৃত সমস্যাগুলো নিয়ে ভাবার সুযোগ পায় না বা আগ্রহ হারিয়ে ফেলে। অথচ বাস্তবতা হলো, দেশের একটি বড় অংশ এখনো দারিদ্র্যসীমার নিচে বাস করে। অনেক মানুষ প্রতিদিন অনাহারের সঙ্গে লড়াই করে। তাদের জন্য উন্নয়ন কিংবা প্রবৃদ্ধির পরিসংখ্যান খুব একটা অর্থবহ নয়। তারা চায় ন্যূনতম নিরাপত্তা, খাদ্য এবং সম্মানজনক জীবনযাপনের সুযোগ। কিন্তু তাদের এই মৌলিক চাহিদাগুলো প্রায়ই আলোচনার বাইরে থেকে যায়।
জ্যেষ্ঠ আইনজীবী তৈমূর আলম খন্দকার একবার একটি তীক্ষ্ণ মন্তব্য করেছিলেন—“ব্রিটিশরা যেখানে চারজন মানুষ এক জায়গায় হলে একটি ক্লাব করে, বাংলাদেশে মনে হয় দশজন বাটপার একত্র হলে একটি ব্যাংক করে। এক ব্যাংকের ঋণখেলাপি অন্য ব্যাংকের পরিচালক।” কথাটি নিছক কৌতুক নয়; বরং এটি আমাদের অর্থনৈতিক ও নৈতিক সংকটের একটি নগ্ন প্রতিফলন।
সমস্যার মূল কারণগুলো বিশ্লেষণ করলে কয়েকটি বিষয় স্পষ্ট হয়ে ওঠে। প্রথমত, জবাবদিহিতার অভাব। যখন কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান তাদের কাজের জন্য জবাবদিহি করতে বাধ্য হয় না, তখন অনিয়ম ও দুর্নীতি বাড়ার সুযোগ পায়। দ্বিতীয়ত, আইনের শাসনের দুর্বল প্রয়োগ। আইন থাকলেও যদি তা সবার ক্ষেত্রে সমানভাবে প্রয়োগ না হয়, তবে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা সম্ভব নয়। তৃতীয়ত, নাগরিক সচেতনতার ঘাটতি। মানুষ যদি তাদের অধিকার ও দায়িত্ব সম্পর্কে সচেতন না হয়, তবে তারা সহজেই বিভ্রান্তির শিকার হয়।
এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের জন্য প্রয়োজন একটি সমন্বিত উদ্যোগ, সচেতনতা ও দায়িত্ববোধ। রাষ্ট্রকে তার দায়িত্ব পালন করতে হবে—দুর্নীতির বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া, আইনের শাসন নিশ্চিত করা এবং স্বচ্ছতা প্রতিষ্ঠা করা। একই সঙ্গে নাগরিকদেরও সক্রিয় ভূমিকা নিতে হবে। শুধুমাত্র নির্বাচনের সময় ভোট দেওয়া নয়, বরং প্রতিদিনের জীবনে অন্যায়ের বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়া, প্রশ্ন করা এবং সঠিককে সমর্থন করা জরুরি। বিশেষ করে তরুণ প্রজন্মের ভূমিকা এখানে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তারা যদি সচেতন ও দায়িত্বশীল নাগরিক হিসেবে গড়ে ওঠে, তবে ভবিষ্যতে একটি ইতিবাচক পরিবর্তন আনা সম্ভব। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমসহ বিভিন্ন প্ল্যাটফর্মকে ইতিবাচকভাবে ব্যবহার করে সচেতনতা বৃদ্ধি করা যেতে পারে। আমাদের প্রত্যেককে নিজের অবস্থান থেকে দায়িত্ব পালন করতে হবে। সময় এসেছে এই চক্র ভাঙার। সময় এসেছে সত্যিকারের অর্থে দেশকে নিজেদের করে নেওয়ার—চিন্তায়, চেতনায় এবং কাজে।
সুধীর বরণ মাঝি, শিক্ষক
হাইমচর সরকারি মহাবিদ্যালয়, হাইমচর, চাঁদপুর।








































