বখতিয়ার রহমান
মার্কিন শ্রম বিভাগের অফিস অফ ইন্সপেক্টর জেনারেল (OIG) এবং প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও ভাইস প্রেসিডেন্ট জে.ডি. ভ্যান্সের নেতৃত্বাধীন ‘জালিয়াতি নির্মূল টাস্ক ফোর্স’ (White House Task Force to Eliminate Fraud) যৌথভাবে এইচ-১বি (H-1B) এবং PERM ভিসা জালিয়াতি ও মানব পাচারের বিরুদ্ধে দেশব্যাপী এক বড় ধরনের তদন্ত ও অভিযান শুরু করেছে।
এই তদন্তের অংশ হিসেবে সম্প্রতি টেক্সাসের ডালাসে সরেজমিন অভিযান চালানো হয়েছে এবং ক্যালিফোর্নিয়ায় একাধিক ভিসা দালাল ও প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে আদালতে দোষ স্বীকার ও কারাদণ্ডের রায় ঘোষণা করা হয়েছে। কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, এই জালিয়াতি চক্রগুলো কেবল আমেরিকান কর্মীদের কর্মসংস্থান কেড়ে নিচ্ছে না, বরং বিদেশি কর্মীদের জোরপূর্বক শ্রমে বাধ্য করে তাদের মৌলিক অধিকারও লঙ্ঘন করছে।
🔍 ডালাসে OIG-এর সরেজমিন অভিযান
গত ১৩ আগস্ট, মার্কিন শ্রম বিভাগের ইন্সপেক্টর জেনারেল অ্যান্থনি পি. ডি’এসপোসিটো টেক্সাসের ডালাসে সরেজমিনে তদন্তকারী কর্মকর্তাদের সাথে বৈঠক করেন। এ সময় তিনি এমন একটি বহুতল ভবন পরিদর্শন করেন, যেখানে ৫০০টিরও বেশি অনুমোদিত এইচ-১বি আবেদনের সাথে জড়িত অসংখ্য ব্যবসা প্রতিষ্ঠান থাকার কথা ছিল। কিন্তু বাস্তবে দেখা গেছে, ওই ভবনের বেশিরভাগ অফিসই তালাবদ্ধ, আলো নেভানো এবং সেখানে কোনো ধরনের ব্যবসায়িক কার্যক্রমের চিহ্নমাত্র নেই।
ইন্সপেক্টর জেনারেল ডি’এসপোসিটো বলেন, “আমরা একটি স্পষ্ট বার্তা দিচ্ছি: আমাদের বিদেশি শ্রম বিষয়ক কর্মসূচিগুলোতে কোনো ধরনের জালিয়াতি সহ্য করা হবে না। যখন এই ব্যবস্থার অপব্যবহার করা হয়, তখন কঠোর পরিশ্রমী আমেরিকানদেরই তার মাশুল দিতে হয়।”
⚖️ ভুয়া ‘এন্ড-ক্লায়েন্ট’ দেখিয়ে কারাদণ্ড
সান হোসে ভিত্তিক কর্মী সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান ‘ন্যানোসিম্যান্টিকস, ইনকর্পোরেটেড’ (Nanosemantics, Inc.)-এর সহ-মালিক ৫৫ বছর বয়সী কিশোর দত্তপুরমকে ভিসা জালিয়াতির দায়ে ১৪ মাসের ফেডারেল কারাদণ্ড দিয়েছেন মার্কিন ডিস্ট্রিক্ট জজ এডওয়ার্ড জে. ডেভিলা।
তদন্তে জানা যায়, দত্তপুরম ও তার সহযোগীরা এইচ-১বি আবেদনে মিথ্যা তথ্য দিয়ে দাবি করতেন যে, বিদেশি কর্মীদের জন্য নির্দিষ্ট কিছু কোম্পানিতে চাকরি অপেক্ষা করছে। বাস্তবে ওই কর্মীরা কখনোই সে কোম্পানিতে কাজ করতেন না। চাকরি নিশ্চিত হওয়ার আগেই ভিসা পেতে এবং প্রতিযোগীদের চেয়ে এগিয়ে থাকতে তারা এই জালিয়াতি করতেন। কারাদণ্ডের পাশাপাশি তাকে ১,২৫,৪৫৬.৪৮ ডলার বাজেয়াপ্ত, ৭,৫০০ ডলার জরিমানা এবং ১,১০০ ডলার বিশেষ মূল্যায়ন ফি দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন আদালত।
🏛️ ইউনিভার্সিটির নাম ব্যবহার করে প্রতারণা
অপর এক মামলায়, ডাবলিনের বাসিন্দা ৫১ বছর বয়সী সম্পথ রাজিদি এবং শ্রীধর মাডা ভিসা জালিয়াতির ষড়যন্ত্রে দোষী সাব্যস্ত হয়েছেন।
রাজিদি ‘এস-টিম সফটওয়্যার ইনকর্পোরেটেড’ এবং ‘আপট্রেন্ড টেকনোলজিস এলএলসি’ নামে দুটি ভিসা পরিষেবা কোম্পানি পরিচালনা করতেন। মাডা ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের (UCANR) চিফ ইনফরমেশন অফিসার (CIO) হিসেবে কর্মরত ছিলেন। ২০২০ থেকে ২০২৩ সালের মধ্যে তারা মিথ্যা এইচ-১বি আবেদন জমা দেন, যেখানে দাবি করা হয় বিদেশি কর্মীরা ইউনিভার্সিটি অফ ক্যালিফোর্নিয়ার প্রকল্পে কাজ করবেন। মাডা তার পদমর্যাদার অপব্যবহার করে এই ভুয়া চাকরির বিষয়টি বিশ্বাসযোগ্য করতে সহায়তা করেন। কিন্তু বাস্তবে ওই পদগুলোর কোনো অস্তিত্বই ছিল না; ভিসা পাওয়ার পর তাদের অন্য ক্লায়েন্টদের কাছে কাজে পাঠানো হতো।
📢 হুইসেলব্লোয়ারদের জন্য হটলাইন ও পুরস্কার
এই ধরনের জালিয়াতি রোধে জনসচেতনতা বাড়াতে OIG একটি দেশব্যাপী উদ্যোগ নিয়েছে। যেসব মার্কিন কর্মী মনে করছেন তাদের চাকরি কেড়ে নেওয়া হয়েছে, অথবা যেসব বিদেশি কর্মী ‘বেঞ্চিং’ (কাজ না দিয়ে বসিয়ে রাখা), মজুরি ফেরত দিতে বাধ্য করা (wage kickback) বা প্রতারণার শিকার হয়েছেন, তাদেরকে গোপন ভাবে অভিযোগ জানানোর আহ্বান জানানো হয়েছে।
সতর্কতামূলক তথ্য প্রদানকারীদের নগদ পুরস্কার বা অন্যান্য সুবিধা দেওয়ার কথাও জানিয়েছে কর্তৃপক্ষ। অভিযোগ জানাতে মার্কিন শ্রম বিভাগের OIG হটলাইনে (১-৮০০-৩৪৭-৩৭৫৬) অথবা তাদের অফিসিয়াল ওয়েবসাইটের (oig.dol.gov) মাধ্যমে যোগাযোগ করা যাবে।
মার্কিন সরকারের এই কঠোর পদক্ষেপ প্রবাসী এবং বৈধ ভিসাধারী কর্মীদের মধ্যে একদিকে যেমন স্বস্তি ফিরিয়ে আনবে, তেমনি অসাধু নিয়োগকর্তা ও দালালদের জন্য একটি বড় সতর্কবার্তা হিসেবে কাজ করবে।

































































