মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স রবিবার বলেছেন, ২১ ঘণ্টার আলোচনার পর ইরানের সঙ্গে কোনো চুক্তিতে পৌঁছাতে না পারায় তার আলোচক দল পাকিস্তান ত্যাগ করছে, যা দুই সপ্তাহের ভঙ্গুর যুদ্ধবিরতিকে ঝুঁকির মধ্যে ফেলেছে।
আলোচনা শেষ হওয়ার পর ভ্যান্স সাংবাদিকদের বলেন, “খারাপ খবর হলো, আমরা কোনো চুক্তিতে পৌঁছাতে পারিনি, এবং আমি মনে করি এটি যুক্তরাষ্ট্রের চেয়ে ইরানের জন্য অনেক বেশি খারাপ খবর।” “সুতরাং, আমরা কোনো চুক্তিতে না পৌঁছেই যুক্তরাষ্ট্রে ফিরে যাচ্ছি। আমাদের রেড লাইনগুলো কী, তা আমরা খুব স্পষ্টভাবে জানিয়ে দিয়েছি।”
ভ্যান্স আলোচনায় ত্রুটির কথা উল্লেখ করে বলেন, ইরান পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি না করার মতো মার্কিন শর্তগুলো গ্রহণ না করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এর কিছুক্ষণ পরেই, ইসলামাবাদে এয়ার ফোর্স টু-তে ওঠার সময় ভ্যান্স সিঁড়ির উপর থেকে হাত নেড়ে বিদায় জানান।
আমাদের একটি ইতিবাচক অঙ্গীকার দেখতে হবে যে তারা পারমাণবিক অস্ত্র চাইবে না এবং এমন কোনো সরঞ্জামও চাইবে না যা তাদের দ্রুত পারমাণবিক অস্ত্র অর্জনে সক্ষম করবে। এটাই মার্কিন প্রেসিডেন্টের মূল লক্ষ্য, এবং এই আলোচনার মাধ্যমে আমরা সেটাই অর্জন করার চেষ্টা করেছি।
ইরানের আধা-সরকারি সংবাদ সংস্থা তাসনিম জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের ‘অতিরিক্ত’ দাবি একটি চুক্তিতে পৌঁছানোকে বাধাগ্রস্ত করেছে এবং আলোচনা শেষ হয়ে গেছে। ভ্যান্সের বক্তব্যের আগে, ইরানের সরকার এক্স-এ একটি পোস্টে জানিয়েছিল আলোচনা চলবে এবং উভয় পক্ষের কারিগরি বিশেষজ্ঞরা নথি বিনিময় করবেন।
ইসলামাবাদে অনুষ্ঠিত এই আলোচনা ছিল এক দশকেরও বেশি সময়ের মধ্যে প্রথম সরাসরি যুক্তরাষ্ট্র-ইরান বৈঠক এবং ১৯৭৯ সালের ইসলামী বিপ্লবের পর সর্বোচ্চ পর্যায়ের আলোচনা।
তার সংক্ষিপ্ত সংবাদ সম্মেলনে ভ্যান্স হরমুজ প্রণালী পুনরায় খোলার বিষয়ে কোনো উল্লেখ করেননি। এই প্রণালীটি বিশ্বের প্রায় ২০ শতাংশ জ্বালানি সরবরাহের একটি গুরুত্বপূর্ণ পথ, যা যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে ইরান অবরুদ্ধ করে রেখেছে। এই সংঘাত বিশ্বব্যাপী তেলের দাম আকাশচুম্বী করে দিয়েছে এবং হাজার হাজার মানুষের প্রাণ কেড়ে নিয়েছে।
ভ্যান্সের প্রতিনিধিদলে ছিলেন বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফ এবং প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের জামাতা জ্যারেড কুশনার। ভ্যান্স বলেন, আলোচনার সময় তিনি ট্রাম্পের সঙ্গে ছয় থেকে বারোবার কথা বলেছেন।
ইরানের দলে ছিলেন সংসদীয় স্পিকার মোহাম্মদ বাকের কালিবাফ এবং পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাকচি।
প্রয়াত সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি এবং যুদ্ধে নিহত অন্যদের প্রতি শোক প্রকাশ করে ইরানি প্রতিনিধিদলটি শুক্রবার কালো পোশাক পরে এসে পৌঁছায়। ইরান সরকার জানিয়েছে, তারা একটি সামরিক ঘাঁটির পাশের স্কুলে মার্কিন বোমাবর্ষণে নিহত কিছু ছাত্রের জুতো ও ব্যাগ বহন করছিল। পেন্টাগন জানিয়েছে, এই হামলাটি তদন্তাধীন রয়েছে, কিন্তু রয়টার্স জানিয়েছে সামরিক তদন্তকারীরা মনে করছেন এর জন্য সম্ভবত যুক্তরাষ্ট্রই দায়ী।
প্রথম দফার আলোচনার প্রসঙ্গে একটি পাকিস্তানি সূত্র জানায়, “বৈঠক চলাকালীন দুই পক্ষের মেজাজের ওঠানামা হচ্ছিল।”
যুক্তরাষ্ট্র-ইরান আলোচনার জন্য ২০ লাখেরও বেশি মানুষের শহর ইসলামাবাদকে অবরুদ্ধ করে রাখা হয়েছিল এবং রাস্তায় হাজার হাজার আধাসামরিক কর্মী ও সেনা মোতায়েন করা হয়েছিল।
এক বছর আগেও কূটনৈতিকভাবে একঘরে থাকা একটি দেশের জন্য পাকিস্তানের এই মধ্যস্থতাকারী ভূমিকা এক উল্লেখযোগ্য রূপান্তর।
হরমুজ প্রণালী
আলোচনা শুরুর সাথে সাথে মার্কিন সামরিক বাহিনী জানায় তারা হরমুজ প্রণালী পরিষ্কারের কাজ শুরু করার জন্য “শর্তাবলী তৈরি করছে”।
যুদ্ধবিরতি আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে হরমুজ প্রণালী। মার্কিন সামরিক বাহিনী জানায়, তাদের দুটি যুদ্ধজাহাজ প্রণালীটি অতিক্রম করেছে এবং মাইন অপসারণের জন্য শর্ত তৈরি করা হচ্ছে, অন্যদিকে ইরানের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম কোনো মার্কিন জাহাজ এই জলপথ অতিক্রম করার কথা অস্বীকার করেছে।
আলোচনা শুরুর আগে, ইরানের একজন ঊর্ধ্বতন সূত্র রয়টার্সকে জানায়, যুক্তরাষ্ট্র কাতার ও অন্যান্য বিদেশি ব্যাংকে জব্দকৃত সম্পদ ছেড়ে দিতে সম্মত হয়েছে। একজন মার্কিন কর্মকর্তা অর্থ ছাড়তে সম্মত হওয়ার বিষয়টি অস্বীকার করেছেন।
ইরানের রাষ্ট্রীয় টেলিভিশন ও কর্মকর্তাদের মতে, বিদেশে থাকা সম্পদ ছাড়ার পাশাপাশি তেহরান হরমুজ প্রণালীর নিয়ন্ত্রণ, যুদ্ধকালীন ক্ষতিপূরণ প্রদান এবং লেবাননসহ সমগ্র অঞ্চলে যুদ্ধবিরতির দাবি জানাচ্ছে।
তেহরান হরমুজ প্রণালীতে ট্রানজিট ফি আদায় করতেও চায়।
ট্রাম্পের ঘোষিত লক্ষ্য পরিবর্তিত হয়েছে, কিন্তু ন্যূনতমভাবে তিনি প্রণালীটির মধ্য দিয়ে বিশ্বব্যাপী জাহাজ চলাচলের অবাধ সুযোগ এবং ইরানের পারমাণবিক সমৃদ্ধকরণ কর্মসূচিকে পঙ্গু করে দিয়ে দেশটি যাতে পারমাণবিক বোমা তৈরি করতে না পারে, তা নিশ্চিত করতে চান।
মার্কিন মিত্র ইসরায়েল লেবাননে তেহরান-সমর্থিত হিজবুল্লাহ জঙ্গিদের ওপর বোমা হামলা চালাচ্ছে এবং বলছে এই সংঘাত ইরান-মার্কিন যুদ্ধবিরতির অংশ নয়।
পারস্পরিক অবিশ্বাস অনেক বেশি।









































