ইমিগ্রেশন অ্যান্ড কাস্টমস এনফোর্সমেন্ট (ICE)-এর হেফাজতে থাকাকালীন সময়ে তার এক ও চার বছর বয়সী সন্তানরা প্রথমে তাকে চিনতে পারেনি। তার অনুপস্থিতিতে তারা ভিদাল রিভাস-এর সাথে ছিল; রিভাস একজন এপিস্কোপাল যাজক যিনি অভিবাসন কর্তৃপক্ষ তাকে হেফাজতে নিলে শিশুদের সাময়িক অভিভাবক হওয়ার দায়িত্ব নিয়েছিলেন।
মা যখন দূরে ছিলেন, তখন শিশুদের শান্ত রাখতে রিভাসের স্ত্রী তাদের পাশে ঘুমাতেন। পরে তার স্ত্রী অসুস্থ হয়ে পড়লে রিভাসই শিশুদের দেখাশোনার বাড়তি দায়িত্ব তুলে নেন।
অভিজ্ঞতাটি ছিল বেশ কঠিন ও শ্রমসাধ্য। কিন্তু ৬২ বছর বয়সী রিভাস আরও ২৯টি শিশুর জন্যও একই দায়িত্ব পালনে প্রস্তুত; ওই শিশুদের অভিবাসী বাবা-মায়েরা তাকে তাদের ‘স্ট্যান্ডবাই’ বা বিকল্প অভিভাবক হিসেবে মনোনীত করেছেন। তিনি জানান, আরও দুটি পরিবার তার সাথে একই ধরনের ব্যবস্থা করার প্রক্রিয়া চালাচ্ছে।
ওয়াশিংটনের উপকণ্ঠে অবস্থিত সেন্ট ম্যাথিউস এপিস্কোপাল চার্চে প্রায় দুই দশক ধরে সেবা দিয়ে আসা রিভাস বলেন, “আমি এক বিশাল দায়িত্ব ও ভারী বোঝা অনুভব করছি।”
চার্চের ভেতরে একটি ফলক ঝোলানো আছে যাতে ইংরেজি, স্প্যানিশ এবং হাইতিয়ান ক্রিওল ভাষায় একই বার্তা লেখা: “আমরা অভিবাসীদের ভালোবাসি।” রিভাসের কাছে এই কথাগুলো সেই পরিবারগুলোর প্রতি এক অঙ্গীকারে পরিণত হয়েছে, যারা আশঙ্কা করে যে অভিবাসন সংক্রান্ত গ্রেপ্তারের কারণে তারা হঠাৎ করেই তাদের সন্তানদের কাছ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়তে পারে।
প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প পুনরায় ক্ষমতায় আসার পরপরই গত বছর রিভাস পরিবারগুলোকে তাকে বিকল্প অভিভাবক হিসেবে মনোনীত করতে উৎসাহিত করা শুরু করেন। প্রায় সব বাবা-মাই তার মতোই এল সালভাদরের নাগরিক এবং তারা আশঙ্কা করছেন যে ট্রাম্প প্রশাসন হয়তো সেই দেশের প্রায় ১ লাখ ৭০ হাজার অভিবাসীর জন্য প্রযোজ্য ‘টেম্পোরারি প্রোটেক্টেড স্ট্যাটাস’ বা টিপিএস (TPS) বাতিল করে দিতে পারে।
রিভাস বলেন, “বাবা-মায়ের জন্য এটা জানা মোটেও সহজ নয় যে, তারা গ্রেপ্তার হতে পারেন এবং তাদের সন্তানরা তাদের ছাড়াই [যুক্তরাষ্ট্রে] থেকে যেতে পারে।”
বিকল্প অভিভাবকত্ব বা ‘স্ট্যান্ডবাই গার্ডিয়ানশিপ’ যেভাবে কাজ করে
মেরিল্যান্ডের আইন অনুযায়ী, অভিবাসন কর্তৃপক্ষের হাতে গ্রেপ্তার হওয়ার পরিস্থিতির কথা মাথায় রেখে বাবা-মায়েরা একজন বিকল্প অভিভাবক মনোনীত করতে পারেন। মনোনীত ব্যক্তি স্বয়ংক্রিয়ভাবে ছয় মাসের জন্য শিশুটির আইনি অভিভাবক হয়ে যান; বিচারকের অনুমোদন সাপেক্ষে এই মেয়াদ বাড়ানোও সম্ভব। রিভাস জানান, কিছু বাবা-মা তাকে এমন পরিস্থিতির কথাও বলেছেন যেখানে তাদের হয়তো দীর্ঘ সময় ধরে আটক কেন্দ্রে থাকতে হতে পারে।
আটক অভিবাসীদের সন্তানদের ‘ফস্টার কেয়ার’ বা সরকারি তত্ত্বাবধানে (অন্য পরিবারে) যাওয়া রোধ করতে অভিভাবকত্ব বিষয়ক আইন সংশোধনকারী প্রথম রাজ্যগুলোর মধ্যে মেরিল্যান্ড অন্যতম। ট্রাম্পের প্রথম মেয়াদে রাজ্যের আইনপ্রণেতারা এমন একটি আইন পাস করেন যা পরিবারগুলোকে একজন সাময়িক অভিভাবক মনোনীত করার সুযোগ দেয়, যাতে আটক বা নির্বাসনের কারণে পরিবার বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়লে শিশুদের দেখাশোনা করা যায়। জুলাই মাসে ম্যাসাচুসেটস অঙ্গরাজ্য তাদের আইনে অনুরূপ একটি পরিবর্তন আনে। এর মাধ্যমে তারা ভার্জিনিয়া, নিউ ইয়র্ক, ক্যালিফোর্নিয়া, নেভাদা এবং ওয়াশিংটন ডি.সি.-র কাতারে শামিল হলো, যারা এ ধরনের ব্যবস্থাকে আরও সহজ ও সুসংহত করার উদ্যোগ নিয়েছে।
টিপিএস (TPS) সংক্রান্ত সিদ্ধান্তের অপেক্ষায় সালভাদোরানরা
দুই ছোট সন্তানের মাকে মুক্তি দেওয়ার পরও রিভাস ও তাঁর স্ত্রী ওই পরিবারটির ঘনিষ্ঠ সান্নিধ্যে থেকে যান। তিনি বলেন, “এখন আমাদের নিজেদেরই ওই শিশুদের দাদা-দাদির মতো মনে হয়; কারণ আমরা এখনও তাদের মায়ের সাথে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক বজায় রেখেছি এবং মা ও শিশু—উভয়েরই দেখাশোনা করছি।”
ওই দুই শিশুর দায়িত্ব নেওয়ার ফলে রিভাস বুঝতে পেরেছেন যে তিনি কতটা বড় একটি দায়িত্ব কাঁধে তুলে নিয়েছেন। হায়াটসভিলে—যেখানে জনসংখ্যার এক-তৃতীয়াংশেরও বেশি হিস্পানিক বা লাতিন বংশোদ্ভূত—যদি অভিবাসন আইন প্রয়োগের কড়াকড়ি বা ধরপাকড় বেড়ে যায়, তবে তাঁকে হয়তো একই সাথে অনেক শিশুর দেখাশোনার দায়িত্ব নিতে হতে পারে।
টিপিএস (TPS) কর্মসূচিকে ঘিরে সৃষ্ট অনিশ্চয়তা এই আশঙ্কাকে আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। ১৯৯০ সালে কংগ্রেস এই কর্মসূচিটি চালু করেছিল এমন অভিবাসীদের সুরক্ষার জন্য, যারা সশস্ত্র সংঘাত, প্রাকৃতিক দুর্যোগ বা অন্যান্য চরম পরিস্থিতির কারণে নিজ দেশে নিরাপদে ফিরে যেতে অক্ষম। ১৯৯০ সালে গৃহযুদ্ধের কারণে এল সালভাদরকে প্রথম দেশ হিসেবে টিপিএস-এর আওতাভুক্ত করা হয়েছিল; পরবর্তীতে ২০০১ সালে পরপর দুটি ভূমিকম্পের আঘাতের পর সেই সুরক্ষার মেয়াদ বাড়ানো হয়। ১৯৯০ সাল থেকে ১ লাখ ৭০ হাজারেরও বেশি সালভাদোরান টিপিএস মর্যাদা পেয়েছেন, যা এই কর্মসূচির আওতায় সুরক্ষিত বৃহত্তম গোষ্ঠীগুলোর মধ্যে অন্যতম।
ট্রাম্প প্রশাসন সম্প্রতি হাইতিয়ান, হন্ডুরান এবং নিকারাগুয়ানসহ আরও এক ডজনেরও বেশি গোষ্ঠীর জন্য টিপিএস সুরক্ষা সুবিধা বাতিল করেছে। এর ফলে আশঙ্কা দেখা দিয়েছে যে, পরবর্তী তালিকায় হয়তো এল সালভাদরের নামও থাকতে পারে।
সেপ্টেম্বরের শুরুর দিকে, সালভাদোরানদের জন্য টিপিএস মর্যাদার মেয়াদ শেষ হওয়ার মাত্র কয়েক ঘণ্টা আগে, ডিপার্টমেন্ট অফ হোমল্যান্ড সিকিউরিটি একটি বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করে। এতে ইঙ্গিত দেওয়া হয় যে, আপাতত এই ব্যবস্থাটি বহাল থাকবে। সংক্ষিপ্ত ওই বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, টিপিএস-এর আওতাভুক্ত সালভাদোরানরা “কাজের অনুমতিসহ (ওয়ার্ক অথোরাইজেশন) সুরক্ষা সুবিধা” ভোগ করা অব্যাহত রাখবেন। তবে এতে আরও বলা হয় যে, কর্মসূচিটির ভবিষ্যৎ নিয়ে ঘোষণা “উপযুক্ত সময়ে” দেওয়া হবে।
বিবৃতিটি খুব একটা আশ্বস্ত করতে পারেনি। দ্রুতই খবর আসতে শুরু করে যে, অভিবাসন মর্যাদা নিয়ে বিভ্রান্তির জেরে হায়াটসভিল ও অন্যান্য স্থানের সালভাদোরানরা চাকরি হারাচ্ছেন। এমনকি যারা এখনও কর্মরত আছেন, তাঁরাও দুশ্চিন্তায় ভুগছেন যে ট্রাম্প প্রশাসনের দেওয়া এই সাময়িক স্বস্তি হয়তো ক্ষণস্থায়ী।
রিভাস বলেন, “অনেকেই চার্চ ছেড়ে অন্য শহরে চলে গেছেন এবং কেউ কেউ নিজ দেশে ফিরে গেছেন। মানুষের মধ্যে ভয় ও নিরাপত্তাহীনতা কাজ করছে।” মেরিল্যান্ডে এমন অনেক সালভাদোরান বসবাস করেন, যারা ১৯৯০-এর দশক কিংবা ২০০০-এর দশকের শুরুর দিকে যুক্তরাষ্ট্রে পাড়ি জমিয়েছিলেন। সেই সময়টিতে এল সালভাদর একটি ভয়াবহ গৃহযুদ্ধ কাটিয়ে সবেমাত্র ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা করছিল; ঠিক তখনই মধ্য আমেরিকার এই দেশটি একটি শক্তিশালী হারিকেন ও দুটি ভূমিকম্পের কবলে পড়ে।
যারা ২০ বছরেরও বেশি সময় ধরে যুক্তরাষ্ট্রে বসবাস করছেন, তাদের কাছে নিজ দেশে ফিরে যাওয়াটা আর বাস্তবসম্মত কোনো বিকল্প বলে মনে নাও হতে পারে। বিশ্বব্যাংকের তথ্যমতে, এল সালভাদরের জনসংখ্যার ২৭ শতাংশেরও বেশি মানুষ জাতীয় দারিদ্র্যসীমার নিচে বসবাস করে। এছাড়া, লন্ডন বিশ্ববিদ্যালয়ের বার্কবেকের ‘ইনস্টিটিউট ফর ক্রাইম অ্যান্ড জাস্টিস পলিসি রিসার্চ’ (ICPR)-এর সংকলিত ডেটাবেস ‘ওয়ার্ল্ড প্রিজন ব্রিফ’-এর তথ্য অনুযায়ী, দেশটিতে বিশ্বের সর্বোচ্চ কারাবাসের হার রয়েছে। প্রেসিডেন্ট নাইব বুকেলে গ্যাং-জনিত সহিংসতা এবং তার প্রশাসনের সমালোচকদের দমনে কঠোর পদক্ষেপ নিয়েছেন। এই কৌশলের ফলে দেশের অপরাধের হার কমেছে বলে মনে করা হলেও, মানবাধিকার সংগঠনগুলো তার সরকারের বিরুদ্ধে নির্বিচারে আটক এবং কারাগারে নির্যাতনের অভিযোগ তোলে। গত বছর, ট্রাম্প প্রশাসন ভেনেজুয়েলার শত শত বহিষ্কৃত অভিবাসীকে এল সালভাদরের ‘সেকোট’ (CECOT) কারাগারে পাঠিয়েছিল; এটি গ্যাং সদস্যদের জন্য নির্ধারিত একটি সর্বোচ্চ নিরাপত্তা-ব্যবস্থাসম্পন্ন কারাগার।
“একটি নৈতিক দায়বদ্ধতা”
রিভাস এল সালভাদরে বেড়ে উঠেছিলেন এমন এক সময়ে যা ছিল চরম অস্থিরতাপূর্ণ। ১৯৭৯ সালের এক সামরিক অভ্যুত্থানের জেরে যুক্তরাষ্ট্র-সমর্থিত সালভাদর সরকার এবং কিউবা-সমর্থিত বামপন্থী গেরিলা গোষ্ঠীর মধ্যে এক দশকব্যাপী প্রাণঘাতী গৃহযুদ্ধ শুরু হয়েছিল।
২৭ বছর বয়সে রিভাস ক্যাথলিক যাজক হওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। তিনি জানান, সামাজিক ন্যায়বিচার ও মানবাধিকারের পক্ষে কথা বলা ক্যাথলিক যাজকদের সামরিক বাহিনী কমিউনিস্ট হিসেবে গণ্য করত। তিনি নিজেও আটকের শিকার হয়েছিলেন, মারধরের ফলে তাকে হাসপাতালে ভর্তি হতে হয়েছিল।
১৯৯৮ সালে রিভাস ওয়াশিংটন ডি.সি.-র একটি ক্যাথলিক চার্চে কাজ করার জন্য যুক্তরাষ্ট্রে আসেন; সেখানে তার বিভিন্ন প্রচারণামূলক ও সামাজিক কর্মকাণ্ড চার্চের নেতৃত্বের সাথে মতপার্থক্যের সৃষ্টি করে। শেষ পর্যন্ত তিনি অপেক্ষাকৃত উদারপন্থী ‘এপিস্কোপালিয়ান চার্চ’-এ যোগ দেন এবং ২০০৮ সালে ‘সেন্ট ম্যাথিউস’ চার্চের সাথে যুক্ত হন।
চার্চে হিস্পানিক বা লাতিন-আমেরিকান বংশোদ্ভূত সদস্য সংখ্যা বাড়ার সাথে সাথে, অভিবাসন সংক্রান্ত জটিলতায় ধুঁকতে থাকা চার্চের সদস্যদের সহায়তা করার দায়িত্ব রিভাস আরও গভীরভাবে অনুভব করতে থাকেন। নিজের এবং সন্তানদের ভবিষ্যৎ নিয়ে আলোচনার সময় বাবা-মায়ের কান্না দেখে তিনি নিশ্চিত হন যে, তাকে আরও বেশি কিছু করতে হবে।
রিভাস জানান, অভিভাবকত্বের দায়িত্ব গ্রহণের বিষয়ে কমিউনিটি বা সম্প্রদায়ের কাছ থেকে তিনি অভূতপূর্ব সমর্থন পেয়েছেন। অনেকে কাপড় ও খেলনা অনুদান দিয়েছেন; এছাড়া অন্যান্য চার্চ এবং অভিবাসন বিষয়ক সংগঠনগুলোও ‘স্ট্যান্ডবাই গার্ডিয়ানশিপ’ বা জরুরি প্রয়োজনে অভিভাবকত্ব গ্রহণের ব্যবস্থায় বাবা-মাকে সহায়তা করছে।
তিনি যদি শেষ পর্যন্ত আরও শিশুর দায়িত্ব গ্রহণ করেন, তবে শিশুদের দেখভালের খরচ মেটানোর জন্য অনুদান সংগ্রহের উদ্দেশ্যে চার্চের নামে একটি ব্যাংক অ্যাকাউন্ট খোলার পরিকল্পনা রয়েছে তার। “আমি জানি, আরও অনেক গির্জা আছে যারা আমাদের সহায়তা করতে ইচ্ছুক,” তিনি বলেন।
রিভাস স্বীকার করেন যে, একসঙ্গে এত শিশুর দেখভাল করাটা হবে এক বিশাল চ্যালেঞ্জ। তবে বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে তিনি বিষয়টিকে “একটি নৈতিক দায়িত্ব” হিসেবেই দেখছেন।
“আমার সাধ্যমতো আমি এই কাজ চালিয়ে যাব,” তিনি বলেন।



































































