প্রথম অধ্যায় – চতুর্থ অংশ: আন্তর্জাতিক সমর্থনের সন্ধানে
২০২৪ সালের মাঝামাঝি সময়ে বাংলাদেশে সরকারি চাকরিতে কোটা সংস্কারের দাবিতে শুরু হওয়া ছাত্র আন্দোলন দ্রুতই একটি রাজনৈতিক রূপ নেয়। এই আন্দোলন শুধুমাত্র ঢাকার রাজপথেই সীমাবদ্ধ থাকেনি, বরং এর ঢেউ বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে পড়ে। এর ফলে বাংলাদেশ সরকার অভ্যন্তরীণ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক অঙ্গনে দেশের ভাবমূর্তি রক্ষার জন্য বিশেষ কূটনৈতিক পদক্ষেপ গ্রহণ করে। –
সরকার এই সংকট মোকাবিলায় একটি দ্বিমুখী কৌশল অবলম্বন করে—একদিকে অভ্যন্তরীণ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে কঠোর পদক্ষেপ নেয়; অন্যদিকে বিদেশে, বিশেষ করে পশ্চিমা দেশগুলোতে দেশের গণতান্ত্রিক ভাবমূর্তি তুলে ধরার জন্য কূটনৈতিক তৎপরতা বাড়িয়ে দেয়। এই প্রেক্ষাপটে যুক্তরাজ্য একটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়। উপনিবেশ-পরবর্তী সম্পর্ক, প্রাতিষ্ঠানিক সম্পৃক্ততা এবং রাজনৈতিকভাবে সক্রিয় বাংলাদেশি প্রবাসীদের কারণে যুক্তরাজ্যের অবস্থান প্রতীকী ও ব্যবহারিক উভয় দিক থেকেই অত্যধিক গুরুত্ব বহন করে। লন্ডনে অবস্থিত বাংলাদেশ হাইকমিশনকে ব্রিটিশ সরকার, নীতিনির্ধারক এবং প্রবাসী বাংলাদেশিদের কাছে সরকারের অবস্থান জোরালোভাবে তুলে ধরার নির্দেশ দেওয়া হয়। ঢাকার লক্ষ্য ছিল যুক্তরাজ্য সরকারের কাছ থেকে এমন একটি বিবৃতি আদায় করা যা দেশের পরিস্থিতি শান্ত করতে এবং আন্তর্জাতিক মহলে সরকারের অবস্থান শক্তিশালী করতে সহায়ক হবে।
কূটনৈতিক পর্দার অন্তরালে
জুলাই থেকে আগস্ট মাসের প্রথম দিক পর্যন্ত লন্ডনে বাংলাদেশ হাইকমিশন যুক্তরাজ্যের ফরেন, কমনওয়েলথ অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট অফিস (FCDO)-এর ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সঙ্গে নিবিড় যোগাযোগ রক্ষা করে। একাধিক টেলিফোন ব্রিফিং এবং সরাসরি বৈঠকের মাধ্যমে সরকারের অবস্থান ব্যাখ্যা তুলে ধরা হয়। দুটি নন-পেপার (কূটনীতিতে ব্যবহৃত একটি অনানুষ্ঠানিক নথি) জমা দেয়, যেখানে উল্লেখ করা হয় যে শান্তিপূর্ণ ছাত্র আন্দোলনকে সহিংস ও চরমপন্থী গোষ্ঠীগুলো ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করেছে। হাইকমিশন সুপ্রিম কোর্টের রায়, দেশের গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনাগুলোতে হামলার ছবি, ভিডিও এবং একটি বিস্তারিত রিপোর্টও FCDO-কে সরবরাহ করে।

একই সময়ে ১৮ জুলাই ২০২৪ ঢাকায় পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বিদেশি মিশনগুলোতে একটি সার্কুলার জারি করে। এতে সরকার ছাত্রদের আন্দোলন, তাদের ক্ষোভ ও হতাশার বিষয়ে সচেতন বলে উল্লেখ করার পাশাপাশি সহিংসতার জন্য “মুক্তিযুদ্ধবিরোধী শক্তি” এবং “স্বার্থান্বেষী মহলকে” দায়ী করে। সার্কুলারে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার জাতির উদ্দেশ্যে দেওয়া ভাষণ এবং নিহতদের প্রতি তাঁর শোক প্রকাশের কথাও উল্লেখ করা হয়। বলা হয়, সরকার একটি তদন্ত কমিটি গঠন করেছে এবং ছাত্রদের সঙ্গে আলোচনার জন্য মন্ত্রীদের দায়িত্ব দিয়েছে।
২০২৪ যখন বাংলাদেশ ধ্বংস হলো (অধ্যায় এক- পর্ব ৩)
একই দিনে FCDO-এর পার্লামেন্টারি আন্ডার-সেক্রেটারি অব স্টেট ক্যাথরিন ওয়েস্ট একটি সংক্ষিপ্ত বিবৃতি দেন। তিনি সহিংসতায় গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেন এবং শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদ ও সমাবেশের অধিকার রক্ষার আহ্বান জানান। তিনি সকল পক্ষকে সহিংসতা বন্ধ করে শান্তিপূর্ণ সমাধানের পথ খুঁজে বের করার জন্য অনুরোধ করেন:
“বাংলাদেশে আন্দোলনের সময় সংঘটিত সহিংসতা নিয়ে যুক্তরাজ্য সরকার গভীরভাবে উদ্বিগ্ন। যুক্তরাজ্য মৌলিক স্বাধীনতা, মানবাধিকার, প্রতিবাদের ও শান্তিপূর্ণ সমাবেশের অধিকার সমুন্নত ও সমর্থন করে। আমরা সকল পক্ষকে সহিংসতা বন্ধ করে শান্তিপূর্ণ সমাধানের পথ খুঁজে নেওয়ার আহ্বান জানাই।”
কূটনৈতিক ভাষায় লেখা এই বিবৃতি ঢাকার কর্মকর্তাদের অস্বস্তিতে ফেলে। কারণ তারা আরও সুস্পষ্ট ও সরকারের পক্ষে সমর্থনসূচক বিবৃতি আশা করেছিলেন।

উত্তেজনা বৃদ্ধি ও প্রতিক্রিয়া
২১ জুলাই পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় হালনাগাদ ব্রিফিং-এ আরও ভয়াবহ পরিস্থিতি তুলে ধরে। আপিল বিভাগ হাইকোর্টের পূর্ববর্তী সিদ্ধান্ত বাতিল করে সরকারি চাকরিতে ৭% কোটা পুনর্বহাল করে—এটি ছাত্রদের মূল দাবির সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ একটি পদক্ষেপ। তবু আন্দোলন শান্ত হওয়ার বদলে সহিংসতা বেড়ে যায়।সরকার দাবি করে বিএনপি ও জামায়াতসহ বিরোধী রাজনৈতিক গোষ্ঠীগুলো আন্দোলনকে সহিংসতায় রূপ দিয়েছে। একই সময়ে ঢাকার গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো, যেমন—সরকারি সম্প্রচার কেন্দ্র, জাতীয় ডেটা সেন্টার, মেট্রো স্টেশন এবং হাসপাতাল—ভয়াবহ হামলার শিকার হয়। জাতীয় ডেটা সেন্টারে নাশকতার ফলে দেশে ইন্টারনেট বন্ধ হয়ে যায়।
রাজধানীর বাইরেও অস্থিরতা ছড়িয়ে পড়ে। রংপুর, মাদারীপুর ও নারায়ণগঞ্জের মতো জেলাগুলোতে সহিংসতা ছড়িয়ে পড়ে। নরসিংদী কারাগার ভাঙচুর করে শতাধিক বন্দিকে মুক্ত করা হয়—যার মধ্যে দুজন সাজাপ্রাপ্ত জঙ্গিও ছিল। এতে জনসাধারণ হতবাক হয়ে যায় এবং ব্যাপক উদ্বেগ ছড়িয়ে পড়ে। আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ঘাঁটি দখল করা হয়, আওয়ামী লীগের দলীয় অফিস পুড়িয়ে দেওয়া হয়, এবং অস্ত্র লুট ও আহতের খবর বাড়তে থাকে।
এই পরিস্থিতিতে প্রধানমন্ত্রী সেনাবাহিনী, ১৪-দল এবং প্রশাসনের ঊর্ধ্বতনদের নিয়ে জরুরি বৈঠক করেন। ২০ জুলাই ‘বিশেষ ক্ষমতা আইন, ১৯৭৪’ প্রয়োগ করে সারাদেশে কারফিউ জারি করা হয়। বেসামরিক প্রশাসনের সহায়তার জন্য সেনাবাহিনী মোতায়েন করা হয়। অত্যাবশ্যকীয় সেবাগুলো কারফিউ থেকে মুক্ত রাখা হয়।
একই সাথে সরকার ছাত্রদের সাথে আলোচনার চেষ্টা চালায় এবং মন্ত্রীরা ছাত্র নেতাদের সাথে বৈঠক করেন। ছাত্ররা আট দফা দাবি তুলে ধরে এবং নিহতদের জন্য ন্যায়বিচার চায়। উভয় পক্ষ গণমাধ্যমের সামনে এসে পরিস্থিতি শান্ত করার বিষয়ে আশাবাদ ব্যক্ত করে।
পররাষ্ট্রমন্ত্রী ঢাকায় কূটনৈতিক প্রতিনিধিদের ব্রিফ করে অভিযোগ করেন যে, বিদেশি গণমাধ্যম মৃতের সংখ্যা বাড়িয়ে দেখাচ্ছে। তিনি সংযত ও তথ্য-নির্ভর প্রতিবেদন কামনা করেন এবং মিশনগুলোকে ভুল তথ্যের প্রতিবাদ জানাতে নির্দেশ দেন।
যুক্তরাজ্যের শক্তিশালী বিবৃতি
বারবার যোগাযোগ এবং তথ্য আদান-প্রদান সত্ত্বেও ২২ জুলাই যুক্তরাজ্যের FCDO একটি কঠোর বিবৃতি দেয়। এই বিবৃতিতে তারা “শত শত নিহত ও হাজার হাজার আহতের” খবরে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে এবং এই প্রাণহানিকে “অগ্রহণযোগ্য” বলে উল্লেখ করে। তারা শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদের অধিকার রক্ষার আহ্বান পুনর্ব্যক্ত করে এবং দ্রুত ইন্টারনেট সংযোগ ফিরিয়ে আনা ও গঠনমূলক রাজনৈতিক সংলাপের প্রয়োজনীয়তার ওপর জোর দেয়:
“বিগত কয়েকদিনে বাংলাদেশে সহিংসতায় শতাধিক নিহত ও হাজারো আহতের খবরে যুক্তরাজ্য গভীরভাবে উদ্বিগ্ন। এই প্রাণহানি মেনে নেওয়া যায় না। শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভকারীদের বিরুদ্ধে সহিংসতা চালানো উচিত নয়। প্রতিবাদ ও শান্তিপূর্ণ সমাবেশ এবং ভিন্ন রাজনৈতিক মত প্রকাশের অধিকার—এগুলো যুক্তরাজ্যের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং সেগুলো রক্ষা করা আবশ্যক। ইন্টারনেট ও যোগাযোগ ব্যবস্থা দ্রুত পুনঃস্থাপন করতে হবে যাতে বাংলাদেশের জনগণ যুক্তরাজ্য ও সারা বিশ্বের পরিবার ও বন্ধুদের সাথে আবার যোগাযোগ করতে পারে।আমরা সহিংসতা ও প্রাণহানি বন্ধের আহ্বান জানাই এবং সব পক্ষকে আহ্বান জানাই যেন তারা বাংলাদেশ জুড়ে শান্তি পুনঃপ্রতিষ্ঠার উপায় খুঁজে বের করে। এ জন্য গঠনমূলক রাজনৈতিক সংলাপের পথ তৈরি করাও জরুরি। ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের প্রতি আমরা সমবেদনা জানাই। আমাদের দুই দেশের মধ্যে মানুষে-মানুষে যোগাযোগ অত্যন্ত দৃঢ়—যেখানে যুক্তরাজ্যে একটি শক্তিশালী বাংলাদেশি সম্প্রদায় বিশাল অবদান রাখছে।”
এই বিবৃতিটিও ঢাকার জন্য অস্বস্তিকর ছিল, কারণ এতে কোটা সংস্কারের বিষয়ে সুপ্রিম কোর্টের রায় বা ছাত্রদের সাথে সংলাপের মতো সরকারের ইতিবাচক পদক্ষেপগুলোর কোনো উল্লেখ ছিল না।
নিরলস কূটনৈতিক প্রচেষ্টা সত্ত্বেও আন্তর্জাতিক মহলে সরকারের অবস্থান সুস্পষ্টভাবে প্রতিফলিত হয়নি। যুক্তরাজ্যের সংযত প্রতিক্রিয়া নিঃসন্দেহে মানবাধিকার ও গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের প্রতি পশ্চিমা বিশ্বের ঐক্যবদ্ধ অবস্থানের প্রতিফলন। তবে এই অবস্থান বাস্তবে কতটা কার্যকর, বিশেষ করে দক্ষিণ এশিয়ার মতো ভূরাজনৈতিকভাবে জটিল অঞ্চলে—তা সত্যিই গভীর পর্যবেক্ষণের দাবি রাখে। কিন্তু তার আগে, বাংলাদেশে চলমান সংকটের সময় আরো পরিকল্পিত, উচ্চ পর্যায়ের এবং সুস্পষ্ট উদ্দেশ্য নিয়ে কার্যকর ও শক্তিশালী নয়া কূটনৈতিক উদ্যোগের পরিকল্পনা নেওয়া হয়।
ইংরেজী থেকে বাংলায় অনুবাদঃ –মতিয়ার চৌধুরী।
(আশেকুন নবী চৌধুরী একজন বিশিষ্ট সাংবাদিক, কূটনীতিক ও লেখক। যোগাযোগের জন্য ইমেইল করতে পারেন-ashikbss@gmail.com)।









































