রাষ্ট্রপতি ডোনাল্ড ট্রাম্প বুধবার বলেছেন, শান্তি আলোচনায় যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে এখনও অমীমাংসিত বিষয় রয়েছে। এর আগে ওয়াশিংটন ইরানের রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনের একটি প্রতিবেদন প্রত্যাখ্যান করে, যেখানে এক মাসের মধ্যে হরমুজ প্রণালী দিয়ে জাহাজ চলাচল পুনরায় চালু করা এবং ইরানি জাহাজের ওপর থেকে মার্কিন নৌ অবরোধ তুলে নেওয়ার একটি কাঠামো চুক্তির কথা বলা হয়েছিল।
ট্রাম্প মন্ত্রিসভার এক বৈঠকে বলেন, ইরান যুদ্ধ শেষ করতে আগ্রহী, যা এই কৌশলগত জলপথ দিয়ে বিশ্বব্যাপী জ্বালানি সরবরাহকে বাধাগ্রস্ত করেছে, কিন্তু চুক্তির শর্তাবলী ওয়াশিংটনকে সন্তুষ্ট করতে পারেনি।
তিনি বিস্তারিত কিছু না বলে বলেন, “ইরান খুবই আগ্রহী, তারা একটি চুক্তি করতে খুব করে চায়। এখন পর্যন্ত তারা সেখানে পৌঁছাতে পারেনি… আমরা এতে সন্তুষ্ট নই, কিন্তু হব। হয় এটা, না হয় আমাদের কাজটা শেষ করতে হবে।”
তিনি পরে যোগ করেন, “চুক্তিটি নিখুঁত হতে হবে,” এবং জোর দিয়ে বলেন চুক্তি হওয়ার সাথে সাথেই হরমুজ প্রণালী খুলে দেওয়া হবে এবং কোনো একক দেশের এই জলপথের ওপর নিয়ন্ত্রণ থাকবে না।
ইরানের রাষ্ট্রীয় টেলিভিশন জানিয়েছে, তারা একটি সমঝোতা স্মারকের অনানুষ্ঠানিক খসড়া পেয়েছে, যার অধীনে যুক্তরাষ্ট্র তার অবরোধ তুলে নেবে এবং ইরানের নিকটবর্তী এলাকা থেকে নিজেদের বাহিনী প্রত্যাহার করে নেবে। এতে বলা হয়েছে, এই অঞ্চলে মার্কিন সেনাদের বিষয়টি নিয়ে আরও আলোচনার প্রয়োজন রয়েছে, তবে এ বিষয়ে বিস্তারিত কিছু বলা হয়নি। এতে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচির কথা উল্লেখ করা হয়নি, যা যুক্তরাষ্ট্র বন্ধ করে দিতে চায়।
সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে দেওয়া এক বিবৃতিতে হোয়াইট হাউস এই প্রতিবেদনটিকে “সম্পূর্ণ মনগড়া” বলে উড়িয়ে দিয়েছে, অন্যদিকে তেহরান এ বিষয়ে কোনো মন্তব্য করেনি। প্রকাশ্যে, এর আগেও দুই পক্ষ সুস্পষ্টভাবে ভিন্ন অবস্থান তুলে ধরেছে।
মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও মন্ত্রিসভার বৈঠকে বলেন: “কিছু অগ্রগতি এবং আগ্রহ দেখা গেছে, এবং আগামী কয়েক ঘণ্টা ও দিনের মধ্যে আমরা দেখব যে আরও অগ্রগতি সম্ভব হয় কি না।”
তিনি আরও যোগ করেন, “মূল কথা হলো, ইরান কখনোই পারমাণবিক অস্ত্র পাবে না।”
হরমুজ নিয়ন্ত্রণ
আলোচনার মূল অমীমাংসিত বিষয়গুলোর মধ্যে রয়েছে হরমুজ প্রণালী পুনরায় চালু করা ও এর ব্যবস্থাপনা, যে প্রণালী দিয়ে সংঘাতের আগে বিশ্বের এক-পঞ্চমাংশ তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস প্রবাহিত হতো, এবং ইরানের পারমাণবিক সক্ষমতা নিরসনের বিষয়টি।
ট্রাম্প বলেছেন, একবার চুক্তি হলে যুক্তরাষ্ট্র সেখানে জাহাজ চলাচল পর্যবেক্ষণ করবে। তিনি আরও বলেন, প্রণালীটির দক্ষিণ তীরে অবস্থিত ওমানকেও এই প্রক্রিয়ায় তার ভূমিকা পালন করতে হবে। প্রণালীটি আন্তর্জাতিক আইনের আওতাভুক্ত, যা বিদেশি জাহাজগুলোকে এর মধ্য দিয়ে যাওয়ার অধিকারের নিশ্চয়তা দেয়।
তিনি বলেন, “আমরা এর ওপর নজর রাখব, কিন্তু কেউ এটি নিয়ন্ত্রণ করবে না – এটাই আমাদের আলোচনার একটি অংশ…”।
ইরানি টেলিভিশনের প্রতিবেদনের পর তেলের দাম ৫ শতাংশের বেশি কমে যায়, পরে তা পতনের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ পুনরুদ্ধার করে।
মার্কিন সামরিক বাহিনী ইরানের উপর অবরোধ কার্যকর করতে প্রায় ১৫,০০০ সৈন্য মোতায়েন করেছে এবং কাতার, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও বাহরাইনের মতো উপসাগরীয় রাষ্ট্রসহ এই অঞ্চলের বিভিন্ন ঘাঁটিতে তাদের হাজার হাজার অতিরিক্ত সৈন্য রয়েছে।
মার্কিন নৌবাহিনীর জাহাজ, যেগুলোর কয়েকটিতে হাজার হাজার নাবিক ও মেরিন সদস্য রয়েছেন, ওমানসহ বিভিন্ন বন্দরে থেমে নিয়মিত এই অঞ্চল দিয়ে যাতায়াত করে। এ বিষয়ে মন্তব্যের অনুরোধে পেন্টাগন তাৎক্ষণিকভাবে কোনো সাড়া দেয়নি।
পারমাণবিক বিষয় নিয়ে দ্বিতীয় দফা আলোচনা হবে, বলছে ইরান
ইরানি সূত্র জানিয়েছে, পারমাণবিক বিষয় নিয়ে আলোচনা দ্বিতীয় দফা আলোচনায় হবে – যা ট্রাম্পের কিছু ঘনিষ্ঠ সমর্থকের কাছে গ্রহণযোগ্য নাও হতে পারে। ইরান বলছে, তাদের পারমাণবিক কর্মসূচি শুধুমাত্র শান্তিপূর্ণ উদ্দেশ্যে পরিচালিত।
বুধবারের শুরুতে, মস্কোতে প্রথম আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা ফোরামের এক ফাঁকে একজন ঊর্ধ্বতন ইরানি কর্মকর্তা সাংবাদিকদের বলেন হরমুজ প্রণালী পুনরায় খুলে দেওয়া একটি অমীমাংসিত বিষয় হয়ে রয়েছে।
জলপথটি পুনরায় চালু করার বিষয়ে একটি চুক্তি সম্পর্কে জানতে চাইলে ইরানের সর্বোচ্চ জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদের উপ-সচিব আলী বাঘেরি কানি সাংবাদিকদের বলেন, “যতক্ষণ না আমরা সব বিষয়ে একমত হচ্ছি, আমরা মনে করি কোনো বিষয়েই সমঝোতা হয়নি।”
ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ডস নেভি বুধবার জানিয়েছে, গত ২৪ ঘণ্টায় তেল ট্যাঙ্কার, কন্টেইনার জাহাজ এবং অন্যান্য বাণিজ্যিক জাহাজসহ ২৩টি জাহাজ তাদের অনুমতি নিয়ে হরমুজ দিয়ে যাতায়াত করেছে, যা সংঘাতের আগে প্রতিদিন যাতায়াতকারী ১২৫ থেকে ১৪০টি জাহাজের তুলনায় খুবই সামান্য।
এই যুদ্ধে হাজার হাজার মানুষ নিহত হয়েছে এবং তেল সরবরাহে এক অভূতপূর্ব সংকট তৈরি হয়েছে, যার ফলে জ্বালানি, সার এবং খাদ্যের দাম বেড়ে গেছে।
এটি দেশের অভ্যন্তরে ট্রাম্পের জন্য রাজনৈতিক সমস্যাও তৈরি করেছে। মধ্যবর্তী নির্বাচনের ছয় মাস আগে মার্কিন জরিপগুলো দেখাচ্ছে, এই যুদ্ধ জনগণের কাছে অত্যন্ত অজনপ্রিয়।

























































