
বাংলাদেশে সড়ক ও নৌপথের দুর্ঘটনা যেন এখন নিত্যদিনের সঙ্গী। প্রতিদিনই দেশের কোথাও না কোথাও ঘটছে অসংখ্য দুর্ঘটনা। এসব দুর্ঘটনার কারণে প্রতিদিনই প্রাণহানির খবর শুনতে হচ্ছে। এরই ধারাবাহিকতার মধ্যেই ২০২৬ সালের ২৫ মার্চ রাজবাড়ীর জেলার দৌলতদিয়া ফেরিঘাটে ঘটে গেল এক মর্মান্তিক দুর্ঘটনা, যা পুরো দেশকে নাড়িয়ে দিয়েছে।বিকেল সাড়ে ৫টার দিকে প্রায় ৪০ থেকে ৫০ জন যাত্রী নিয়ে একটি বাস ফেরিতে ওঠার সময় নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে পদ্মা নদীতে পড়ে যায়। মুহূর্তের মধ্যে ঘটে যায় ভয়াবহ বিপর্যয়। দীর্ঘ ছয় ঘণ্টার উদ্ধার অভিযানের পর ডুবে যাওয়া বাসটি উদ্ধার করা হলেও অধিকাংশ যাত্রী এখনও নিখোঁজ। কাউকেই জীবিত পাওয়া যায়নি। সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, এই দুর্ঘটনায় অন্তত ২৬ জন প্রাণ হারিয়েছেন, যাদের মধ্যে নারী ও শিশুও রয়েছে।এইসমস্থ ঘটনা আমাদের সামনে একটি কঠিন প্রশ্ন তুলে ধরে—এটি কি শুধুই একটি দুর্ঘটনা, নাকি দীর্ঘদিনের অব্যবস্থাপনা ও অবহেলার ফসল?
সম্প্রতি দেশের বিভিন্ন স্থানে একের পর এক দুর্ঘটনা আমাদের উদ্বিগ্ন করে তুলেছে। কোথাও বেপরোয়া বাসের ধাক্কায় প্রাণহানি, কোথাও ট্রাক-মোটরসাইকেলের সংঘর্ষ, আবার কোথাও নৌপথে দুর্ঘটনা। প্রায় প্রতিটি ঘটনার পেছনে একই কারণগুলো বারবার উঠে আসে—অদক্ষ চালক, ফিটনেসবিহীন যানবাহন, ট্রাফিক আইন অমান্য, রাস্তার ত্রুটি এবং দুর্বল তদারকি।
তবে এই প্রেক্ষাপটে দেশের অবকাঠামোগত উন্নয়নের বিষয়টিও গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করতে হয়। বিশেষ করে বিগত আওয়ামীলীগ সরকারের সময় বাস্তবায়িত পদ্মা সেতু বাংলাদেশের যোগাযোগ ব্যবস্থায় এক ঐতিহাসিক পরিবর্তন এনে দিয়েছে। এই সেতুর ফলে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের সঙ্গে রাজধানীর সরাসরি সড়ক যোগাযোগ স্থাপিত হয়েছে, যা অনেকাংশে ফেরিনির্ভরতা কমিয়েছে। বিজ্ঞজনদের মতে, যদি পদ্মা সেতুর মতো বৃহৎ প্রকল্প বাস্তবায়ন না হতো, তাহলে দৌলতদিয়ার মতো ফেরিঘাটগুলোতে চাপ আরও বেশি থাকত এবং দুর্ঘটনার ঝুঁকিও বেড়ে যেত। অর্থাৎ উন্নয়ন যোগাযোগ ব্যবস্থাকে সহজ করেছে, তবে সেই উন্নয়নের সঙ্গে নিরাপত্তা নিশ্চিত করাও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
দৌলতদিয়ার এই দুর্ঘটনা আমাদের মনে করিয়ে দেয়—শুধু অবকাঠামো উন্নয়নই যথেষ্ট নয়; এর পাশাপাশি প্রয়োজন কার্যকর ব্যবস্থাপনা, কঠোর আইন প্রয়োগ এবং দায়িত্বশীলতা। দুর্ঘটনার পর তদন্ত কমিটি গঠন করা হলেও, প্রকৃত পরিবর্তন আনতে হলে প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা গ্রহণই সবচেয়ে জরুরি।
প্রতিটি দুর্ঘটনা শুধু একটি সংখ্যা নয়; এটি একটি পরিবার হারানোর গল্প, একটি স্বপ্ন ভেঙে যাওয়ার ইতিহাস। তাই এই শোককে শুধু আবেগে সীমাবদ্ধ না রেখে আমাদের উচিত এটিকে একটি শিক্ষা হিসেবে গ্রহণ করা।সবশেষে প্রশ্ন থেকেই যায়—বাংলাদেশে কেন এমন দুর্ঘটনা প্রতিনিয়ত ঘটছে? আমরা কি শুধু উন্নয়নেই সন্তুষ্ট থাকব, নাকি নিরাপত্তা নিশ্চিত করেও একটি সত্যিকারের নিরাপদ দেশ গড়ে তুলব?
(লেখক জান্নাতুল ফেরদৌস ডলি যুক্তরাজ্য প্রবাসী কবি ও কলামিষ্ট।)









































