মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প মঙ্গলবার জানিয়েছেন, তিনি ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর সঙ্গে একটি সমঝোতায় পৌঁছেছেন। এই সমঝোতা অনুযায়ী, চলতি বছরের পর থেকে ইসরায়েলকে দেওয়া বার্ষিক ৪ বিলিয়ন ডলারের সহায়তা বন্ধ করে দেবে যুক্তরাষ্ট্র; তবে মধ্যপ্রাচ্যের এই ঘনিষ্ঠ মিত্রের কাছে অস্ত্র বিক্রি অব্যাহত থাকবে।
যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনের দিন ভোটাররা যখন ভোটকেন্দ্রে যাচ্ছেন—যে নির্বাচনে ট্রাম্পের রিপাবলিকান দল কংগ্রেসের ওপর তাদের নিয়ন্ত্রণ হারাবে কি না তা নির্ধারিত হবে—ঠিক সেই মুহূর্তে ট্রাম্প এই আকস্মিক ঘোষণাটি দিলেন। তিনি জানান, এই পদক্ষেপ নেওয়ার একটি উদ্দেশ্য হলো—ইসরায়েলকে সামরিক সহায়তা দেওয়ার বিষয়টি নিয়ে বামপন্থী ডেমোক্র্যাটরা রিপাবলিকানদের বিরুদ্ধে যে সমালোচনা বা ‘নেতিবাচক প্রচার’ চালাত, তা বন্ধ করা।
ট্রাম্প অবশ্য বিস্তারিত কিছু জানাননি বা এটিও ব্যাখ্যা করেননি যে, বছরের শেষে কীভাবে এই অর্থায়ন বন্ধ করা হবে। অথচ, ইসরায়েলকে প্রতি বছর ৩.৮ বিলিয়ন ডলার সামরিক সহায়তা প্রদানের যে সমঝোতা স্মারক (Memorandum of Understanding) রয়েছে, তার মেয়াদ ২০২৮ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত।
তবে তিনি পরোক্ষভাবে স্বীকার করেছেন যে, ইসরায়েলকে সহায়তা দেওয়ার বিষয়টি—যা কয়েক দশক ধরে উভয় দলের (ডেমোক্র্যাট ও রিপাবলিকান) ঐকমত্যের ভিত্তিতে চলে আসছিল—তা এখন তার জন্য কিছু ভোটারের কাছে একটি রাজনৈতিক দায় বা নেতিবাচক বিষয়ে পরিণত হয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, নির্বাচনের দিন ভোটারদের প্রভাবিত করার কৌশল হিসেবেই তিনি এই ঘোষণা দিয়েছেন।
২০২৮ সালের পর ইসরায়েলকে দেওয়া মার্কিন সহায়তার রূপরেখা কেমন হবে, তা নিয়ে আলোচনা চলছিল। নেতানিয়াহু নিজেও আগেই বলেছিলেন যে, তিনি আশা করেন সময়ের সঙ্গে সঙ্গে মার্কিন সহায়তা কমে আসবে।
ট্রাম্পের এই ইঙ্গিত থেকে মনে হচ্ছে, তিনি যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল সম্পর্কের ক্ষেত্রে একটি বড় ধরনের পরিবর্তনের বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছেন। অথচ, ইরানকে লক্ষ্য করে যৌথ হামলার আট মাসেরও বেশি সময় পার হওয়ার পরও, এই দুই দেশ এখনো ইরানের সঙ্গে সংঘাতপূর্ণ পরিস্থিতিতে রয়েছে।
ফক্স নিউজের ‘ফক্স অ্যান্ড ফ্রেন্ডস’ অনুষ্ঠানে ট্রাম্প বলেন, ইসরায়েলের এখন আর এই অর্থায়নের প্রয়োজন নেই। তিনি আরও বলেন, কিছু ডেমোক্র্যাট ও বামপন্থী রাজনীতিবিদ ইসরায়েলকে দেওয়া মার্কিন আর্থিক সহায়তাকে পুঁজি করে রিপাবলিকানদের সমালোচনা করছেন। জনমত জরিপগুলো বলছে, গাজা যুদ্ধের কারণে ইসরায়েলের প্রতি মার্কিন জনগণের সামগ্রিক সমর্থন হ্রাস পেয়েছে।
ট্রাম্প বলেন, “ইসরায়েলকে অর্থ প্রদানের বিষয়ে বলতে গেলে, বিবি নেতানিয়াহু এবং আমি একটি সমঝোতায় পৌঁছেছি। যুক্তরাষ্ট্র ইসরায়েলকে বছরে ৪ বিলিয়ন ডলার দিয়ে থাকি, তবে কয়েক মাস আগেই আমরা সিদ্ধান্ত নিয়েছি যে, আমরা এই সহায়তা বন্ধ করে দিচ্ছি।” “আমরা আগেই একমত হয়েছি যে, এই বছরের শেষ নাগাদ আমরা ইসরায়েলকে আর কোনো অর্থ প্রদান করব না। তবে ইসরায়েলের প্রয়োজনে আমরা তাদের সহায়তা করব,” তিনি যোগ করেন।
২৭ অক্টোবরের নির্বাচনের পর ইসরায়েলের ভবিষ্যৎ নেতৃত্ব অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে। এই নির্বাচনে নেতানিয়াহু—যিনি মার্কিন রিপাবলিকানদের সাথে ঘনিষ্ঠ মিত্রতা গড়ে তুলেছেন—তার শাসনামলের সংখ্যাগরিষ্ঠতা হারিয়েছেন, তবে তার বিরোধীদের জন্যও তাকে ক্ষমতাচ্যুত করার কোনো স্পষ্ট পথ খোলা রাখেননি। নির্বাচনের এই ফলাফল একটি নতুন সরকার গঠনের লক্ষ্যে দীর্ঘস্থায়ী আলোচনার পথ প্রশস্ত করেছে বলে মনে করা হচ্ছে।
হোয়াইট হাউস কিংবা নেতানিয়াহুর কার্যালয়—কোনো পক্ষই রয়টার্সের মন্তব্যের অনুরোধে সাড়া দেয়নি।
তবে নেতানিয়াহুকে ক্ষমতাচ্যুত করতে সচেষ্ট বিরোধী জোটের নেতা গাডি আইজেনকোট ‘এক্স’ (X)-এ লিখেছেন: “ইসরায়েলের নিরাপত্তা সংস্থা এবং সাধারণ নাগরিকরা যে কৌশলগত সম্পর্কের কাঠামো পরিবর্তনের বিষয়টি গণমাধ্যমের মাধ্যমে জানতে পারছে, তা থেকে স্পষ্ট বোঝা যায় যে বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর কর্মকাণ্ড কতটা প্রকৃত ঝুঁকির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। আমরা আর তার ওপর নির্ভর করতে পারি না; তাকে অবশ্যই সরিয়ে দিতে হবে।”
ইসরায়েলের সমালোচনা
২০২৩ সালের অক্টোবরে হামাসের নেতৃত্বাধীন প্রাণঘাতী আন্তঃসীমান্ত হামলার জবাবে গাজায় ইসরায়েলের কঠোর প্রতিক্রিয়ার পর থেকে, বিশেষ করে ডেমোক্র্যাটদের মধ্যে ইসরায়েলের প্রতি মার্কিন জনসমর্থন হ্রাস পেয়েছে।
জুন মাসে কুইনিপিয়াক ইউনিভার্সিটির এক জরিপে দেখা গেছে, ৪৮ শতাংশ ভোটার এবং ৬৬ শতাংশ ডেমোক্র্যাট মনে করেন যে যুক্তরাষ্ট্র ইসরায়েলকে প্রয়োজনের তুলনায় বেশি সমর্থন দিচ্ছে। ২০১৭ সালে যখন প্রথম এই প্রশ্নটি করা হয়েছিল, তখন এই হার ছিল যথাক্রমে ১৬ শতাংশ ও ২০ শতাংশ।
বিভিন্ন জরিপ ও বিশ্লেষকদের মতে, মঙ্গলবারের নির্বাচনে ডেমোক্র্যাটরা ট্রাম্পের রিপাবলিকানদের কাছ থেকে প্রতিনিধি পরিষদের (হাউস অব রিপ্রেজেন্টেটিভস) নিয়ন্ত্রণ ছিনিয়ে নিতে পারে। তবে সিনেটের নিয়ন্ত্রণ কার হাতে থাকবে, তা এখনো অনিশ্চিত।
গত এক বছরে ইসরায়েলের সমালোচনাকারী বেশ কয়েকজন প্রার্থী ডেমোক্র্যাটিক প্রাইমারিতে জয়ী হয়েছেন। এমনকি মধ্যপন্থী আইনপ্রণেতারাও এখন যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘদিনের ইসরায়েল-সমর্থন নীতিকে চ্যালেঞ্জ জানাতে আগের চেয়ে অনেক বেশি আগ্রহী হয়ে উঠেছেন।
একটি গুরুত্বপূর্ণ নির্বাচনী লড়াইয়ে, ডেমোক্র্যাটিক প্রার্থী আব্দুল এল-সায়েদ মিশিগানের প্রতিনিধিত্ব করার জন্য সিনেট নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। এল-সায়েদ—যিনি নির্বাচিত হলে প্রথম মুসলিম মার্কিন সিনেটর হবেন—ইসরায়েলকে শর্তহীন সামরিক সহায়তা প্রদানের বিরোধিতা করেছেন। ট্রাম্প বলেছেন যে, বামপন্থীরা মার্কিন অর্থায়নকে “অন্যায় আচরণের ইঙ্গিত” হিসেবে ব্যবহার করেছে এবং তিনি এমন একটি বিষয়কে সরিয়ে ফেলতে চেয়েছেন, যাকে তিনি “সহজ লক্ষ্যবস্তু” বলে অভিহিত করেছেন। ওয়াশিংটন কেন এই অর্থায়ন বন্ধ করছে—তা ব্যাখ্যা করতে গিয়ে তিনি বিশেষভাবে এল-সায়েদের কথা উল্লেখ করেন।
ট্রাম্প বলেন, “কারণ তাদের (ইসরায়েলের) এই অর্থের প্রয়োজন নেই। আর যখন তাদের প্রয়োজনই নেই, তখন এল-সায়েদের মতো উন্মাদ ব্যক্তিদের কটূক্তি আমরা কেন সহ্য করব? এটি একটি বাজে আলোচনার বিষয়।”
ট্রাম্পের ‘মেক আমেরিকা গ্রেট এগেইন’ (Make America Great Again) আন্দোলনের কিছু সদস্যও ইসরায়েলের কঠোর সমালোচনা শুরু করেছেন। তাঁদের অভিযোগ, ইসরায়েল প্রেসিডেন্টকে বিভ্রান্ত করেছে—যিনি বিদেশিদের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ না করার প্রতিশ্রুতি দিয়ে প্রচারণা চালিয়েছিলেন—এবং তাঁকে বিশ্বাস করিয়েছে যে ইরানকে সহজেই পরাজিত করা সম্ভব। জনমত জরিপ অনুযায়ী, অধিকাংশ আমেরিকান এই যুদ্ধের বিরোধী। এই যুদ্ধের কারণে যুক্তরাষ্ট্রে জ্বালানি তেলের দাম বেড়ে গেছে এবং ট্রাম্পের জনপ্রিয়তা বা অনুমোদনের হার কমে গেছে।
ওয়াশিংটনভিত্তিক থিঙ্ক ট্যাঙ্ক ‘সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজ’-এর জন অল্টারম্যান বলেন, “বিষয়টির সবচেয়ে কৌতূহল উদ্দীপক দিক হলো এর সময়কাল। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প কেন নির্বাচনের দিন এটি ঘোষণা করলেন? আর এমন এক সময়েই বা কেন ঘোষণা করলেন, যখন ধারণা করা হচ্ছে যে ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের বড় ধরনের যৌথ সামরিক অভিযান হয়তো আর মাত্র কয়েক দিন দূরেই রয়েছে?”
ইসরায়েলের মার্কিন সমর্থক গোষ্ঠীর কেউ কেউ ট্রাম্পকে এই সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনার আহ্বান জানিয়ে বলেছেন, সহায়তা হঠাৎ বন্ধ না করে বরং পর্যায়ক্রমে কমিয়ে আনা উচিত। অন্যদিকে, ক্যালিফোর্নিয়ার প্রগতিশীল ডেমোক্র্যাট প্রতিনিধি রো খান্না ‘এক্স’ (সাবেক টুইটার)-এ লিখেছেন, কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ পেলে তাঁর দল ইসরায়েলকে দেওয়া সহায়তা পুরোপুরি বন্ধ করার বিষয়টি তাদের কর্মসূচির অন্তর্ভুক্ত করবে।
রিপাবলিকান প্রতিনিধি ডন বেকন সিএনএন-কে বলেন, “আমার কাছে সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো, ইসরায়েলিরা এ সম্পর্কে কিছুই জানত না।”
২০২০ সালে কংগ্রেস একটি আইন পাস করে ইসরায়েলের জন্য এই অর্থায়নের অনুমোদন দেয়। তবে প্রতি বছর এই অর্থ বরাদ্দ ও ছাড় করার জন্য সিনেট এবং প্রতিনিধি পরিষদে আলাদাভাবে অর্থায়ন বিল (অ্যাপ্রোপ্রিয়েশন বিল) পাস হতে হয়।
অক্টোবর মাসে ইসরায়েলি একটি টেলিভিশন চ্যানেলকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে নেতানিয়াহু বলেন, “আপনারা যদি মনে করেন যে, আমি আগে দুবার যে পরিমাণ সহায়তা—অর্থাৎ প্রতিরক্ষা বাজেটের জন্য কয়েক হাজার কোটি ডলারের মার্কিন সহায়তা—নিশ্চিত করেছিলাম, তা ভবিষ্যতেও পেতে থাকবেন, তবে নিজেদের প্রস্তুত করে নিন এবং মেনে নিন যে তা আর হবে না। কারণ, আমেরিকা বদলে গেছে।”
আগামী বছরগুলোতে মার্কিন আর্থিক সহায়তা কমে যেতে পারে—এমন আশঙ্কায় গত গ্রীষ্মে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিনিধি পরিষদে একটি প্রতিরক্ষা বিল পাস হয়েছে, যার একটি ধারায় যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের মধ্যে সামরিক প্রযুক্তিগত সম্পর্ক আরও গভীর করার কথা বলা হয়েছে। ‘ন্যাশনাল ডিফেন্স অথরাইজেশন অ্যাক্ট ২০২৭’-এর ২১৯ নম্বর ধারা অনুযায়ী, দুই দেশের মধ্যে প্রতিরক্ষা সহযোগিতাকে আরও অনেক বেশি নিবিড় করার পরিকল্পনা রয়েছে। তবে অনেকগুলো বেসরকারি সংস্থা (এনজিও) এই উদ্যোগকে ‘অত্যন্ত বিপজ্জনক’ বলে অভিহিত করেছে এবং মার্কিন আইনপ্রণেতাদের এটি বাতিল করার আহ্বান জানিয়েছে।

































































