মহামারীর পর যুক্তরাষ্ট্রে অভিবাসনের যে ঐতিহাসিক জোয়ার এসেছিল এবং যা দেশটির জনসংখ্যার কাঠামো বদলে দিয়েছিল, তা অর্থনীতিতেও গভীর প্রভাব ফেলেছে। এটি স্থানীয় কর্মীদের ওপর খুব একটা নেতিবাচক প্রভাব না ফেলেই অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ত্বরান্বিত করেছে—তবে একই সাথে বাড়িভাড়া বৃদ্ধির পেছনেও ভূমিকা রেখেছে।
বিষয়টি কেন গুরুত্বপূর্ণ: গত সপ্তাহে ‘ব্রুকিংস পেপারস অন ইকনোমিক অ্যাক্টিভিটি’-তে উপস্থাপিত নতুন এক গবেষণায় এই তথ্যগুলো উঠে এসেছে। আধুনিক যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে অভিবাসনের অন্যতম বৃহত্তম ঢেউয়ের অর্থনৈতিক প্রভাব নিয়ে এটিই এখন পর্যন্ত সবচেয়ে বিস্তারিত বিশ্লেষণ।
এমন এক সময়ে এই নতুন গবেষণাপত্রটি প্রকাশিত হলো যখন যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতি ঠিক বিপরীত পরিস্থিতির মুখোমুখি: কঠোর অভিবাসন নীতি এবং কড়াকড়ি প্রয়োগের ফলে নিট অভিবাসনের হার শূন্য বা তার নিচে নেমে এসেছে।
পরিসংখ্যান অনুযায়ী: অর্থনীতিবিদ জেনিফার হান্ট, পিয়া ওরেনিয়াস এবং ম্যাডেলিন জাভোডনি তাঁদের গবেষণাপত্রে উল্লেখ করেছেন, ২০২১ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে প্রায় ৬৫ লাখ অভিবাসী প্রচলিত আইনি পথের বাইরে যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশ করেছেন। এই সংখ্যাটি ওই সময়কালের শুরুতে যুক্তরাষ্ট্রের মোট জনসংখ্যার অন্তত ২ শতাংশের সমান।
গবেষকদের প্রাক্কলন অনুযায়ী, এই সময়ে প্রতিটি অতিরিক্ত অভিবাসী গড়ে প্রায় ০.৪টি নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে ভূমিকা রেখেছেন। তাঁদের পর্যালোচিত প্রধান মেট্রোপলিটন এলাকাগুলোতে অভিবাসীদের এই আগমনের ফলে প্রায় ১৬ লাখ অতিরিক্ত কর্মসংস্থান তৈরি হয়েছে—যা ২০২১ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে মোট কর্মসংস্থান বৃদ্ধির প্রায় ১৮ শতাংশ।
গবেষণাপত্রটিতে আরও বলা হয়েছে, অভিবাসনের এই জোয়ারের ফলে গড়ে প্রতিটি মেট্রোপলিটন এলাকায় জিডিপি (GDP) আনুমানিক ১.৫ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে।
বিস্তারিত বিশ্লেষণ: গবেষকরা জানিয়েছেন, অভিবাসনের এই ব্যাপক বৃদ্ধির ফলে স্থানীয় কর্মীদের কর্মসংস্থানের হারে কোনো পরিবর্তন হয়নি; বরং ২০২১ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে তাঁদের মজুরি আনুমানিক ০.৯ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে।
তবে তাঁরা এও উল্লেখ করেছেন যে, অতিরিক্ত জনসংখ্যার তুলনায় আবাসন সরবরাহ পর্যাপ্ত না হওয়ায় বাড়িভাড়া কিছুটা বেড়েছে।
তাঁদের বক্তব্য: ফেডারেল রিজার্ভ ব্যাংক অফ ডালাসের শ্রম অর্থনীতিবিদ ওরেনিয়াস এক ব্রিফিংয়ে সাংবাদিকদের বলেন, “আমি অবাক হয়েছি যে স্থানীয়দের ওপর—বিশেষ করে স্থানীয় কর্মীদের ওপর—আমরা খুব বেশি নেতিবাচক প্রভাব খুঁজে পাইনি।”
ওরেনিয়াস জানান, এর একটি সম্ভাব্য কারণ হতে পারে যে, অভিবাসী এবং স্থানীয় কর্মীরা একই ধরনের চাকরির জন্য একে অপরের সাথে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার পরিবর্তে একে অপরের পরিপূরক হিসেবে কাজ করেন। “আপনি যদি একজন অভিবাসীকে কাজে নিয়োগ করেন এবং তার সাথে একজন স্থানীয় কর্মীকে যুক্ত করেন, তবে অভিবাসী কর্মী ছাড়া যে কর্মদক্ষতা ও উৎপাদনশীলতা পাওয়া যেত, তার চেয়ে ভালো ফলাফলই পাওয়া যায়।”
আকর্ষণীয় বিষয় হলো: অভিবাসীদের এই বিপুল আগমন এমন এক সময়ে ঘটেছিল যখন যুক্তরাষ্ট্রে কর্মীদের ব্যাপক চাহিদা ছিল।
মহামারির ধাক্কা কাটিয়ে অর্থনীতি তখন দ্রুত ঘুরে দাঁড়াচ্ছিল এবং নিয়োগকর্তারা কর্মী খুঁজে পেতে হিমশিম খাচ্ছিলেন—বিশেষ করে বিনোদন, আতিথেয়তা এবং নির্মাণ শিল্পের মতো খাতগুলোতে।
জাভোদনি বলেন, “শ্রমবাজারের জন্য বিপুল সংখ্যক অভিবাসী কর্মীকে কাজে যুক্ত করার ক্ষেত্রে অর্থনৈতিকভাবে এটি ছিল অত্যন্ত অনুকূল একটি সময় এবং শ্রমবাজার তা সফলভাবেই করতে পেরেছিল।”
প্রেক্ষাপট: অভিবাসীদের এই ঢেউ ২০২৪ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনী প্রচারণায় অভিবাসন ইস্যুকে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে নিয়ে আসতে সহায়তা করেছে। উদাহরণস্বরূপ, ভাইস প্রেসিডেন্ট ভ্যান্স বারবার যুক্তি দিয়েছেন যে, অভিবাসীদের এই আগমন আবাসন সংকটকে আরও তীব্র করেছে; কারণ সীমিত সংখ্যক বাড়ির জন্য প্রতিযোগিতায় যুক্ত হয়েছেন আরও লাখ লাখ মানুষ।
অথচ নতুন গবেষণায় দেখা গেছে, অভিবাসীদের এই বিপুল আগমনের ফলে আবাসন খাতে যে প্রভাব পড়েছে, তা পরিমাপযোগ্য হলেও তুলনামূলকভাবে কম।
গবেষকদের প্রাক্কলন অনুযায়ী, ২০২১ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে এই অভিবাসন প্রবাহের কারণে বাড়িভাড়া ১.৪% থেকে ১.৬% পর্যন্ত বৃদ্ধি পেয়েছে।
জাভোদনি সাংবাদিকদের জানান, অভিবাসীদের অনেকেই শুরুতে আশ্রয়কেন্দ্র, জরুরি আবাসন কিংবা বন্ধু-বান্ধব ও আত্মীয়স্বজনের বাড়িতে অবস্থান করছিলেন।


































































