মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে শুক্রবারের মধ্যে ইরান যুদ্ধ শেষ করতে হবে অথবা এর মেয়াদ বাড়ানোর জন্য কংগ্রেসের কাছে যুক্তি উপস্থাপন করতে হবে। কিন্তু নৌপথ নিয়ে চলমান অচলাবস্থায় পরিণত হওয়া এই সংঘাতের গতিপথ পরিবর্তন না করেই সম্ভবত এই সময়সীমা পার হয়ে যাবে।
যুদ্ধ শেষ হওয়ার সম্ভাবনা অত্যন্ত ক্ষীণ বলেই মনে হচ্ছে।
এর পরিবর্তে, বিশ্লেষক এবং কংগ্রেসের সহকারীরা বলেছেন, তারা আশা করছেন ট্রাম্প কংগ্রেসকে জানাবেন তিনি ৩০ দিনের জন্য যুদ্ধ বাড়ানোর পরিকল্পনা করছেন অথবা সময়সীমা উপেক্ষা করবেন। তার প্রশাসন যুক্তি দেবে যে তেহরানের সঙ্গে বর্তমান যুদ্ধবিরতিই এই সংঘাতের সমাপ্তি।
তীব্রভাবে বিভক্ত কংগ্রেসের বেশিরভাগ নীতির মতোই, যুদ্ধ সংক্রান্ত ক্ষমতাও গভীরভাবে দলীয় বিতর্কের বিষয় হয়ে উঠেছে। বিরোধী ডেমোক্র্যাটরা কংগ্রেসকে যুদ্ধ ঘোষণার সাংবিধানিক অধিকার পুনঃপ্রতিষ্ঠা করার আহ্বান জানাচ্ছে এবং রিপাবলিকানরা ডেমোক্র্যাটদের বিরুদ্ধে ট্রাম্পকে দুর্বল করার জন্য যুদ্ধ সংক্রান্ত ক্ষমতা আইন ব্যবহার করার চেষ্টার অভিযোগ করছে।
২৮ ফেব্রুয়ারি যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে ডেমোক্র্যাটরা ট্রাম্পকে মার্কিন বাহিনী প্রত্যাহার করতে বা কংগ্রেসের অনুমোদন পেতে বাধ্য করার জন্য প্রস্তাব পাস করার বারবার চেষ্টা করেছে। কিন্তু ট্রাম্পের রিপাবলিকানরা, যারা সিনেট এবং প্রতিনিধি পরিষদে সামান্য সংখ্যাগরিষ্ঠতা ধরে রেখেছেন, তারা প্রায় সর্বসম্মতভাবে এগুলোর বিরুদ্ধে ভোট দিয়েছেন।
যুদ্ধ ক্ষমতা প্রয়োগের সময়সীমার একদিন আগে, বৃহস্পতিবার রিপাবলিকানরা সিনেটে এই ধরনের ষষ্ঠ প্রচেষ্টাটি আটকে দিয়েছে। যদিও মেইনের সিনেটর সুসান কলিন্স, যিনি পূর্ববর্তী প্রস্তাবগুলোর বিরুদ্ধে ভোট দিয়েছিলেন, তিনি তার দলের দ্বিতীয় সদস্য হিসেবে এই পদক্ষেপকে সমর্থন করেন। তার সাথে কেন্টাকির সিনেটর র্যান্ড পলও এই পদক্ষেপকে সমর্থন করেন, যিনি এর আগে সমস্ত প্রস্তাবকেই সমর্থন করেছিলেন।
১৯৭৩ সালের যুদ্ধ ক্ষমতা প্রস্তাব (War Powers Resolution) অনুযায়ী, রাষ্ট্রপতি শুধুমাত্র ৬০ দিনের জন্য সামরিক অভিযান চালাতে পারেন। এরপর তিনি কংগ্রেসের কাছে অনুমোদনের জন্য আবেদন করে অথবা “মার্কিন সশস্ত্র বাহিনীর নিরাপত্তার জন্য অপরিহার্য সামরিক প্রয়োজনীয়তা”র কারণে ৩০ দিনের মেয়াদ বৃদ্ধির আবেদন করে তা শেষ করতে পারেন।
ইরান সংঘাত শুরু হয়েছিল ২৮শে ফেব্রুয়ারি, যখন ইসরায়েল এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ইরানের উপর বিমান হামলা শুরু করে। ট্রাম্প ৪৮ ঘণ্টা পর আনুষ্ঠানিকভাবে কংগ্রেসকে এই সংঘাতের কথা জানান, যার ফলে ৬০ দিনের সময়সীমার গণনা শুরু হয়, যা ১ মে শেষ হবে।
দুর্বল যুদ্ধবিরতি
সংঘাতের অবসান ঘটাতে ইরানকে আলোচনায় বসতে বাধ্য করার জন্য দেশটির ওপর নতুন করে সামরিক হামলা চালানোর পরিকল্পনা নিয়ে বৃহস্পতিবার ট্রাম্পের একটি ব্রিফিং পাওয়ার কথা ছিল, একজন মার্কিন কর্মকর্তা রয়টার্সকে এ কথা জানিয়েছেন।
যদি আবার যুদ্ধ শুরু হয়, তবে ট্রাম্প আইনপ্রণেতাদের বলতে পারবেন যে তিনি আরও একটি ৬০ দিনের সময়সীমার গণনা শুরু করেছেন। ভিয়েতনাম যুদ্ধের প্রতিক্রিয়ায় তৎকালীন প্রেসিডেন্ট রিচার্ড নিক্সনের ভেটো অগ্রাহ্য করে কংগ্রেস যখন ‘ওয়ার পাওয়ারস ল’ পাস করে, তখন থেকে উভয় দলের প্রেসিডেন্টরাই এমনটা বারবার করে আসছেন।
সেই সংঘাতটিও কংগ্রেসের অনুমোদন পায়নি।
প্রশাসন এ যুক্তিও দিতে পারে যে, ১ মে সময়সীমা নয়, কারণ ট্রাম্প ৭ এপ্রিল একটি যুদ্ধবিরতি ঘোষণা করেছিলেন। প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ বৃহস্পতিবার সিনেটের এক শুনানিতে বলেন, তার ধারণা অনুযায়ী যুদ্ধবিরতির সময় ৬০ দিনের সময়সীমা থেমে গিয়েছিল।
ডেমোক্র্যাটরা এর বিরোধিতা করে বলেছে, যুদ্ধ ক্ষমতা আইনে এমন কোনো বিধান নেই।
বৃহস্পতিবার ইরান বলেছে, ওয়াশিংটন যদি পুনরায় হামলা চালায়, তবে তারা মার্কিন অবস্থানগুলোর ওপর “দীর্ঘ ও যন্ত্রণাদায়ক হামলা” চালাবে। এতে হরমুজ প্রণালী খোলার জন্য একটি আন্তর্জাতিক জোট গঠনের ব্যাপারে ওয়াশিংটনের আশা আরও জটিল হয়ে উঠেছে।
আগামী বছর কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ কার হাতে থাকবে তা নির্ধারণকারী নভেম্বরের নির্বাচনের ছয় মাস আগে, জনমত জরিপে দেখা গেছে আমেরিকানদের মধ্যে ইরান যুদ্ধ অজনপ্রিয়।
এই মাসে ট্রাম্পের জনপ্রিয়তার হার তার বর্তমান মেয়াদের সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমে এসেছে, কারণ জীবনযাত্রার ব্যয় নিয়ে আমেরিকানরা হতাশ হয়ে পড়েছে এবং মূল্যবৃদ্ধির জন্য যুদ্ধকে দায়ী করেছে।
কিন্তু ট্রাম্প তার দলের ওপর শক্তিশালী নিয়ন্ত্রণ বজায় রেখেছেন এবং খুব কম রিপাবলিকানই তার নীতির বিরোধিতা করেছেন। এছাড়াও, রিপাবলিকানরা ইসরায়েলকে জোরালোভাবে সমর্থন করে, যারা ইরানের ওপরও হামলা চালাচ্ছে, এবং যুক্তরাষ্ট্রের ঘোর শত্রু ইরানের দুর্বল হয়ে পড়াকে স্বাগত জানায়।
ওয়াশিংটনের স্টিমসন সেন্টার থিঙ্ক ট্যাঙ্কের একজন সিনিয়র ফেলো ক্রিস্টোফার প্রিবল বলেন, “এটা সোজাসাপ্টা দলীয় রাজনীতি।” “রিপাবলিকানরা প্রেসিডেন্টের অবাধ্য হতে রাজি নয়, ব্যাপারটা এতটাই সহজ।”
‘সক্রিয় আলোচনা’
হোয়াইট হাউস জানায়নি তারা কীভাবে এগোতে চায়, বা ইরান অভিযানের অনুমোদন দেওয়ার জন্য কংগ্রেসকে অনুরোধ করবে কি না।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে হোয়াইট হাউসের একজন কর্মকর্তা বলেন, “এই বিষয়ে প্রশাসন কংগ্রেসের সঙ্গে সক্রিয় আলোচনা চালাচ্ছে। কংগ্রেসের যে সদস্যরা সর্বাধিনায়কের কর্তৃত্ব কেড়ে নিয়ে রাজনৈতিক ফায়দা তোলার চেষ্টা করেন, তারা কেবল বিদেশে মার্কিন সামরিক বাহিনীকে দুর্বলই করবেন, যা কোনো নির্বাচিত কর্মকর্তারই করা উচিত নয়।”
মার্কিন সংবিধান অনুযায়ী, কেবল কংগ্রেসই যুদ্ধ ঘোষণা করতে পারে, প্রেসিডেন্ট নন, কিন্তু এই নিষেধাজ্ঞা স্বল্পমেয়াদী অভিযান বা কোনো তাৎক্ষণিক হুমকি মোকাবেলার ক্ষেত্রে প্রযোজ্য নয়।
যুদ্ধ ক্ষমতা সংক্রান্ত প্রস্তাবের বিরুদ্ধে ভোট দেওয়া কয়েকজন রিপাবলিকান বলেছেন, ১ মে-র পর তাঁরা বিষয়টি পুনর্বিবেচনা করতে পারেন।
উটাহ-র রিপাবলিকান সিনেটর জন কার্টিস একটি প্রবন্ধ প্রকাশ করে বলেছেন, তিনি ট্রাম্পের পদক্ষেপকে সমর্থন করলেও কংগ্রেসের অনুমোদন ছাড়া নির্ধারিত সময়সীমার পরেও চলমান সামরিক অভিযানকে সমর্থন করবেন না।
অন্যরা বলেছেন, তাঁরা পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করবেন।
সাউথ ডাকোটার সিনেটর জন থুন, যিনি সিনেটের রিপাবলিকান সংখ্যাগরিষ্ঠ দলের নেতা, বলেছেন ওয়াশিংটন ও তেহরান যদি একটি শান্তি চুক্তিতে পৌঁছাতে পারে তবে তা হবে “আদর্শ”।
নিউইয়র্কের ডেমোক্র্যাটিক সিনেট নেতা চাক শুমার যুদ্ধ শেষ করার লক্ষ্যে বেশ কিছু প্রস্তাবের সহ-পৃষ্ঠপোষকতা করেছেন।
গ্যাসোলিন ও অন্যান্য পণ্যের মূল্যের তীব্র বৃদ্ধির কথা উল্লেখ করে সিনেটে দেওয়া এক ভাষণে তিনি বলেন, “রিপাবলিকানরা জানে এই যুদ্ধ পরিচালনায় ট্রাম্পের ভূমিকা একটি বিপর্যয়। তারা দেখছে আমেরিকান জনগণ এখন কতটা কষ্ট পাচ্ছে।”
শুমার প্রশ্ন করেন, “সিনেটের রিপাবলিকানরা সঠিক কাজটি করার আগে ডেমোক্র্যাটদের আর কতগুলো যুদ্ধ ক্ষমতা সংক্রান্ত প্রস্তাব পেশ করতে হবে?”
























































