বিশেষজ্ঞদের মতে, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই (AI)-এর অগ্রগতির ধারাটি যদি আরও শক্তিশালী অথচ কম খরচের মডেল তৈরির দিকে ঝুঁকে পড়ে, তবে তা নিরাপদভাবে এর উন্নয়নের গতি কমিয়ে আনার পথ প্রশস্ত করতে পারে।
বিষয়টি কেন গুরুত্বপূর্ণ: ওপেনএআই (OpenAI) এবং অ্যানথ্রপিক (Anthropic)-এর মতো শীর্ষস্থানীয় মার্কিন স্টার্টআপ এবং অন্যান্য এআই কোম্পানিগুলোকে উন্নয়নের গতি ধীর করার সুযোগ পেতে হলে এমন একটি অর্থনৈতিকভাবে টেকসই পথ খুঁজে বের করতে হবে যা তাদের টিকে থাকতে সাহায্য করবে। তা না হলে, দ্রুত মুনাফা অর্জনের আর্থিক প্রলোভন এতটাই প্রবল হবে যে গতি কমানো কঠিন হয়ে পড়বে।
খবরের প্রেক্ষাপট: যুক্তরাষ্ট্রের সামগ্রিক অর্থনীতির অবস্থা এখন অনেকাংশেই এআই খাতের অভাবনীয় প্রসারের ওপর নির্ভরশীল। অথচ এই প্রতিযোগিতার কেন্দ্রে থাকা কোম্পানিগুলো আয়ের চেয়ে অনেক বেশি অর্থ ব্যয় করছে এবং অদূর ভবিষ্যতেও এই ধারা অব্যাহত থাকবে।
অনিয়ন্ত্রিত বা ‘রোগ’ (rogue) এআই এজেন্টদের দ্বারা বাইরের কোম্পানিগুলোর সিস্টেম হ্যাক হওয়ার মতো বেশ কিছু উদ্বেগজনক ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে, মডেল তৈরির গতি কমিয়ে আনার বিষয়ে কোম্পানিগুলোর শীর্ষ কর্মকর্তারাও এক বিরল ঐকমত্য ও সংহতি প্রকাশ করেছেন।
অন্তর্নিহিত বিষয়: অর্থনৈতিক দিক থেকে উন্নয়নের গতি ধীর করতে হলে কোম্পানিগুলোকে ব্যবহারকারীদের জন্য এমন এক ‘ভ্যালু প্রপোজিশন’ বা উপযোগিতা তৈরি করতে হবে, যা কেবল কল্পনাতীত বুদ্ধিমত্তা বা সক্ষমতার ওপর নির্ভরশীল নয়। কারণ, তথাকথিত সক্ষমতার সর্বোচ্চ সীমানায় বা ‘ফ্রন্টিয়ার’-এ টিকে থাকার জন্য অবিরাম এবং বিপুল পরিমাণ অর্থ ব্যয়ের এক অন্তহীন প্রতিযোগিতায় লিপ্ত থাকতে হয়।
নতুন মডেল প্রশিক্ষণের জন্য প্রয়োজনীয় কম্পিউটিং সক্ষমতা বা ‘কম্পিউটিং ফায়ারপাওয়ার’-এর পেছনে যে বিপুল অর্থ ব্যয় হয়, তার পরিমাণ কিছুটা কমাতে পারলে কোম্পানিগুলো আরও ভালো মুনাফা অর্জন করতে পারবে।
কিছু অর্থনীতিবিদ এবং এআই বিশেষজ্ঞদের মতে, এর ফলে কম্পিউটিং, ডেটা সেন্টার এবং বৈদ্যুতিক গ্রিড আপগ্রেড করার মতো অবকাঠামোগত খাতে বিনিয়োগের ওপর খুব একটা নেতিবাচক প্রভাব পড়বে না। কারণ, এআই ব্যবহারের চাহিদা যেভাবে আকাশচুম্বী হারে বাড়ছে, তা মেটানোর জন্য এই বিনিয়োগগুলো অব্যাহত রাখা জরুরি।
একনজরে সর্বশেষ পরিস্থিতি: এই সপ্তাহে বেশ কয়েকটি নতুন মডেল বাজারে এসেছে এবং এগুলোর মধ্যে একটি সাধারণ মিল হলো—শীর্ষস্থানীয় বুদ্ধিমত্তা বা সক্ষমতা বজায় রেখেই এগুলোর খরচ আগের চেয়ে অনেক কমিয়ে আনা হয়েছে।
ওপেনএআই, অ্যানথ্রপিক এবং স্পেসএক্স (SpaceX)—সবাই এই সপ্তাহে তাদের নতুন মডেলগুলোর তুলনামূলক কম খরচের বিষয়টি তুলে ধরেছে। পাশাপাশি তারা জানিয়েছে, মাত্র কয়েক মাস আগে তাদের যেসব শীর্ষস্থানীয় সিস্টেম চালু ছিল, নতুন মডেলগুলো সেগুলোর চেয়েও ভালো পারফরম্যান্স দেখাতে সক্ষম।
ডিপসিক (DeepSeek)-এর মতো চীনা মডেলগুলোর ক্ষেত্রেও একই চিত্র দেখা গেছে। এই মাসের শুরুর দিকে মুক্তি পাওয়া ডিপসিক-এর ‘V4.1 Flash’ মডেলটি বর্তমানে ‘ওপেনরাউটার’ (OpenRouter)-এর লিডারবোর্ডে শীর্ষস্থানে রয়েছে এবং এই সপ্তাহে এর ব্যবহারের হার ১৭২% বৃদ্ধি পেয়েছে।
বাস্তবতা যাচাই: দাম কমানোর পেছনে কেবল নিরাপত্তার বিষয়টিই একমাত্র কারণ নয়, এর পেছনে আরও অন্যান্য যুক্তিও রয়েছে। গ্রাহকদের পাঠানো এক প্রতিবেদনে সিটাডেল সিকিউরিটিজ (Citadel Securities) উল্লেখ করেছে যে, প্রতি-টোকেন খরচ কমে আসার ফলে এআই-এর ব্যবহার এতটাই বৃদ্ধি পাচ্ছে যে সামগ্রিক ব্যয়ের পরিমাণ বেড়ে যাচ্ছে; এর অর্থ হলো, খরচ কমানোর পরেও এআই ল্যাবগুলোর মুনাফা বাড়ছে।
এই আপাত-বৈপরীত্যের কারণেই সময়ের সাথে সাথে এআই মডেলের দাম কার্যকরভাবে কমিয়ে আনার একটি দীর্ঘ ইতিহাস রয়েছে এই ল্যাবগুলোর; কারণ এতে তাদের গ্রাহকসংখ্যা ও মুনাফা—উভয়ই বৃদ্ধি পায়।
সারকথা হলো: এআই-এর খরচ কমানোর প্রতিযোগিতাই হয়তো শেষ পর্যন্ত ল্যাবগুলোকে তাদের কাঙ্ক্ষিত সেই ধীরগতির পরিস্থিতি (slowdown) তৈরি করার সুযোগ করে দেবে।



































































