আমেরিকা ১৯৮৫ সালে জাপানকে থামিয়ে দিয়েছিল, কিন্তু চীনকে থামাত পারছে না।
১৯৮৫ সালে বিশ্বের সেরা উৎপাদক দেশ ছিল জাপান।
সবচেয়ে বেশি গাড়ি তৈরি করত জাপান,সবচেয়ে বেশি জাহাজ বানাত জাপান,এমনকি বিশ্বের সবচেয়ে বড় চিপ কোম্পানিটিও ছিল একটি জাপানি প্রতিষ্ঠান।
ওই সময়ে ১৯১৪ সালের পর প্রথমবারের মতো আমেরিকা এক ঋণগ্রস্ত দেশে পরিণত হয়।অন্যদিকে জাপান ছিল বিশ্বের সবচেয়ে বড় ঋণদাতা বা পাওনাদার দেশ।
আমেরিকান সিনেটররা এই অবস্থা দেখে জাপানি পণ্যের ওপর চড়া শুল্ক বসানোর জোর দাবি জানাচ্ছিলেন।
আজ চীন যে অবস্থানে,সেসময় জাপান ঠিক একই অবস্থানে ছিল।
তারপর নিউইয়র্কের এক হোটেল কক্ষে একটি চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়, আর এরপর জাপান আর কখনোই ঘুরে দাঁড়াতে পারেনি।
আজ চীনের জন্যও ঠিক একই চুক্তির কথা বলা হচ্ছে।
কিন্তু এবার এই ফর্মুলা আর কাজে আসবে না।
প্রথমে দেখে নেওয়া যাক ওই বদ্ধ ঘরে সেদিন আসলে কী ঘটেছিল।
২২ সেপ্টেম্বর ১৯৮৫ সালে প্লাজা হোটেলে ৫টি দেশের অর্থমন্ত্রীরা একত্রিত হন।
আমেরিকা টেবিলে শুল্কের হুমকি ছুড়ে দিল। জাপানকে হয় তাদের মুদ্রার মান বাড়াতে রাজি হতে হবে, নয়তো তাদের সমস্ত পণ্যের ওপর চড়া শুল্ক চাপিয়ে দেওয়া হবে।
জাপানের পক্ষে এই চুক্তি প্রত্যাখ্যান করার কোনো উপায় ছিল না।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর তাদের নিরস্ত্র করা হয়েছিল, আমেরিকার নজরদারিতে তাদের সংবিধান লেখা হয়েছিল এবং তাদের মাটিতে ছিল মার্কিন সামরিক ঘাঁটি।
জাপান রাজি হয়ে গেল।
সিদ্ধান্ত নেওয়া হলো, এই পাঁচ দেশ মিলে একসাথে বাজারে ডলার বিক্রি করবে এবং তার বিনিময়ে জাপানি ইয়েন ও জার্মান মার্ক কিনবে।
কিন্তু এর বাস্তব অর্থ কী ছিল?
মাত্র তিন বছরে ইয়েনের মান যখন দ্বিগুণ হয়ে গেল, তখন যে জাপানি গাড়িটি জাপান ১০ হাজার ডলারে বিক্রি করত, কাগজের হিসাবে সেটির দাম গিয়ে দাঁড়াল ২০ হাজার ডলারে।
গাড়ি একই ছিল,কারখানা একই ছিল,শ্রমিকও একই ছিল। শুধু বদলে গিয়েছিল মুদ্রার মান।
জাপানি কোম্পানিগুলো নিজেদের মুনাফা ছেড়ে দিয়ে দাম কম রাখার চেষ্টা করল, তাদের একটি অংশ উৎপাদন আমেরিকায় স্থানান্তরিত করল। তা সত্ত্বেও তারা আগের মতো আর বিক্রি করতে পারল না।
রপ্তানি কমতে শুরু করল এবং জাপানকে একটি কঠিন সিদ্ধান্ত নিতে হলো।
তারা সুদের হার এক অভূতপূর্ব স্তরে নামিয়ে আনল, যাতে কোম্পানিগুলো একটু স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলতে পারে। উদ্দেশ্য ছিল উৎপাদনকে নতুন করে পুনরুজ্জীবিত করা।
সুদের হার কমে যাওয়ায় ঋণ নেওয়া সহজ হয়ে গেল এবং কোম্পানিগুলো অনায়াসে ঋণ পেতে শুরু করল। কিন্তু রপ্তানি যখন দুর্বল, তখন সেই বিপুল অর্থ উৎপাদনে খাটাতে যাওয়ার মতো কোনো জায়গা ছিল না।
ফলে টাকা ঠিক সেখানেই গেল যেখানে তার যাওয়ার সুযোগ ছিল–জমি আর শেয়ার বাজারে।
টোকিওতে জমির দাম আকাশচুম্বী হয়ে উঠল। ১৯৮৯ সালের শেষ দিকে শেয়ার বাজার এমন এক শিখর স্পর্শ করল,যা পরবর্তী ৩৪ বছরেও আর অতিক্রম করা সম্ভব হয়নি।
সবাই ভাবছিল তারা ধনী হয়ে উঠছে। অথচ বাস্তবে নতুন কিছুই উৎপাদিত হচ্ছিল না।
তারপর সেই ফুলে উঠা ‘বাবল’ ফেটে গেল। শেয়ার বাজারে ধস নামল, জমির দাম হু হু করে পড়ে গেল, আর ব্যাংকগুলোর হাতে জমে রইল হাজার হাজার কোটি টাকার খেলাপি ঋণ।
জাপানের ‘হারানো ৩০ বছর’ বা ‘Lost Decades’ নামে পরিচিত যুগের সূচনা হয়েছিল এভাবেই।
গল্পটি এখানেই শেষ না,আসল গল্প তো শুরু হচ্ছে এখন।
বাবল ফেটে যাওয়ার পর জাপান এবার সুদের হার একদম শূন্যে নামিয়ে আনল এবং প্রায় ২৫ বছর সেটা সেখানেই ধরে রাখল।
মুনাফা বা রিটার্ন বন্ধ হয়ে যাওয়ায় জাপানে টাকা জমা রাখার আর কোনো অর্থ রইল না। পেনশন ফান্ড, বীমা কোম্পানি আর ব্যাংকগুলো তাদের টাকা এমন সব জায়গায় পাঠাতে শুরু করল যেখানে বেশি লাভ পাওয়া যায়।
সেই টাকা কোথায় গেল?
আমেরিকায়।
অর্থাৎ, এই চুক্তির মাধ্যমে আমেরিকা প্রথমে জাপানকে থামাল, আর তারপর দীর্ঘ ৩০ বছর ধরে জাপানের টাকাতেই নিজেরা বিলাসিতা করে বাঁচল।
এই পরিকল্পনার চরম ধূর্ততা ছিল এখানেই। আমেরিকা জিতল, আর তার জন্য তাকে একটি পয়সাও মাশুল গুনতে হলো না।
এবার ৪ যুগ বা ৪০ বছর পরের আজকের বাস্তবতায় আসা যাক।
আমেরিকার সামনে আজ আবারও দাঁড়িয়ে আছে এক উৎপাদন দানব- চীন। আর তাদের নিজেদের হাতে ঝুলে আছে এক বিশাল ঋণের বোঝা।আমেরিকার ঋণের পরিমাণ বর্তমানে ৩৯ ট্রিলিয়ন ডলার।
ট্রাম্প অবশ্য খোলামেলাই বলছেন তিনি শক্তিশালী বা চড়া দামের ডলারের পক্ষে নন।
এর পেছনের লজিকটা খুবই সাধারণ।
ডলারের মান কমে গেলে ওই ঋণের আসল আকারও ছোট হয়ে যায়।
অর্থাৎ, ১৯৮৫ সালে যে যুক্তি কাজ করেছিল, আজ আবারও সেটাই আলোচনার টেবিলে এসেছে।
তফাতটা শুধু এক জায়গায়।
জাপান হুমকি মেনে নিয়েছিল, তাই চড়া শুল্কের আর প্রয়োজন পড়েনি।
চীন কিন্তু তা মেনে নিচ্ছে না।
আর এই কারণেই ১৯৮৫ সালে যেটা কেবল একটি হুমকি ছিল, আজ তা বাস্তবে রূপ নিয়েছে। শুল্ক এখন প্রকৃতপক্ষে কার্যকর করা হচ্ছে।
অর্থাৎ,শুল্ক কোনো মূল পরিকল্পনার অংশ নয়; বরং পরিকল্পনা ব্যর্থ হওয়ার সরাসরি পরিণতি।
তাহলে চীন কেন নির্দ্বিধায় ‘না’ বলতে পারছে?
১৯৮৫ সালে ওই চুক্তিটি সফল হয়েছিল কারণ তিনটি বিষয় একই সাথে সত্যি ছিল।
প্রথমত, জাপানের ইয়েনের দাম নির্ধারণ করত মুক্ত বাজার। আর চীনের ইউয়ানের দাম নির্ধারণ করে খোদ চীন সরকার।
দ্বিতীয়ত, জাপানের ‘না’ বলার কোনো সুযোগ ছিল না। কিন্তু চীন অবলীলায় ‘না’ বলতে পারে।
তৃতীয়ত, জাপান তার ওই বিপুল টাকা রাখার মতো দ্বিতীয় কোনো জায়গা পাচ্ছিল না। আজ কিন্তু সেই বিকল্প জায়গাটি বেশ ভালোভাবেই তৈরি হয়ে গেছে।
মূল খেলাটি জড়িয়ে আছে এই তৃতীয় বিষয়টির সাথে।
বিশ্বের বড় বড় ব্যাংকগুলো এখন ঋণ নেওয়ার সময় ডলারের বদলে ইউয়ান বেছে নিতে শুরু করেছে। বিদেশী প্রতিষ্ঠানগুলোর চীন থেকে ইউয়ানে ঋণ নেওয়ার পরিমাণ এ বছর গত বছরের প্রায় দ্বিগুণে গিয়ে পৌঁছেছে।
আর এই কাজগুলো যারা করছে, তারা হলো -ডয়েচে ব্যাংক (Deutsche Bank), মরগান স্ট্যানলি (Morgan Stanley) এবং বিএনপি পারিবাস (BNP Paribas)।
এদের কোনটিই চীনের ব্যাংক নয়। তিনটিই খোদ ডলার ব্যবস্থার প্রতিষ্ঠাতাদের অন্যতম।
এর পেছনে কোনো রাজনীতিও নেই।
ডলারে ১০ বছরের মেয়াদে ঋণ নেওয়ার সুদের হার ৪.৪৬%, আর ইউয়ানে সেই সুদের হার মাত্র ১.৮২%। অর্থাৎ ডলারে একই ঋণ নিতে আড়াই গুণ বেশি খরচ পড়ে।
বিষয়টি কেবল সুদের হারের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। আমেরিকা তার চেয়েও বড় এবং মূল্যবান একটি জিনিস হারিয়ে ফেলেছে।
একসময় বিশ্ব যখন আমেরিকাকে ঋণ দিত,তখন তারা আমেরিকার কাছ থেকে তুলনামূলক কম সুদ দাবি করত। কারণ আপনার টাকা রাখার জন্য সবচেয়ে নিরাপদ জায়গা ছিল সেটিই,তাই আমেরিকা সবার চেয়ে কম খরচে ঋণ পেত।
সেই ছাড় বা ডিসকাউন্টের দিন এখন শেষ।
এখন ঘটছে ঠিক উল্টোটা।
বিশ্ব এখন আমেরিকাকে ঋণ দেওয়ার জন্য অতিরিক্ত সুদ দাবি করছে।
বিভিন্ন দেশের রিজার্ভের দিকে তাকিয়ে দেখুন। ২০০১ সালে বিশ্ব রিজার্ভের ৭২% ছিল ডলারে। আজ তা কমে ৫৭% স্তরে গিয়ে নেমেছে।
শহরের একমাত্র কারখানাটি যদি আপনার হয়,তবে আপনি চাইলেই শ্রমিকের মজুরি কমিয়ে দিতে পারেন। তার যাওয়ার অন্য কোনো জায়গা নেই, পরদিন সকালে সে বাধ্য হয়ে আবার কাজে আসবে।
কিন্তু যে দিন ওই একই রাস্তায় দ্বিতীয় আরেকটি কারখানা খুলে যাবে, ঠিক সেই দিন থেকেই ওই মজুরি ছাঁটাই করার বিষয়টি আপনার জন্য সবচেয়ে বড় সমস্যায় পরিণত হবে।
১৯৮৫ সালে জাপানের জন্য দ্বিতীয় কোনো কারখানা ছিল না।
আমেরিকা চাইলে আজ আবারও ডলারের মান কমিয়ে দিতে পারে। সেই ক্ষমতা এখনো তাদের হাতেই আছে।
কিন্তু বিশ্ব যাতে ক্রমাগত ডলার ধরে রাখা অব্যাহত রাখে -আমেরিকা সেটা আর কিছুতেই নিশ্চিত করতে পারবে না।
কারণ সেই নিয়ন্ত্রণটুকু আর তাদের হাতে নেই।



































































