ঘটনাটি শুনে মনে হতে পারে এটি কেবল ওয়াশিংটন ডি.সি.-তেই সম্ভব—এমন কোনো কৌতুকের সূচনা:
রিপাবলিকান দলের তিনজন প্রভাবশালী ব্যক্তি খোলামেলা ট্রাম্পের আলোচনার জন্য একটি বারে ঢুকলেন। অজান্তেই তাঁরা বসে পড়লেন একজন উদারপন্থী (লিবারেল) কৌতুকশিল্পীর পাশে। এরপর সেই নারী কৌতুকশিল্পী ইনস্টাগ্রাম পোস্টে তাঁদের কথোপকথনের বিবরণ তুলে ধরে তাঁদের তীব্র ব্যঙ্গ-বিদ্রূপের শিকার বানালেন।
বিষয়টি কেন গুরুত্বপূর্ণ: এই ঘটনাটি একজন রিপাবলিকান নেতার জন্য আর কৌতুকের বিষয় থাকেনি—তিনি হলেন তেল ব্যবসায়ী হ্যারি সার্জেন্ট। ভেনেজুয়েলায় ব্যবসায়িক কার্যক্রমের জেরে ট্রাম্প প্রশাসনের সঙ্গে তাঁর যে অস্বস্তিকর সম্পর্ক তৈরি হয়েছিল, তিনি তা উন্নয়নের চেষ্টা করছিলেন।
সম্পর্ক পুনরুদ্ধারের এই প্রচেষ্টা গত মাসে জটিল হয়ে পড়ে যখন প্রশাসনের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা ওই কৌতুকশিল্পীর সোশ্যাল মিডিয়া পোস্টটি সম্পর্কে জানতে পারেন; সেখানে তিনি অভিযোগ করেছিলেন যে সার্জেন্ট প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প সম্পর্কে নেতিবাচক মন্তব্য করেছেন।
সামগ্রিক প্রেক্ষাপট: এই ঘটনাটি আধুনিক সমাজ এবং বিশেষ করে দেশের রাজধানীর ওপর সার্বক্ষণিক নজরদারির (প্যানোপটিকন) বিষয়টি তুলে ধরে। এখানে প্রত্যেকেই নজরদারির মধ্যে থাকেন। আর হোয়াইট হাউস খেয়াল রাখে কে ট্রাম্পের প্রতি সদয় আর কে বিরূপ আচরণ করছে।
বিস্তারিত ঘটনা: ঘটনাটি ঘটেছিল ১৮ আগস্ট ডি.সি.-র ‘ফোর সিজনস’ হোটেলের ‘বোরবন লাউঞ্জ’-এ। সেখানে কৌতুকশিল্পী সুজান ল্যাম্বার্ট তাঁর পরবর্তী অনুষ্ঠানের জন্য কৌতুক তৈরির কাজ করছিলেন। তিনি তাঁর ৪ লাখ ৯৫ হাজার ইনস্টাগ্রাম অনুসারীর উদ্দেশ্যে একটি পোস্ট দিয়েছিলেন, যা মুছে ফেলার আগে ২০ লাখ বার দেখা হয়েছিল।
ভিডিওতে ল্যাম্বার্ট জানান, কাকতালীয়ভাবে তিনি সার্জেন্টের পাশেই বসেছিলেন। তবে পিট মারোক্কো ও জেন্ট্রি বিচ নামের আরও দুজন ব্যক্তি সেখানে আসার পর পরিবেশের আমূল পরিবর্তন তিনি লক্ষ্য করেন।
ফক্স নিউজ মারোক্কোকে সেই ‘মূল পরিকল্পনাকারী’ হিসেবে বর্ণনা করেছিল, যিনি ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদের শুরুর দিকে ইউএসএআইডি (USAID)-কে ভেঙে দেওয়ার প্রক্রিয়ায় সহায়তা করেছিলেন। পরবর্তীতে পলিটিকো জানিয়েছিল পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও-র সঙ্গে তাঁর মতবিরোধ ছিল।
বিচকে নিয়ে গত বছর ওয়াল স্ট্রিট জার্নালে একটি প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছিল। সেখানে বলা হয়েছিল, কীভাবে এই লবিস্ট আন্তর্জাতিক ব্যবসায়িক লেনদেনের ক্ষেত্রে—যার মধ্যে রাশিয়ার সঙ্গে একটি তেলের চুক্তিও অন্তর্ভুক্ত—তাঁর দীর্ঘদিনের বন্ধু ও প্রেসিডেন্টের ছেলে ডোনাল্ড ট্রাম্প জুনিয়রের নাম ব্যবহার করে প্রভাব খাটান।
ঘরের ভেতরের দৃশ্য: ল্যাম্বার্ট তাঁর পোস্টে উল্লেখ করেন যে তিনি কেবল নিজের কাজে মগ্ন ছিলেন, কিন্তু বারে বসা ওই ব্যক্তিরা যখন “ট্রাম্পকে নিয়ে নানা কথা বলতে শুরু করলেন”—তখন তিনি মনোযোগ দিতে বাধ্য হন। তিনি শুনতে পান—”ট্রাম্প, ট্রাম্প, ট্রাম্প, ট্রাম্প”—এসব কথা।
একপর্যায়ে ল্যাম্বার্ট তাঁর পোস্টে সার্জেন্টের এমন কিছু মন্তব্যের কথা উল্লেখ করেন, যাতে ট্রাম্প এবং মধ্যবর্তী নির্বাচনে রিপাবলিকানদের জয়ের সম্ভাবনা নিয়ে নেতিবাচক বা অবমাননাকর কথা বলা হয়েছিল বলে অভিযোগ করা হয়। সার্জেন্ট তাঁর আইনজীবীদের মাধ্যমে দৃঢ়ভাবে এই অভিযোগ অস্বীকার করেছেন।
নেপথ্যের ঘটনা: ল্যাম্বার্টের ভিডিওটি দ্রুত ভাইরাল হয়ে যায়, যার ফলে সার্জেন্টের আইনজীবীরা তাকে একটি ‘সিজ অ্যান্ড ডেজিস্ট’ (কার্যক্রম বন্ধের) নোটিশ পাঠান।
ল্যাম্বার্ট পোস্টটি সরিয়ে ফেললেও ততক্ষণে তা ট্রাম্পের উপদেষ্টাদের মধ্যে ছড়িয়ে পড়েছিল। একটি সূত্রের মতে, রুবিও বিষয়টি সম্পর্কে অবগত হয়েছিলেন।
প্রশাসনের একটি সূত্র সার্জেন্ট সম্পর্কে বলেন, “হ্যারি কিছু সমস্যার সম্মুখীন এবং হোয়াইট হাউস যা দেখেছিল, তা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছিল।”
তাদের বক্তব্য: সার্জেন্টের আইনজীবী জেসন রাইট এক লিখিত বিবৃতিতে বলেন, “একজন স্বঘোষিত উদারপন্থী কন্টেন্ট নির্মাতার মাধ্যমে নিজের নামে প্রচারিত মিথ্যা বক্তব্যগুলো মিস্টার সার্জেন্ট স্পষ্টভাবে অস্বীকার করছেন। একজন দেশপ্রেমিক এবং মেরিন ফাইটার পাইলট হিসেবে দেশের প্রতি নিষ্ঠাবান সেবাদানকারী হিসেবে তিনি প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের ভিশন, নেতৃত্ব এবং ‘আমেরিকা ফার্স্ট’ (আমেরিকাকে অগ্রাধিকার)-এর লক্ষ্যে নেওয়া অক্লান্ত প্রচেষ্টাকে পূর্ণ সমর্থন করেন।”
রাইটের মাধ্যমে বিচ এবং মারোক্কো কোনো মন্তব্য করতে অস্বীকৃতি জানান। ল্যাম্বার্টের একজন মুখপাত্র ইমেইলের কোনো উত্তর দেননি।
কৌতূহলোদ্দীপক বিষয়: ফ্লোরিডায় থাকাকালীন ২০১০ সাল থেকেই রুবিওর সাথে সার্জেন্টের সম্পর্ক বেশ জটিল হয়ে ওঠে।
সে সময় রুবিও প্রাক্তন গভর্নর চার্লি ক্রিস্টের বিরুদ্ধে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে মার্কিন সিনেটর নির্বাচিত হন। সার্জেন্ট ছিলেন ক্রিস্টের বন্ধু এবং ফ্লোরিডা স্টেট ইউনিভার্সিটিতে তাঁর ‘ফ্র্যাটারনিটি’র (ছাত্র সংগঠন) সহকর্মী; তিনি প্রাক্তন গভর্নরের নির্বাচনী প্রচারণায় অর্থ সহায়তাও করেছিলেন।
ভেনেজুয়েলার তৎকালীন শক্তিশালী শাসক নিকোলাস মাদুরোর সাথে সার্জেন্টের তেলের ব্যবসার সম্পর্ক—যাকে রুবিও অত্যন্ত অপছন্দ করতেন—বছরের পর বছর ধরে তাদের সম্পর্কের উন্নতিতে কোনো সহায়তা করেনি।
গত বছর ট্রাম্প পুনরায় ক্ষমতায় আসার পর রুবিও পররাষ্ট্রমন্ত্রী (সেক্রেটারি অফ স্টেট) নিযুক্ত হন এবং কারাকাসে সরকার পরিবর্তনের পক্ষে জোরালো অবস্থান নেন। সার্জেন্টের মিত্র ও ট্রাম্পের বিশেষ দূত রিচার্ড গ্রেনেল শুরুতে এর বিরোধিতা করলেও শেষ পর্যন্ত রুবিওই জয়ী হন। ৩রা জানুয়ারি এক অভিযানের মাধ্যমে মার্কিন বাহিনী মাদুরোকে আটক করে।
এর এক মাস পর, মাদুরোর পতনের পরেও ভেনেজুয়েলায় সার্জেন্টের সম্পৃক্ততা নিয়ে ‘ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল’-এ একটি প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়। এরপর ট্রাম্প ‘ট্রুথ সোশ্যাল’-এ একটি পোস্টের মাধ্যমে সার্জেন্টকে বিশেষভাবে উল্লেখ করে বলেন যে, “মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষে কোনো ধরনের কার্যক্রম পরিচালনার কোনো এখতিয়ার সার্জেন্টের নেই; এমনকি স্টেট ডিপার্টমেন্টের অনুমোদন ছাড়া অন্য কারওও এমন কোনো অধিকার নেই।”
৭ই আগস্ট, ট্রেজারি ডিপার্টমেন্ট সার্জেন্টের একটি কোম্পানির ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে এবং সেটির সম্পদ বাজেয়াপ্ত করে। তিনি ৩০০ মিলিয়ন ডলারের বিনিময়ে ‘নর্থ আমেরিকান ব্লু এনার্জি পার্টনার্স’ (সংক্ষেপে NABEP)-এর কাছে এর মালিকানাস্বত্ব হস্তান্তর করেছিলেন।
এর ১১ দিন পর, সার্জেন্ট ‘ফোর সিজনস’ বারে মারোক্কো ও বিচের (এবং ল্যাম্বার্টের) সাথে মিলিত হন।
তারও নয় দিন পর, ভেনেজুয়েলায় ট্রাম্পের বিশাল তেল চুক্তির মাধ্যম বা বাহন হয়ে ওঠে NABEP—যার খবরটি সর্বপ্রথম ২৭ আগস্ট ‘অ্যাক্সিওস’ (Axios) প্রকাশ করেছিল।
প্রেক্ষাপট বিশ্লেষণ: ট্রাম্প-ঘনিষ্ঠ মহলের মতে, সার্জেন্টের এই ভোগান্তি প্রশাসনের সুনজরে থাকার বিষয়ে একটি সতর্কবার্তা হিসেবে কাজ করছে।
ট্রাম্পের একজন উপদেষ্টা বলেন, “হ্যারিকে আমি পছন্দ করি না, কিন্তু তার সাথে চরম বিশ্বাসঘাতকতা করা হয়েছে। তারা তাকে ভেনেজুয়েলা থেকে বের করে দিয়েছে, তার কোম্পানির ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে এবং তাকে অন্য একটি চুক্তি থেকেও সরিয়ে দিয়েছে। এমনকি কেউ কেউ তার বিরুদ্ধে তদন্তও চাইছে।”
সার্জেন্টের একজন প্রাক্তন ব্যবসায়িক সহযোগী উল্লেখ করেছেন যে, তিনি ২০২০ সালে ট্রাম্পের নির্বাচনী প্রচারণায় আর্থিক সহায়তা দিয়েছিলেন এবং সে সময় জো বাইডেনের বিরুদ্ধে তদন্তের জন্য ইউক্রেনকে চাপ দেওয়ার ক্ষেত্রেও ট্রাম্পকে সহায়তা করেছিলেন।
ওই সহযোগী বলেন, “হ্যারি ট্রাম্পের প্রতি অবিশ্বস্ত ছিলেন না। তিনি মূলত তেল ব্যবসার সাথে জড়িত একজন মানুষ; তিনি তেলের ব্যবসায়িক চুক্তি করতে চান। আর শুরু থেকেই তাঁর উচিত ছিল রুবিও-র দলের সাথে থাকা।”





























































