ওয়াশিংটন সফরের সময় চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের কাছে তাইওয়ানে অস্ত্র বিক্রি বন্ধের দাবি জানাবেন বলে আশা করা হচ্ছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রের তথ্যমতে, তিনি যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল আর্কাইভস পরিদর্শনের সময় এই বিষয়টি উত্থাপন করতে পারেন।
তাইওয়ানকে নিজেদের ভূখণ্ড হিসেবে বিবেচনা করা চীন নিয়মিতভাবে এই বিষয়টিকে তাদের সবচেয়ে সংবেদনশীল ও গুরুত্বপূর্ণ কূটনৈতিক ইস্যু হিসেবে অভিহিত করে আসছে এবং বারবার অস্ত্র বিক্রি বন্ধের আহ্বান জানিয়ে আসছে।
আনুষ্ঠানিক কূটনৈতিক সম্পর্ক না থাকা সত্ত্বেও, গণতান্ত্রিকভাবে শাসিত তাইওয়ানকে আত্মরক্ষার সক্ষমতা প্রদানে যুক্তরাষ্ট্র আইনগতভাবে বাধ্য। তাইওয়ানের সরকার বেইজিংয়ের সার্বভৌমত্বের দাবি প্রত্যাখ্যান করে।
ট্রাম্পের সঙ্গে শীর্ষ বৈঠকের জন্য শি-র ওয়াশিংটন সফরের আগে যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের মধ্যে যে আলোচনা হয়েছে, সে সম্পর্কে অবগত তিনটি সূত্র রয়টার্সকে জানিয়েছে যে, চীন সম্ভবত ১৯৮২ সালে স্বাক্ষরিত দুই দেশের মধ্যকার তিনটি ‘যৌথ ইশতেহার’-এর মধ্যে তৃতীয়টির নিজস্ব ব্যাখ্যা তুলে ধরবে।
ওই ইশতেহার অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্র জানিয়েছিল যে তারা তাইওয়ানে অস্ত্র বিক্রি পর্যায়ক্রমে কমিয়ে আনার ইচ্ছা পোষণ করে এবং তাইপেইয়ের কাছে দীর্ঘমেয়াদে অস্ত্র বিক্রির কোনো লক্ষ্য তাদের নেই।
তবে, এর সাথে যুক্ত একটি স্মারকলিপিতে তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট রোনাল্ড রিগ্যান বলেছিলেন যে, অস্ত্র বিক্রি কমানোর বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের এই সদিচ্ছা সম্পূর্ণভাবে নির্ভর করছে তাইওয়ানের সাথে মতপার্থক্যের শান্তিপূর্ণ সমাধানে চীনের অব্যাহত প্রতিশ্রুতির ওপর।
গত পাঁচ বছরে তাইওয়ানের আশপাশে চীন তার সামরিক তৎপরতা ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি করেছে; এর মধ্যে রয়েছে সরাসরি ক্ষেপণাস্ত্র পরীক্ষার মাধ্যমে যুদ্ধ-মহড়া পরিচালনা। তাদের সশস্ত্র বাহিনী প্রায় প্রতিদিনই তাইওয়ানের আশপাশে কার্যক্রম চালায়।
চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে যে, সরকার তাইওয়ানে মার্কিন অস্ত্র বিক্রির “দৃঢ় বিরোধিতা” করে এবং সম্পর্ককে স্থিতিশীল ও সুস্থ ধারায় এগিয়ে নিতে তিনটি যৌথ ইশতেহার ও তাইওয়ান ইস্যুতে যুক্তরাষ্ট্রের পূর্ববর্তী প্রতিশ্রুতি মেনে চলা একটি “আবশ্যিক পূর্বশর্ত”।
শি বুধবার ওয়াশিংটনে পৌঁছাবেন; বৃহস্পতিবার আনুষ্ঠানিক আলোচনা এবং শুক্রবার আর্কাইভস পরিদর্শনের কর্মসূচি রয়েছে।
হোয়াইট হাউসের একজন কর্মকর্তা জানিয়েছেন, ট্রাম্প বলেছেন তিনি খুব শীঘ্রই নতুন অস্ত্র বিক্রির প্যাকেজটির বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেবেন।
ওই কর্মকর্তা আরও জানান, নিজের প্রথম মেয়াদে ট্রাম্প ইতিহাসের অন্য যেকোনো প্রেসিডেন্টের চেয়ে তাইওয়ানে বেশি অস্ত্র বিক্রির অনুমোদন দিয়েছিলেন; আর দ্বিতীয় মেয়াদের প্রথম বছরেই তিনি প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনের চার বছরের মেয়াদের মোট বিক্রির চেয়েও বেশি অস্ত্রের অনুমোদন দিয়েছেন। তাইওয়ানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, তারা যুক্তরাষ্ট্রের সাথে “জোরালো যোগাযোগ” বজায় রাখার পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের মধ্যকার উচ্চ-পর্যায়ের আলোচনার গতিপ্রকৃতির ওপর নিবিড় নজর রাখছে।
অস্ত্র সরবরাহ
বিষয়টির সংবেদনশীলতার কারণে নাম প্রকাশ না করার শর্তে কথা বলা সূত্রগুলো জানিয়েছে, চীন যুক্তরাষ্ট্রের কাছে তাইওয়ানের জন্য আগে থেকেই অর্ডার করা অস্ত্র সরবরাহ বন্ধ করারও আহ্বান জানিয়েছে।
সূত্রগুলোর একটি জানিয়েছে, শি হয়তো ট্রাম্পের কাছে জোর দিয়ে বলবেন যে তাইওয়ানই উসকানিদাতা এবং যুক্তরাষ্ট্র-চীন সম্পর্কের অস্থিতিশীলতার একমাত্র কারণ; এবং তাইওয়ানই বিদ্যমান স্থিতাবস্থা (স্ট্যাটাস কো) পরিবর্তন করছে।
সূত্রগুলো আরও জানায়, এর বিনিময়ে মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধের বিষয়ে ইরানের ওপর চাপ সৃষ্টিতে চীন সহায়তা করার প্রস্তাব দিচ্ছে।
যুক্তরাষ্ট্র “এক চীন নীতি” (one-China policy) অনুসরণ করে; যার অধীনে তারা তাইওয়ানের সার্বভৌমত্বের বিষয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো অবস্থান নেয় না এবং বেইজিংয়ের এই অবস্থানকে স্বীকার করলেও তা সমর্থন করে না যে তাইওয়ান চীনের অংশ।
ট্রাম্প প্রশাসন গত ডিসেম্বরে তাইওয়ানের কাছে ১১ বিলিয়ন ডলারের অস্ত্র বিক্রির একটি প্যাকেজ অনুমোদন করেছিল, যা ছিল এ যাবৎকালের সবচেয়ে বড় প্যাকেজ। তবে, প্রায় ১৪ বিলিয়ন ডলার মূল্যের দ্বিতীয় একটি প্যাকেজ কয়েক মাস ধরে স্থগিত রয়েছে।
বেইজিংয়ে শি-র সাথে মে মাসে অনুষ্ঠিত শীর্ষ বৈঠকের পর ট্রাম্প বলেছিলেন যে তিনি এটি স্থগিত রেখেছেন এবং এটিকে “আলোচনার জন্য অত্যন্ত ভালো একটি হাতিয়ার” (negotiating chip) হিসেবে অভিহিত করেছিলেন।
তাইওয়ান ইস্যুতে ট্রাম্পকে ‘উপদেশ’ দিতে পারেন শি
তাইওয়ানের জন্য “ছয়টি নিশ্চয়তা” (Six Assurances)-এর আওতায়—যা ১৯৮২ সালে জারি করা হলেও ২০২০ সালে গোপনীয়তার তালিকা থেকে মুক্ত করা হয়—যুক্তরাষ্ট্র তাইওয়ানে অস্ত্র বিক্রি বন্ধের কোনো তারিখ নির্ধারণ করেনি এবং এ ধরনের বিক্রির বিষয়ে বেইজিংয়ের সাথে পূর্ব-পরামর্শের কোনো প্রতিশ্রুতিও দেয়নি।
শীর্ষস্থানীয় মার্কিন রিপাবলিকান নেতারা এই শীর্ষ বৈঠকের আগে তাইওয়ানের প্রতি তাদের সমর্থন ব্যক্ত করে আসছেন।
সিনেটের পররাষ্ট্র সম্পর্ক বিষয়ক উপকমিটির (পূর্ব এশিয়া বিষয়ক) রিপাবলিকান চেয়ারম্যান ও মার্কিন সিনেটর পিট রেকেটস গত সপ্তাহে হাডসন ইনস্টিটিউটের এক অনুষ্ঠানে বলেন, তাইওয়ান ইস্যুতে ট্রাম্পের কঠোর অবস্থান নেওয়া উচিত এবং এটি স্পষ্ট করা উচিত যে তাইওয়ান বিষয়ক মার্কিন নীতি অপরিবর্তিত রয়েছে।
তিনি বলেন, “আমাদের তাদের বারবার এটা জানিয়ে যেতে হবে যে, জোরপূর্বক তাইওয়ান দখল করার সুযোগ তাদের দেওয়া হবে না। এ বিষয়ে আমাদের অবস্থান অপরিবর্তিত রয়েছে এবং আমরা তাইওয়ানকে সমর্থন দিয়ে যাব।” শুক্রবার ট্রাম্পের কাছে লেখা এক চিঠিতে, ‘হাউস সিলেক্ট কমিটি অন চায়না’-র রিপাবলিকান চেয়ারম্যান জন মুলেনার—তাইওয়ান ও এশিয়ায় যুক্তরাষ্ট্রের মিত্রদের প্রসঙ্গ টেনে—লিখেছেন, যুক্তরাষ্ট্রের অস্ত্র বিক্রি ও নিরাপত্তা সহযোগিতার বিষয়ে চীনের আপত্তিগুলো “এক কথায় প্রত্যাখ্যান” করা উচিত।
শনিবার তাইপেইতে আয়োজিত একটি প্রতিরক্ষা বিষয়ক ফোরামে বক্তব্য রাখার সময় ট্রাম্পের প্রথম প্রশাসনের উপ-জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা ম্যাট পটিংগার বলেন, চলতি সপ্তাহের বৈঠকগুলোতে তাইওয়ান ইস্যুতে “উল্লেখযোগ্য” কোনো কিছু ঘটার আশা তিনি করছেন না।
তিনি বলেন, “আমি বাজি ধরে বলতে পারি, আগের বৈঠকগুলোর মতোই এবং অন্যান্য মার্কিন প্রেসিডেন্টের ক্ষেত্রে যেমনটা করেছেন, এবারও শি জিনপিং প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পকে তাইওয়ান বিষয়ে দীর্ঘ বক্তৃতা দেবেন।”


































































