শৈশব—যেন স্বপ্নের এক রঙিন জগৎ, নির্ভেজাল আনন্দ, কৌতূহল আর খেলাধুলার প্রতিটি মুহূর্ত আবেগ ভরা ভাণ্ডার। জীবনের প্রতিটি স্মৃতি যেন রঙিন ছবির মতো ভেসে ওঠে মনে। সেই স্মৃতির ভেতর একটি বিশেষ স্থান দখল করে আছে দুর্গোৎসব। আমার শৈশবের দুর্গোৎসব কেবল ধর্মীয় আচার ছিল না; এটি ছিল আনন্দ, উৎসব আর মানবিক মিলনের এক অনন্য স্মৃতিচিত্র। যেখানে ধর্মীয় ভেদাভেদ ভুলে আমরা মিলিত হতাম একসাথে। সম্প্রীতির এক অনন্য বন্ধন ছিল। পূজা শুরু হওয়ার অনেক আগে থেকেই মনে অদ্ভুত উত্তেজনা কাজ করত। দুর্গা পূজার প্রায় দুই মাস আগে থেকেই পয়সা জমাতাম মাটির ব্যাংক কিংবা ঘরের বাশেঁর খুঁটিতে ছিদ্র করে। প্রতিমা গড়ার কাজ শুরু হতো গ্রামের মণ্ডপে। ছোট্ট আমি প্রতিদিন সেখানে যেতাম, দেখতাম কাদা থেকে দেবী দুর্গার ধীরে ধীরে রূপ নেওয়ার বিস্ময়কর দৃশ্য। প্রথমে বাঁশের কাঠামো, তারপর খড়ে ভরাট, কাদার প্রলেপ, আর শেষে রঙের আঁচড়ে যেন প্রতিমা জীবন্ত হয়ে উঠত। ছোট্ট চোখে মনে হতো—মা দুর্গা সত্যিই স্বর্গ থেকে নেমে আসছেন আমাদের মাঝে। কিন্তু এখন দুর্গোৎসব মানে এক ধরনের ভয় আতঙ্ক বিরাজ করে। প্রতিমা বা বিগ্রহ ভাঙ্গার বা মিথ্যে অভিযোগে হামলার শিকার হওয়ার। যা কোন ভা্বেই সভ্য মানুষের কাম্য নয়।
গর্জন নয়, গঠন চাই: নতুন বাংলাদেশের প্রত্যাশা
দুর্গোৎসব মানেই নতুন জামাকাপড়। আমরা ছিলাম চার ভাই , চর বোন এবং সবার ছোট ছিলাম আমি। তাই আমার বায়নাটা একটু বেশিই ছিল। দুর্গোৎসব উপলক্ষে আমার বড় ভাই সবাইকে নতুন জামাকাপড় কিনে দিতেন সাধ ও সাধ্যের সবটুকু দিয়ে। বড় ভাই সরকারি স্কুলের শিক্ষক ছিলেন। তাই দুর্গোৎসরে কেনাকাটা ঢাকায় করা হতো। এখনো বড় ভাই দুর্গোৎসবে পরিবারের সবাইকে নতুন জামাকাপড় কিনে দেন। পূজার সময় বাড়িতে যে আনন্দ থাকত, তা ভাষায় প্রকাশ করা কঠিন। নতুন জামাকাপড় পাওয়া ছিল সবচেয়ে বড় আকর্ষণ। আবার বাবার সাথে দোকানে গিয়ে জামা বেছে নেওয়া, নতুন চটি বা জুতো কেনা—এসব মুহূর্ত মনে হলে এখনও চোখ ভরে ওঠে আনন্দে। দুর্গোৎসবে বাবার কাছে অনেক আবদার করতাম। বাবা আবদার পূরণে উজার করে দিতেন নিজেকে। আজ বাবা নেই, আমি নিজে আজ বাবা হয়েছি । আমার সন্তানরা যখন আমার কাছে আবদার করে তখন বাবাকে খুব মনে পড়ে। দোকানে নতুন পোশাক বাছাইয়ের মুহূর্তটি ছিল অদ্ভুত আনন্দে ভরা। জামা হাতে পেলে আর দমে রাখা যেত না, বারবার দেখতাম। বন্ধুদের বলতাম। পূজার সকালে সেই জামা পরে যখন বন্ধুদের সঙ্গে বের হতাম, মনে হতো আমি যেন পৃথিবীর সবচেয়ে সুখী শিশু।
শৈশবে আমার দুর্গোৎসব তা কেবল উৎসব নয়—এটি ছিল আনন্দের রঙে আঁকা শৈশবের ক্যানভাস, পারিবারিক ভালোবাসার উষ্ণতা আর সামাজিক সম্প্রীতির প্রতীক। যখনই মনে পড়ে, হৃদয় ভরে ওঠে নস্টালজিয়ায়। হয়তো সেই দিন আর ফিরে আসবে না, কিন্তু স্মৃতির ভাণ্ডারে শৈশবের পূজা আজীবন থাকবে উজ্জ্বল, আবেগঘন এক অধ্যায় হয়ে। আমার শৈশবের দুর্গোৎসবের সবচেয়ে প্রিয় অংশ ছিল ঢাকের বাজনা। ঢাকের গর্জন উঠলেই মন নেচে উঠত। ভিড়ের মাঝেও দাঁড়িয়ে থাকতাম চুপচাপ, শুধু ঢাকিদের নাচের ভঙ্গি আর তাল-লয়ের ঝড়ে মুগ্ধ হয়ে। কখনো আবার বন্ধুদের সঙ্গে ছন্দ মেলাতে গিয়ে অজান্তেই পা কাঁপত, শরীর নাচত। সন্ধ্যায় আড়তি হতো । ঢাকের তালে নাচতাম বন্ধুরা মিলে সবাই। ছোট ছিলাম বলে অনেক সময় বড়রা আড়তির সময় মন্ডপের পাশে দাঁড় করিয়ে রাখত।
মণ্ডপের প্রসাদ খাওয়াও ছিল এক অমূল্য আনন্দ। নাড়ু, খই, বুরিন্দা, কাঁচা প্রসাদ, মিষ্টির স্বাদ যেন ভিন্নতর হয়ে উঠত পূজার আবহে। কলা পাতা হাতে নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকতাম ধৈর্য ধরে, কিন্তু মনে হতো সময় আর কাটছে না। প্রসাদ মুখে পুরলেই মন ভরে যেত। আমার শৈশবের পূজা শুধু আনন্দেই সীমাবদ্ধ ছিল না; এটি ছিল সামাজিক বন্ধনেরও এক মহান উৎসব। আমাদের গ্রামে হিন্দু-মুসলিম নির্বিশেষে সবাই একসঙ্গে পূজার কাজে হাত লাগাত। মণ্ডপ সাজাতে, আলো ঝুলাতে কিংবা প্রসাদ বিতরণে ধর্ম-বর্ণের বিভাজন কোথাও ছিল না। এখন বুঝি—এই সম্প্রীতির শিক্ষা-ই ছিল পূজার আসল প্রাপ্তি। তবু পূজার সবচেয়ে আবেগঘন মুহূর্ত ছিল প্রতিমা বিসর্জনের দিন। দেবীর বিদায়ের সঙ্গে সঙ্গে আমাদের ছোট্ট হৃদয়ে যেন হাহাকার বয়ে যেত। নদীর জলে প্রতিমা ভেসে যাওয়ার সময় আমরা দাঁড়িয়ে কাঁদতাম। মনে হতো—মা আমাদের ছেড়ে চলে যাচ্ছেন দূরে। কিন্তু সেই দুঃখের মাঝেই জন্ম নিত নতুন আশার আলো—“আবার আসিবে মা, আবার হবে উৎসব।”
শৈশবে দুর্গোৎসব মানেই ছিল উৎসবের আমেজ, রঙিন আলো আর অদ্ভুত এক আনন্দ। আমাদের এলাকায় দুর্গাপূজাই সবচেয়ে বড় উৎসব ছিল। দুর্গা মণ্ডপ সাজানো , ঢাকের বাদ্য, আর আলোকসজ্জা—সবকিছু যেন নতুন করে প্রাণ দিত আমাদের। পূজা শুরু হবার অনেক আগেই আমাদের মনে উচ্ছ্বাসের ঢেউ বয়ে যেত। বন্ধুদের সঙ্গে মণ্ডপে যাওয়া, প্রতিদিন প্রতিমার গড়নের পরিবর্তন দেখতে দাঁড়িয়ে থাকা ছিল আমার অন্যতম আনন্দের জায়গা। কাদা থেকে প্রতিমার কাঠামো তৈরি, তারপর ধীরে ধীরে রঙের আঁচড়ে প্রতিমার জীবন্ত হয়ে ওঠা—এসব আমার কাছে ছিল যেন জাদুর মতো।
আজ সময়ের স্রোতে ভেসে শৈশব বহু দূরে হারিয়ে গেছে। এখনো পূজা হয়, মণ্ডপে ভিড় জমে, আলো ঝলমলে সাজসজ্জা হয়, কিন্তু সেই সরল আনন্দের গভীরতা আর খুঁজে পাওয়া যায় না। আজকের পূজায় রয়েছে আধুনিকতার ঝলক, কিন্তু শৈশবের পূজার নির্মল আবেগ আর রঙিন স্মৃতি হৃদয়ের গভীরে অমর হয়ে আছে। শৈশবে আমার পূজা তাই কেবল ধর্মীয় উৎসব নয়; এটি ছিল শৈশবের নির্মল আনন্দ, পারিবারিক ভালোবাসা ও সামাজিক সম্প্রীতির প্রতীক। জীবনের পথে যতই এগোই না কেন, সেই দিনগুলোর কথা মনে পড়লেই মন ভরে ওঠে নস্টালজিয়ায়। হয়তো সেই দিন আর ফিরে আসবে না, কিন্তু স্মৃতিগুলো আমাকে বারবার মনে করিয়ে দেয়— শৈশবের দুর্গোৎসব তাই আমার জীবনের গোপন রঙতুলি, যা স্মৃতির ক্যানভাসে আজও আঁকে আনন্দের উজ্জ্বল ছবি। শৈশবের দুর্গোৎসবের মতো দিনগুলো যদি আবার ফিরে আসতো তবে সম্প্রীতির বন্ধনে আবদ্ধ হয়ে নিরাপদ ও সুখী জীবন উপভোগ করতে পারতাম।
শৈশব—যেন স্বপ্নের রঙিন জগৎ; নির্ভেজাল আনন্দ, কৌতূহল আর খেলাধুলায় ভরা ভাণ্ডার। জীবনের প্রতিটি মুহূর্তই ছিল আবেগঘন, আর সেই স্মৃতির ভেতর এক বিশেষ স্থান দখল করে আছে দুর্গোৎসব। আমার শৈশবের দুর্গোৎসব কেবল ধর্মীয় আচার ছিল না; এটি ছিল আনন্দ, উৎসব আর মানবিক মিলনের এক অনন্য অভিজ্ঞতা, যেখানে ধর্ম-বর্ণ ভুলে সবাই মিলিত হতো সম্প্রীতির বন্ধনে।
পূজা শুরু হওয়ার অনেক আগে থেকেই উত্তেজনা কাজ করত। দুর্গাপূজার দুই মাস আগে আমরা মাটির ব্যাংক কিংবা বাঁশের খুঁটির গোপন ছিদ্রে পয়সা জমাতাম। মণ্ডপে প্রতিমা গড়ার কাজ ছিল আমাদের কৌতূহলের কেন্দ্রবিন্দু। বাঁশের কাঠামো, খড়ের ভরাট, কাদার প্রলেপ আর শেষে রঙের আঁচড়ে দেবী দুর্গা ধীরে ধীরে জীবন্ত হয়ে উঠতেন। শিশুমনে সত্যিই মনে হতো—মা স্বর্গ থেকে নেমে এসেছেন আমাদের মাঝে।
দুর্গোৎসব মানেই নতুন জামাকাপড়। আমরা ছিলাম চার ভাই ও চার বোন; সবার ছোট ছিলাম আমি, তাই আমার বায়নাটাও বেশি ছিল। বড় ভাই, যিনি সরকারি স্কুলের শিক্ষক ছিলেন, সাধ্যের সবটুকু দিয়ে সবাইকে নতুন পোশাক কিনে দিতেন। সেই দোকান বাছাই, জামা হাতে নিয়ে বারবার দেখা, বন্ধুদের দেখানো—এসব মুহূর্ত আজও মনে হলে আনন্দে চোখ ভরে ওঠে। বাবার কাছে আবদার করতাম, তিনি উজাড় করে দিতেন স্নেহ। আজ বাবা নেই, কিন্তু আমার সন্তানদের আবদারে বাবার কথাই বারবার মনে পড়ে।
শৈশবের পূজার সবচেয়ে প্রিয় অংশ ছিল ঢাকের বাজনা। ঢাকের গর্জনে মনে হতো, পুরো গ্রাম যেন আনন্দে নেচে উঠছে। ঢাকিদের ছন্দময় নাচ, আড়তির ঝংকারে মণ্ডপ মুখর হয়ে উঠত, আর আমরা শিশুদের শরীরও অজান্তেই দুলত সেই তালে।
আরেকটি অবিস্মরণীয় আনন্দ ছিল প্রসাদ খাওয়া। নাড়ু, খই, বুরিন্দা কিংবা মিষ্টি—সবই পূজার আবহে হয়ে উঠত অন্যরকম স্বাদময়। কলাপাতা হাতে দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করার সেই ধৈর্য ও প্রসাদ মুখে পুরলেই মনে ভরে ওঠা তৃপ্তি আজও ভোলার নয়।
আমাদের গ্রামে হিন্দু-মুসলিম নির্বিশেষে সবাই পূজার কাজে অংশ নিত। মণ্ডপ সাজানো, আলো ঝোলানো কিংবা প্রসাদ বিতরণে কোনো বিভাজন ছিল না। এখন বুঝি—শৈশবের পূজা আমাদের শিখিয়েছে মানবিক সম্প্রীতির অমূল্য শিক্ষা।
সবচেয়ে আবেগঘন মুহূর্ত ছিল প্রতিমা বিসর্জনের দিন। দেবীর বিদায়ের সঙ্গে আমাদের ছোট্ট হৃদয়ে নেমে আসত হাহাকার। নদীর জলে প্রতিমা ভেসে যাওয়ার সময় চোখ ভিজে উঠত, মনে হতো—মা আমাদের ছেড়ে চলে যাচ্ছেন দূরে। কিন্তু সেই দুঃখের ভেতরই জন্ম নিত আশার আলো—“আবার আসিবে মা, আবার হবে উৎসব।”
আজও পূজা হয়, মণ্ডপ ভরে ওঠে আলো-ঝলমলে সাজে, ভিড় জমে, তবু সেই শৈশবের সরল আনন্দ খুঁজে পাই না। আধুনিকতার ঔজ্জ্বল্য আছে, কিন্তু নেই সেই নির্মল আবেগ। তাই আমার কাছে শৈশবের দুর্গোৎসব শুধু একটি ধর্মীয় অনুষ্ঠান নয়—এটি ভালোবাসা, পারিবারিক উষ্ণতা আর সামাজিক সম্প্রীতির রঙে আঁকা এক অমর স্মৃতি। সময় যতই এগিয়ে যাক না কেন, সেই দিনগুলো আমার হৃদয়ে রয়ে গেছে নস্টালজিয়ার দীপশিখা হয়ে, যা বারবার মনে করিয়ে দেয়—শৈশবের দুর্গোৎসব আমার জীবনের গোপন রঙতুলি, যা স্মৃতির ক্যানভাসে আজও আঁকে আনন্দের উজ্জ্বল ছবি।
সুধীর বরণ মাঝি, শিক্ষক, হাইমচর সরকারি মহাবিদ্যালয়, হাইমচর, চাঁদপুর।


























































