একদিকে দেশের নদী-খাল পুনরুদ্ধারে সরকারের মহাপরিকল্পনা, অন্যদিকে নদী খননের বালু দিয়ে খাল ও জলাশয় ভরাট করে দখলে নিয়ে বালু বাণিজ্য করার অভিযোগ পাওয়া গিয়েছে স্থানীয় বিএনপি’র এক নেতার বিরুদ্ধে।
বরিশালের হিজলা থানার মৌলভীর হাটের কাছে মেঘনা নদীর একটি গুরুত্বপূর্ণ চ্যানেল ড্রেজিং করে নাব্যতা ফেরানোর উদ্যোগ নেয় সরকার। আর চলতি অর্থ বছর সেই প্রজেক্ট শুরু হলে সেখান থেকে উত্তোলিত বালু পাইপের মাধ্যমে স্থানীয় খাল, কৃষিজমি ও জলাশয় ভরাট করে দখলের অভিযোগ উঠেছে উপজেলা ছাত্রদলের আহ্বায়ক মহসিন শিকদারের বিরুদ্ধে। তার সাথে যুক্ত হয়ে বিএনপি নেতা আলী আহমেদ আলি ক্বারিসহ আরও কয়েকজন প্রভাবশালী ব্যক্তি স্থানীয়দের জমি, ডোবা এবং সরকারী খালও দখলে নিয়ে নিচ্ছে।
স্থানীয় একাধিক ভুক্তভোগী ও রাজনৈতিক সূত্র জানায়, কয়েক কোটি টাকার বালু অবৈধভাবে সংগ্রহ করে তা বিক্রির পাশাপাশি প্রভাব খাটিয়ে নদীপাড়ের বিস্তীর্ণ এলাকা দখল করা হয়েছে। কৃষিজমি, পুকুর, ডোবা, বাগান এমনকি সরকারি জলাশয়ও রেহাই পাচ্ছে না। বাংলামটর এলাকায় একটি খাল বন্ধ করে বালু সংরক্ষণ করায় বিস্মিত এলাকাবাসী। প্রধানমন্ত্রী খাল খননে যখন সারাদেশে জোরালো পদক্ষেপ নিয়েছেন তখন বিএনপি ও সহযোগী সংগঠনের নেতারা খাল জলাশয় ভরাট করায় তা ব্যাপক সমালোচনার জন্ম দিয়েছে। তবে প্রভাবশালী এ চক্রের ভয়ে সাধারণ মানুষতো বটেই দলের নেতাকর্মীরাও মুখ খুলতে সাহস পায় না।
জানা গেছে, সাবেক নৌপরিবহন উপদেষ্টা ব্রিগেডিয়ার শাখাওয়াত হোসেনের উদ্যোগে গত অর্থবছরে হরিণাথপুর থেকে তুলাতলা-মৌলভীরহাট হয়ে উপজেলা সদর পর্যন্ত মেঘনা নদীর একটি চ্যানেল ড্রেজিং শুরু করে বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআইডব্লিউটিএ)। দীর্ঘদিন নাব্য সংকটে বন্ধ থাকা মৌলভীরহাট লঞ্চঘাট সচল করতেই এ উদ্যোগ নেয়া হয়। তবে প্রকল্প শুরুর আগেই বালু ফেলার স্থান নির্ধারণ নিয়ে জটিলতা দেখা দেয়। স্থানীয়রা এতে আপত্তি জানিয়ে নানা কর্মসূচি পালন করে।
মানববন্ধন ও প্রতিবাদের মধ্যেই প্রশাসনের আশ্বাসে কাজ শুরু হলে সুযোগটি কাজে লাগান অভিযুক্তরা—অভিযোগ এলাকাবাসীর। নাম প্রকশে অনিচ্ছুক ভুক্তভোগীরা বলেন, ‘ইজারার নামে জোরপূর্বক বহু জমি দখল করা হয়েছে। অনেককে ভয়ভীতি দেখিয়ে সই নেয়া হয়েছে। এমনকি পানি উন্নয়ন বোর্ডের সরকারি জমিও ভরাট করা হয়েছে বালু দিয়ে।’ অভিযোগ রয়েছে, প্রভাব খাটিয়ে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের নির্দিষ্ট স্থানে বালু ফেলতে বাধ্য করা হয়। আগে থেকে ইটভাটাসহ নদীর পাড়ের জায়গায় বাঁধ দিয়ে জায়গা করে রাখে অভিযুক্তরা।
সংগৃহীত বালু ট্রাক ও নৌপথে বিক্রি করা হচ্ছে। একই সঙ্গে মৌলভীরহাট সংলগ্ন একাধিক জলাশয় ভরাট করে ভবিষ্যতে স্থায়ীভাবে দখলের পরিকল্পনাও চলছে বলে জানিয়েছেন স্থানীয়রা। তাদের অভিযোগ, স্থানীয় সংসদ সদস্য ও প্রতিমন্ত্রীর কঠোর অবস্থানের মধ্যেও থেমে নেই বালু সিন্ডিকেট। এ নিয়ে ঈদের দিন সংঘর্ষ হলে মামলাও হয়েছে।
উত্থাপিত অভিযোগের বিষয় জানার জন্য মহসিন সিকদারকে একাধিকবার ফোন করলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি। এর পরে তার ফোনে মেসেজ দিলেও তিনি এর উত্তর দেওয়া থেকে বিরত ছিলেন।
প্রশাসনের নাকের চোখের সামনে কোটিকোটি টাকার বালু অবৈধ মজুদ এবং বিক্রি বিষয়ে জানার জন্য উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাকে ফোন দিলে তিনিও রেস্পন্স না করায় তার মেসেঞ্জারে মেসেজ দিলে তিনিও মেসেজের জবাব দেয়া থেকে বিরত থাকেন।
এদিকে ঈদের ছুটির সুযোগে মাসকাটা এলাকায় খালের ওপর অবৈধ স্থাপনা নির্মাণ করে স্থানীয় কয়েকজন। উপজেলা প্রশাসনের হস্তক্ষেপে তা বন্ধ হয়। তবে, বালু সিন্ডিকেটের বিষয়ে উদাসীনতা লক্ষ্য করা গেছে।
সম্প্রতি স্থানীয় সংসদ সদস্য বালু, মাছ ও সালিশি বাণিজ্য নিয়ে দলীয় নেতাকর্মী ও প্রশাসনকে কঠোর হুঁশিয়ারি দিলেও বাস্তবে তার কোনো প্রভাব পড়েনি বলে অভিযোগ উঠেছে। বরং সেই নির্দেশনা উপেক্ষা করে চলছে বালু বাণিজ্যের ‘মহোৎসব’। ফলে পরিবেশের ভারসাম্য নষ্ট হওয়ার পাশাপাশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন সাধারণ মানুষ। এ বিষয়ে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক ব্যক্তি বলেন, “সরকার খাল খনন করে জনগণের সুবিধার জন্য, আর এখানে সেই খালসহ নিচু এলাকাই ভরাট করে ব্যক্তিগত স্বার্থ হাসিল করা হচ্ছে—এটা খুবই দুঃখজনক।” সচেতন মহলের দাবি, রাজনৈতিক পরিচয় খাটিয়ে দলের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ণ করছে চক্রটি।










































