একজন সত্যনিষ্ঠ সাংবাদিকের মৃত্যু আমাদের বিবেককে নাড়িয়ে দিয়েছে। প্রশ্ন উঠছে—আমরা কি সত্যের কণ্ঠরোধের সমাজ গড়ে তুলছি? কোথা থেকে শুরু করব? কোন স্মৃতি দিয়ে শুরু করব? মনে পড়ে, ২০২২ সালের এক বিকেল। চাঁদপুরের হাইমচর সরকারি মহাবিদ্যালয়ের মাঠ—ডিগ্রি ক্যাম্পাস। চাঁদপুরের হাইমচর সরকারি মহাবিদ্যালয়ের মাঠে নদীভাঙন প্রতিরোধের দাবিতে মানুষের আকাঙ্খা। নদীভাঙন প্রতিরোধ সংগ্রাম কমিটির আয়োজনে এক সভায় প্রথম দেখা হয়েছিল বিভুরঞ্জন সরকারের সঙ্গে। সেই দিনটি যেন এখনো চোখের সামনে ভাসে। মঞ্চে দাঁড়িয়ে তিনি যে দৃঢ়তায় কথা বলছিলেন, তা শুধু বক্তৃতা ছিল না—ছিল সত্যের পক্ষে দৃপ্ত শপথ। বিদায়ের সময় বলেছিলেন, “ঢাকা এলে যোগাযোগ করো।” ঢাকায় গিয়েছিলাম। কিন্তু দেখা হয়নি। আর হবে না কোনোদিন। ২২ আগস্ট ২০২৫ রাতের খবর যেন বজ্রাঘাত হয়ে এলো—ফেসবুকে ভেসে বেড়াচ্ছে বিভুরঞ্জন সরকারের নিখোঁজ হওয়ার খবর। তারপর মেঘনার জলে ভেসে উঠল তার প্রাণহীন দেহ। সেদিন রাতভর যন্ত্রণা আমাকে গ্রাস করেছে। চোখের সামনে বারবার ভেসে উঠেছে সেই কলেজ মাঠের দৃশ্য—সাবলীল কণ্ঠে মানুষকে উজ্জীবিত করছেন, সত্যের সপক্ষে দৃঢ় কণ্ঠে বলছেন, “এই লড়াই ন্যায়বিচারের জন্য।”
তার শেষ লেখা পড়তে পড়তে বুকের ভেতর হাহাকার জমেছে। তিনি লিখেছিলেন: “আমি বিভুরঞ্জন সরকার, ‘আজকের পত্রিকা’র সম্পাদকীয় বিভাগে কাজ করি। সাংবাদিকতার সঙ্গে আমার সম্পর্ক পাঁচ দশকের বেশি সময়ের। দেশের নানা পরিবর্তন, আন্দোলন, গণআন্দোলন এবং রাজনৈতিক উত্থান–পতন প্রত্যক্ষ করেছি। এই দীর্ঘ সময় আমি লিখেছি সত্যের পক্ষে, মানুষের পক্ষে, দেশের পক্ষে। কিন্তু আজ, যখন নিজের জীবনকে দেখি, অনুভব করি—সত্য লিখে বাঁচা সহজ নয়। আমার পেশা আমাকে শিখিয়েছে—সত্য প্রকাশ করা মানে সাহসের সঙ্গে ঝুঁকি নেবার নাম।”
বিভুরঞ্জন সরকার লিখতেন—মানবাধিকার, নদীভাঙন, দুর্নীতি ইত্যাদি বিষয়ে। তিনি জীবন দিয়ে প্রমাণ করে গেলেন—সত্য লিখে বাঁচা সত্যিই সহজ নয়। এই মৃত্যু শুধু এক ব্যক্তির মৃত্যু নয়, এটি পুরো সমাজের ব্যর্থতার প্রতিচ্ছবি। রাষ্ট্র, কর্তৃপক্ষ, প্রতিষ্ঠান—কেউ এই দায় থেকে মুক্ত নয়। কারণ দীর্ঘদিন ধরে সাংবাদিকদের ওপর শোষণ, অবমূল্যায়ন, সুরক্ষার অভাব এবং সত্যের প্রতি উদাসীনতা আমাদের এমন পরিস্থিতিতে এনে দাঁড় করিয়েছে, যেখানে একটি প্রাণের মূল্য দিতে হয় কেবল সত্য বলার জন্য। প্রশ্ন হলো—আমরা কি এমন সমাজে বাস করতে চাই, যেখানে সত্য বলা মানে মৃত্যুর ঝুঁকি নেওয়া? আমরা কি চাই ভবিষ্যতে আরও বিভুরঞ্জন সরকারকে হারাতে? আমরা কি চাই সত্য বলার অপরাধে আরেকটি জীবন নিভে যাক?
বিভুরঞ্জন সরকারের মৃত্যু অশনিসংকেত। এই মৃত্যু কেবল পরিবারকে শোকের সাগরে ডুবিয়েছে তা নয়, এটি আমাদের সমাজব্যবস্থা ও রাষ্ট্রব্যবস্থার মুখোশ উন্মোচন করেছে। আমরা যারা কলমের শক্তিতে বিশ্বাস করি, তারা কি এখনো নিশ্চুপ থাকব? কর্তৃপক্ষের শোষণমূলক আচরণ, অবহেলা এবং দায়িত্বহীনতা এই মৃত্যুর মূলে। যে দেশে সাংবাদিকরা নিরাপদ নন, সে দেশ গণতন্ত্রের মুখ দেখবে কিভাবে? সত্যের প্রতি অবজ্ঞা চলতে থাকলে অচিরেই আমরা এমন এক সমাজে পরিণত হব যেখানে মিথ্যা হবে প্রতিষ্ঠিত সত্য, আর সত্য হবে ভয়ংকর অপরাধ।
তার শেষ লেখা পড়ছিলাম ফেসবুকে। সেখানে তিনি লিখেছিলেন: “আমি বিভুরঞ্জন সরকার। আজকের পত্রিকার সম্পাদকীয় বিভাগে কাজ করি। সাংবাদিকতার সঙ্গে আমার সম্পর্ক পাঁচ দশকের বেশি। এই দীর্ঘ সময় আমি লিখেছি সত্যের পক্ষে, মানুষের পক্ষে, দেশের পক্ষে। কিন্তু সত্য লিখে বাঁচা সহজ নয়। আমার পেশা আমাকে শিখিয়েছে—সত্য প্রকাশ করা মানে সাহসের সঙ্গে ঝুঁকি নেওয়া।” বিভুরঞ্জন সরকার জীবন দিয়ে প্রমাণ করে গেলেন—সত্য লিখে বাঁচা সহজ নয়।
এই মৃত্যু কেবল একটি ব্যক্তির মৃত্যু নয়; এটি পুরো সমাজের লজ্জা। এটি সাংবাদিকতার নৈতিকতার ব্যর্থতার প্রতীক। রাষ্ট্র ও কর্তৃপক্ষ কি এই দায় থেকে মুক্ত? নিশ্চয়ই না। সত্যের পক্ষে দাঁড়ানো সাংবাদিকদের সংকট কোনো একদিনে তৈরি হয়নি। বছরের পর বছর অবহেলা, অবজ্ঞা, শোষণমূলক আচরণ আর সুরক্ষার অভাব তাদের প্রান্তে ঠেলে দিয়েছে। ফলাফল—অকালে ঝরে যাওয়া প্রাণ। বিভুরঞ্জন সরকারের মৃত্যু তাই কেবল একটি শোকগাথা নয়, এটি একটি অশনিসংকেত। আমরা কি চাই ভবিষ্যতে আরও বিভুরঞ্জন সরকারকে হারাতে? সমাজ ও রাষ্ট্র কি এখনো চোখ বন্ধ করে থাকবে? নাকি এই মৃত্যুর ভেতর থেকে আমরা শিখব—সত্যের মূল্য দিতে হবে, কিন্তু সেই মূল্যে যেন প্রাণ না ঝরে পড়ে?
বিভুরঞ্জন দাদা, আমাদের ক্ষমা করবেন। আমরা আপনার সমস্যার সমাধান করতে পারিনি, আপনার সংকটে পাশে দাঁড়াতে পারিনি। কিন্তু আপনার মৃত্যু অসংখ্য প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে—সেই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে হবে। কারণ সেই উত্তর খোঁজা ছাড়া আমরা এগোতে পারব না—না সমাজে, না রাষ্ট্রে।
বিভুরঞ্জন সরকারের মৃত্যু কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। সাম্প্রতিক বছরগুলোয় সাংবাদিকদের ওপর একের পর এক আক্রমণ, মামলা এবং হয়রানি ভয়ঙ্কর চিত্র এঁকেছে। প্রথম আলোর প্রতিবেদন বলছে ১৯৯২ সাল থেকে বাংলাদেশের সাংবাদিকদের পেশাগত কারণে কমপক্ষে ৩৪ জন নিহত হয়েছেন । ঢাকা ট্রিবিউন ও ডেইলি স্টারের প্রতিবেদনে দেখা যায়,২০২৪ সালে প্রতিবাদের সময় অন্তত ৫ জন সাংবাদিক হত্যার শিকার হয়েছেন—যা বাংলাদেশকে সংবাদদাতা হত্যার ক্ষেত্রে বিশ্বের বিপজ্জনক দেশের তালিকায় তুলে ধরে হয়েছে । দ্যা গার্ডিয়ান ও প্রথম আলোতে আমরা দেকতে পাই ডিজিটাল সিকিউরিটি আইন (DSA) ২০১৮-এর আওতায় ২০১৮–২৩ পর্যন্ত ৭,০০০টি মামলা দায়ের করা হয়েছে; এর মধ্যে সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে ২৫৫ মামলা, এবং ১৫৫ জন অভিযুক্তের বিরুদ্ধে তথ্য “পরিকল্পিত ভয়” সৃষ্টি করার অভিযোগ । প্রথম আলোর রির্পোট সাইবার সিকিউরিটি অ্যাক্ট (পরিবর্তন) হলেও তা একই ধরনের নিয়ন্ত্রণ এবং ভয় তৈরির সুযোগ রেখেছে । ডেইলি অবজারভার প্রকাশ করে ২০২৪–২৫ সময়ে ৪৯৬ সাংবাদিক হয়রানির শিকার হয়েছেন; এর মধ্যে তিনজন নিহত হয়েছেন ।উইকপিডিয়ার সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে ২৯৪টি সাংবাদিক নির্যাতন বা জোরালো ত্রাসের শিকার হয়েছেন, ১১৩টি মামলা দায়ের করা হয়েছে, এবং ১৬৭ জন সাংবাদিকের প্রেস কার্ড বাতিল হয়েছে । ট্রান্সফারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ, ২০২৫ সালের বিশ্ব প্রেস ফ্রিডম ইনডেক্সে বাংলাদেশের অবস্থান ১৪৯। অত্যন্ত সংকুচিত ও কার্যকর স্বাধীনতার চিহ্ন নয় ।
বিভুরঞ্জন দাদা, আমাদের ব্যর্থতার দায়ভার আমরা অস্বীকার করতে পারি না। আপনার মৃত্যু অসংখ্য প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। সেই প্রশ্নের উত্তর খুঁজে না পেলে আমরা এগোতে পারব না—না সমাজে, না রাষ্ট্রে। বিভুরঞ্জন সরকারের মৃত্যু হোক জাগরণের শঙ্খধ্বনি। রাষ্ট্র যদি দায়িত্বহীন থাকে, সমাজ যদি চুপ থাকে, তবে ইতিহাস ক্ষমা করবে না। কারণ আজ বিভুরঞ্জন, কাল কে?
শেষে একটাই দাবি—বিভুরঞ্জন সরকারের প্রতি দায়িত্ব পালন না করা প্রতিষ্ঠানগুলোকে আইনের আওতায় এনে ক্ষতিপূরণ আদায়ের ব্যবস্থা করতে হবে। দায়িত্বহীন প্রতিষ্ঠান ও সংশ্লিষ্টদের আইনের আওতায় এনে ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের নৈতিক কর্তব্য। নইলে এই অন্যায়ের দায় আমরা কেউ এড়াতে পারব না।
সুধীর বরণ মাঝি, শিক্ষক, হাইমচর সরকারি মহাবিদ্যালয়, হাইমচর, চাঁদপুর।
shudir_chandpur@yahoo.com









































