মধ্যপ্রাচ্য ও উপসাগরীয় অঞ্চল যেন বৃহৎ শক্তিগুলোর প্রতিদ্বন্দ্বিতার রণক্ষেত্রে পরিণত না হয়—সোমবার ওমানের সুলতানের সঙ্গে আলাপকালে এ কথা বলেছেন চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং। তিনি জানান, দীর্ঘস্থায়ী শান্তি অর্জনের লক্ষ্যে আরব দেশগুলোর সঙ্গে কাজ করতে চীন প্রস্তুত।
মধ্যপ্রাচ্যে চীন ঐতিহাসিকভাবেই তুলনামূলক সীমিত কূটনৈতিক ভূমিকা পালন করে এসেছে। তবে ইরানকে কেন্দ্র করে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের মধ্যকার উত্তেজনার প্রেক্ষাপটে চীন এখন পরিস্থিতি শান্ত করার প্রচেষ্টায় আরও সক্রিয় হয়েছে। এই উত্তেজনার কারণে হরমুজ প্রণালীতে সংকট তৈরি হয়েছে এবং বিশ্বজুড়ে জ্বালানি ও পণ্য পরিবহনের ব্যয় বেড়ে গেছে।
ওমানের সুলতান হাইসাম বিন তারিক আল-সাইদকে শি জিনপিং বলেন, বিশ্ব বর্তমানে গভীর পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে।
চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, শি জিনপিং বলেন, “মধ্যপ্রাচ্য ও উপসাগরীয় অঞ্চল যেন বৃহৎ শক্তিগুলোর প্রতিদ্বন্দ্বিতা বা ভূ-রাজনৈতিক সংঘাতের ক্ষেত্র না হয়ে ওঠে। এই অঞ্চলে শান্তি ও স্থিতিশীলতা বজায় রাখার জন্য সব পক্ষের সম্মিলিত প্রচেষ্টা ও সুরক্ষা প্রয়োজন।”
তিনি আরও বলেন, যুদ্ধ বন্ধের বিষয়ে চীন বরাবরই প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। এই অঞ্চলের নিরাপত্তা সংক্রান্ত জটিলতা নিরসনে চীন তার “প্রজ্ঞা ও সমাধান” দিয়ে অবদান রাখতে চায়।
শি জিনপিং জানান, শান্তি পুনরুদ্ধার এবং দীর্ঘস্থায়ী স্থিতিশীলতা ও নিরাপত্তা অর্জনের লক্ষ্যে উপসাগরীয় সহযোগিতা কাউন্সিল (GCC) ভুক্ত দেশসহ অন্যান্য আরব রাষ্ট্রগুলোর সঙ্গে যোগাযোগ ও সমন্বয় জোরদার করতে চীন আগ্রহী।
উভয় পক্ষ ২০ দফা বিশিষ্ট একটি যৌথ বিবৃতিতে জানিয়েছে যে, হরমুজ প্রণালীতে স্বাভাবিক ও নিরাপদ নৌ-চলাচল পুনরায় শুরু হওয়া উচিত। এছাড়া, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের প্রতি তারা আহ্বান জানিয়েছে যেন তারা শান্তিপূর্ণ পথ বেছে নেয়, সংঘাত অবসানের লক্ষ্যে জুন মাসে হওয়া চুক্তিতে ফিরে আসে এবং পুনরায় আলোচনার টেবিলে বসে।
সোমবার পরবর্তী সময়ে চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানায়, মধ্যপ্রাচ্য বিষয়ক চীনের বিশেষ দূত ঝাই জুন চলতি মাসেই ইরান, ওমান ও সৌদি আরব সফর করবেন।
**চীনে প্রথম সফর**
ওমানের সুলতান হাইসাম দুই দিনের সফরে রবিবার বেইজিং পৌঁছান। ১৯৭৮ সালে দুই দেশের মধ্যে কূটনৈতিক সম্পর্ক স্থাপনের পর ওমানের কোনো রাষ্ট্রপ্রধানের এটিই প্রথম চীন সফর।
ওমানের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, সুলতান হাইসাম চীনা প্রেসিডেন্টকে জানান, এই অঞ্চলের গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোতে চীনের অবস্থানকে তাঁর সরকার অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে দেখে।
তিনি বলেন, “আমরা বিশ্বাস করি, উন্নয়ন ও স্থিতিশীলতা একে অপরের সঙ্গে অবিচ্ছেদ্যভাবে জড়িত।” “জাতিসমূহের সমৃদ্ধির জন্য এমন একটি পরিবেশ প্রয়োজন, যা নিরাপত্তা, শান্তি, রাষ্ট্রীয় সার্বভৌমত্বের প্রতি শ্রদ্ধা এবং আন্তর্জাতিক আইনের অনুসরণের মাধ্যমে গঠিত—এমন একটি পরিবেশ যেখানে বিরোধের নিষ্পত্তি হয় শান্তিপূর্ণ উপায়ে।”
তিনি আরও বলেন, ওমান চীনের সঙ্গে একটি অগ্রাধিকারমূলক দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য ও বিনিয়োগ চুক্তি স্বাক্ষরের বিষয়ে আগ্রহী।
হাইথাম বলেন, “আমরা নিশ্চিত যে, এ ধরনের একটি চুক্তি বাণিজ্য ও বিনিয়োগের নতুন পথ উন্মোচন করবে এবং আমাদের দুই দেশের মধ্যে বাণিজ্যিক ও বিনিয়োগ সংক্রান্ত আদান-প্রদানকে আরও সহজতর ও জোরদার করবে।”
চীন ওমানের বৃহত্তম বাণিজ্যিক অংশীদার। গত বছরের নভেম্বর মাস থেকে বেইজিং ও মাস্কাটের মধ্যে সরাসরি ফ্লাইট চালু হওয়ার ফলে উভয় দেশের মধ্যে পর্যটন ও ব্যবসায়িক সম্পর্ক আরও জোরদার হয়েছে।
ওমান চীনে অপরিশোধিত তেল ও জ্বালানি পণ্য রপ্তানি করে থাকে। এছাড়া দেশটি নবায়নযোগ্য জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থা এবং ডিজিটাল বাণিজ্যের আরও উন্নয়নের দিকেও নজর দিচ্ছে।
তাদের যৌথ বিবৃতিতে বলা হয়েছে, উভয় দেশ তেল ও প্রাকৃতিক গ্যাস খাতে বাস্তবসম্মত সহযোগিতা আরও গভীর করার পাশাপাশি সৌর ফটোভোলটাইক, বায়ুশক্তি, বিদ্যুৎ সঞ্চালন ও রূপান্তর এবং জ্বালানি সংরক্ষণের মতো নতুন জ্বালানি খাতেও সহযোগিতা সম্প্রসারণে সম্মত হয়েছে।
বেইজিং বিমানবন্দরে ওমানের এই নেতাকে স্বাগত জানান ‘পিপলস ব্যাংক অফ চায়না’-র গভর্নর প্যান গংসশেং। ওমানি নেতা এ সময় বিনিয়োগ ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে পারস্পরিক সহযোগিতার ওপরও বিশেষ গুরুত্বারোপ করেন।

































































