হযরত শাহ জালাল (রঃ) ও ৩৬০ আউলিয়ার অন্যতম সিপাহসালার সৈয়দ নাসির উদ্দিন সিলেটের ইতিহাসে এক অবিস্মরনীয় নাম। ৭০৩ হিজরীতে সিলেট বিজয়ের পর সিপাহসালার সৈয়দ নাসির উদ্দিনের নেতৃত্বে ১২ আউলিয়া তরফের অত্যাচারী রাজা আচক নারায়নকে পরাজিত করে তরফরাজ্য জয় করেন। সৈয়দ নাসির উদ্দিনের মাঝার সাবেক তরফ রাজ্যের বর্তমান মুড়ারবন্ধ দরগায় অবস্থিত। মুড়ারবন্ধ দরগা শরীফে সিপাহসালার সৈয়দ নাসির উদ্দিন সহ শতাধিক আউলিয়ার মাজার রয়েছে। ‘‘জনশ্রুতি আছে সিপাহসালার নাসির উদ্দিন যখন বাড়ী থেকে বেরিয়ে আসেন তখন তার মা তাঁকে আর্শীবাদ করে বলেছিলেন তিনি যেখানেই যান ভাল থাকবেন এবং তার বংশধরেরা আসমানের তারার মতো বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে পড়বে’’ এবং বিশ্বে আলো ছড়াবে। কামেল এই মহিলার দোয়া‘র প্রতিফলন বর্তমান সময়ে পরিলক্ষিত হচ্ছে।

সমগ্র বাংলাদেশ এবং পশ্চিমবঙ্গেও সিপাহসালার সৈয়দ নাসির উদ্দিনের বংশধরদের খুঁজে পাওয়া যায়। সিলেট ব্রাম্মনবড়িয়া কুমিল্লা বিশেষ করে হবিগঞ্জের সায়েস্তাগঞ্জ ও চুনারুঘাট উপজেলায় সিপাহসালার সৈয়দ নাসির উদ্দিনের উত্তরসূরীদের শতাধিক পরিবারের অস্থিত্ব দিব্যমান। বাহুবল নবীগঞ্জ, মাধবপুর নাসিরনগর, আখাউড়া, কিশোরগঞ্জে আরো শতাধিক পরিবারের অস্থিত্ব খুজে পাওয়া যায়। নরপতি-সুলতানসি-দাউদনগর-লস্করপুর ফরিদপুর-সুরাবই তথা রঘুনন্দ পর্বতঘেষা গ্রাম গুলোর সৈয়দদের সকলেই এই নাসির উদ্দিনের উত্তরসূরী। শুধু হবিগঞ্জ বা ব্রাম্মন বাড়িয়াই নয় সমগ্র বাংলাদেশে এরা ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছেন। নবীগঞ্জের এনাতাবাদ গুলডোবা সহ আরো কয়েকটি গ্রামে সিপাহসালার নাসির উদ্দিনের বংশধরদের অস্থিত্ব পাওয়া যায়। বিভিন্ন সময়ে লেখক ও ইতিহাস বেত্তারা এনিয়ে বিস্তর লোখালেখি করেছেন। এর প্রমান পাওয়া যায় সিলেটের প্রাচীন ইতিহাসের একমাত্র প্রামাণ্যগ্রন্থ (১৯১০-১৯১৭) সালে অচ্যুত চরন চৌধুরী তত্বনিধি লিখিত এবং স্বরসতী লাইব্রেরী শিলচার থেকে প্রকাশিত শ্রীহট্টের ইতিবৃত্তের উত্তরাংশ ও পূর্বাংশে। বাংলা একাডেমী কর্তৃক প্রকাশিত জালালাবাদের কথা, মাসিক আল ইসলাহ (১৯৩৬-১৯৪৮) এর বিভিন্ন সংখ্যায় ।
মুড়ারবন্ধ দরগা শরীফের বর্তমান মোতাওয়াল্লী সিপাহসালার সৈয়দ নাসির উদ্দিনের উত্তরসূরী সৈয়দ মুরাদের মতে সিপাহসালার নাসির উদ্দিনের বংশধরদের সকলের শেকড় মুরাড়বন্ধে। মুড়ারবন্ধ থেকেই স্থানান্তরিত হওয়া শুরু হয়। মুড়ারবন্ধ থেকে লস্করপুর, রামশ্রী খান্দুরা সুরাবই সুলতানসি দাউদনগর সিলেট শহর প্রবৃতি জায়গায় গেছেন প্রথমদিকে। এরপর সেসব স্থান থেকে বিভিন্ন জায়গায় গিয়ে বসতি স্থাপন করেন। এই বংশের সদস্যরা যুগে যুগে দেশের বিভিন্ন স্থানে স্থানান্তরিত হয়েছেন এখনও এই ধারা অব্যাহত রয়েছে। যে যেখানেই যাননা কেন সকল পরিবারের ইতিবৃত্ত সংরক্ষিত আছে মুড়ারবন্দ সৈয়দ পরিবারে। সৈয়দ মুরাদের কথার সত্যতা খুঁজে পাওয়া যায় অচ্যুত চরন চৌধুরীর শ্রীহট্টের ইতিবৃত্ত (১৯১০-১৯১৭) সালে প্রকাশিত পূর্বাংশে তরফ ও সৈয়দ বংশের উৎস চাপ্টারে তরফ বংশ পরিচয় অধ্যায় পৃষ্টা ১৫২,১৫৪,১৬০,১৬২ নাম্বারে। এতে তিনি উল্লেখ করেছেন রামশ্রী শাখার করম মুহাম্মদের পুত্র শাহ সিকন্দর গুলডোবায় গমন করেন এবং সেখানে বসত করেন।
মুড়ারবন্দে রক্ষিত নছবনামা ও ইতিহাসবিদদের দেয়া তথ্য মতে সৈয়দ মুসা মুড়ারবন্দ থেকে লস্করপুর আসেন। সেই হিসেবে লস্করপুর সৈয়দ বাড়ীর প্রতিষ্ঠাতা সৈয়দ মুসা। মুসার পুত্র সৈয়দ আদম, আদমের পুত্র সৈয়দ কুদ্দুস। কুদ্দুসের পুত্র সৈয়দ আলা উদ্দিন সৈয়দ আলা উদ্দিনের দুই পুত্র সৈয়দ হাসান এবং সৈয়দ ফরিদ। বর্তমান লস্করপুরের সৈয়দদের সকলেই সৈয়দ হাসানের উত্তরসূরী। সৈয়দ ফরিদ চলে আসেন কুর্শা পরগনায় তিনি এখানেই বসতি স্থাপন করেন, তাঁর নামানুসারে গ্রামের নাম হয় ফরিদপুর। অচ্যুতচরন চৌধুরী তত্বনিধি এবং সৈয়দ নাসির উদ্দিন বিষয়ক গবেষক ও সৈয়দ মোহাম্মদ ইলিয়াছ এবং দেওয়ান নূরুল আনোয়ার হোসেন চৌধুরীর মতে সৈয়দ ফরিদ এই ফরিদপুর গ্রামের গোড়াপত্তন করেন।
সৈয়দ ফরিদের তিনপুত্র ১. সৈয়দ রেহান ২. সৈয়দ সুলতান ৩ সৈয়দ মনুওর সৈয়দ। সৈয়দ রেহানের পুত্র সৈয়দ এনায়েত উল্লাহ এবং সুলতানের পুত্র সৈয়দ করম মুহাম্মদ। সৈয়দ মনুওরের পুত্র সৈয়দ আমির আলী। (সৈয়দ আমীর আলীর বংশধরেরা বর্তমান ত্রিপুরা রাজ্যের কাসিম নগরে আছেন।) সৈয়দ এনায়েত উল্লার কন্যা সৈয়দা কালাবিবি, যা ইতিহাসবিদ অচ্যূতচরন চৌধুরী তার গ্রন্থে বার বার উল্লেখ করেন। সৈয়দ করম মোহাম্মদের পুত্র সৈয়দ শাহ সিকন্দর। সৈয়দ শাহ সিকন্দরের উত্তরসূরীরা বিভিন্ন শাখা প্রশাখায় বিভক্ত হয়ে বর্তমানে গুলডোবা গ্রামে বসবাস করছেন।

নবীগঞ্জের প্রথম মুনসেফ সৈয়দ রজাওর রহমান সম্পর্কে আলোকপাত করতে গিয়ে অচ্যুত চরন চৌধুরী বলেছেন তরফ পরগনার অধিবাসী মোতিওর রহমানের পুত্র রিয়াজুর রহমান সৈয়দ এনায়েত উল্লার কন্যা কালাবিবিকে বিবাহ করে ৩নং ও ২১ নং মহালের সত্বপ্রাপ্ত হন। রিয়াজুর রহমান ও তার ভ্রাতা চৌধুরী ও কানগুই সনদ প্রাপ্ত হয়ে ছিলেন। রিয়াজুর রহমানের পুত্র রওজাওর রহমান রজাপুর গ্রাম স্থাপন করেন। এই রাজাপুরের অবস্থান পশ্চিম বঙ্গের মুর্শিদাবাদে তিনি কলিকাতায় লেখাপড়া করেন। তখনকার গভর্নর জেনারেল মন্ত্রি সভার সদস্য মহামতি মার্টিন সাহেবের সাথে তার পরিচয় ঘটে। মার্টিন সাহেবের সহায়তায় তিনি নবীগঞ্জের মুনসেফ নিযুক্ত হন। তিনি ৮৫ বছর বয়সে ১২৭৬ বঙ্গাব্দে মৃত্যুমুখে পতিত হন। শ্রীহট্টের ইতিবৃত্ত দ্বিতীয় খন্ড পৃষ্টা-৬০। অচ্যুত চরন চৌধুরীর এই লিখাটি পৃষ্টা নাম্বর সহ ১৯৮৫ সালে নবীগঞ্জের ইতিকথায় ছাপা হয়। পৃষ্টা ৬৫ নবীগঞ্জের ইতিকথা প্রথম সংসংস্করন।
শ্রীহট্টের ইতিবৃত্তের লেখক অচ্যুতচরন চৌধুরীর মতে লস্করপুর সৈয়দ বাড়ির প্রতিষ্টাতা সৈয়দ মুসা। সৈয়দ মুসার প্রপুত্র সৈয়দ হাসান লস্করপুরের সম্পদের অধিকার লাভ করেন এবং সৈয়দ হাসানের ভ্রাতা সৈয়দ ফরিদ কুর্শা পরগনায় নতুন বাড়ি তৈরী করে সেখানেই বসবাস শুরু করেন, সৈয়দ ফরিদের নামানুসারে গ্রামটির নাম হয় ফরিদপুর। এই সৈয়দ ফরিদ ছিলেন একজন আলেম তাঁর নামের আগে শায়েখ পদবী লক্ষনীয় শায়েখ থেকে শেখ কেউ কেউ তাঁকে শেখ ফরিদ বলে থাকেন। সৈয়দ ফরিদের পুত্র সৈয়দ রেহান, সৈয়দ রেহানের কন্যা হলেন সৈয়দা কালাবিবি। রেহানের ভাই সৈয়দ শাহ করম মুহাম্মদ, আর করম মুহাম্মদের পুত্র সৈয়দ শাহ সিকন্দর। অচ্যুত চরন চৌধুরীর দেয়া তথ্যামতে সৈয়দ শাহ সিকন্দর এবং সৈয়দা কালা বিবি আপন চাচাত ভাই বোন। সৈয়দ শাহ সিকন্দরের উত্তর সূরীদের কাছে রক্ষিত একটি দলিলে এর প্রমাণ পাওয়া যায়। এখানে সেই শতবছরের পুরানো দলিলটি তুলে ধরা হলো।

সিপাহসালার সৈয়দ নাসির উদ্দিন বিষয়ক গবেষক এবং তারই উত্তরসূরী কুমিল্লার অধিবাসী সৈয়দ মোহাম্মদ ইলিয়াছের মতে সৈয়দ ফরিদ থেকে ফরিদপুর সৈয়দ বাড়ির গোড়াপত্তন হয় এবং গ্রামটির নাম হয় ফরিদপুর। সৈয়দ মোহাম্মদ ইলিয়াস ও অচ্যুতচরন চৌধুরীর বর্নণা মতে সৈয়দ ফরিদের তিন পুত্র সৈয়দ রেহান উল্লাহ, সৈয়দ সুলতান ও সৈয়দ মনুওর। সৈয়দ সুলতানের তিন পুত্র সৈয়দ এনায়েত উল্লাহ, সৈয়দ শাহ আহমদ ও সৈয়দ শাহ মুহম্মদ করম।
সিলেট থেকে প্রকাশিত মাসিক আল ইসলাহ পত্রিকার (১৯৩৬-১৯৪৮) সংখ্যায় সৈয়দ নাসির উদ্দিনের উত্তরসূরীদের ফকিরি ধারা‘‘ নামক এক নিবন্ধে দেওয়ান মামুন চৌধুরী ফরিদপুর সৈয়দ বাড়ির সৈয়দ শাহ মোহাম্মদ করমের তিন পুত্র সৈয়দ শাহ সৈয়দ ওলি উল্লাহ ও সৈয়দ শাহ সিকন্দর ও সৈয়দ শাহ আহমদের নাম উল্লেখ করেছেন করেছেন।
কুমিল্লার অধিবাসী গবেষক সৈয়দ মোহাম্মদ ইলিয়াস নাসির উদ্দিন ও তার উত্তরসূরীদের নিয়ে দুই খন্ডে বই লিখেছেন। গবেষক সৈয়দ মোহাম্মদ ইলিয়াছের মতে সবটুকু উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি। সিপাহসারাল সৈয়দ নাসির উদ্দিনের উত্তসূরীদের নিয়ে লিখতে হলে ২০/ ২৫ খন্ডেও সব কিছু একত্রিত করা সম্ভব নয়। কেন সম্ভব হয়নি তারও কারন রয়েছে, কেননা নাসির উদ্দিনের বংশধরেরা শতাধিক শাখা প্রশাখায় বিভক্ত। যেসব পরিবার লেখকদের তথ্য সর্বরাহ করেছেন তারা শুধু তাদের কথাই বলেছেন পুরোটা কেউই সর্বরাহ করতে পারেননি। এযাবত নাসির উদ্দিন সম্পর্কে যেসব গ্রন্থ বেরিয়েছে আমার বিশ্বাস ক্রমান্বয়ে সব কিছু উঠে আসবে। এসব বিষয় শুধু আবেগ দিয়ে বিচার করলে হবেনা। গবেষণা ও প্রমাণাদির বিষয় বিবেচনায় আনতে হবে।

এই সৈয়দদের সকলেই মুড়ারবন্ধ থেকে বেরিয়ে আসেন। ১৯৭৯ সালে সৈয়দ মোস্তফা কামাল তরফের ইতিহাস গ্রন্থের ২৮/২৯ পৃষ্টায় উল্লেখ করেছেন সৈয়দ শাহ করম মুহাম্মদের পুত্র সৈয়দ শাহ অলি উল্লাহর উত্তরসূরীরা ফরিদপুর থেকে আতোয়াজান পরগায় চলে যান। সৈয়দ শাহ আহমদের বংশধরেরা পরবতিতে সব কিছু হারিয়ে অন্যত্র চলে যান, তবে এই বংশের কেউ কেউ এখনও ঢাকায় আছেন। বর্তমান ফরিদপুরে সৈয়দ ফরিদের প্রতিষ্টিত গ্রামটির অস্থিত্ব থাকলেও সৈয়দ শাহ ফরিদের বংশের কেউ আর গ্রামে অবশিষ্ট নেই। কালক্রমে এরা দেশের বিভিন্ন স্থানে চলে গেছেন। ফরিদপুর গ্রামের পাশে একটি হাঠ প্রতিষ্টা করেছিলেন তার উত্তরসূরীরা। স্থানীয় ভাবে এই হাটের নাম বাজার ফরিদপুর এবং গ্রামটির নাম গ্রাম ফরিদপুর। স্থানীয় ভাবে এই বাজারিটি ছৈদপুর বাজার হিসেবে পরিচিত। সৈয়দ থেকে ছৈদ শদ্বের সৃষ্টি উৎপত্তি বলে গবেষকদের ধারনা। বর্তমানে কেউ কেউ সৈয়দপুর বাজার বলে থাকেন। গাউ ফরিদপুর ও বাজার ফরিদপুর হিসেবে এলাকায় এসবের অস্থিত্ব বিদ্যমান আছে।

আমার মূল আলোচ্য বিষয় সৈয়দ শাহ সিকন্দর (রঃ)। সিপাহসালার সৈয়দ নাসির উদ্দিনের বংশধর সৈয়দ মুসার বংশে সৈয়দ শাহ ফরিদ (র) এর প্রপুত্র সৈয়দ শাহ সিকন্দর ছিলেন একজন কামেল ফকির। হবিগঞ্জ ছাতক-নবীগঞ্জসহ ময়মনসিংহের কিশোগঞ্জ ও নেত্রকোনায় তাঁর বহু শিষ্য ছিল। তিনি বছরের অধিকাংশ সময়ই ঘুড়ে বেড়াতেন। বিষয়টি উল্লেখ করেছন সিলেটের ইতিহাসবেত্তা মনির উদ্দিন চৌধুরী সিলেট থেকে প্রকাশিত অধুনালুপ্ত সাপ্তাহিক সিলেট সমাচার পত্রিকায় ১৯৮১ সালে ইতিহাস কথা কয় নামক তাঁর নিজস্ব কলামে। দরবেশ সিকন্দর ও তার পূর্বসূরীদের নিয়ে আলোচনা করতে গিয়ে গুলডোবা গ্রামে বসতি স্থাপনের বিষয়টি বিস্তারিত ভাবে আলোচনা করেছেন। মনির উদ্দিন চৌধুরী ও দেওয়ান মামুন চৌধুরী সৈয়দ শাহ সিকন্দরের আগনা পরগনার গুলডোবা গ্রামে বসতি স্থাপনের বিষটি সুন্দরভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন তাদের লিখনীতে। শাহ সিকন্দরের উত্তরসুরীদের কাছে সংরক্ষিত একটি তৌজি মোতাবেক শাহ সিকন্দরের বাড়িটিকে ঈমাম বাড়ি হিসেবে উল্লেখ রয়েছে। এই বাড়ীতে রয়েছে প্রাচীন আমলের একটি মসজিদ এবং মসজিদ সংলগ্ন পারিবারিক গোরস্থান এই গোরস্থানেই শায়িত আছেন সৈয়দ শাহ সিকন্দর (রঃ) এবং তারই রক্তের ধারা সৈয়দ গৌস ও আরো অনেকে। পরবর্তিতে গুলডোবা গ্রামের সৈয়দ সিকন্দরের উত্তরসূরীরা আরেকটি গুরস্থান করেছেন এখানে এই বংশের অনেকেই শায়িত আছেন এখানে।
সৈয়দ শাহ সিকন্দরের গুলডোবা আগমন ও বসতি স্থাপন। গুল ফারসি শব্দ এর অর্থ ফুল আর ডোবা শব্দের অর্থ জলাময় স্থান। গুলডোবা শব্দের অর্থ দাড়ায় ডোবায় জনন্মানো ফুল। ভৌগলিক ভাবে নবীগঞ্জের এই অঞ্চলটি ভাটি এলাকা হিসেবে পরিচিত। একসময় এই অঞ্চলে প্রচুর জলজ উদ্ধিদ জন্মাতো। তখনকার সময়ে এই এলাকায় মহামারি আকারে কলেরা বসসন্ত ইত্যাদি রোগ লেগেই থাকত। সেই সময়ে চিকিৎসা ব্যবস্থা বলতে বনাজি-কবিরাজি ওজা বৈদ্য এবং পীর ফকিরদের উপর মানুষের ছিল অগাদ বিশ্বাস। সেসময় এই এলাকায় সৈয়দ শাহ সিকন্দরের শিষ্য এবং মুরিদ ছিল অনেকে। শুধু মুসলিম নয় সনাতন ধর্মের মানুষেরাও তাঁকে শ্রদ্ধা করত। শিষ্যদের অনুরোধে সৈয়দ শাহ সিকন্দর ফরিদপুর থেকে গুলডোবায় এসে বসতি স্থাপন করেন। পারিবারিক তথ্যমতে জানা যায় শাহ সৈয়দ সিকন্দর বিয়ে করেন ইজপুর দেওয়ান বাড়ীতে তাঁর স্ত্রীর নাম জানা যায়নি। পরবর্তিতে সৈয়দ শাহ সিকন্দরের পুত্র শাহ অজিম উল্লা ও বিয়ে করেন ইজপুর দেওয়ান পরিবারের দেওয়ান ইউসুফের কন্যাকে। সৈয়দ শাহ সিকন্দরের এক ভাতিজা সৈয়দ আফসর তাঁর খুঁজে নরপতি থেকে গুলডোবা আসেন তিনিও এখানে বসতি স্থাপন করেন। এই সৈয়দ আফসর হলেন গুলাডোবা গ্রামের সৈয়দ লকিক ও সৈয়দ লিলু মিয়ার পূর্বপুরুষ। হযরত সৈয়দ শাহ সিকন্দর (রঃ) গুলডোবা গ্রামে মৃত্যু বরন করেন। গুলডোবা গ্রামে তাঁর মাঝার রয়েছে।

তার পরবর্তি সময়েও সৈয়দ শাহ সিকন্দরের বংশে কয়েকজন আলেম ও সাধু দরবেশের জন্ম হয়। এই বংশে দছর মিয়া একজন কামেল দরবেশ ছিলেন। গুলডোবা গ্রামে সৈয়দ শাহ সিকন্দরের বংশধরেরা কয়েকটি শাখায় বিভক্ত। শাহ সৈয়দ সিকন্দরের উত্তসূরীদের নামে কয়েকটি তালুকের উল্লেখ পাওয়া যায়। তালুক সমূহ হলো ২৭০৩/৩ ও ২৬,৬৬১। পরবর্তিতে এই বংশের লোকেরা আরো কয়েকটি তালুক ক্রয় করেন।
বিভিন্ন সময়ে সৈয়দ শাহ সিকন্দরের বংশধর সাথে আগনা-জয়ন্তরী-দিনারপুর-সিকসুনাইত্যা-আতোয়াজান-বাজোসুনাইত্যা-বাজোসতরসথী ও আওরঙ্গপুর পরগনার সম্ভ্রান্তদের একাধিক আত্মীয়তার সম্পর্ক গড়ে উঠে। সৈয়দ শাহ সিকন্দরের অধস্তন পুরুষ সৈয়দ শাহ আব্দুল ওয়াহাবের বংশধরেরা এলাকায় একটি ধার্মিক পরিবার হিসেবে পরিচিত। এই শাখার সন্তানদের সকলেই স্ব স্ব ক্রেত্রে প্রতিষ্ঠিত। শাহ ক্বারি গিয়াস উদ্দিন ছিলেন গ্রেট ব্রিটেনে বাংলাদেশী কমিউনিটিতে একজন শ্রদ্ধার পাত্র এবং প্রবাসে মহান মুক্তিযুদ্ধের একজন অন্যতম সংগঠক। ১৯৭১ সালে লন্ডনে হাইডপার্ক কণর্রারে বাংলাদেশের পক্ষে আন্তর্জাতিক জনমত আদায়ের প্রতিটি সভাসমাবেশে থাকতেন সামনের সারিতে বিচারপতি আবু সাইদ চৌধুরীর নেতৃত্বে অনুষ্ঠিত সমাবেশে তিনি অত্যাচারী পাকিস্তানীদের কবল থেকে বাংলাদেশের স্বাধীনতার জন্যে মোনাজাত পরিচালনা করেন। লন্ডনের ইতিহাসে হাইড পার্ক কর্নারে হাজার হাজার মানুষের উপস্থিতিতে এটি সবচেয়ে বড় মোনাজাত। এই বংশের শাহ নাসির উদ্দিন মৌলদ সাহিত্য সংস্কৃতির একজন পৃষ্টপোষক। মুফতি শাহ সদর উদ্দিন একজন ইসলামী স্কলার, আল আজহার বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সর্বোচ্চ ডিগ্রিধারী একজন পন্ডিত ব্যক্তি। ইংরেজী-বাংলা –উর্দু- আরবী ও হিন্দি ভাষায় সমান পরদর্শি। ব্রিটিশ বাংলাদেশী কমিউনিটিতে একজন সম্মানীত ব্যক্তি।
সিপাহসালার সৈয়দ নাসির উদ্দিন (রঃ)
সৈয়দ হাসান (লস্করপুর)—সৈয়দ ফরিদ (ফরিদপুর)
সৈয়দ রেহান – সৈয়দ সুলতান – সৈয়দ মনুওর
সৈয়দা কালা বিবি (স্বামী: সৈয়দ নিয়াজুর রহমান)
সৈয়দ শাহ আহমদ – শাহ ওলি উল্লাহ- সৈয়দ শাহ সিকন্দর (রঃ)
সৈয়দ আমির আলি পরবর্তিতে বৈবাহিক সূত্রে চলে যান কাশিম নগর (ত্রিপুরা)
সৈয়দ শাহ সিকন্দর (রঃ) (গুলডোবা)
সৈয়দ শাহ আজিম উল্লা – সৈয়দ কাজি নাজিম উদ্দিন – সৈয়দ ইম্মত উল্লা –
সৈয়দ শাহ আলিম উল্লা, আব্দুল্লা মিয়া – শাহ তজমুল মিয়া
শাহ কারি রিয়াছত,- শাহ মৌলভী কলমদর – শাহ হাফিজ দরছ –
শাহ কুতুব উদ্দিন – শাহ ক্বারী গিয়াস উদ্দিন – শাহ মহিউদ্দিন –
তথ্যসূত্রঃ শ্রীহট্টের ইতিবৃত্ত উত্তরাংশ-পূর্বাংশ, সিপাহ সালার সৈয়দ নাসির উদ্দিন প্রথম ও দ্বিতীয় খন্ড, নবীগঞ্জের ইতিকথা প্রথম খন্ড, তরফের ইতিহাস, মাসিক আল ইসলাহ, সিলেট সমাচার, দৈনিক জালালাবাদী, মুড়ারবন্ধ, রামশ্রী ও খান্দুরা সৈয়দ পরিবারে সংরক্ষিত নছবনামা।








































