চাঁদপুরের হাইমচর উপজেলার হাজারো মানুষ প্রতিদিন শিক্ষা, চিকিৎসা, ব্যবসা, চাকরি ও নিত্যপ্রয়োজনীয় কাজে হাইমচর–চাঁদপুর সড়কপথে যাতায়াত করেন। কিন্তু এই গুরুত্বপূর্ণ রুটে দীর্ঘদিন ধরে যাত্রীদের কাছ থেকে অতিরিক্ত ভাড়া আদায়ের অভিযোগ ক্রমেই উদ্বেগজনক রূপ ধারণ করেছে। একটি সভ্য ও জবাবদিহিমূলক গণপরিবহন ব্যবস্থা কেবল মানুষকে এক স্থান থেকে অন্য স্থানে পৌঁছে দেওয়ার মাধ্যম নয়; এটি নাগরিক অধিকার, সুশাসন ও আইনের শাসনেরও একটি গুরুত্বপূর্ণ সূচক। কিন্তু বাস্তবতা হলো, চাঁদপুরের হাইমচর–চাঁদপুর সড়কপথে প্রতিদিন হাজারো যাত্রী এমন এক অনিয়মের মুখোমুখি হচ্ছেন, যা দীর্ঘদিন ধরে চললেও কার্যকর প্রতিকার মিলছে না। অতিরিক্ত ভাড়া আদায় যেন এখানে অলিখিত নিয়মে পরিণত হয়েছে, আর সাধারণ মানুষ হয়ে পড়েছেন এক নীরব জিম্মি।
কিছুদিন আগেও এ রুটে যাত্রীপ্রতি ভাড়া ছিল ৬০ টাকা। বর্তমানে নেওয়া হচ্ছে ৭০ টাকা। কিন্তু এই ভাড়া বৃদ্ধির পক্ষে কোনো সরকারি প্রজ্ঞাপন, অনুমোদিত ভাড়ার তালিকা বা যৌক্তিক ব্যাখ্যা যাত্রীদের সামনে উপস্থাপন করা হয়নি। এর ফলে প্রশ্ন ওঠে—এই অতিরিক্ত অর্থ আদায়ের বৈধতা কোথায়? যদি সরকারিভাবে ভাড়া বৃদ্ধি না হয়ে থাকে, তবে এটি নিঃসন্দেহে আইনের লঙ্ঘন এবং সাধারণ মানুষের ওপর অন্যায্য আর্থিক চাপ।
শুধু তাই নয়, প্রতি শুক্রবার সকালে একই রুটে যাত্রীদের কাছ থেকে ৮০ থেকে ১০০ টাকা পর্যন্ত ভাড়া আদায় করা হয় বলে অভিযোগ রয়েছে। ঈদসহ বিভিন্ন ধর্মীয় ও জাতীয় উৎসবের সময় পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হয়ে ওঠে। তখন যাত্রীদের অসহায়ত্বকে পুঁজি করে মূল ভাড়ার তিন থেকে চার গুণ পর্যন্ত ভাড়া আদায়ের অভিযোগ নতুন নয়।
সবচেয়ে দুঃখজনক বিষয় হলো, কোনো যাত্রী অতিরিক্ত ভাড়ার প্রতিবাদ করলে তাঁকে অনেক ক্ষেত্রে তুচ্ছতাচ্ছিল্য, দুর্ব্যবহার এমনকি ভয়ভীতি প্রদর্শনের মুখোমুখি হতে হয়। ফলে অধিকাংশ যাত্রী নিরুপায় হয়ে অন্যায় ভাড়া পরিশোধ করতে বাধ্য হন। এতে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন শিক্ষার্থী, চাকরিজীবী, কৃষক, ব্যবসায়ী, রোগীসহ সমাজের সব শ্রেণি-পেশার মানুষ। প্রশ্ন হলো—সরকার নির্ধারিত ভাড়া বাস্তবায়নের দায়িত্ব কার? যাত্রীদের ন্যায্য অধিকার রক্ষা ও পরিবহন খাতে শৃঙ্খলা নিশ্চিত করার দায়িত্ব কি কেবল কাগজ-কলমেই সীমাবদ্ধ থাকবে? নিয়মিত তদারকি ও কার্যকর ব্যবস্থা না থাকলে এ ধরনের অনিয়ম আরও বিস্তৃত হওয়ার আশঙ্কা থেকেই যায়।
চাঁদপুরের জেলা প্রশাসন, হাইমচর উপজেলা প্রশাসন, বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআরটিএ) এবং সংশ্লিষ্ট পরিবহন কর্তৃপক্ষের প্রতি জোরালো আহ্বান—হাইমচর–চাঁদপুর সড়কপথে অতিরিক্ত ভাড়া আদায়ের অভিযোগ দ্রুত তদন্ত করা হোক। সরকার নির্ধারিত ভাড়া কঠোরভাবে বাস্তবায়ন, প্রতিটি যানবাহনে দৃশ্যমান স্থানে ভাড়ার তালিকা প্রদর্শন, নিয়মিত ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা এবং অনিয়মকারীদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে যাত্রীদের অভিযোগ জানানোর কার্যকর ব্যবস্থা গড়ে তোলা এবং অভিযোগের দ্রুত নিষ্পত্তি নিশ্চিত করাও জরুরি।
আইনের শাসন তখনই অর্থবহ হয়, যখন তা সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনে প্রতিফলিত হয়। হাইমচর–চাঁদপুর সড়কপথে অতিরিক্ত ভাড়া আদায়ের এই দীর্ঘস্থায়ী অনিয়ম বন্ধ করা শুধু কয়েক হাজার যাত্রীর আর্থিক স্বস্তির বিষয় নয়; এটি সুশাসন, ন্যায়বিচার ও নাগরিক অধিকারের প্রশ্ন। প্রশাসনের দৃঢ়, নিরপেক্ষ ও সময়োপযোগী পদক্ষেপই পারে এই অনিয়মের অবসান ঘটিয়ে জনমনে আস্থা ফিরিয়ে আনতে। কারণ, ন্যায্য ভাড়া কোনো অনুগ্রহ নয়—এটি প্রতিটি নাগরিকের আইনসম্মত অধিকার।হাইমচরের মানুষ আর জিম্মি হয়ে থাকতে চান না। তাঁরা চান আইনের শাসন, ন্যায্য ভাড়া এবং মানবিক গণপরিবহন ব্যবস্থা। প্রশাসনের সময়োপযোগী, দৃঢ় ও নিরপেক্ষ পদক্ষেপই পারে দীর্ঘদিনের এই ভোগান্তির অবসান ঘটিয়ে সাধারণ মানুষের আস্থা ফিরিয়ে আনতে।



































































