
দেশের বিভিন্ন স্থানে সাম্প্রতিক সময়ে কন্যাশিশু ধর্ষণ এবং ধর্ষণের পর হত্যার ঘটনা ভয়াবহভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। প্রতিদিন সংবাদপত্র খুললেই যেন নতুন নতুন কোনো নিষ্ঠুরতার খবর চোখে পড়ে। কোনো শিশুকে স্কুলে যাওয়ার পথে, কাউকে ঘরের ভেতরে, আবার কাউকে পরিচিত মানুষের হাতে পাশবিক নির্যাতনের শিকার হতে হচ্ছে। একটি জাতীয় দৈনিকের প্রতিবেদনে দেখলাম—গত চার মাসে ১১৮ জন কন্যাশিশু ধর্ষণের শিকার হয়েছে এবং ১৭ জনকে হত্যা করা হয়েছে। একটি শিশুর চিৎকার, একটি পরিবারের ধ্বংস হয়ে যাওয়া স্বপ্ন এবং পুরো সমাজের ব্যর্থতা। আজ দেশের অসংখ্য পরিবার আতঙ্ক আর অনিশ্চয়তার মধ্যে দিন কাটাচ্ছে। যাদের ঘরে ফুটফুটে কন্যাসন্তান আছে,তারা প্রতিনিয়ত এক অদৃশ্য ভয়ের সঙ্গে বসবাস করছে। একজন অভিভাবক কতটা উদ্বিগ্ন হলে, বিচারহীনতার সংস্কৃতি দেখলে রাষ্ট্রকে প্রকাশ্যে চ্যালেঞ্জ করে বলতে পারেন, ” আমি বিচার চাই না,কারণ আপনারা বিচার করতে পারবেন না, আপনাদের বিচারের কোন উদাহরণ নেই —“আমার সন্তানের নিরাপত্তা কোথায়?”—তখন বুঝতে হবে সমাজ ও রাষ্ট্রের প্রতি মানুষের আস্থার জায়গাটি কতটা দুর্বল হয়ে পড়েছে। আরও কষ্টের বিষয় হলো, সেই আর্তনাদকে গুরুত্ব দিয়ে গ্রহণ করার মতো দৃশ্যমান উদ্যোগ আমরা অনেক সময় দেখতে পাই না।
ধর্ষণ শুধু একটি অপরাধ নয়; এটি মানবতা, সভ্যতা ও নৈতিকতার বিরুদ্ধে জঘন্যতম অপরাধ। একটি শিশুর শরীর ও মনকে ধ্বংস করে দেওয়া মানে একটি ভবিষ্যৎকে হত্যা করা। কিন্তু দুঃখজনকভাবে আমরা এমন এক সমাজের দিকে এগোচ্ছি, যেখানে কিছু মানুষ নানা অজুহাতে ধর্ষকের পক্ষে অবস্থান নেয়, ধর্ষণের পক্ষে অবস্থান নেয়। কেউ রাজনৈতিক পরিচয়ে, কেউ সামাজিক প্রভাবের কারণে, আবার কেউ অর্থের বিনিময়ে অপরাধীদের রক্ষা করার চেষ্টা করে। এটি শুধু লজ্জাজনক নয়, বরং ভয়ংকর আত্মঘাতিও। কারণ একজন ধর্ষক কারও আপন হতে পারে না। যে শিশু নির্যাতন করতে পারে, সে সমাজের প্রতিটি শিশুর জন্য হুমকি।
সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো বিচারহীনতার সংস্কৃতি। যখন মানুষ দেখে অপরাধ করেও অনেকেই পার পেয়ে যাচ্ছে, তখন অন্যরাও অপরাধে উৎসাহিত হয়। অপরাধবিজ্ঞান বলছে, শাস্তির কঠোরতার চেয়ে শাস্তি নিশ্চিত হওয়ার বিষয়টি অপরাধ দমনে বেশি কার্যকর। অর্থাৎ অপরাধী যদি নিশ্চিতভাবে জানে যে দ্রুত বিচার হবে এবং শাস্তি এড়ানোর সুযোগ নেই, তাহলে অপরাধের প্রবণতা অনেকাংশে কমে আসে।
বিশ্বের বিভিন্ন দেশে যৌন অপরাধের বিরুদ্ধে কঠোর ও দ্রুত বিচার ব্যবস্থার উদাহরণ রয়েছে। সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত কিংবা কিছু এশীয় দেশে ধর্ষণের মতো জঘন্য অপরাধে দ্রুত বিচার ও কঠোর শাস্তির নজির দেখা যায়। ভারতে ২০১২ সালের দিল্লির “নির্ভয়া” ঘটনার পর আইন আরও কঠোর করা হয় এবং শিশু ধর্ষণের ক্ষেত্রে মৃত্যুদণ্ডের বিধান যুক্ত করা হয়। অনেক দেশে বিশেষ ট্রাইব্যুনাল গঠন করে নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে তদন্ত ও বিচার সম্পন্ন করার ব্যবস্থা করা হয়েছে। এসব উদাহরণ প্রমাণ করে—রাষ্ট্র চাইলে কঠোর অবস্থান নেওয়া সম্ভব। বাংলাদেশেও নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন রয়েছে। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে—আইনের বাস্তব প্রয়োগ কতটা কার্যকর? একটি মামলা বছরের পর বছর ঝুলে থাকলে, সাক্ষী নিরাপত্তা না থাকলে, তদন্তে গাফিলতি হলে কিংবা রাজনৈতিক ও সামাজিক প্রভাবের কারণে বিচার বাধাগ্রস্ত হলে সাধারণ মানুষ হতাশ হবেই। অনেক সময় দেখা যায়, ভুক্তভোগী পরিবার ভয়, চাপ কিংবা সামাজিক অপমানের কারণে ন্যায়বিচার থেকে দূরে সরে যায়। এই বাস্তবতা পরিবর্তন করা জরুরি।
ধর্ষণ ও শিশু নির্যাতনের বিরুদ্ধে শুধু আবেগ নয়, কার্যকর রাষ্ট্রীয় পদক্ষেপ প্রয়োজন। প্রতিটি ধর্ষণ মামলার দ্রুত ও নিরপেক্ষ তদন্ত নিশ্চিত করতে হবে। বিশেষ ট্রাইব্যুনালের মাধ্যমে ৭দিনের মধ্যে বিচার মৃত্যুদন্ড নিশ্চৎ করা। অপরাধীর রাজনৈতিক, সামাজিক বা অর্থনৈতিক পরিচয় যেন বিচার প্রক্রিয়ায় কোনো প্রভাব ফেলতে না পারে, তা নিশ্চিত করতে হবে। পাশাপাশি তদন্ত কর্মকর্তা বা প্রশাসনের কেউ যদি ঘুষ, প্রভাব বা অবহেলার মাধ্যমে অপরাধীকে রক্ষা করার চেষ্টা করেন, তাদের বিরুদ্ধেও কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে। সামাজিক প্রতিরোধও গড়ে তুলতে হবে। পরিবারে সন্তানদের নৈতিক শিক্ষা, বিদ্যালয়ে সচেতনতা কার্যক্রম, অনলাইনে বিকৃত কনটেন্ট নিয়ন্ত্রণ, মাদক ও অপরাধচক্রের বিরুদ্ধে অভিযান—সবকিছু একসঙ্গে চালাতে হবে। সমাজের প্রতিটি মানুষকে বুঝতে হবে, ধর্ষকের পক্ষে অবস্থান নেওয়া মানে ভবিষ্যতের আরও অপরাধকে প্রশ্রয় দেওয়া।
আজ প্রয়োজন রাষ্ট্রের সুস্পষ্ট ও দৃশ্যমান অবস্থান। মানুষ জানতে চায়—এই দেশের শিশুরা নিরাপদ কি না। মানুষ দেখতে চায়—ধর্ষক যেই হোক, তার বিচার হবে। কোনো রাজনৈতিক পরিচয়, অর্থ বা ক্ষমতা তাকে রক্ষা করতে পারবে না। কারণ বিচারহীনতা শুধু একটি অপরাধকে বাঁচিয়ে রাখে না; এটি আরও বহু অপরাধের জন্ম দেয়। আমরা এমন একটি সমাজ চাই, যেখানে একটি শিশু নিরাপদে স্কুলে যেতে পারবে, মাঠে খেলতে পারবে, হাসতে পারবে। আমরা এমন একটি রাষ্ট্র চাই, যেখানে কোনো মা-বাবাকে আতঙ্কে দিন কাটাতে হবে না। ধর্ষকদের বিরুদ্ধে আপসহীন অবস্থান এখন সময়ের দাবি। কারণ প্রতিটি শিশুর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা শুধু রাষ্ট্রের দায়িত্ব নয়, এটি পুরো জাতির নৈতিক দায়িত্ব।
ধর্ষণ ও শিশু নির্যাতনের বিরুদ্ধে শুধু আবেগ নয়, কার্যকর রাষ্ট্রীয় পদক্ষেপ প্রয়োজন। প্রথমত, প্রতিটি ধর্ষণ মামলার দ্রুত ও নিরপেক্ষ তদন্ত নিশ্চিত করতে হবে। দ্বিতীয়ত, বিশেষ ট্রাইব্যুনালের মাধ্যমে স্বল্পসময়ের মধ্যে বিচার সম্পন্ন করতে হবে। তৃতীয়ত, অপরাধীর রাজনৈতিক, সামাজিক বা অর্থনৈতিক পরিচয় যেন বিচার প্রক্রিয়ায় কোনো প্রভাব ফেলতে না পারে, তা নিশ্চিত করতে হবে। পাশাপাশি তদন্ত কর্মকর্তা বা প্রশাসনের কেউ যদি ঘুষ, প্রভাব বা অবহেলার মাধ্যমে অপরাধীকে রক্ষা করার চেষ্টা করেন, তাদের বিরুদ্ধেও কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে।
শুধু কঠোর শাস্তি নয়, প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থাও জরুরি। শিশুদের নিরাপত্তা শিক্ষা ও সচেতনতা বৃদ্ধি, অনলাইন ও সামাজিক মাধ্যমে যৌন সহিংসতার বিরুদ্ধে কঠোর নজরদারি, অপরাধীদের রাজনৈতিক বা সামাজিক আশ্রয় বন্ধ করা, ভুক্তভোগী পরিবারকে আইনি ও মানসিক সহায়তা দেওয়া, তদন্ত ও বিচার প্রক্রিয়ায় জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা, মাদক, কিশোর গ্যাং ও অপরাধচক্রের বিরুদ্ধে কার্যকর অভিযান পরিচালনা করা
যখন সমাজের কোনো অংশ ধর্ষকের পক্ষে অবস্থান নেয় বা অপরাধকে আড়াল করার চেষ্টা করে, তখন তা মানুষের ক্ষোভ আরও বাড়িয়ে দেয়। কারণ মানুষ চায়—শিশুরা নিরাপদ থাকুক, পরিবার নিরাপদ থাকুক, এবং অপরাধীরা শাস্তি পাক। আজ প্রয়োজন রাষ্ট্রের সুস্পষ্ট ও দৃশ্যমান অবস্থান। মানুষ জানতে চায়—এই দেশের শিশুরা নিরাপদ কি না। মানুষ দেখতে চায়—ধর্ষক যেই হোক, তার বিচার হবে। কোনো রাজনৈতিক পরিচয়, অর্থ বা ক্ষমতা তাকে রক্ষা করতে পারবে না। কারণ বিচারহীনতা শুধু একটি অপরাধকে বাঁচিয়ে রাখে না; এটি আরও বহু অপরাধের জন্ম দেয়। আমরা এমন একটি সমাজ চাই, যেখানে একটি শিশু নিরাপদে স্কুলে যেতে পারবে, মাঠে খেলতে পারবে, হাসতে পারবে। আমরা এমন একটি রাষ্ট্র চাই, যেখানে কোনো মা-বাবাকে আতঙ্কে দিন কাটাতে হবে না। ধর্ষকদের বিরুদ্ধে আপসহীন অবস্থান এখন সময়ের দাবি। কারণ প্রতিটি শিশুর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা শুধু রাষ্ট্রের দায়িত্ব নয়, এটি পুরো জাতির নৈতিক দায়িত্ব। প্রতিনিয়ত বিকৃত মানসিকতার মানুষগুলোর নগ্ন উল্লাস, বর্বরতা আর ঔদ্ধত্য দেখে আজ বিবেকবান মানুষ নির্বাক। কিন্তু নীরব থাকলে চলবে না। এখনই সময় রাষ্ট্র, সমাজ ও জনগণকে একসঙ্গে দাঁড়ানোর। না হলে আগামী প্রজন্ম আমাদের ক্ষমা করবে না।
সুধীর বরণ মাঝি, শিক্ষক, হাইমচর সরকারি মহাবিদ্যালয়, হাইমচর, চাঁদপুর।


























































