ইউক্রেনের জ্বালানি অবকাঠামোর ওপর বুধবার রাশিয়া এক ব্যাপক বিমান হামলা চালিয়েছে—যা নিয়ে আগে থেকেই আশঙ্কা করা হচ্ছিল। কিয়েভ ও অন্যান্য অঞ্চলের বিদ্যুৎ কেন্দ্র ও অবকাঠামো লক্ষ্য করে চালানো এই হামলাটি ছিল গত কয়েক মাসের মধ্যে জ্বালানি স্থাপনার ওপর সবচেয়ে বড় যৌথ আক্রমণ।
ইউক্রেনীয় কর্মকর্তাদের মতে, এই হামলায় সাতজন নিহত হয়েছেন। এর আগে বেশ কয়েক দিন ধরে মূলত রাজধানী কিয়েভকে লক্ষ্য করে ড্রোন হামলা তীব্র করা হয়েছিল। অনেক ইউক্রেনীয় আশঙ্কা করছেন, এটি আসন্ন শীতকালে শহরগুলোকে তীব্র শীত ও অন্ধকারে নিমজ্জিত করার লক্ষ্যে চালানো ধারাবাহিক হামলারই একটি সূচনা মাত্র—বিশেষ করে যখন ইউক্রেনের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা সীমিত।
রাতের এই হামলার পর প্রধানমন্ত্রী সের্গেই কোরেৎস্কি ‘এক্স’ (X)-এ বলেন, “রাশিয়া জ্বালানি অবকাঠামোর ওপর ব্যাপক হামলা শুরু করেছে।”
তিনি আরও বলেন, “গ্রীষ্মকাল থেকেই আমাদের জ্বালানি অবকাঠামোর ওপর প্রায় প্রতিদিনই কোনো না কোনো হামলা হয়েছে। কিন্তু গত শীতকালীন তাপ সরবরাহ মৌসুম শেষ হওয়ার পর থেকে এত বড় মাত্রার যৌথ হামলা আর হয়নি।”
গত শীতে রাশিয়ার হামলায় বিদ্যুৎ ও তাপ সরবরাহ ব্যবস্থা বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছিল এবং তাপমাত্রা রেকর্ড সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমে গিয়েছিল; ফলে ইউক্রেনীয়দের চরম প্রতিকূল পরিস্থিতির সাথে মানিয়ে নিতে হয়েছিল।
**নজরে ইউক্রেনের রাজধানী**
বুধবার সকালে কিয়েভের বাসিন্দারা ঘুম থেকে উঠে দেখেন শহরটি হামলার ধোঁয়ায় সৃষ্ট ঘন কুয়াশায় আচ্ছন্ন। কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, হামলায় রাজধানীর আশপাশের একটি গুরুত্বপূর্ণ বিদ্যুৎ কেন্দ্র ও অন্যান্য জ্বালানি স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি জানান, প্রায় ১৯০টি ড্রোন ও ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করে চালানো এই হামলার মূল লক্ষ্য ছিল কিয়েভ ও এর আশপাশের এলাকার জ্বালানি অবকাঠামো। বিমান বাহিনী জানিয়েছে, তারা ৫টি ক্ষেপণাস্ত্র ও ১৫৫টি ড্রোন ভূপাতিত করেছে।
জেলেনস্কি জানান, সারা দেশে নিহত সাতজনের মধ্যে একটি শিশুও রয়েছে এবং পাঁচটি অঞ্চলে গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো হামলার শিকার হয়েছে। তিনি আরও যোগ করেন, আরও পাঁচটি অঞ্চলে অন্যান্য ক্ষয়ক্ষতির খবর পাওয়া গেছে।
রাশিয়া জানিয়েছে, তাদের বাহিনী কিয়েভ অঞ্চলের বিদ্যুৎ কেন্দ্র, ওডেসা অঞ্চলের একটি শিল্প কমপ্লেক্স এবং দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলীয় ইসমাইল শহরের বন্দর অবকাঠামোতে আঘাত হেনেছে।
কিয়েভের মেয়র ভিটালি ক্লিচকো জানান, একটি পশ্চিমা দেশের দূতাবাসের প্রাঙ্গণে ধ্বংসাবশেষ পাওয়া গেছে, তবে তিনি এ বিষয়ে বিস্তারিত কিছু জানাননি। রাতের এই হামলার কারণে ১২ ঘণ্টারও বেশি সময় ধরে বিমান হামলার সতর্কতা জারি ছিল। কিয়েভে দিনের বেলা প্রায় অবিরাম সাইরেন ও বিস্ফোরণের শব্দ এখন নিত্যদিনের ঘটনায় পরিণত হয়েছে; কেবল গত এক সপ্তাহেই সেখানে ড্রোন হামলায় প্রায় এক ডজন মানুষ প্রাণ হারিয়েছেন।
শীতের আগমন
ইউক্রেনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আন্দ্রি সিবিহা বুধবার রাশিয়ার চালানো হামলাকে পূর্ব ইউক্রেনে তাদের দীর্ঘস্থায়ী সামরিক অভিযান থেকে মনোযোগ সরানোর একটি “পরিকল্পিত” কৌশল হিসেবে অভিহিত করেছেন। উল্লেখ্য, গত বছর থেকেই ওই অঞ্চলে রাশিয়ার অভিযান কিছুটা ধীর হয়ে পড়েছে।
এক্স (সাবেক টুইটার)-এ তিনি বলেন, “শীত এগিয়ে আসার সাথে সাথে মস্কো ইউক্রেনীয় বেসামরিক নাগরিকদের ওপর চাপ বাড়াচ্ছে। তারা আবারও তীব্র শীত, অন্ধকার এবং স্বাভাবিক জীবনযাত্রায় ব্যাঘাত ঘটানোর বিষয়গুলোকে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহারের চেষ্টা করছে।”
২০২২ সালের ফেব্রুয়ারিতে পূর্ণমাত্রায় আগ্রাসন শুরু করা রাশিয়া বেসামরিক নাগরিকদের লক্ষ্যবস্তু করার কথা অস্বীকার করে আসছে, যদিও তারা ইউক্রেনজুড়ে বিভিন্ন শহর ও জনপদে ব্যাপক হামলা চালিয়েছে।
প্রধানমন্ত্রী কোরেৎস্কি জানিয়েছেন, তিনি স্থানীয় কর্তৃপক্ষকে গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনাগুলোতে জরুরি বা বিকল্প বিদ্যুৎ ব্যবস্থার প্রস্তুতি যাচাই করতে এবং এ সংক্রান্ত স্থাপনা বসানোর কাজ দ্রুত করতে নির্দেশ দিয়েছেন।
রাশিয়ার সম্ভাব্য শীতকালীন অভিযানের আগেই কর্তৃপক্ষ গত কয়েক সপ্তাহ ও মাস ধরে সুরক্ষামূলক অবকাঠামো নির্মাণ এবং বিদ্যুৎ উৎপাদনের উৎস বহুমুখী করার উদ্যোগ নিয়েছে।
তবে ইউক্রেনের মানবাধিকার বিষয়ক ন্যায়পাল দিমিত্রো লুবিনেটস বুধবার জানিয়েছেন যে, শহরগুলোতে আশ্রয়কেন্দ্রের তীব্র সংকট রয়েছে এবং তিনি দেশটির বেসামরিক সুরক্ষা ব্যবস্থাকে “সম্পূর্ণ ব্যর্থ” হিসেবে বর্ণনা করেছেন।
এদিকে, ইউক্রেনের আবহাওয়া দপ্তর জানিয়েছে যে, আগামী দিনগুলোতে কিয়েভে রাতের বেলা তাপমাত্রা হিমাঙ্কের নিচে নেমে যেতে পারে।
মলদোভায় ড্রোন বিস্ফোরণ
প্রতিবেশী দেশ মলদোভায় একটি ড্রোন আকাশসীমা লঙ্ঘন করে প্রবেশ করে এবং দেশটির পূর্বাঞ্চলীয় গ্রাম হিরবোভেতের কাছে বিস্ফোরিত হয় বলে পুলিশ জানিয়েছে।
ন্যাটো সদস্য দেশ রোমানিয়া ও পোল্যান্ড—উভয় দেশই তাদের যুদ্ধবিমান আকাশে পাঠায় এবং পোল্যান্ডের লুবলিন ও জেসজোভ বিমানবন্দরে বিমান চলাচল সাময়িকভাবে স্থগিত করা হয়।
ইউক্রেনও রাশিয়ার বিরুদ্ধে হামলা জোরদার করেছে; মস্কোর যুদ্ধ প্রচেষ্টাকে দুর্বল করতে তারা রাশিয়ার তেল শোধনাগার ও বড় অনলাইন খুচরা বিক্রেতা প্রতিষ্ঠানের ওপর আঘাত হানছে।
ইউক্রেন সীমান্তবর্তী রাশিয়ার ব্রায়ানস্ক অঞ্চলে ড্রোন হামলায় একজন নিহত হয়েছেন বলে ওই অঞ্চলের গভর্নর জানিয়েছেন।


































































