ডেমোক্র্যাটদের মধ্যবর্তী নির্বাচনে জয়লাভের ফলে হাকিম জেফ্রিস যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিনিধি পরিষদের (হাউস অব রিপ্রেজেন্টেটিভস) প্রথম কৃষ্ণাঙ্গ স্পিকার হওয়ার পথে এগিয়ে গেছেন। তার সামনে এখন দ্বিমুখী চ্যালেঞ্জ—একদিকে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের বিরোধিতা করা, অন্যদিকে নিজ দলের মধ্যপন্থী ও প্রগতিশীল অংশের মধ্যে দূরত্ব কমিয়ে আনা।
নিউ ইয়র্ক সিটির একটি কংগ্রেসনাল ডিস্ট্রিক্টের প্রতিনিধিত্বকারী জেফ্রিস স্পিকার হিসেবে এমন একটি সংখ্যাগরিষ্ঠ দলের নেতৃত্ব দেবেন, যারা জানুয়ারির প্রথম সপ্তাহে শপথ নেবে। এর মাধ্যমে গত চার বছর ধরে প্রতিনিধি পরিষদে নিয়ন্ত্রণ রাখা রিপাবলিকানদের হাত থেকে ক্ষমতা ডেমোক্র্যাটদের হাতে আসবে।
মঙ্গলবার গভীর রাতে দেওয়া বিজয় ভাষণে জেফ্রিস ঘোষণা করেন, “আজ থেকে আমেরিকার দুর্দান্ত প্রত্যাবর্তনের সূচনা হলো।” এর আগে বিভিন্ন গণমাধ্যম প্রতিনিধি পরিষদ ও সিনেটে ডেমোক্র্যাটদের সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাওয়ার পূর্বাভাস দিয়েছিল।
তিনি গত দুই বছরে কংগ্রেসে ট্রাম্প-নেতৃত্বাধীন রিপাবলিকান এজেন্ডার কঠোর সমালোচনা করেন। তিনি প্রতিশ্রুতি দেন যে, দরিদ্র ও প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের জন্য থাকা ‘মেডিকেইড’ (Medicaid) স্বাস্থ্যসেবা কর্মসূচিতে যে বড় ধরনের ব্যয় সংকোচন করা হয়েছিল—যা ৪ জুলাই, ২০২৫-এ আইনে পরিণত হয়—তা বাতিল করে নতুন আইন পাস করবেন।
জেফ্রিস বলেন, “আমেরিকার জনগণ তাদের মতামত জানিয়েছে। তারা স্পষ্ট করে দিয়েছে যে, চরমপন্থা ও দুর্নীতিতে তারা অতিষ্ঠ। তারা এমন একটি কংগ্রেস চায়, যা প্রকৃতপক্ষে আমেরিকান জনগণের কল্যাণে কাজ করবে।”
জেফ্রিস দীর্ঘদিন ধরেই বলে আসছেন যে, তার দল দরিদ্র ও মধ্যবিত্তদের জীবনযাত্রার উচ্চ ব্যয়ের বোঝা কমাতে কাজ করবে। পাশাপাশি, ট্রাম্প প্রশাসনের সঙ্গে করপোরেট নির্বাহীদের সম্পর্ক—বিশেষ করে যারা ট্রাম্পের বিভিন্ন প্রচারণায় ও প্রকল্পে বড় অঙ্কের অনুদান দিয়েছেন—সেগুলো নিয়েও ডেমোক্র্যাটরা তদন্ত করবে। তবে তার নেতৃত্বে প্রতিনিধি পরিষদ ট্রাম্পকে তৃতীয়বারের মতো অভিশংসন (impeach) করার চেষ্টা করবে কি না, সে বিষয়ে তিনি সরাসরি কিছু বলেননি।
ক্যালিফোর্নিয়ার ডেমোক্র্যাটিক প্রতিনিধি রবার্ট গার্সিয়া, যিনি প্রতিনিধি পরিষদের তদারকি কমিটির (Committee on Oversight) চেয়ারম্যান হতে পারেন বলে ধারণা করা হচ্ছে, তিনি একটি সংক্ষিপ্ত পরামর্শ দিয়েছেন। নির্বাচনের রাতে দেওয়া এক বিবৃতিতে তিনি বলেন, “আইনজীবী প্রস্তুত রাখুন।”
মঙ্গলবার নির্বাচনের পর দেশের অনেক জায়গায় এখনো ভোট গণনা চলছে, তাই আগামী দুই বছরের জন্য প্রতিনিধি পরিষদে ডেমোক্র্যাটদের সংখ্যাগরিষ্ঠতার প্রকৃত আকার এখনো স্পষ্ট নয়।
প্রতিনিধি পরিষদের স্পিকার ৪৩৫ সদস্যবিশিষ্ট এই কক্ষের প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। তিনিই নির্ধারণ করেন কোন আইনটি ভোটের জন্য উত্থাপিত হবে আর কোনটি আলোচনার টেবিলেই হারিয়ে যাবে। ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্সের পর হাউস স্পিকার হলেন প্রেসিডেন্ট পদের উত্তরাধিকারের তালিকায় দ্বিতীয় ব্যক্তি।
এই মাসের শেষের দিকে, নবনির্বাচিত ডেমোক্র্যাটিক সদস্যরা রুদ্ধদ্বার বৈঠকে মিলিত হবেন। সেখানে জানুয়ারি মাসে অনুষ্ঠিতব্য স্পিকার নির্বাচনের জন্য তারা নিজেদের প্রার্থী মনোনীত করবেন। ডেমোক্র্যাটিক দলের একাধিক সহযোগীর মতে, জেফ্রিসের প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে কেউ তেমন জোরালো চ্যালেঞ্জ গড়ে তুলতে পারবেন বলে মনে হচ্ছে না।
এর কয়েক সপ্তাহ পর, নতুন কংগ্রেসের কার্যক্রম শুরুর প্রাক্কালে, পুরো হাউস ১৭৮৯ সালের পর থেকে ৫৭তম স্পিকার নির্বাচনের জন্য ভোট দেবে। রিপাবলিকানরাও তাদের নিজস্ব প্রার্থী দাঁড় করাবে, তবে সেই প্রার্থীর জয়ী হওয়ার সম্ভাবনা প্রায় নেই বললেই চলে।
তবে জেফ্রিজের এখনও কিছু কাজ বাকি রয়েছে—বিশেষ করে কট্টর প্রগতিশীল বা বামপন্থী সদস্যদের সমর্থন নিশ্চিত করা। এর মধ্যে রয়েছেন নিউ ইয়র্কেরই প্রতিনিধি এবং নবনির্বাচিত সদস্য ডারিয়ালিজা আভিলা শেভালিয়ার।
৩০ সেপ্টেম্বর ‘ভ্যানিটি ফেয়ার’-কে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে আভিলা শেভালিয়ার জেফ্রিসকে ভোট দেওয়ার বিষয়ে কোনো প্রতিশ্রুতি দেননি।
এর পরিবর্তে, তিনি এমন কিছু নীতির তালিকা দিয়েছেন যা পরবর্তী স্পিকারকে সমর্থন করতে হবে বলে তিনি মনে করেন। এর মধ্যে রয়েছে—ভোটাধিকার সংস্কার, সরকারি আবাসন খাতে বিনিয়োগ, ইসরায়েলে আক্রমণাত্মক অস্ত্র পাঠানো বন্ধ করা এবং সবার জন্য সর্বজনীন স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করা।
অথচ, ইসরায়েল-পন্থী গোষ্ঠীগুলো জেফ্রিসের নির্বাচনী প্রচারণায় সবচেয়ে বড় অর্থদাতাদের অন্যতম। এছাড়া, ‘মেডিকেয়ার ফর অল’ (সবার জন্য স্বাস্থ্যসেবা) কর্মসূচির প্রস্তাবের প্রতিও তিনি খুব একটা আগ্রহী নন; কারণ অনেক মধ্যপন্থী ডেমোক্র্যাটিক সদস্য মনে করেন, এটি অত্যন্ত ব্যয়বহুল হয়ে পড়বে।
জর্জটাউন বিশ্ববিদ্যালয়ের আমেরিকান সরকার বিষয়ক অধ্যাপক মিশেল সোয়ার্স বলেন, “প্রশ্ন হলো, তাদের সমর্থন পেতে জেফ্রিসকে কী ছাড় দিতে হবে?”
তবে, অতি বামপন্থী অবস্থানের দিকে ঝুঁকে পড়লে দলের মধ্যপন্থী সদস্যদের মধ্যে বিদ্রোহ দেখা দিতে পারে।
সবকিছুর ঊর্ধ্বে সাশ্রয়ী জীবনযাপন
৫৬ বছর বয়সী জেফ্রিস তার দলের ভেতরে ঐকমত্য গড়ে তোলার জন্য পরিচিত—যা সাবেক স্পিকার ন্যান্সি পেলোসির ওপর থেকে চাপিয়ে দেওয়া (টপ-ডাউন) কর্মপদ্ধতির চেয়ে ভিন্ন। তবে প্রয়োজনে তিনি কঠোর অবস্থান নিতেও জানেন, বিশেষ করে দলের সদস্যদের উজ্জীবিত করার ক্ষেত্রে।
মঙ্গলবার অনুষ্ঠিত মধ্যবর্তী নির্বাচনের মাত্র তিন দিন আগে এক রাজনৈতিক সমাবেশে জেফ্রিস বলেছিলেন, “আমরা যখন সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাব, তখন আমাদের প্রথম কাজগুলোর একটি হবে পিট হেগসেথকে ক্ষমতা থেকে বিদায় করা।”
জেফ্রিসের মূল লক্ষ্য হলো—ডেমোক্র্যাটরা ‘সাশ্রয়ী জীবনযাপনের সংকট’ (affordability crisis) মোকাবিলায় কাজ করবে। ভোটাররা বারবার এই বিষয়টিকে তাদের প্রধান উদ্বেগের কারণ হিসেবে উল্লেখ করেছেন। জনসমক্ষে দেওয়া বিভিন্ন বক্তব্যে তিনি বারবার বলে আসছেন যে, “আমেরিকা অত্যন্ত ব্যয়বহুল একটি দেশ।”
হাউস ডেমোক্র্যাটিক দলের একজন জ্যেষ্ঠ সহযোগী জানিয়েছেন, এমন কিছু বিল রয়েছে যা দিয়ে তিনি কাজ শুরু করতে পারেন এবং যা ডেমোক্র্যাটদের ঐক্যবদ্ধ করতে সহায়তা করবে। এর মধ্যে রয়েছে—শিশু কর ক্রেডিট (child tax credit) সম্প্রসারণ (যা ট্রাম্প ও কংগ্রেসের রিপাবলিকানরা মেয়াদ শেষ হতে দিয়েছিলেন), বাড়ি কেনাকে আরও সাশ্রয়ী করার লক্ষ্যে আবাসন কর ক্রেডিট, ইরানে যুদ্ধের অবসান, পরিচ্ছন্ন জ্বালানির জন্য ভর্তুকি পুনর্বহাল এবং ‘ওবামাকেয়ার’ (Obamacare) স্বাস্থ্যসেবা কর্মসূচির কিছু ভর্তুকি পুনরায় চালু করা।
এগুলো তুলনামূলক সহজ লক্ষ্য হলেও, এর মধ্যে কিছু বিলে ট্রাম্প ভেটো (নিষেধাজ্ঞা) প্রয়োগ করতে পারেন। জেফ্রিসের জন্য আরও কঠিন চ্যালেঞ্জ হবে গুরুত্বপূর্ণ আইন পাসের লক্ষ্যে বিরোধী দলের (রিপাবলিকানদের) সাথে সমঝোতায় পৌঁছানো। এর মধ্যে রয়েছে সরকারি ঋণ খেলাপি (default) এড়াতে যুক্তরাষ্ট্রের ঋণের সীমা বাড়ানো এবং সরকারি কার্যক্রম বন্ধ হওয়া (shutdown) রোধ করতে ফেডারেল ব্যয়ের অনুমোদন দেওয়া।
জেফ্রিস ডেমোক্র্যাটদের অন্যান্য অগ্রাধিকারমূলক বিষয়গুলোরও নেতৃত্ব দেবেন; যার মধ্যে রয়েছে সামাজিক নিরাপত্তা (সোশ্যাল সিকিউরিটি) রক্ষা করা, মেডিকেইড (Medicaid) খাতে রিপাবলিকানদের ৯০০ বিলিয়ন ডলারের কাটছাঁট বাতিল করা এবং অভিবাসন আইন সংস্কার করা।
মধ্যপন্থী ডেমোক্র্যাটিক পরামর্শক সংস্থা ‘থার্ড ওয়ে’ (Third Way)-এর মুখপাত্র কেট ডিগ্রুইটার বলেছেন, প্রেসিডেন্টকে অভিশংসন (impeachment) করার জন্য প্রগতিশীলদের পক্ষ থেকে যে আহ্বান জানানো হচ্ছে, জেফ্রিসের উচিত তা প্রতিহত করা।
তিনি বলেন, “আমার মনে হয় না যে প্রেসিডেন্টকে নিয়ে বড় ধরনের কোনো অভিশংসন লড়াই চালানোটা খুব একটা ফলপ্রসূ হবে।”
আমেরিকান ইউনিভার্সিটির গভর্নমেন্ট বা রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিষয়ের অধ্যাপক ডেভিড মিলার বলেন, নবনির্বাচিত প্রগতিশীলরা সম্ভবত ওয়াশিংটনে এমন প্রত্যাশা নিয়ে আসবেন যে, প্রথম দিন থেকেই তারা পুরো পৃথিবী বদলে ফেলতে পারবেন। জেফ্রিসের সামনে চ্যালেঞ্জ হবে—যেহেতু হোয়াইট হাউসের নিয়ন্ত্রণ ডেমোক্র্যাটদের হাতে নেই, তাই তাদের এই প্রত্যাশাগুলোকে কিছুটা সংযত করা।






























































