ব্রিটেনে অবৈধপথে অর্থপাচার ও সংঘবদ্ধ অপরাধের অর্থনৈতিক ভিত্তি ভেঙে দিতে পাঁচশত নতুন কর্মকর্তা নিয়োগের ঘোষণা দিয়েছে ব্রিটিশ সরকার। আগামী তিন বছরে এ কার্যক্রম সফল করতে পাঁচ শত মিলিয়ন পাউন্ড ব্যায় করবে সরকার।
নতুন এই উদ্যোগের আওতায় অপরাধীদের অবৈধ সম্পদ শনাক্ত, জব্দ ও পুনরুদ্ধারের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক অর্থপাচার নেটওয়ার্কের বিরুদ্ধেও অভিযান জোরদার করা হবে। সম্প্রতি প্রকাশিত এক সরকারি ঘোষণায় ব্রিটিশ হোম অফিস জানায়, নতুন কর্মকর্তারা বিভিন্ন পুলিশ বাহিনী, ন্যাশনাল ক্রাইম এজেন্সী (এনসিএ) এবং ক্রাউন প্রসিকিউশন (সিপিএস)-এর সঙ্গে কাজ করবেন। তাদের অন্যতম প্রধান দায়িত্ব হবে গুরুতর ও সংঘবদ্ধ অপরাধের সঙ্গে যুক্ত অর্থের গতিপথ অনুসরণ করা এবং অপরাধীদের আর্থিক কাঠামো শনাক্ত করা।
সরকারের নতুন অর্থপাচার প্রতিরোধ ও অপরাধলব্ধ সম্পদ পুনরুদ্ধার কৌশল ২০২৬–২০২৯ (Anti-Money Laundering and Asset Recovery Strategy 2026–2029)-এর অংশ হিসেবে এই কর্মসূচি নেওয়া হয়েছে। কৌশলটির লক্ষ্য হলো অপরাধীদের অবৈধ অর্থ লুকানো, স্থানান্তর ও অপরাধ থেকে অর্জিত অর্থ ভোগ করার সুযোগ কমিয়ে দেওয়া।
বছরে একশত বিলিয়ন পাউন্ডের বেশি অর্থপাচারের আশঙ্কা হোম আফিস-এর তথ্য অনুযায়ী, এনসিএ-এর হিসাবে প্রতি বছর একশত বিলিয়নের বেশি অর্থ যুক্তরাজ্য বা যুক্তরাজ্যভিত্তিক করপোরেট কাঠামোর মাধ্যমে পাচার হতে পারে। মাদক পাচার, প্রতারণা, মানব পাচার ও দুর্নীতি থেকে অর্জিত অর্থ বৈধ অর্থনৈতিক ব্যবস্থার ভেতরে প্রবেশ করাতে বিভিন্ন নেটওয়ার্ক ব্যবহার করা হয়।
সরকারের মতে, ফিনটেক, ক্রিপ্টোকারেন্সি ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার মতো নতুন প্রযুক্তির বিস্তারের ফলে অর্থপাচারের পদ্ধতিও আরও জটিল হয়ে উঠছে। নতুন কৌশলপত্রে তাই আর্থিক গোয়েন্দা সক্ষমতা বাড়ানো, প্রযুক্তির ব্যবহার সম্প্রসারণ এবং সরকারি সংস্থা, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও বেসরকারি খাতের মধ্যে তথ্য বিনিময় জোরদারের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
এক বছরে প্রায় সাড়ে তিনশত মিলিয়ন পাউন্ডের অবৈধ সম্পদ উদ্ধারে কথা জানিয়েছে সরকার, গত এক বছরের অভিযানে অপরাধীদের কাছ থেকে প্রায় ৩৫০ মিলিয়ন অবৈধ অর্থ ও সম্পদ উদ্ধার করা হয়েছে। একই সময়ে আরও এক বিলিয়ন পাউন্ডের বেশি অর্থ অপরাধীদের ব্যবহারের বাইরে রাখা হয়েছে।
এ ছাড়া ২,৭০০টি অবৈধ অর্থায়ন-সংক্রান্ত কার্যক্রম ব্যাহত হয়েছে এবং অর্থপাচারের মামলায় দণ্ডিত ব্যক্তির সংখ্যা প্রায় ৪,০০০-এ পৌঁছেছে। ক্ষতিগ্রস্তদের কাছে প্রায় ২৬ মিলিয়ন পাউন্ড ফেরত দেওয়া হয়েছে বলেও জানিয়েছে হোম অফিস। অভিবাসন ও মানব পাচার-সংক্রান্ত অপরাধ দমনের অংশ হিসেবে গত এক বছরে পাচারকারী ও সংশ্লিষ্ট অপরাধীদের কাছ থেকে প্রায় এক মিলিয়ন পাউন্ড পরিমাণ অর্থও জব্দ করা হয়েছে।
নজরদারিতে রুশ অর্থপাচার নেটওয়ার্কও নতুন কর্মকর্তাদের কার্যক্রমের একটি গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র হবে আন্তর্জাতিক অর্থপাচার নেটওয়ার্ক। বিশেষ করে রুশ ও অন্যান্য আন্তর্জাতিক নেটওয়ার্কের মাধ্যমে যুক্তরাজ্যে বা যুক্তরাজ্যকে ব্যবহার করে অবৈধ অর্থ স্থানান্তরের ওপর নজরদারি বাড়ানো হবে।এ ক্ষেত্রে এনসিএ-এর অপারেশন ডিস্টেবিলাইজ-এর অভিজ্ঞতা কাজে লাগানোর কথা জানিয়েছে সরকার। সংস্থাটির তথ্য অনুযায়ী, ওই অভিযানে ১২ মাসেরও কম সময়ে ১১৯ জন সন্দেহভাজন অর্থপাচারকারীকে গ্রেপ্তার করা হয় এবং নগদ অর্থ ও ক্রিপ্টোকারেন্সি মিলিয়ে ২৫ মিলিয়ন পাউন্ডের বেশি সম্পদ জব্দ করা হয়।
হাই স্ট্রিটের সন্দেহজনক ব্যবসার বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা অর্থপাচারের বিরুদ্ধে নতুন উদ্যোগ শুধু বড় আন্তর্জাতিক নেটওয়ার্কের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকছে না। যুক্তরাজ্যের বিভিন্ন এলাকার হাই স্ট্রিটে অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের আড়াল হিসেবে ব্যবহৃত ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলোর বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। ব্রিটিশ হোম আফিস জানিয়েছে, হাই স্ট্রিট অর্গানাইজ্ড ক্রাইম ইউনিট-এর কার্যক্রম আরও শক্তিশালী করা হচ্ছে। পুলিশ ও ট্রেডিং স্ট্যান্ডার্স কর্তৃপক্ষকে অতিরিক্ত সহায়তা দেওয়ার পাশাপাশি অপরাধমূলক কাজে ব্যবহৃত কিছু ব্যবসা বন্ধ করার আইনি ব্যবস্থাও জোরদার করা হচ্ছে।
শুধু গ্রেপ্তার নয়, অপরাধের অর্থের উৎসে নজর যুক্তরাজ্য সরকারের নতুন কৌশলের একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন হলো—শুধু অপরাধীকে গ্রেপ্তার করার পরিবর্তে তার অর্থনৈতিক অবকাঠামো এবং অপরাধলব্ধ সম্পদের দিকেও নজর দেওয়া।
পার্লামেন্টে দেওয়া সরকারের বিবৃতিতে বলা হয়েছে, ২০২৬–২৯ কৌশলের তিনটি প্রধান লক্ষ্য হলো অর্থপাচার প্রতিরোধব্যবস্থা আরও কার্যকর করা, গুরুতর অর্থপাচার নেটওয়ার্ক ভেঙে দেওয়া এবং উদ্ধার করা অপরাধলব্ধ সম্পদ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী সংস্থা, ভুক্তভোগী ও জনস্বার্থে কাজে লাগানো।
সরকারের পরিকল্পনায় আর্থিক তদন্তকারী, ফরেনসিক অ্যাকাউন্ট্যান্ট এবং ক্রিপ্টো-সম্পদ বিশ্লেষণের সক্ষমতা বাড়ানোর কথাও রয়েছে। পাশাপাশি এনসিএ-এর অধীনে আর্থিক গোয়েন্দা সক্ষমতা আরও সমন্বিত করার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। অর্থপাচার মোকাবিলায় নতুন কৌশল হোম অফিসের ভাষ্য অনুযায়ী, নতুন কর্মসূচির মাধ্যমে অপরাধীদের অবৈধ অর্থের উৎস শনাক্ত করা, সম্পদ জব্দ করা এবং আন্তর্জাতিক পর্যায়ে অর্থপাচার নেটওয়ার্কের বিরুদ্ধে সমন্বিত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
সরকারের প্রকাশিত অর্থপাচার প্রতিরোধ ও অপরাধলব্ধ সম্পদ পুনরুদ্ধার কৌশল ২০২৬–২০২৯ আগামী তিন বছরে যুক্তরাজ্যের অর্থপাচারবিরোধী কার্যক্রমের কাঠামো নির্ধারণ করবে। এতে সরকারি সংস্থা, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী, আর্থিক প্রতিষ্ঠান এবং আন্তর্জাতিক অংশীদারদের মধ্যে সহযোগিতা বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।





























































