চলো পাল্টাই। এইভাবে আর কত দিন? প্রতিদিনই ঘটছে কোনো না কোনো ঘটনা। কোনোটি আমাদের ক্ষুব্ধ করছে, কোনোটি হতাশ করছে, কোনোটি বিবেককে নাড়া দিচ্ছে। আবার কোনো কোনো ঘটনা আমাদের আশান্বিতও করছে। কিন্তু এসব ঘটনায় একটি বিষয় স্পষ্ট হয়ে ওঠে—এগুলো নিছক বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়; বরং আমাদের দায়বদ্ধতার অবক্ষয়ের বাস্তব চিত্র। ঘটনাগুলো যেন প্রতিদিন আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিচ্ছে—আমরা কোথায় দাঁড়িয়ে আছি। কোথাও আইন অমান্য হচ্ছে, কোথাও ক্ষমতার অপব্যবহার, কোথাও ঘুষ-দুর্নীতি, কোথাও প্রতারণা, কোথাও ধর্মের নামে উগ্রতা, কোথাও তরুণদের অসহিষ্ণুতা ও উদাসীনতা, কোথাও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে গুজব ও বিদ্বেষ ছড়ানো হচ্ছে। আবার কোথাও দেখা যাচ্ছে, মানুষ অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়াচ্ছে, বিপদগ্রস্ত মানুষের পাশে দাঁড়াচ্ছে, সত্য প্রকাশের সাহস দেখাচ্ছে। দায়বদ্ধতার অভাব যত গভীর হচ্ছে, সামাজিক বিশৃঙ্খলাও ততই চরম আকার ধারণ করছে। এই দুই বিপরীত চিত্রের মধ্যেই আমাদের সমাজের বর্তমান বাস্তবতা—একদিকে অবক্ষয়, অন্যদিকে প্রতিরোধ; একদিকে অন্ধকার, অন্যদিকে আলোর ক্ষীণ রেখা।
আমরা প্রায় প্রতিটি সামাজিক সমস্যার সমাধান হিসেবে নতুন আইন, কঠোর শাস্তি, প্রশাসনিক ব্যবস্থা কিংবা রাজনৈতিক উদ্যোগের কথা বলি। কিন্তু প্রশ্ন হলো—শুধু আইন দিয়ে কি সমাজের নৈতিক সংকট দূর করা সম্ভব? দায়বদ্ধতা কেবল আইন মানার বিষয় নয়; এটি নৈতিকতা, বিবেক, মূল্যবোধ এবং নিজের দায়িত্ব সম্পর্কে সচেতন থাকার নাম। একজন নাগরিক যখন নিজের দায়িত্ব এড়িয়ে যান, একজন কর্মকর্তা যখন কর্তব্যের বিনিময়ে ঘুষ প্রত্যাশা করেন, একজন ক্ষমতাবান যখন অন্যায়কে প্রশ্রয় দেন, একজন তরুণ যখন সমাজ ও রাষ্ট্রের প্রতি উদাসীন হয়ে পড়েন কিংবা ধর্মের নামে যখন উগ্রতা ও বিদ্বেষ ছড়িয়ে দেওয়া হয়—তখন মূলত একই সংকটের প্রকাশ ঘটে: দায়বদ্ধতার সংকট।
একজন জনপ্রতিনিধি জনগণের অর্থ অপব্যবহার করবেন না—এটি আইনের বিষয়; কিন্তু জনগণের সম্পদকে নিজের সম্পদ মনে না করার যে নৈতিক শিক্ষা, সেটি আসে দায়বদ্ধতার বোধ থেকে। একজন শিক্ষক শুধু পাঠ্যবই পড়াবেন না, শিক্ষার্থীর ভবিষ্যতের প্রতিও দায়িত্বশীল থাকবেন। একজন সাংবাদিক শুধু সংবাদ প্রকাশ করবেন না, সত্য ও জনস্বার্থের প্রতিও দায়বদ্ধ থাকবেন। একজন ধর্মীয় নেতা শুধু ধর্মীয় বক্তব্য দেবেন না, মানুষের মধ্যে সহনশীলতা, মানবিকতা ও শান্তির বোধ তৈরি করবেন। একজন নাগরিক শুধু নিজের অধিকার দাবি করবেন না, নিজের দায়িত্বও পালন করবেন। আমাদের সংকটের একটি বড় জায়গা এখানেই। আমরা অধিকার সম্পর্কে যতটা সোচ্চার, দায়িত্ব সম্পর্কে ততটা নই। অন্যের ভুল দেখতে যতটা আগ্রহী, নিজের ভুল স্বীকার করতে ততটাই অনাগ্রহী।
কোনো সমাজে বিচ্ছিন্নভাবে কয়েকজন মানুষ দায়িত্বহীন হলে সেটি বড় সংকট নয়। সংকট তখনই গভীর হয়, যখন দায়িত্বহীনতা ধীরে ধীরে সামাজিক সংস্কৃতিতে পরিণত হয়। ‘সবাই তো করছে’, ‘এতে আমার কী’, ‘একটু ঘুষ না দিলে কাজ হয় না’, ‘ক্ষমতাবানদের সঙ্গে লাগতে নেই’, ‘সত্য বলে কী লাভ’—এই ধরনের মানসিকতা যখন সাধারণ মানুষের চিন্তায় জায়গা করে নেয়, তখন সামাজিক অবক্ষয় শুধু অপরাধীর কারণে ঘটে না; নীরব দর্শক ও প্রশ্রয়দাতারাও তার অংশ হয়ে ওঠে। একজন দুর্নীতিবাজ একা দুর্নীতি করে না; একটি পরিবেশ তাকে সহায়তা করে—কেউ ঘুষ দেয়, কেউ নেয়, কেউ জানে, কেউ দেখে, কেউ চুপ থাকে। এই নীরবতাই দুর্নীতিকে শক্তিশালী করে। একইভাবে অজ্ঞতা, অসহিষ্ণুতা, বিদ্বেষ, ভুল ব্যাখ্যা, রাজনৈতিক বা সামাজিক স্বার্থ এবং নীরব প্রশ্রয়ের সমন্বয়ে উগ্রতার পরিবেশ তৈরি হয়।
যে কোনো দেশের সবচেয়ে বড় শক্তি তার তরুণ সমাজ। কিন্তু তরুণদের একটি অংশ যদি সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় বাস্তবতা সম্পর্কে উদাসীন হয়ে পড়ে, সেটি ভবিষ্যতের জন্য বিপজ্জনক সংকেত। তরুণদের প্রশ্ন করতে হবে, যুক্তি দিয়ে ভাবতে হবে, অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়াতে হবে এবং সমাজ পরিবর্তনের স্বপ্ন দেখতে হবে। দেশকে ভালোবাসা মানে শুধু জাতীয় দিবসে পতাকা উত্তোলন নয়; অন্যায় না করা, অন্যায়ের প্রতিবাদ করা, জনসম্পদ রক্ষা করা, ভিন্নমতকে সম্মান করা এবং সত্যের পাশে দাঁড়ানোও দেশপ্রেম। এই দায়বদ্ধ নাগরিক তৈরির প্রথম প্রতিষ্ঠান পরিবার, আর দ্বিতীয় গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান শিক্ষা প্রতিষ্ঠান। কিন্তু আমাদের শিক্ষাব্যবস্থায় পরীক্ষার ফল, সার্টিফিকেট ও চাকরির প্রস্তুতির ওপর যতটা গুরুত্ব দেওয়া হয়, চরিত্র, নৈতিকতা, সামাজিক দায়িত্ব ও নাগরিক মূল্যবোধের ক্ষেত্রে ততটা গুরুত্ব সবসময় দেখা যায় না।
শিক্ষা যদি মানুষকে শুধু দক্ষ করে কিন্তু নৈতিক না করে, তবে সেই দক্ষতা কখনো কখনো সমাজের জন্য বিপজ্জনকও হতে পারে। একজন মেধাবী মানুষ যদি দুর্নীতির কৌশল জানেন, একজন প্রযুক্তিবিদ যদি প্রযুক্তিকে প্রতারণার কাজে ব্যবহার করেন, একজন শিক্ষিত ব্যক্তি যদি বিদ্বেষ ছড়ান কিংবা একজন ক্ষমতাবান ব্যক্তি যদি আইনের অপব্যবহার করেন—তাহলে প্রশ্ন উঠতেই পারে, আমরা কি সত্যিই শিক্ষিত সমাজ তৈরি করতে পেরেছি? শিক্ষার উদ্দেশ্য শুধু জীবিকা অর্জন নয়; মানুষ তৈরি করা। তাই পরিবার, শিক্ষক ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের দায়িত্ব শুধু জ্ঞান দেওয়া নয়, দায়িত্বশীল ও মানবিক নাগরিক তৈরি করা।
ঘুষ ও দুর্নীতিকে আমরা প্রায়ই প্রশাসনিক সমস্যা হিসেবে দেখি। কিন্তু এটি মূলত একটি নৈতিক ও সামাজিক সমস্যা। যখন একজন মানুষ ঘুষ নেন, তিনি শুধু আইন ভঙ্গ করেন না; তিনি একটি প্রতিষ্ঠান, রাষ্ট্র এবং সাধারণ মানুষের প্রতি তার দায়বদ্ধতাও অস্বীকার করেন। দুর্নীতি রাষ্ট্রের অর্থনৈতিক ক্ষতি করে, প্রতিষ্ঠানের কার্যকারিতা নষ্ট করে এবং নাগরিকের অধিকার ক্ষুণ্ন করে। কিন্তু তার চেয়েও ভয়াবহ হলো—এটি মানুষের বিশ্বাস নষ্ট করে। মানুষ যখন মনে করতে শুরু করে, ‘সততার সঙ্গে কোনো কাজ হয় না’, তখন দুর্নীতি শুধু অফিসে থাকে না; মানুষের মানসিকতায়ও জায়গা করে নেয়। তখন সততা হয়ে যায় বোকামি, আর অসততা হয়ে যায় ‘স্মার্টনেস’। এই মানসিকতার পরিবর্তন না ঘটাতে পারলে কেবল শাস্তির ভয় দেখিয়ে দুর্নীতি নির্মূল করা কঠিন। ধর্ম মানুষের নৈতিক ও আত্মিক উন্নতির পথ দেখায়। কিন্তু ধর্মকে যখন ঘৃণা, বিদ্বেষ, বিভাজন কিংবা সহিংসতার হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা হয়, তখন তার মূল মানবিক উদ্দেশ্যই ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
একটি সভ্য সমাজে প্রত্যেকের ধর্মীয় বিশ্বাস ও মতের প্রতি সম্মান থাকা প্রয়োজন। অন্যের ওপর নিজের বিশ্বাস চাপিয়ে দেওয়া, ভিন্নমতের মানুষকে শত্রু হিসেবে দেখা কিংবা ধর্মের নামে সহিংসতা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। ধর্মের প্রকৃত সৌন্দর্য তখনই প্রকাশ পায়, যখন তা মানুষকে মানুষের প্রতি শ্রদ্ধাশীল, সহনশীল ও মানবিক করে তোলে।
এতসব হতাশার মধ্যেও আশাবাদী হওয়ার কারণ আছে—সত্য এখনো বেঁচে আছে। প্রতিদিন আমরা এমন মানুষ দেখি, যারা অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়ান; এমন সাংবাদিক দেখি, যারা চাপের মধ্যেও সত্য তুলে ধরেন; এমন শিক্ষক দেখি, যারা নিজেদের স্বার্থের বাইরে শিক্ষার্থীর ভবিষ্যৎ নিয়ে ভাবেন; এমন তরুণ দেখি, যারা সমাজ পরিবর্তনের স্বপ্ন দেখেন; এমন সাধারণ মানুষ দেখি, যারা বিপদে অপরিচিত মানুষের পাশে দাঁড়ান। এই মানুষগুলো হয়তো সংখ্যায় কম। কিন্তু পরিবর্তনের ইতিহাস সবসময় সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের নীরবতায় লেখা হয় না; অনেক সময় অল্প কিছু সাহসী মানুষের সত্যের পক্ষে দাঁড়ানোর মধ্য দিয়েই পরিবর্তনের শুরু হয়। সত্য শুধু তথ্যের সঠিকতা নয়; সত্য হলো বিবেকের স্বাধীনতা, অন্যায়ের সামনে মাথা নত না করার সাহস এবং নিজের ভুল স্বীকার করার সততা। এই সত্য, বিবেক ও মানবিকতাই আমাদের সবচেয়ে বড় আশার জায়গা।
দায়বদ্ধতার সংস্কৃতি গড়ে তোলার দায়িত্ব শুধু রাষ্ট্রের নয়; ব্যক্তি, পরিবার, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, প্রশাসন, রাজনৈতিক নেতৃত্ব, গণমাধ্যম ও সামাজিক নেতৃত্ব—সবার। রাষ্ট্রকে আইনের শাসন নিশ্চিত করতে হবে এবং প্রশাসনকে কার্যকর জবাবদিহির মধ্যে আনতে হবে। দুর্নীতির বিরুদ্ধে দৃশ্যমান ও কার্যকর ব্যবস্থা নিতে হবে। শিক্ষা ব্যবস্থায় নৈতিকতা, নাগরিক মূল্যবোধ ও সামাজিক দায়িত্বকে গুরুত্ব দিতে হবে। তরুণদের সৃজনশীল ও সামাজিক কর্মকাণ্ডে যুক্ত করতে হবে। ধর্মীয় ও সামাজিক নেতৃত্বকে সহনশীলতা ও মানবিকতার পক্ষে দৃঢ় ভূমিকা নিতে হবে। গণমাধ্যমকে সত্য, ন্যায় ও জনস্বার্থের প্রতি দায়বদ্ধ থাকতে হবে। তবে রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থার পরিবর্তনের পাশাপাশি ব্যক্তির আত্মজিজ্ঞাসাও জরুরি। আমরা কি শুধু সন্তানকে সফল হতে শেখাচ্ছি, নাকি ভালো মানুষ হতেও শেখাচ্ছি? আমরা কি শুধু অন্যের দুর্নীতি ও অন্যায় নিয়ে প্রশ্ন করছি, নাকি নিজের আচরণ নিয়েও প্রশ্ন করছি? পরিবর্তনের সবচেয়ে কঠিন জায়গাটি হলো নিজেকে পরিবর্তন করা। কারণ সমাজ কোনো বিমূর্ত বিষয় নয়—সমাজ মানে আমরা। আমাদের আচরণ, মূল্যবোধ ও সিদ্ধান্তের সমষ্টিই সমাজের চরিত্র তৈরি করে।
সামাজিক অবক্ষয়, মূল্যবোধের সংকট, দুর্নীতি, অসহিষ্ণুতা, উগ্রতা, প্রতারণা ও দায়িত্বহীনতা—সবকিছু মিলিয়ে প্রশ্ন উঠছে, আমরা কোন দিকে যাচ্ছি? এই প্রশ্নের উত্তর শুধু রাষ্ট্র বা অন্য কারও কাছে খুঁজলে হবে না। উত্তর খুঁজতে হবে নিজেদের মধ্যেও। আমাদের প্রয়োজন শুধু অপরাধের বিচার নয়; প্রয়োজন এমন একটি সামাজিক পরিবেশ তৈরি করা, যেখানে মানুষ অন্যায় করতে ভয় পাবে এবং সত্য বলতে সাহস পাবে। যেখানে দায়িত্ব পালন হবে সম্মানের, সততা হবে শক্তির এবং মানবিকতা হবে মানুষের পরিচয়ের প্রধান মাপকাঠি। আমাদের নতুন করে দায়বদ্ধতার সংস্কৃতি গড়ে তুলতে হবে—যেখানে ক্ষমতা মানে দায়িত্ব, স্বাধীনতা মানে দায়িত্বশীলতা, অধিকার মানে কর্তব্যের সঙ্গে ভারসাম্য, শিক্ষা মানে মানবিকতা, ধর্ম মানে সহমর্মিতা এবং নাগরিকত্ব মানে শুধু পরিচয় নয়—দায়িত্ব। সত্যনিষ্ঠ মানুষই ন্যায় প্রতিষ্ঠার শক্তি তৈরি করে। আর ন্যায়ভিত্তিক সমাজেই মানুষ নিরাপদ, মর্যাদাপূর্ণ ও সুন্দরভাবে বাঁচতে পারে। সত্যই সুন্দর। মানুষই সুন্দর। আর মানুষ যখন সত্য, ন্যায় ও মানবিকতার পথে দাঁড়ায়—তখনই সমাজ সুন্দর হয়ে ওঠে।
সুধীর বরণ মাঝি, শিক্ষক, হাইমচর সরকারি মহাবিদ্যালয়, হাইমচর, চাঁদপুর।






























































