বাংলাদেশের জাতীয় ইতিহাসে ১৯৭১ এর মহান মুক্তিযুদ্ধ এবং বীর মুক্তিযোদ্ধাদের অবদান অস্বীকার করার উপায় নেই। মুক্তিযোদ্ধাদের আত্মত্যাগের বিনিময়ে আমরা পেয়েছি একটি স্বাধীন দেশ, একটি জাতীয় পতাকা এবং ‘‘জাতীয় সঙ্গীত আমার সোনার বাংলা অমি তুমায় ভালবাসি‘‘। তাদের ত্যাগ ও অবদানকে অস্বীকার করা ৩০লক্ষ শহীদের রক্তের সাথে বেঈমানী করার সামিল। কথিত জুলাই বিপ্লেবের নামে মেটিকুল্যাস ডিজাইনের মাধ্যমে ২০২৪ সালের ৫ আগষ্টে পট পরিবর্তনের পর থেকে একটি গোষ্টী মরিয়া হয়ে উঠেছে, মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস এবং মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিচিহ্ন গুলোকে ধ্বংশ করতে। এরই ধারাবাহিকতায় বঙ্গভবন সহ দেশের বিভিন্ন স্থানে মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিচিহ্ন গুলোকে ধ্বংশ করা হচ্ছে। এসব ঘৃন্য অপতৎপরতার মাধ্যমে মুক্তিযুদ্ধকে ইতিহাসের পাতা থেকে মুছে ফেলা সম্ভব নয় এবং হবেনা, ইতিহাস তার সঠিক গতি পথেই চলবে।
সোমবার ৬ জুলাই ২০২৬ লন্ডনের একটি রেষ্টুরেন্টে বসে কথা হচ্ছিল বীর মুক্তিযোদ্ধা শাহ ফজর আলীর পুত্র ইংল্যান্ডের বিশিষ্ট কমিউনিটি নেতা ও সমাজকর্মি শাহ শহীদ আলীর সাথে। তিনি জানান তার পিতার মহান মুক্তিযুদ্ধের অবদানকে সম্মান করে ২০১২ সালে বাংলাদেশ সরকারের স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর হবিগঞ্জ-নবীগঞ্জ আঞ্চলিক সড়ক থেকে মান্দারকান্দি পর্জন্ত একটি রাস্তার নাম করন করে ‘‘বীর মুক্তিযোদ্ধা শাহ ফজর আলী সড়ক‘‘। ২০১৪ সালের ১৬ অক্টোবর এই রাস্তায় সরকার একটি তোরন নির্মান করে। এর আনুষ্টানিক উদ্ভোধন করেন তৎকালীন হবিগঞ্জ-১ আসন থেকে নির্বাচিত জাতীয় পার্টির সংসদ সদস্য এম.এ.মুনিম চৌধুরী বাবু, হবিগঞ্জের জেলা প্রশাসক মোঃ জয়নাল আবেদিন এবং নবীগঞ্জ উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান অ্যাডভোটেক আলমগীর চৌধুরী। ২০২৪ সালের ৫ আগষ্টের পর স্বাধীনতা বিরোধীরা রাতের আধারে এই তোরটি ভেঙ্গে মাটির সাথে গুড়িয়ে দেয়। মুক্তিযোদ্ধা সন্তান শাহ শহীদ আলী কান্না জড়িত কণ্টে বলেন ১৯৭১ সালে যখন যুদ্ধ শুরু হয়, তার পিতা তখন পাকিস্তানের রাওয়ালপিন্ডিতে ইষ্টবেঙ্গল রেজিমেন্টের (ইপিএম) ইলেকট্রনিক ম্যাকানিকেল কোরে কর্মরত ছিলেন। তিনি দেশ মাতৃকার টানে পাকিস্তান থেকে পালিয়ে এসে যুদ্ধে অংশ নেন। তিনি মনে করেন যারা দেশের স্বাধীনতা সার্বভৌমত্বে বিশ্বাস করেনা তারাই মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিচিহ্নগুলোকে ধ্বংশ করতে মরিয়া হয়ে উঠেছে।
বীর মুক্তিযোদ্ধা শাহ ফজর আলীর জন্ম ১৯৩৮ সালে হবিগঞ্জের নবীগঞ্জ উপজেলার কালিয়ার ভাঙ্গা ইউনিয়নের মান্দারকান্দি গ্রামে, তার পিতার নাম শাহ আরজদ আলী। তাদের পূর্বপুরুষ হযরত শাহ জালাল (রঃ) অন্যতম সফর সঙ্গী হযরত জালাল শাহ (রঃ) সুদুর ইরান থেকে ধর্মপ্রচারের জন্য এই অঞ্চলে আগমন করেছিলেন। একারনে এই বংশের লোকরা নামের সাথে শাহ পদবী ব্যবহার করেন। বীরমুক্তিযোদ্ধা শাহ ফজর আলী পাকিস্তান আমলের শেষ দিকে পাকিস্তান সেনাবাহিনীতে যোগদান করেন। ১৯৭১ সালে দেশে প্রতিরোধযুদ্ধ শুরু হলে তিনি পাকিস্তানের রাওয়ালপিন্ডিতে ইষ্টবেঙ্গল রেজিমেন্টের (ইপিএম) ইলেকট্রনিক ম্যাকানিকেল কোরে কর্মরত ছিলেন। ১৯৭১ সালের এপ্রিল মাসে রাওয়ালপিন্ডি থেকে পালিয়ে এসে মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেন। ৫নং সেক্টেরের ভালাট সাব সেক্টরে অধীন যুদ্ধ করেন। তখন বেশ কয়েকটি বড় বড় অপারেশনে অংশ নেন। মুক্তিবাহিনীর প্রতিরোধের কারনে ৫নং সেক্টরের অধীন ভাটি অঞ্চল ছিল অনেকটাই মুক্তাঞ্চল। ভালাট সাব সেক্টরের মুক্তিবাহিনীর প্রতিরোধের কারনে পাকিস্তান বাহিনী এই অঞ্চলে বেশ সুবিধা করতে পারেনি। দেশ স্বাধীনের পর মুক্তিযোদ্ধা শাহ ফজর আলী আবার বাংলাদেশ সেনাবাহিনীতে যোগ দেন। সেনাবাহিনী থেকে অবসর গ্রহনের পর তিনি ২০১২ সালের ২৩ অক্টোবর মৃত্যুবরন করেন। বিবাহহিত জীবনে এই বীর মুক্তিযোদ্ধা ছিলেন ১৩ সন্তানের জনক। তার স্ত্রীর নাম শাহ আয়েশা বেগম। তার ৬ পুত্র ও ৭ কন্যার মধ্যে চারজন আর ইহজগতে নেই।
এই বীর মুক্তিযোদ্ধার স্মৃতিকে ধরে রাখতে তার সন্তানেরা ২০১৩ সালে ‘‘ বীর মুক্তিযোদ্ধা শাহ ফজর আলী ফাউন্ডেশন‘‘ নামে একটি ট্রাষ্ট গঠন করে এলাকার আর্তমানবতার কল্যানে কাজ করে যাচ্ছেন। এই প্রতিষ্টানের ফাউন্ডার সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছন তার প্রথম পুত্র শাহ শহিদ আলী। শাহ শহীদ আলী যেমন একজন বীর মুক্তিযোদ্ধার সন্তান তেমনি তিনি একজন গর্বিত পিতাও। লন্ডনে জন্ম নেয়া তার সন্তানেরা সকলেই প্রতিষ্টিত তিনি বলেন মুক্তিযোদ্ধা পিতার ইচ্ছে পূরনে সন্তানদের ইংল্যান্ডের নামীদামি বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়িয়েছেন। তিনি বলেন তার সন্তানদের উচ্চ শিক্ষার পেছনে ন্ত্রী শিরিয়া ভানুর অবদান সবচেয়ে বেশী। তার সন্তানেরা হলেন সুমাইয়া নার্গিস আলী শাহ একজন সলিসিটর, পুত্র শাহ শাখাওত আলী ব্রিটিশ সিভিল (HMRC) সার্ভিসে কর্মরত, শারমিন আলী শাহ সিভিল সার্ভিস রয়েল কোর্ট অব জাষ্ট্রিজে কর্মরত, শাহ সাইফ আলী, এবছর ইংল্যান্ডের সোয়াস বিশ্ববিদ্যালয় থেকে একাউটেন্সী এন্ড ফিনান্সয়ে ডিগ্রি নিয়েছেন, সাবিয়া আলী শাহ ইংল্যান্ডের কিংস কলজে বিশ্ববিদ্যালয়ে সাইকোলজিতে ফাইন্যাল বর্ষের শিক্ষার্থী , সিকন্দর আলী শাহ লন্ডনের কুইনমেরী বিশ্ববিদ্যালয়ে স্থান পেয়েছে সে ভবিষ্যতে একজন চিকিৎসক হতে চায়। তথ্য সূত্রঃ নবীগঞ্জ মুক্তিযোদ্ধা সংসদ ১৯৮৩, মতিয়ার চৌধুরী লিখিত ইতিকথা ১৯৮৫- সপ্তম অধ্যায় পৃষ্টা ২০৬-২০১৫, একাত্তরের যুদ্ধ কথা তাজুল মোহাম্মদ ও বীর মুক্তিযোদ্ধা সন্তান শাহ শহীদ আলী ।
























































