নটিং হিল কার্নিভালের শেষ দিনে পশ্চিম লন্ডনের রাস্তায় রাস্তায় নেচে-গেয়ে আনন্দ করেছেন নৃত্যশিল্পী, ডিজে এবং ড্রামবাদকরা। প্রতি বছর প্রায় ২০ লাখ মানুষের সমাগম ঘটা এই উৎসবটি এবার তার ৬০তম বার্ষিকী উদযাপন করছে। প্রতি বছর এতে অংশ নেওয়া স্থানীয় এক বাসিন্দা বলেন, “এটি আমাদের সম্প্রদায়ের সাথে আনন্দ ভাগ করে নেওয়ার একটি সুযোগ।” জমকালো সব পোশাকে সজ্জিত নৃত্যশিল্পীরা এবারের উৎসবের শেষ দিনটিতে সকাল ১০:৩০টা (বিএসটি) থেকেই আনন্দে মেতে উঠেছেন। দুপুর ৩টায় (বিএসটি) কার্নিভালস্থলের কাছেই অবস্থিত গ্রেনফেল টাওয়ারে ২০১৭ সালের অগ্নিকাণ্ডে নিহত ৭২ জনের স্মরণে ৭২ সেকেন্ডের নীরবতা পালন করা হয়। উৎসবটিতে পারফর্ম করা ডিজে জাডা পিঙ্ক বলেন, “ক্যারিবীয় বংশোদ্ভূত তৃতীয় প্রজন্মের প্রতিনিধি হিসেবে—আমার বাবার বাড়ি ডোমিনিকা ও গ্রেনাডায় এবং মায়ের বাড়ি সেন্ট লুসিয়া ও গায়ানায়—এই কার্নিভাল আমাকে আমার নিজস্ব পরিচয়ের সাথে সংযুক্ত করে।”
ওয়েষ্ট লন্ডনের নটিং হিল গেট, ল্যাডব্রোক গ্রোভ রোড, হলান্ডপার্ক, পোর্টোবেলো রোডসহ আশপাশের বিস্তীর্ণ এলাকা পরিণত হয়েছে বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ স্ট্রিট কার্নিভালের মঞ্চে। রং-বেরঙের পোশাক, ঝিলমিলে সাজ, তুমুল সঙ্গীত, নাচ আর হাজারো মানুষের উচ্ছ্বাসে পশ্চিম লন্ডন যেন এক অন্য শহরে পরিণত হলো। সোমবার ব্রিটেনে ব্যাংকহলিডের সরকারি ছুটির দিনে অনুষ্ঠিত হয়েছে বিশ্বখ্যাত নটিং হিল কার্নিভালের অ্যাডাল্টস’ ডে। এবারের আয়োজনটির বিশেষ গুরুত্ব রয়েছে, কারণ ২০২৬ সালে এই ঐতিহ্যবাহী কার্নিভাল উদযাপন করছে তার ৬০তম বার্ষিকী।
রোববারের আয়োজন ছিল শিশু ও পরিবারের জন্য নির্ধারিত চিলড্রেনস’ ডে। কিন্তু সোমবারের অ্যাডাল্টস’ ডে-ই মূলত কার্নিভালের সবচেয়ে বড় ও উচ্ছ্বসিত দিন। সকাল সাড়ে ১০টায় শুরু হয়েছে অ্যাডাল্টস’ প্যারেড। এতে অংশ নিচ্ছেন বিভিন্ন মাস ব্যান্ড, নৃত্যশিল্পী, সঙ্গীতশিল্পী এবং বর্ণিল পোশাকে সজ্জিত হাজারো মানুষ। বছরের পর বছর প্রস্তুতি নিয়ে বিভিন্ন মাস ব্যান্ড এই দিনের জন্য তাদের পোশাক, নাচ এবং পরিবেশনা তৈরি করে। ফলে আজকের আয়োজনের মধ্যে আনন্দের পাশাপাশি রয়েছে এক ধরনের সৃজনশীল প্রতিযোগিতার আবহ—কার পোশাক বেশি আকর্ষণীয়, কার নাচ বেশি প্রাণবন্ত এবং কোন ব্যান্ড দর্শকদের সবচেয়ে বেশি মাতাতে পারে।
অ্যাডাল্টস’ ডে-এর সবচেয়ে চোখে পড়ার মতো বিষয়গুলোর একটি হলো কার্নিভাল কস্টিউম। নারী-পুরুষ নির্বিশেষে অনেক অংশগ্রহণকারী পালক, পুঁতি, ঝিলমিলে কাপড়, উজ্জ্বল রং এবং নানা ধরনের অলংকারে তৈরি বিশেষ পোশাক পরে রাস্তায় নেমেছেন। কিছু কস্টিউম এতটাই জটিল ও বিশাল যে সেগুলো তৈরি করতে কয়েক মাস সময় লাগে। অনেক পোশাকের মধ্যে ক্যারিবীয় সংস্কৃতি, আফ্রিকান ঐতিহ্য এবং আধুনিক ফ্যাশনের সমন্বয় দেখা যায়। অ্যাডাল্টস’ ডে-তে পোশাকের ধরনও শিশুদের দিনের তুলনায় অনেক বেশি সাহসী, আকর্ষণীয় এবং শরীরকেন্দ্রিক। তবে এই পোশাক ও সাজসজ্জা মূলত কার্নিভালের ঐতিহ্যবাহী মাস কালচার বা উৎসবের পোশাক-সংস্কৃতির অংশ। এখানে অংশগ্রহণকারীরা নিজেদের শরীর, নাচ এবং পোশাকের মাধ্যমে স্বাধীনভাবে নিজেদের প্রকাশ করেন। কারও পোশাক খুবই ঝলমলে ও আকর্ষণীয়, আবার কেউ বেছে নেন তুলনামূলকভাবে কম পোশাকের সঙ্গে পালক, গহনা ও শরীরের সাজসজ্জা।
অ্যাডাল্টস’ ডে-এর আরেকটি বড় আকর্ষণ হলো সাউন্ড সিস্টেম। দুপুর ১২টা থেকে সন্ধ্যা ৭টা পর্যন্ত বিভিন্ন স্থানে সাউন্ড সিস্টেমের মাধ্যমে উচ্চস্বরে গান বাজানো হয়। এর সঙ্গে হাজারো মানুষ নাচতে থাকেন নটিংহিল কার্নিভালের সঙ্গীত ঐতিহ্যের সঙ্গে রেগে, সোকা, ক্যালিপসো, হাউস, সাম্বা, সোল, ফাঙ্কসহ বিভিন্ন ধারার সঙ্গীত জড়িয়ে আছে। বিশাল স্পিকার, ডিজে, লাইভ পারফরম্যান্স এবং নৃত্যরত মানুষের কারণে রাস্তার প্রতিটি অংশ যেন আলাদা আলাদা ওপেন-এয়ার পার্টিতে পরিণত হয়।
অ্যাডাল্টস’ ডে-এর পরিবেশ শিশুদের দিনের তুলনায় অনেক বেশি স্বাধীন ও উচ্ছ্বসিত। রাস্তার দুই পাশে দর্শকদের ভিড়। মাঝখানে চলছে কার্নিভাল প্যারেড। তার মধ্যে নাচতে নাচতে এগিয়ে যাচ্ছেন মাসকারেডাররা। অনেক প্রাপ্তবয়স্ক বন্ধুদের দল নিয়ে কার্নিভালে আসেন। কেউ বিশেষ কস্টিউম পরে আসেন, কেউ সাধারণ পোশাকে এসে সঙ্গীত ও নাচ উপভোগই করেন। প্রতিবছরই এই কার্নিভালকে ঘিরে নিরাপত্তা বেশ জোরদার করা হয়। হাজার হাজার পুলিশের উপস্থিতিই জানান দেয় ব্রিটিশ সরকার এর নিরাপত্তায় সচেষ্ট।
নটিং হিল কার্নিভালের যে বিষয়টি আমার সবচেয়ে ভালো লাগে তা হলো, এখানে একই জায়গায় ক্যারিবিয়ান অঞ্চলের অবিশ্বাস্য বৈচিত্র্য উপভোগ করা যায়। এক মুহূর্ত আগে আমি ত্রিনিদাদের ঐতিহ্যবাহী খাবার ‘ডাবলস’ (doubles) খাচ্ছিলাম—যার মধ্যে ভারতীয় ধাঁচের সেই সুস্বাদু ও ঝাল স্বাদের ছোঁয়া রয়েছে—আর কিছুক্ষণ পরেই জ্যামাইকান ‘জার্ক চিকেন’-এর স্বাদ নিচ্ছিলাম।
তবে খাবার, সঙ্গীত আর জমকালো পোশাকের বাইরেও দিনটি ছিল মূলত মানুষের পারস্পরিক মেলবন্ধনের। সবাইকে আনন্দ করতে, নাচতে, হাসতে এবং উৎসবের আমেজ উপভোগ করতে দেখা গেছে। নিরাপত্তা ব্যবস্থা ছিল চমৎকার, যার ফলে মানুষ নিশ্চিন্ত মনে উৎসব উপভোগ করতে পেরেছে।
এজরা ডি’ফানমেশিন (Ezra D’Funmachine) এবং হলিউড এইচপি (Hollywood HP) হলেন ক্যারিবিয়ান অঞ্চলের দেশ সেন্ট লুসিয়ার কার্নিভাল প্রতিনিধি; তারা জানান যে নিজেদের দেশের প্রতিনিধিত্ব করতে পেরে তারা আনন্দিত। তিনি বলেন, “বিষয়টা শুধু [শোভাযাত্রার] পথের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; রাস্তার মোড়ে মোড়ে গেলে জ্যামাইকান বা ত্রিনিদাদিয়ানদের দেখা পাওয়া যায়—সেই অভিজ্ঞতাও দারুণ।”তিনি আরও বলেন: “সেই অভিজ্ঞতা সত্যিই চমৎকার, আর অবশ্যই বিশাল এক দেশে থাকার অনুভূতি তো আছেই। আমরা এখন লন্ডনে আছি, যা ছোট্ট সেন্ট লুসিয়া নয়।”
ওয়েস্টবোর্ন গ্রোভ স্টেশনের কাছেই এমন একটি মঞ্চের পাশ দিয়ে এলাম যেখানে একটি পূর্ণাঙ্গ ব্রাস ব্যান্ড বাজছিল। কাছাকাছিই ‘দিসিয়া জেনারেশন’ (Disya Jeneration) সাউন্ড সিস্টেমের সামনে নানা রঙের পতাকা উড়ছে—জ্যামাইকা, বার্বাডোস, সেন্ট লুসিয়া, গ্রেনাডা, ডোমিনিকান রিপাবলিক এবং ত্রিনিদাদ ও টোবাগোর মতো দেশের পতাকা।

































































