অতি সাম্প্রতিক শক্তিশালী ভূমিকম্পে ভেনিজুয়েলা বড় ধরনের মানবিক সংকটে পড়েছে। মুহূর্তের মধ্যে ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে বহু জনপদ, ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে সড়ক, হাসপাতাল, বিদ্যুৎ ও যোগাযোগব্যবস্থা। অসংখ্য মানুষ প্রাণ হারিয়েছেন, হাজারো পরিবার গৃহহীন হয়েছে। প্রতিটি বড় ভূমিকম্পের মতো এই বিপর্যয়ও আমাদের একটি কঠিন সত্যের মুখোমুখি দাঁড় করিয়েছে—প্রকৃতি কখনো আগাম সতর্ক করে না; কিন্তু প্রস্তুতির অভাবের মূল্য দিতে হয় মানুষের জীবন দিয়ে।
সভ্যতার দীর্ঘ ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, কয়েক সেকেন্ডের একটি ভূমিকম্প বহু বছরের উন্নয়ন, পরিশ্রম ও স্বপ্নকে ধুলিসাৎ করে দিতে পারে। বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি অভূতপূর্ব অগ্রগতি অর্জন করলেও ভূমিকম্পের নির্দিষ্ট সময়, স্থান ও তীব্রতা এখনো নির্ভুলভাবে পূর্বাভাস দেওয়া সম্ভব হয়নি। তাই ভূমিকম্প মোকাবিলায় সবচেয়ে কার্যকর কৌশল হলো দুর্যোগ-পরবর্তী তৎপরতার চেয়ে দুর্যোগ-পূর্ব প্রস্তুতিকে অগ্রাধিকার দেওয়া। ভেনিজুয়েলার অভিজ্ঞতা আবারও প্রমাণ করেছে, ভূমিকম্পে প্রাণহানির প্রধান কারণ কেবল ভূকম্পন নয়; বরং দুর্বল অবকাঠামো, অপরিকল্পিত নগরায়ণ, নির্মাণে অনিয়ম এবং দুর্যোগ প্রস্তুতির ঘাটতি। একই মাত্রার ভূমিকম্প দুটি দেশে সম্পূর্ণ ভিন্ন পরিণতি ডেকে আনতে পারে। কোথাও হাজারো মানুষের মৃত্যু ঘটে, আবার কোথাও ক্ষয়ক্ষতি সীমিত থাকে। এই পার্থক্যের নাম—প্রস্তুতি।
দীর্ঘদিনের অর্থনৈতিক সংকট ভেনিজুয়েলার অবকাঠামো উন্নয়ন ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনাকে দুর্বল করেছে। অনেক ভবন আধুনিক ভূমিকম্প-সহনশীল নকশায় নির্মিত নয়। কোথাও উদ্ধার সরঞ্জামের ঘাটতি, কোথাও চিকিৎসাসেবার সীমাবদ্ধতা, আবার কোথাও যোগাযোগব্যবস্থা ভেঙে পড়ায় উদ্ধারকাজ বিলম্বিত হয়েছে। ফলে ভূমিকম্পের প্রাথমিক আঘাতের পাশাপাশি দ্বিতীয় পর্যায়ের মানবিক সংকট আরও গভীর হয়েছে। এই বাস্তবতা আমাদের মনে করিয়ে দেয়, দুর্যোগের পর যত দক্ষ উদ্ধার অভিযানই পরিচালিত হোক না কেন, দুর্যোগের আগে যথাযথ প্রস্তুতির বিকল্প নেই।
বিশ্বের কয়েকটি দেশ এই শিক্ষা অনেক আগেই গ্রহণ করেছে। জাপান তার অন্যতম উদাহরণ। ভূমিকম্প সেখানে নিত্যদিনের বাস্তবতা, তবু তুলনামূলকভাবে প্রাণহানি কম। কারণ দেশটি কঠোর ভবন নির্মাণবিধি, উন্নত প্রকৌশল প্রযুক্তি, দ্রুত সতর্কীকরণ ব্যবস্থা এবং নিয়মিত মহড়ার মাধ্যমে একটি দুর্যোগ-সহনশীল সংস্কৃতি গড়ে তুলেছে। শিশুরা স্কুলজীবন থেকেই ভূমিকম্পের সময় করণীয় শেখে, সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো নিয়মিত মহড়া পরিচালনা করে এবং নাগরিকদের মধ্যে প্রস্তুতির সংস্কৃতি গড়ে উঠেছে। চিলিও কঠোর নির্মাণনীতি ও পরিকল্পিত নগর ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে একই ধরনের সাফল্য অর্জন করেছে। এসব উদাহরণ দেখায়, প্রাকৃতিক দুর্যোগ ঠেকানো না গেলেও পরিকল্পিত প্রস্তুতির মাধ্যমে ক্ষয়ক্ষতি উল্লেখযোগ্যভাবে কমানো সম্ভব।
এই প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের বাস্তবতা বিশেষভাবে উদ্বেগজনক। অনেকের ধারণা, বাংলাদেশ মূলত বন্যা ও ঘূর্ণিঝড়প্রবণ দেশ; তাই ভূমিকম্পের ঝুঁকি তুলনামূলক কম। বাস্তবে এই ধারণা বিভ্রান্তিকর। বাংলাদেশ ভারতীয়, ইউরেশীয় ও বার্মা টেকটোনিক প্লেটের প্রভাবাধীন অঞ্চলে অবস্থিত। দেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চল, পূর্বাঞ্চল এবং মধ্যাঞ্চলের বিস্তীর্ণ এলাকা উল্লেখযোগ্য ভূমিকম্প ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে। অতীতের একাধিক শক্তিশালী ভূমিকম্প সেই বাস্তবতারই সাক্ষ্য বহন করে।ঝুঁকির বিষয়টি জানা থাকলেও আমাদের প্রস্তুতি এখনো কাঙ্ক্ষিত পর্যায়ে পৌঁছায়নি। দ্রুত নগরায়ণ, অপরিকল্পিত ভবন নির্মাণ, ঘনবসতি, দুর্বল তদারকি এবং আইন বাস্তবায়নের সীমাবদ্ধতা সম্ভাব্য একটি ভূমিকম্পকে জাতীয় বিপর্যয়ে রূপ দিতে পারে। রাজধানী ঢাকা এ ক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিপূর্ণ। বিশ্বের অন্যতম ঘনবসতিপূর্ণ এই মহানগরে অনেক এলাকায় ভবনের মধ্যবর্তী দূরত্ব অত্যন্ত কম। একটি ভবন ধসে পড়লে পাশের ভবনও ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা থাকে। সংকীর্ণ সড়ক, তীব্র যানজট, উন্মুক্ত স্থানের অভাব এবং জটিল গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংযোগ উদ্ধারকাজকে আরও কঠিন করে তুলতে পারে। একই চিত্র কমবেশি চট্টগ্রাম, সিলেট, নারায়ণগঞ্জসহ অন্যান্য বড় শহরেও বিদ্যমান।
আরও উদ্বেগের বিষয় হলো, জাতীয় ভবন নির্মাণ বিধিমালা (BNBC) থাকলেও বাস্তবে সব ক্ষেত্রে তা কঠোরভাবে অনুসরণ করা হয় না। কোথাও অনুমোদিত নকশা পরিবর্তন করা হয়, কোথাও নিম্নমানের নির্মাণসামগ্রী ব্যবহার করা হয়, আবার কোথাও অনুমতির বাইরে অতিরিক্ত তলা নির্মাণ করা হয়। এসব অনিয়ম শুধু আইন ভঙ্গের ঘটনা নয়; এটি মানুষের জীবনের নিরাপত্তার সঙ্গে আপস। একটি বড় ভূমিকম্পে এসব ভবনই ব্যাপক প্রাণহানির কারণ হতে পারে। অবকাঠামোর পাশাপাশি জনসচেতনতাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। আমাদের দেশে ঘূর্ণিঝড় ও বন্যা মোকাবিলায় সচেতনতা আগের তুলনায় অনেক বেড়েছে। কিন্তু ভূমিকম্পের ক্ষেত্রে এখনো সেই সংস্কৃতি গড়ে ওঠেনি। অনেকেই আতঙ্কিত হয়ে লিফট ব্যবহার করেন, সিঁড়িতে হুড়োহুড়ি করেন কিংবা গুজবের কারণে ভুল সিদ্ধান্ত নেন। অথচ অল্প সময়ের প্রশিক্ষণ এবং নিয়মিত মহড়া অসংখ্য প্রাণ রক্ষা করতে পারে।
তাই শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে বছরে অন্তত দুবার ভূমিকম্প মহড়া, নিরাপদ নির্গমনপথের অনুশীলন এবং প্রাথমিক চিকিৎসার প্রশিক্ষণ বাধ্যতামূলক করা উচিত। একইভাবে সরকারি ও বেসরকারি অফিস, হাসপাতাল, শিল্পকারখানা এবং বিপণিবিতানেও নিয়মিত দুর্যোগ মহড়ার ব্যবস্থা থাকতে হবে। দুর্যোগ প্রস্তুতি কোনো আনুষ্ঠানিকতা নয়; এটি জীবন রক্ষার একটি কার্যকর উপায়। প্রযুক্তিও এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। মোবাইলভিত্তিক জরুরি সতর্কবার্তা, ডিজিটাল মানচিত্র, ড্রোনের মাধ্যমে ক্ষয়ক্ষতি মূল্যায়ন, সমন্বিত যোগাযোগব্যবস্থা এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে গুজব প্রতিরোধের ব্যবস্থা উদ্ধারকাজকে আরও দ্রুত ও কার্যকর করতে পারে। একই সঙ্গে অনুসন্ধান ও উদ্ধারকারী সংস্থাগুলোর জন্য আধুনিক সরঞ্জাম, পর্যাপ্ত প্রশিক্ষণ এবং নিয়মিত যৌথ মহড়া নিশ্চিত করতে হবে। আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা বলছে, ভূমিকম্পের পর প্রথম ২৪ থেকে ৭২ ঘণ্টা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। এই সময়ের মধ্যে কার্যকর উদ্ধার অভিযান পরিচালনা করা গেলে বহু মানুষের প্রাণ রক্ষা করা সম্ভব।
দুর্যোগ প্রস্তুতিতে নাগরিকদেরও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। প্রতিটি পরিবারের একটি জরুরি পরিকল্পনা থাকা উচিত। একটি জরুরি ব্যাগে প্রাথমিক চিকিৎসাসামগ্রী, টর্চ, অতিরিক্ত ব্যাটারি, বিশুদ্ধ পানি, শুকনো খাবার, প্রয়োজনীয় ওষুধ এবং গুরুত্বপূর্ণ নথির অনুলিপি সংরক্ষণ করা যেতে পারে। পরিবারের সদস্যদের জন্য একটি নির্দিষ্ট মিলনস্থল নির্ধারণ এবং বিকল্প যোগাযোগব্যবস্থা তৈরি করাও জরুরি। এসব প্রস্তুতি ছোট মনে হলেও সংকটের সময় জীবন বাঁচাতে বড় ভূমিকা রাখতে পারে।বাংলাদেশ ইতোমধ্যে ঘূর্ণিঝড় মোকাবিলায় বিশ্বের সামনে একটি সফল উদাহরণ স্থাপন করেছে। আগাম সতর্কবার্তা, আশ্রয়কেন্দ্র, স্বেচ্ছাসেবক নেটওয়ার্ক এবং জনসচেতনতার সমন্বয়ে হাজার হাজার প্রাণ রক্ষা করা সম্ভব হয়েছে। এই অভিজ্ঞতা আমাদের আত্মবিশ্বাস জোগায় যে রাজনৈতিক সদিচ্ছা, দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা এবং কঠোর বাস্তবায়ন থাকলে ভূমিকম্প প্রস্তুতিতেও একই ধরনের সাফল্য অর্জন করা সম্ভব।
তবে একটি বিষয় স্পষ্ট—দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কেবল সরকারের একার দায়িত্ব নয়। প্রকৌশলী যখন নিরাপদ নকশা প্রণয়ন করেন, ঠিকাদার যখন মানসম্পন্ন নির্মাণসামগ্রী ব্যবহার করেন, স্থানীয় প্রশাসন যখন আইন কঠোরভাবে প্রয়োগ করে, শিক্ষক যখন শিক্ষার্থীদের সচেতন করেন, গণমাধ্যম যখন তথ্যভিত্তিক প্রতিবেদন প্রকাশ করে এবং সাধারণ মানুষ যখন নিজ নিজ পরিবারকে প্রস্তুত করেন, তখনই একটি দুর্যোগ-সহনশীল সমাজ গড়ে ওঠে। ভেনিজুয়েলার সাম্প্রতিক ভূমিকম্প আমাদের সামনে একটি নির্মম সত্য তুলে ধরেছে—প্রকৃতিকে থামানো যায় না, কিন্তু প্রস্তুতির মাধ্যমে ক্ষয়ক্ষতি অনেকাংশে কমানো যায়। তাই এটি শুধু দূরদেশের একটি সংবাদ নয়; বাংলাদেশের জন্যও একটি স্পষ্ট সতর্কসংকেত। উন্নয়নের প্রতিটি পরিকল্পনায় নিরাপত্তাকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিতে হবে। ভবন নির্মাণ আইন কঠোরভাবে বাস্তবায়ন, দুর্যোগ প্রস্তুতিকে শিক্ষাব্যবস্থার অংশ করা, উদ্ধার সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং নাগরিক সচেতনতা জোরদার করার এখনই উপযুক্ত সময়।
ভূমিকম্প কোনো পূর্বঘোষণা দিয়ে আসে না। কিন্তু প্রস্তুতি নেওয়ার সুযোগ আমাদের হাতে আজই রয়েছে। আমরা যদি অন্য দেশের বিপর্যয় থেকে শিক্ষা গ্রহণ করি এবং এখনই কার্যকর উদ্যোগ নিই, তাহলে ভবিষ্যতের সম্ভাব্য দুর্যোগে অসংখ্য প্রাণ ও বিপুল সম্পদ রক্ষা করা সম্ভব হবে। ভেনিজুয়েলার ধ্বংসস্তূপ তাই কেবল একটি দেশের ট্র্যাজেডি নয়; এটি বাংলাদেশের জন্যও একটি জাগরণের আহ্বান। আজকের দূরদর্শী সিদ্ধান্তই আগামী দিনের নিরাপদ বাংলাদেশ গড়ার ভিত্তি হতে পারে।
সুধীর বরণ মাঝি, শিক্ষক, হাইমচর সরকারি মহাবিদ্যালয়, হাইমচর, চাঁদপুর।





















































