গত কয়েকদিন আগে বিকেলে শেষ আলোটা জানালার কাঁচে নিভু নিভু করছিল। ঠিক তখনই ফোনটা বেজে উঠল। ওপাশে আমার এক শুভাকাঙ্ক্ষী। কণ্ঠে এমন এক ক্লান্তি ছিল, যেন দীর্ঘদিন ধরে বুকের ভেতর জমে থাকা কোনো ভার হঠাৎ ভাষা খুঁজে পেয়েছে।”
জিজ্ঞাসা করলেন কেমন আছেন?
ভালো আছি ।
আমিও তাকে জিজ্ঞাসা করলাম কেমন আছেন?
তিনি দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন, “ভালো নেই।“
আমি উদ্বিগ্ন হয়ে জানতে চাইলাম, “কেন? শরীর খারাপ নাকি?”
“না, শরীর ঠিক আছে।“
“তাহলে? বাসায় কোনো সমস্যা ?”
তিনি বললেন,
“না, বাসায় নয়। আর নিতে পারছি না। চারপাশে যা ঘটছে, যা দেখছি, যা শুনছি—সেগুলোই আমাকে ভেতর থেকে ভেঙে দিচ্ছে।“
আমি কিছুক্ষণ নীরব থেকে বললাম “কিন্তু এসব তো এখন প্রায় প্রতিদিনের ঘটনা হয়ে গেছে!” তিনি যেন আরও বেদনাহত কণ্ঠে বললেন, “না রে ভাই, কোনো অন্যায় কখনো স্বাভাবিক হতে পারে না। আমরা হয়তো অন্যায়ের সঙ্গে বসবাস করতে করতে সেটাকে স্বাভাবিক বলে মেনে নিতে শিখে গেছি। কিন্তু তাই বলে অন্যায় স্বাভাবিক হয়ে যায় না।“
তিনি বলতে থাকলেন, “প্রতিদিন ঘুম থেকে উঠেই কান পাতলে যা শুনি, চোখ মেলে যা দেখি—তা যেন এক বিভীষিকাময় বাস্তবতা। কোথাও ধর্ষণ, কোথাও গণধর্ষণ, কোথাও মব সন্ত্রাস, কোথাও খুন–হত্যা, অভাবের তাড়নায় আত্মহত্যা। কোথাও সন্তানের হাতে পিতা–মাতা নিহত, কোথাও ধর্ষণের পর খণ্ড–বিখণ্ড লাশ উদ্ধার। ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাতের অভিযোগ তুলে ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের ওপর হামলা, নির্যাতন, অগ্নিসংযোগ, লুটপাট; কিশোর গ্যাংয়ের দৌরাত্ম্য; মামলা বাণিজ্য; চাঁদাবাজি; মাদক; দুর্নীতি—সব মিলিয়ে সমাজ যেন এক অদৃশ্য আতঙ্কে বন্দি। আজ একজন শিক্ষার্থী নিরাপদে বিদ্যালয়ে যাবে কি না, একজন নারী কর্মস্থল থেকে নিরাপদে ফিরবে কি না, একজন ব্যবসায়ী চাঁদাবাজির শিকার হবেন কি না, একজন বৃদ্ধ চিকিৎসার জন্য বের হয়ে প্রতারণার কবলে পড়বেন কি না—এসব প্রশ্নই মানুষের নিত্যদিনের উদ্বেগে পরিণত হয়েছে।“ এখানেই কি শেষ ? কাজের নিশ্চয়তা নেই। তারওপরে আছে দ্রব্যমূল্যের উর্ধ্বগতি,বাড়িভাড়া বৃদ্ধির দৌরাত্ম্য, খাদ্যে ভেজাল, জীবন রক্ষাকারী ওষুধে ভেজাল, চিকিৎসা ব্যবস্থায় অনিয়ম ও ভেজাল, দেশীয় ও সাম্রাজ্যবাদী মোড়লদের শকুনি দৃষ্টি, সবমিলিয়ে ভেজালের সমারোহে একটু স্বস্তির নিঃশ্বাসের আশায় বেঁচে থাকার আপ্রাণ চেষ্টা। আজ গ্রামের কৃষক যেমন বাজারদরের অনিশ্চয়তায় ভীত, তেমনি শহরের মধ্যবিত্ত মানুষ ভীত বাড়িভাড়া, চিকিৎসা খরচ আর ভবিষ্যতের অনিশ্চয়তায়। ভয় যেন শ্রেণি, পেশা, ধর্ম—সব সীমা অতিক্রম করে আমাদের সবার জীবনে প্রবেশ করেছে। অমানুষ হওয়ার প্রতিযোগিতায় নেমেছে ওরা। মনে হচ্ছে অমানুষ হওয়ার মধ্যেই জীবনের সকল সুখ-সমৃদ্ধি – বীরত্ব নিহিত আছে।
“আমরা এমন এক সময়ে দাঁড়িয়ে আছি, যখন প্রযুক্তি আমাদের হাতের মুঠোয়, কিন্তু মানুষের হৃদয়ের দূরত্ব যেন ক্রমেই বেড়ে যাচ্ছে।” “বলুন তো, চারপাশ যদি নিরাপদ না থাকে, সমাজ যদি অস্থির থাকে, রাষ্ট্র যদি মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে না পারে, তাহলে আমি বা আমার পরিবার কীভাবে সত্যিকার অর্থে ভালো থাকব? নিজের ঘরে নিরাপদ থাকলেও কি সমাজের অনিরাপত্তা থেকে মুক্ত থাকা যায়?” “নিরাপত্তা মানে শুধু তালাবদ্ধ ঘর নয়; নিরাপত্তা মানে নিশ্চিন্তে সন্তানকে স্কুলে পাঠানো, রাতে প্রিয়জনের ফেরার অপেক্ষায় আতঙ্কে না থাকা, মত প্রকাশের কারণে নিপীড়নের ভয় না পাওয়া।”
আমি তাঁর কথাগুলো মনোযোগ দিয়ে শুনছিলাম। সত্যিই তো, মানুষের সবচেয়ে বড় প্রয়োজন খাদ্য, বস্ত্র কিংবা বাসস্থান নয়—সবকিছুর আগে প্রয়োজন নিরাপত্তা। নিরাপত্তাহীন মানুষ কখনো শান্তিতে বাঁচতে পারে না। যে সমাজে মানুষ প্রতিনিয়ত ভয় নিয়ে বেঁচে থাকে, সেখানে উন্নয়নের সব অর্জনই অনেকাংশে অর্থহীন হয়ে পড়ে। অপরাধের দ্রুত ও নিরপেক্ষ বিচার না হলে অপরাধীর মনে ভয় জন্মায় না, আর সাধারণ মানুষের মনে জন্ম নেয় অনিরাপত্তা। আইন থাকলেও তার প্রয়োগের নিশ্চয়তা নেই। থাকলে হয়তো এমনটা হতো না। ২৬জুন ২০২৬খ্রি.তারিখের কোন এক জাতীয় দৈনিকে দেখলাম অন্তর্বর্তী সরকারের এক বছরে ঘুষের লেনদেন১২হাজার৬৩৩কোটি টাকা।
আজ আমাদের সবচেয়ে বড় সংকট শুধু অর্থনৈতিক নয়, শুধু রাজনৈতিকও নয়; বরং মানুষের প্রতি মানুষের বিশ্বাসের সংকট, আইনের শাসনের সংকট এবং নিরাপত্তার সংকট। সমাজকে নিরাপদ করার দায় শুধু সরকারের নয়; নাগরিক হিসেবেও আমাদের দায়িত্ব রয়েছে। পরিবারে নৈতিক শিক্ষা, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে মানবিক মূল্যবোধের চর্চা, আইনের নিরপেক্ষ প্রয়োগ, সামাজিক সম্প্রীতি এবং পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ—এসবই একটি নিরাপদ সমাজ গঠনের ভিত্তি হতে পারে। ফোন কেটে যাওয়ার পর অনেকক্ষণ আমি নীরবে বসে ছিলাম। মনে হচ্ছিল, তিনি শুধু নিজের কষ্টের কথা বলেননি; তিনি যেন আমাদের সময়েরই একটি দীর্ঘশ্বাস শুনিয়ে গেলেন।
আমার মনে হলো, আমরা ধীরে ধীরে এমন এক সমাজে অভ্যস্ত হয়ে উঠছি, যেখানে অন্যায়ের খবর আর আমাদের চমকে দেয় না; বরং অবাক করে সেই দিনগুলো, যেদিন কোনো বড় অপরাধের খবর থাকে না। এই অভ্যস্ততাই সবচেয়ে ভয়ংকর। কারণ, অন্যায়ের বিরুদ্ধে মানুষের প্রতিবাদ যখন নিস্তেজ হয়ে যায়, তখন অন্যায় আরও সাহসী হয়ে ওঠে। একটি সমাজের নৈতিক অবক্ষয়ের শুরু হয় তখনই, যখন মানুষ অন্যায়ের সঙ্গে আপস করতে শেখে।
রাষ্ট্রের প্রকৃত শক্তি তার অস্ত্রভাণ্ডারে নয়, বরং নাগরিকের নিরাপত্তা ও আস্থার ভিতের ওপর দাঁড়িয়ে থাকে। যে সমাজে মানুষ ভয়ের চেয়ে আশাকে বড় করে দেখতে পারে, সেই সমাজই প্রকৃত অর্থে সভ্য ও উন্নত সমাজ। একটি রাষ্ট্র তখনই সত্যিকার অর্থে উন্নত হয়, যখন তার মানুষ ভয়ে নয়, বিশ্বাসে বাঁচে। আসুন, আমরা এমন একটি বাংলাদেশ গড়ি, যেখানে শিশুর হাসি আতঙ্কে থেমে যাবে না, বৃদ্ধের দীর্ঘশ্বাস অসহায়ত্বে হারিয়ে যাবে না, আর মানুষ মানুষের কাছেই নিরাপত্তা খুঁজে পাবে। আসুন, আমরা এমন একটি বাংলাদেশ গড়ার প্রত্যয়ে এগিয়ে যাই, যেখানে মানুষ ভয় নয়, আশা নিয়ে ঘুম থেকে উঠবে; যেখানে কোনো মা সন্তানের নিরাপত্তা নিয়ে আতঙ্কিত হবেন না; যেখানে ধর্ম, বর্ণ বা মতের ভিন্নতার কারণে কেউ নির্যাতনের শিকার হবে না; এবং যেখানে “নিরাপদ থাকা“ কোনো চ্যালেঞ্জ নয়, বরং প্রতিটি নাগরিকের নিশ্চিত অধিকার হবে। আমরা এমন একটি সমাজ চাই, যেখানে শিশুর হাসি হবে নির্ভয়ের, তরুণের স্বপ্ন হবে বাধাহীন, নারীর পথচলা হবে সম্মানজনক, প্রবীণের জীবন হবে নিরাপদ। যে বাংলাদেশ মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় মানবিকতা, ন্যায়বিচার ও সম্প্রীতির স্বপ্ন দেখেছিল, সেই বাংলাদেশ গড়ার দায়িত্ব আমাদের সবার।”





















































