লন্ডনে ব্রিটিশ বাঙ্গালীদের প্রতিষ্ঠিত ব্রিকলেন জামে মসজিদের পঞ্চাশ বছর পূর্তি উপলক্ষে আগামী ৫/৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬ দু‘দিন ব্যাপী সুবর্ণজয়ন্তী উদযাপন করবে। ৩১ জুলাই শুক্রবার লন্ডন সময় বিকেল তিন ঘটিকায় মসজিদের আতাউর রহমান চৌধুরী মিলনায়তনে এক সাংবাদিক সম্মেলনে মসজিদ পরিচালনা কমিটি বিষয়টি নিশ্চিত করেছে। সাংবাদিক সম্মেলনে মসজিদ পরিচালনা কমিটি পক্ষ থেকে জানানো হয় বাংলাদেশ মধ্যপ্রাচ্য সহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে অতিথিরা অংশ নেবেন। সংবাদ সম্মেলনে দি-ব্রিকলেন জামে মসজিদ ট্রাষ্ট লন্ডন লিমিটেড ও সুবর্ণজয়ন্তী উদযাপন পরিষদের পক্ষে মসজিদ প্রতিষ্টার সংক্ষিপ্ত ইতিহাস, বর্তমান কার্জক্রম, ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা তুলে ধরে লিখিত বক্তব্যে জনাব মোহাম্মদ হরমুজ আলী বলেনঃ
দু‘শতাব্দীর অধিককাল থেকে ব্রিক লেইন জামে মসজিদের ভবনটি বিভিন্ন সম্প্রদায়ের ধর্মীয় উপাসনালয় হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে আসছে। ১৭৪৩ সালে এটি একটি ফরাসী প্রোটেষ্টট্যান্ট গীর্জা হিসেবে তৈরি করা হয়েছিলো, এরপর এটি ম্যাথডিস্ট চ্যাপেল হিসেবে ব্যবহৃত হয়। ১৮৯৮ সালে ইহুদি অধ্যুষিত এলাকা হিসেবে বিখ্যাত সিনেগগে রূপান্তরিত হয় এ ভবনটি। বর্তমান জামে মসজিদটি প্রতিষ্ঠিত হয় ১৯৭৬ সালে। ১৭৪৩ সালে তৈরী ঐতিহাসিক এই ভবনটির বেইসমেন্টটি একসময় বাণিজ্যিক গোদাম ঘর হিসেবে ব্যবহার করা হতো, বর্তমানে সেখানে মহিলাদের নামাজ আদায়ের জায়গা করা হয়েছে।
লন্ডনে ব্রিক লেইন জামে মসজিদ একটি ঐতিহাসিক মসজিদ, ইউরোপসহ যুক্তরাজ্যের অনেক বই- পুস্তক এবং জার্নালে ঐতিহাবাহী এ মসজিদের উল্লেখ রয়েছে। দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর গত ৩০ জানুয়ারী ২০০৬ সাল থেকে বহুল প্রত্যাশিত এ মসজিদের মিনার নির্মাণের কাজ হাতে নেয়া হয়েছে। ইংলিশ হেরিটেজের মতামতের ভিত্তিতে টাওয়ার হ্যামলেটস কাউন্সিল গত ৩০ জানুয়ারী ২০০৬ সালে প্রত্যাশিত এই মিনার নির্মাণের পরিকল্পনাটি অনুমোদন করে এবং এতে অর্থায়ন করেন টাওয়ারহ্যামলেটস কাউন্সিল ও বিশপ গেট রিজেনারেশন। অবশেষে ২০১০ সালের জানুয়ারিতে প্রতিষ্ঠা পায় দৃষ্টিনন্দন এই মিনার – যা আজ পূর্ব লন্ডনের এক আইকন বা প্রতীক হয়ে উঠেছে।
কনজারভেশন এলাকা হিসেবে মসজিদের দক্ষিণের ভবনটি যেখানে বর্তমানে নামাজ পড়ানো হয়, সেখানেই গীর্জা ছিলো। এবং পরবর্তীতে বিখ্যাত সিনেগগ। ১৯৫০ সালে ভবনটি গ্রেট লিষ্টেট বিল্ডিং-টু হিসেবে তালিকাভুক্ত করা হয়। যার ফলে ভবনটির মেরামত, পরিবর্তন কিংবা পরিবর্ধনের ক্ষেত্রে কঠোর শর্তারোপ করা হয়েছে। ১৯৭৬ সালে মসজিদ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর ভবনটির কাঠামোগত পরিবর্তন ব্যাতিরেকে ভিতরের কক্ষগুলির ব্যাপক সংস্কার করা হয়েছে। আর এ জন্য মসজিদের বিগত পরিচালনা পরিষদ থেকে শুরু করে বর্তমান পরিচালনা পরিষদ তাঁদের প্রচেষ্টা নিরলসভাবে চালিয়ে যাচ্ছে। আমাদের যে সমস্ত মুরুব্বী ও মুসল্লীদের অক্লান্ত পরিশ্রম ও আন্তরিক সহযোগিতায় ঐতিহাসিক এ মসজিদটি প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব হয়েছিলো তাঁদের অনেকেই আজ দুনিয়া ছেড়ে বিদায় নিয়েছেন। তবে তাঁদের মধ্যে আলহাজ্ব জহুরুল ইসলাম, আলহাজ্ব মতলিব চৌধুরী, আলহাজ্ব তৈয়বুর রহমান, আলহাজ্ব মোবশ্বির আলী, আলহাজ্ব কারী এ. গনি, আলহাজ্ব এ. মতিন, আলহাজ্ব এ. মান্নান, আলহাজ্ব শামসুর রহমান, আলহাজ্ব মাসুদ আলী, আলহাজ্ব উস্তার আলী, মোহাম্মদ আব্দুল গফুর বি.এ.বি.টি, আলহাজ্ব শামসুল হক, আলহাজ্ব আব্দুর রকিব, আলহাজ্ব মতিউর রহমান চৌধুরী, মোহাম্মদ আব্দুল আহাদ, আলহাজ্ব আব্দুল মুকিত, আলহাজ্ব গোলাম মোস্তফা, আলহাজ্ব জিল্লুল হক, আলহাজ্ব আতাউর রহমান চৌধুরী, আলহাজ্ব আব্দুল মুকিত, আলহাজ্ব সাজ্জাদ মিয়া এমবিই, মোহাম্মদ আব্দুল কাদির, মোহাম্মদ আরমান আলী, হাজী মোস্তরী মিয়া এবং মৌলভী আরশাদ আলীর অবদান অনস্বীকার্য।
ঐতিহাসিক এ মসজিদটির প্রতিষ্ঠার পর থেকে এদের অনেকেই পরিচালনা পরিষদের দায়িত্ব পালন করেছেন। প্রতি দুবছর পর পর মসজিদ কমিটির নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। তিন থেকে চার হাজার মুসল্লী প্রতিদিন এখানে নামাজ আদায় করেন। শিশু-কিশোরদের জন্য হাফিজি এবং ধর্মীয় শিক্ষার ব্যবস্থা রয়েছে। বাংলা শিক্ষার জন্যও ক্লাস চালু আছে। প্রায় ১৫০ জন ছাত্রছাত্রী বিভিন্ন বিভাগে পড়াশোনা করে। মসজিদের জন্য কোন সরকারী অনুদান পাওয়া যায় না, মুসল্লীদের দানেই মসজিদের ব্যায়ভার চলে। মসজিদের ৩টি ফ্লোরে ২০টিরও বেশী কক্ষ আছে। বর্তমানে এ ভবনটির মূল্য হবে প্রায় ২০ লক্ষ পাউন্ড।
সুন্নী আকিদা মতে সম্পূর্ণ বাঙালী ব্যবস্থাপনায় ঐতিহ্যবাহী এ মসজিদটি পরিচালিত হয়ে থাকে। কার পাকিংয়ের অসুবিধা থাকলেও বর্তমান মসজিদ কমিটির প্রচেষ্টায় পবিত্র ঈদ এবং শুক্রবার জুম্মার নামাজের সময় মসজিদের আশপাশের এলাকায় পাকিং ফ্রী করে দেয়া হয়েছে। দেশীয় এবং আন্তর্জাতিক উচ্চ পর্যায়ের প্রতিনিধিগন প্রায়ই মসজিদ পরিদর্শনে আসেন। গীর্জার পাদ্রী, প্রশাসনের প্রতিনিধি, ইউরোপ ও আমেরিকার স্কুল, কলেজ এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রছাত্রীও মসজিদ পরিদর্শনে আসেন। বিভিন্ন দেশের বিশিষ্ট ব্যাক্তিবর্গ এ মসজিদটি পরিদর্শন করেছেন। তাঁদের মধ্যে রয়েছেন রাজা তৃতীয় চার্লস, কুইন কনসর্ট ক্যামিলা, আর্চ বিশপ অব কক্যান্টারবারী, জর্জ কেরী, প্রাইম মিনিস্টার বরিস জনসন, ডেপুটি প্রাইম মিনিস্টার মাইকেল হেজেলটাইন, লর্ড এভরী, লন্ডন মেয়র কেন লিভিংষ্টন ও মেয়র সাদিক খান, ডেপুটি মেয়র রিচার্ড বার্নস, পুলিশের ভারপ্রাপ্ত সুপারিনটেনডেন্ট রবার্ট রেভিল, পুলিশের বারা কমান্ডার ষ্টিভ পেন্ডিং, ব্রিটিশ হাই কমিশনার ষ্টিফেন ইভান্স প্রমূখ। বাংলাদেশের জেনারেল এম.এ.জি ওসমানী, সাবেক প্রেসিডেন্ট হোসেইন মোহাম্মদ এরশাদ, সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্দুস সামাদ আজাদ, সাবেক স্পীকার হুমায়ুন রশীদ চৌধুরী, সিলেটের তৎকালীন মেয়র আরিফুল হক চৌধুরী, সৌদি আরবের শেখ আলফাসী ও শেখ আব্বাস আলভী, কুয়েতের শেখ ইউসুফ রেফায়ী, মিশরের আল-আজহার বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. শেখ আবু লায়লা সহ আরো অনেকে।
ব্রিক লেইন জামে মসজিদের পরিচালনা পরিষদ এলাকার মুসল্লীদের দীর্ঘদিনের প্রত্যাশিত মিনার নির্মাণ করা সহ মসজিদ ও ইভিনিং মাদ্রাসার ব্যাপক উন্নয়ন ও মেরামতের কাজ শেষ করেছে এবং মসজিদের ফিউনারেল সার্ভিস চালু করেছে। সর্বোপরি সকলের সহযোগিতায় যথারীতি আল্লাহর ঘর মসজিদের খেদমত করে যাচ্ছে। ব্রিকলেন জামে মসজিদের পরিচালনা পরিষদ আপনাদের সকলের কাছে আন্তরিকভাবে কৃতজ্ঞ। আপনারা ইতোমধ্যেই জানতে পেরেছেন যে, ১৯৭৬ সালে প্রতিষ্ঠিত ব্রিকলেন জামে মসজিদ ট্রাস্ট এ বছর ৫০ বছরে পদার্পণ করেছে। আমাদের মুরুব্বিদের প্রতিষ্ঠিত ঐতিহাসিক এ ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানটির সুদীর্ঘ এই পথচলা এবং অগ্রযাত্রাকে আমরা আপনাদের সকলকে নিয়ে উদযাপন করতে চাই। আগামী ৫ সেপ্টেম্বর শনিবার ও ৬ সেপ্টেম্বর রবিবার ২০২৬ আমাদের মসজিদেই দুদিনব্যাপী এই সুবর্ণজয়ন্তীর অনুষ্ঠান উদযাপন করা হবে। এই উদযাপনে আমরা আপনাদের সকলের আন্তরিক সাহায্য ও সহযোগিতা কামনা করছি।





























































