ভীষণ মন খারাপ নিয়ে লিখতে বসলাম, দেশজুড়ে হামের প্রাদুর্ভাব গত কয়েক দিনে হামে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুর সংখ্যা ২১ ছাড়িয়েছে। আমরা জানি মানুষের জীবনে স্বাস্থ্যই সর্বশ্রেষ্ঠ সম্পদ। অথচ আমাদের অসচেতনতা, অবহেলা এবং ব্যবস্থাগত দুর্বলতার কারণে অনেক প্রতিরোধযোগ্য রোগ আজও জনস্বাস্থ্যের জন্য বড় হুমকি হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। তেমনই একটি রোগ হলো হাম (Measles)—একটি অত্যন্ত সংক্রামক ভাইরাসজনিত রোগ, যা বিশেষ করে শিশুদের জন্য মারাত্মক ঝুঁকি সৃষ্টি করে। বাংলাদেশে হামের প্রাদুর্ভাব ভয়াবহ রূপ নিয়েছে। এ বছর অন্তত ৩৮ জন শিশু হাম ও এর জটিলতায় মারা গেছে। রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন জেলায় এই সংক্রামক ব্যাধি দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে। দেশে ২০২৫সালে হামের টিকাদানে বড় ধরনের ব্যত্যয় ঘটেছে। ২০২৫ সালে মাত্র ৫৬ দশমিক ২ শতাংশ শিশু হামের টিকা পেয়েছে। অর্থাৎ, ৪৩ দশমিক ৮ শতাংশ শিশু টিকার বাইরে রয়ে গেছে, যা গত ৯ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন হার
হাম মূলত শ্বাসতন্ত্রের মাধ্যমে ছড়ায়। আক্রান্ত ব্যক্তি কাশি বা হাঁচি দিলে বাতাসে ছড়িয়ে পড়া ক্ষুদ্র কণার মাধ্যমে এই ভাইরাস অন্যের শরীরে প্রবেশ করে। এমনকি ভাইরাসটি বাতাসে বা বিভিন্ন পৃষ্ঠে কয়েক ঘণ্টা পর্যন্ত সক্রিয় থাকতে পারে, যা এর সংক্রমণ ক্ষমতাকে আরও বাড়িয়ে দেয়। গবেষণায় দেখা গেছে, টিকা না নেওয়া ব্যক্তিদের মধ্যে আক্রান্ত ব্যক্তির সংস্পর্শে এলে প্রায় ৯০ শতাংশ ক্ষেত্রেই সংক্রমণ ঘটে। গত দুই বছরে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO) ও ইউনিসেফসহ আন্তর্জাতিক স্বাস্থ্য সংস্থাগুলো হাম রোগের বৈশ্বিক পুনরুত্থান সম্পর্কে সতর্ক করে আসছে। বিশ্বব্যাপী হাম সংক্রমণ দ্রুত বৃদ্ধি পাচ্ছে, কারণ টিকাদানের হার ৯৫%–এর নিচে নেমে গেছে — যা হার্ড ইমিউনিটি বজায় রাখার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
হামের লক্ষণ শুরুতে সাধারণ সর্দি-কাশির মতো মনে হলেও দ্রুত তা গুরুতর আকার ধারণ করে। উচ্চ জ্বর, তীব্র কাশি, নাক দিয়ে পানি পড়া, চোখ লাল হয়ে যাওয়া এবং পরে সারা শরীরে লালচে ফুসকুড়ি—এসবই হামের প্রধান লক্ষণ। মুখের ভেতরে ছোট সাদা দাগ, যাকে কোপলিক স্পট বলা হয়, হামের একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রাথমিক চিহ্ন। অনেক ক্ষেত্রে রোগটি নিউমোনিয়া, কানের সংক্রমণ, এমনকি মস্তিষ্কের প্রদাহ (এনসেফালাইটিস) সৃষ্টি করতে পারে, যা মৃত্যুঝুঁকিও বাড়িয়ে দেয়। তবে আশার কথা হলো—হাম সম্পূর্ণভাবে প্রতিরোধযোগ্য। সময়মতো টিকাদানই এর বিরুদ্ধে সবচেয়ে কার্যকর অস্ত্র। বাংলাদেশে জাতীয় টিকাদান কর্মসূচির আওতায় শিশুদের ৯ মাস ও ১৫ মাস বয়সে দুই ডোজ এমআর (MR) বা এমএমআর (MMR) টিকা প্রদান করা হয়। এই টিকার দুই ডোজ প্রায় ৯৭ শতাংশ পর্যন্ত সুরক্ষা দেয়, যা একটি শিশুকে দীর্ঘমেয়াদে হামের ভয়াবহতা থেকে রক্ষা করে। বর্তমানে দেশজুড়ে হামের সংক্রমণ উদ্বেগজনক হারে বৃদ্ধি পাওয়ায় শিশুদের সুরক্ষায় বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) নিয়মিত সুপারিশ অনুযায়ী শিশুদের ৯ মাস বয়সে হামের প্রথম ডোজ দেওয়ার নিয়ম থাকলেও, বর্তমান বিশেষ পরিস্থিতি বিবেচনায় তা কমিয়ে ৬ মাস করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হচ্ছে।
কিন্তু দুঃখজনক বাস্তবতা হলো—এত কার্যকর প্রতিরোধব্যবস্থা থাকা সত্ত্বেও দেশে হামে আক্রান্ত হয়ে শিশুদের মৃত্যু এখনও ঘটছে। এটি কোনো বিচ্ছিন্ন স্বাস্থ্যগত দুর্ঘটনা নয়; বরং আমাদের রাষ্ট্রীয় কাঠামো, জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনা এবং নীতিনির্ধারণের গভীর দুর্বলতার নির্মম প্রতিফলন। একটি প্রতিরোধযোগ্য রোগে একটি শিশুর মৃত্যু মানে শুধুই একটি প্রাণহানি নয়—এটি রাষ্ট্রের দায়িত্ব পালনে ব্যর্থতার স্পষ্ট চিত্র। বিভিন্ন গণমাধ্যমে চিকিৎসক ও স্বাস্থ্য কর্মকর্তাদের দেওয়া বক্তব্য থেকে জানা যাচ্ছে, গত বছরের ডিসেম্বর থেকে হামের রোগীর সংখ্যা বাড়তে শুরু করে। এ বছর তা আশঙ্কাজনক হারে বেড়েছে। যাদের অবহেলা এবং অসচেতনার কারণে আমাদের ভবিষ্যৎ সম্ভবনার মৃত্যু ঘটে তাদেরকে গণহত্যাকারী হিসেবে চিহ্নিত করে আইনের আওতায় নিয়ে এসে শাস্তি নিশ্চিত করা প্রয়োজন বলে মেন করেন দেশের সচেতন সাধারণ নাগরিক। শুধু তাই নয় যারা খাদ্যে ভেজালের মাধ্যমে মানুষকে অসুস্থ বানিয়ে মৃত্যুর দিকে ধাবিত করছে তাদেরকেও দ্রুত চিহ্নিত করে শাস্তি নিশ্চিত করা অতীব জরুরী এবং সময়ের চাহিদা বলে মনে করেন।
একটি রাষ্ট্রের অন্যতম মৌলিক দায়িত্ব হলো তার নাগরিকদের মৌলিক স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করা। শিশুদের টিকাদান কর্মসূচি শুধু একটি স্বাস্থ্য উদ্যোগ নয়; এটি একটি জাতীয় অগ্রাধিকার হওয়া উচিত। অথচ বাস্তবতা বলছে—গ্রাম থেকে শহরের বস্তি পর্যন্ত এখনও অনেক শিশু নিয়মিত টিকার আওতার বাইরে রয়ে যাচ্ছে। কোথাও সরবরাহ ব্যবস্থার ঘাটতি, কোথাও প্রশিক্ষিত স্বাস্থ্যকর্মীর অভাব, আবার কোথাও জনসচেতনতার সংকট—সব মিলিয়ে একটি দুর্বল ও ভঙ্গুর ব্যবস্থার চিত্র স্পষ্ট হয়ে ওঠে। বাংলাদেশের জন্যও এটি একটি বড় শিক্ষণীয় বিষয়। জনস্বাস্থ্যের মতো অতি গুরুত্বপূর্ণ খাতের জন্য বিদেশি সহায়তার ওপর নির্ভরশীল থাকা কতটা বিপজ্জনক হতে পারে, তা এই হামের প্রাদুর্ভাব চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিচ্ছে। বাংলাদেশের জনস্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষ ইতোমধ্যে নজরদারি জোরদার, সংক্রমণ ক্লাস্টার তদন্ত এবং পুনরায় টিকাদান কার্যক্রম শক্তিশালী করার উদ্যোগ নিয়েছে। তবে হাম নিয়ন্ত্রণে দ্রুত ও সমন্বিত পদক্ষেপ অপরিহার্য।
অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের কাছ থেকে প্রত্যাশা ছিল—এ ধরনের জনস্বাস্থ্য ঝুঁকি মোকাবিলায় দ্রুত, সমন্বিত ও কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ। কিন্তু হামের প্রাদুর্ভাব এবং শিশু মৃত্যুর ঘটনাগুলো ইঙ্গিত দেয়, সেই প্রত্যাশা পুরোপুরি পূরণ হয়নি। সংকটকালীন দ্রুত প্রতিক্রিয়া, টিকাদান কার্যক্রম জোরদার, ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় বিশেষ নজরদারি এবং গণসচেতনতা বৃদ্ধির ক্ষেত্রে দৃশ্যমান ঘাটতি রয়ে গেছে। অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময়ে স্বাস্থ্যখাতে যে বিশৃঙ্খলা দৃশ্যমান হয়েছে তা এক ধরনের বেহায়াপনা ছাড়া আর কিছুই না।
একটি শিশুর মৃত্যু কখনোই শুধুমাত্র পরিসংখ্যান হতে পারে না। এটি একটি পরিবারে শোকের ছায়া, একটি ভবিষ্যতের অবসান, একটি জাতির সম্ভাবনার ক্ষতি। অথচ আমরা অনেক সময় এই ঘটনাগুলোকে সংখ্যা দিয়ে মাপার চেষ্টা করি—এটাই আমাদের সবচেয়ে বড় মানসিক ব্যর্থতা। এই দৃষ্টিভঙ্গি বদলানো জরুরি। এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের জন্য প্রয়োজন সুসংহত পরিকল্পনা, কার্যকর বাস্তবায়ন এবং কঠোর জবাবদিহিতা। টিকাদান কর্মসূচির শতভাগ বাস্তবায়ন, স্বাস্থ্যখাতে পর্যাপ্ত বাজেট বরাদ্দ, স্থানীয় পর্যায়ে নজরদারি জোরদার এবং ব্যাপক গণসচেতনতা—এসব পদক্ষেপ এখন সময়ের দাবি। পাশাপাশি, যেসব ক্ষেত্রে ব্যর্থতা ঘটেছে, সেগুলোর নিরপেক্ষ তদন্ত এবং দায় নির্ধারণ নিশ্চিত করতে হবে। বাংলাদেশ অতীতে টিকাদান কর্মসূচিতে উল্লেখযোগ্য সাফল্য দেখিয়েছে। সময়োপযোগী পদক্ষেপ এবং সম্মিলিত সচেতনতার মাধ্যমে দেশ আবারও হাম রোগ নিয়ন্ত্রণে আনতে পারে এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে একটি প্রতিরোধযোগ্য রোগের ঝুঁকি থেকে সুরক্ষিত রাখতে সক্ষম হবে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের রোগ নিয়ন্ত্রণ শাখার পরিচালক হালিমুর রশীদ জানিয়েছেন, এই পরিবর্তনটি শুধুমাত্র বিশেষ কর্মসূচির জন্যই প্রযোজ্য হবে।
শেষ পর্যন্ত, একটি সভ্য ও মানবিক রাষ্ট্রের পরিচয় নির্ভর করে সে তার সবচেয়ে দুর্বল নাগরিকদের—অর্থাৎ শিশুদের—কতটা সুরক্ষা দিতে পারে তার উপর। হামে একটি শিশুর মৃত্যুও যেন আমাদের বিবেককে নাড়া দেয়, আমাদের নীতিনির্ধারকদের জাগিয়ে তোলে এবং আমাদের সবাইকে আরও দায়িত্বশীল করে তোলে—এই প্রত্যাশাই আজ সময়ের দাবি।
সুধীর বরণ মাঝি,
শিক্ষক, হাইমচর সরকারি মহাবিদ্যালয়, হাইমচর, চাঁদপুর।
shudir_chandpur@yahoo.com









































