সেই ফ্ল্যাটটির দরজা টানা সাত দিন ধরে বন্ধ ছিল। পাশের বাসার মানুষজন ভেবেছিলেন, হয়তো বৃদ্ধা কোথাও গেছেন। কেউ খোঁজ নেননি, কেউ দরজায় কড়া নাড়েননি। ব্যস্ত শহরের ব্যস্ত মানুষদের কাছে এটি ছিল আরেকটি সাধারণ ঘটনা। কিন্তু সপ্তম দিনের শেষে করিডোরজুড়ে ছড়িয়ে পড়ল এক অসহনীয় দুর্গন্ধ।
প্রতিবেশীরা প্রথমে ভেবেছিলেন, হয়তো কোনো পশু মারা গেছে। কিন্তু গন্ধ যখন ক্রমেই তীব্র হতে লাগল, তখন সন্দেহের অবকাশ রইল না। খবর দেওয়া হলো পুলিশকে। পুলিশ আসলো, দরজা ভাঙা হলো। আর তারপর…
ঘরের ভেতরের দৃশ্য দেখে উপস্থিত সবাই স্তব্ধ হয়ে গেল। বিছানার ওপর নিথর হয়ে পড়ে আছে একজন বৃদ্ধা মায়ের মৃত দেহ। মৃত্যুর পর কয়েক দিন পেরিয়ে গেছে। নিঃসঙ্গতার নির্মম সাক্ষী হয়ে আছে চারপাশের অগোছালো ঘর, নীরব দেয়াল আর বন্ধ জানালা। মনে হচ্ছিল, মৃত্যুর পরও তিনি যেন কারও অপেক্ষায় ছিলেন। অথচ এই মা একা ছিলেন না। তার তিন ছেলে এবং এক মেয়ে রয়েছে। একজন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা, একজন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, একজন বিদেশে প্রতিষ্ঠিত। সমাজের চোখে তাঁরা সফল, শিক্ষিত, সম্মানিত মানুষ। কিন্তু সেই মুহূর্তে বৃদ্ধা মায়ের নিথর দেহ যেন একটাই প্রশ্ন ছুড়ে দিচ্ছিল- আমার সাফল্য কোথায়?
কোন একদিন এই সন্তানদের জ্বর হলে মা রাত জেগে মাথায় পানি দিতেন। নিজের নতুন শাড়ির টাকা বাঁচিয়ে বই কিনে দিতেন। নিজের ক্ষুধা চেপে রেখে সন্তানের পেট ভরাতেন। জীবনের প্রতিটি স্বপ্ন, প্রতিটি ত্যাগ, প্রতিটি প্রার্থনা ছিল সন্তানদের ঘিরে। তিনি বিশ্বাস করতেন, একদিন সন্তানরা প্রতিষ্ঠিত হবে। তাঁর কষ্টের দিন শেষ হবে। সন্তানরা সত্যিই প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। বড় চাকরি পেয়েছে। সমাজে সম্মান পেয়েছে। কিন্তু মা?
মায়ের পৃথিবী ধীরে ধীরে ছোট হতে হতে একসময় একটি ঘরের চার দেয়ালের মধ্যে বন্দি হয়ে গেল। মৃত্যুর আগের রাতে হয়তো তিনি অসুস্থ শরীরে এক গ্লাস পানির জন্য তাকিয়েছিলেন। হয়তো দরজার দিকে চেয়ে ভেবেছিলেন—আজ কেউ আসবে। হয়তো অপেক্ষা করেছিলেন একটি ফোনকলের, একটু খোঁজ নেওয়ার কিংবা একটি স্নেহভরা কণ্ঠের। হয়তো ভেবেছিলেন, ঈদের দিনে সন্তানরা আসবে। বলবে— মা, ঈদ মোবারক। হয়তো তাঁর জন্য এক বাটি সেমাই, এক প্লেট পোলাও কিংবা এক মুঠো ভালোবাসা নিয়ে কেউ দরজায় কড়া নাড়বে। কিন্তু কেউ আসেনি।
অপেক্ষা শেষ হয়েছে। জীবনও শেষ হয়েছে। পুলিশ যখন মরদেহটি বের করে আনছিল, তখন এক বৃদ্ধ প্রতিবেশী চোখ মুছতে মুছতে বললেন- মা মানুষটার সবচেয়ে বড় কষ্ট মৃত্যু না, একাকীত্ব। চারপাশ নিরব এবং নিস্তব্ধ হয়ে গেল। সত্যিই, মৃত্যু মানুষকে কাঁদায়। কিন্তু কিছু কিছু মৃত্যু বিবেককে নাড়িয়ে দেয়। এই মৃত্যু শুধু একজন মায়ের মৃত্যু নয়; এটি আমাদের সময়ের, আমাদের সমাজের, আমাদের মানবিকতার এক নীরব পরাজয়।
আজ প্রশ্ন জাগে—
শিক্ষা কি শুধুই একটি ডিগ্রির নাম নাকি বড় চাকরি কি মানুষ হওয়ার প্রমাণ? সফলতা কি শুধু পদ-পদবি আর অর্থের হিসাব? যে মা সন্তানের জন্য নিজের পুরো জীবন উৎসর্গ করেন, তাঁর খোঁজ নেওয়ার সময়টুকুও যদি সন্তানের না থাকে, তবে সেই সাফল্যের মূল্য কত?
মায়ের সবচেয়ে বড় চাওয়া কখনো দামি বাড়ি নয়, ব্যাংক ব্যালেন্স নয়, বিদেশি উপহারও নয়। একজন মায়ের সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি হলো—সন্তানের একটি ফোনকল, একটি খোঁজ নেওয়া, একটি স্পর্শ কিংবা একটি ভালোবাসার বাক্য। কারণ পৃথিবীর সব দরজা বন্ধ হয়ে গেলেও একজন মা শেষ পর্যন্ত সন্তানের জন্যই অপেক্ষা করেন। আর সেই অপেক্ষা যদি অপূর্ণ থেকে যায়, তাহলে শুধু একজন মা নন, হারিয়ে যায় মানবতারও একটি অংশ।
সেদিন সেই ফ্ল্যাটে শুধু একটি মরদেহ পাওয়া যায়নি। সেখানে মৃত অবস্থায় পড়ে ছিল আমাদের বিবেক, আমাদের দায়িত্ববোধ, আমাদের মানবিকতার একটি অংশও। আর বৃদ্ধা মায়ের নীরব ঘরটি যেন আজও সমাজকে একটি কথাই বলে চলেছে-সন্তানকে শুধু শিক্ষিত নয়, মানুষও বানাও। কারণ ডিগ্রি মানুষকে প্রতিষ্ঠিত করে, আর মানবতা মানুষকে মানুষ বানায়।
(শাহ লাভলী রহমান যুক্তরাজ্য প্রবাসী একজন কবি ও প্রাবন্ধিক)


























































