হাইতির প্রেসিডেন্ট জোভেনেল মোইসকে হত্যার ষড়যন্ত্রে সহায়তা ও পরিকল্পনায় জড়িত থাকার অভিযোগে অভিযুক্ত হাইতিয়ান-আমেরিকান এক যাজকের বিচার সোমবার মায়ামিতে শুরু হতে যাচ্ছে; অভিযোগ রয়েছে যে, ক্যারিবিয়ান দেশটির নেতৃত্বের দায়িত্ব নিজের হাতে তুলে নেওয়ার লক্ষ্যেই তিনি এই ষড়যন্ত্রে জড়িয়েছিলেন।
৬৭ বছর বয়সী ক্রিশ্চিয়ান ইমানুয়েল স্যানন মোইসকে হত্যা বা অপহরণের ষড়যন্ত্রসহ বিভিন্ন অভিযোগ অস্বীকার করেছেন; দোষী সাব্যস্ত হলে তাঁর যাবজ্জীবন কারাদণ্ড হতে পারে।
হত্যার কয়েক দিন পরই হাইতির কর্তৃপক্ষ স্যাননকে গ্রেপ্তার করে এবং তখন থেকেই তিনি আটক রয়েছেন। পুলিশ তাঁর বাড়িতে তল্লাশি চালিয়ে প্রচুর গোলাবারুদ, ১৯টি পাসপোর্ট এবং অন্যান্য সামগ্রী উদ্ধার করেছিল। ২০২৩ সালের শুরুর দিকে তাঁকে যুক্তরাষ্ট্রে স্থানান্তর করা হয়।
মায়ামির ইউএস ডিস্ট্রিক্ট কোর্টে হতে যাওয়া এই বিচার প্রক্রিয়াটি ২০২১ সালের ৭ জুলাই মোইস হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় পরিচালিত বিশাল আন্তর্জাতিক তদন্তের সর্বশেষ অধ্যায়। পোর্ট-অ-প্রিন্সের কাছে অবস্থিত নিজ বাড়িতে সশস্ত্র ব্যক্তিদের হামলায় শোবার ঘরেই গুলিবিদ্ধ হয়ে নিহত হয়েছিলেন মোইস।
সাক্ষ্য দেওয়ার জন্য সম্ভাব্য সাক্ষীদের তালিকায় রয়েছেন মোইসের স্ত্রী মার্টিন মোইস, যিনি ওই হামলায় প্রাণে বেঁচে গিয়েছিলেন।
স্যানন সেই কয়েক ডজন ব্যক্তির মধ্যে একজন—যাদের মধ্যে কলম্বিয়ার সাবেক সেনাসদস্যরাও রয়েছেন—যারা এই হত্যাকাণ্ড বাস্তবায়ন ও পরিকল্পনার দায়ে অভিযুক্ত; এদের মধ্যে পাঁচজনের ইতিমধ্যে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড হয়েছে। সরকারি কৌঁসুলিদের মতে, এই ষড়যন্ত্রের পরিকল্পনা ও অর্থায়নের বড় অংশটি হয়েছিল দক্ষিণ ফ্লোরিডায়, যেখানে স্যানন ২০০০-এর দশক থেকে মাঝে-মধ্যে বসবাস করতেন।
স্থানীয় গণমাধ্যমের তথ্যমতে, হাইতির দক্ষিণাঞ্চলে জন্মগ্রহণকারী স্যানন ফ্লোরিডায় আসার আগে ডোমিনিকান রিপাবলিকে চিকিৎসাশাস্ত্রে পড়াশোনা করেছিলেন। পরবর্তীতে তিনি অনলাইনে বিভিন্ন ভিডিওর মাধ্যমে নিজেকে এমন একজন সম্ভাব্য নেতা হিসেবে তুলে ধরেন, যিনি হাইতিতে পরিবর্তন আনতে সক্ষম।
কৌঁসুলিদের অভিযোগ, স্যানন এই ষড়যন্ত্রে অংশগ্রহণকারীদের নিয়োগে সহায়তা করেছিলেন এবং মোইসকে ক্ষমতা থেকে সরানোর পর নিজে হাইতির প্রেসিডেন্ট হওয়ার আশা করেছিলেন। তাঁর আইনজীবীরা স্বীকার করেছেন যে তাঁর প্রেসিডেন্ট হওয়ার উচ্চাকাঙ্ক্ষা ছিল, তবে মোইসকে হত্যার পরিকল্পনার বিষয়ে তিনি অবগত ছিলেন—এই অভিযোগ তাঁরা অস্বীকার করেছেন।
দণ্ডপ্রাপ্ত কয়েকজন অভিযুক্ত ব্যক্তি স্যাননকে ষড়যন্ত্রের অন্যতম মূল হোতা হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। তাঁর আইনজীবীরা সম্ভবত এই যুক্তি তুলে ধরবেন যে, মোইসের উত্তরসূরি হিসেবে অন্য প্রার্থীদের দিকে মনোযোগ দেওয়ার সময় ষড়যন্ত্রের অন্য সহযোগীরা স্যাননকে ধীরে ধীরে কোণঠাসা বা দূরে সরিয়ে দিয়েছিল। কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে যে, এই ষড়যন্ত্রের পেছনে একাধিক রাজনৈতিক ও আর্থিক উদ্দেশ্য কাজ করেছে; এর মধ্যে রয়েছে নতুন সরকার গঠনের প্রচেষ্টা এবং লাভজনক সরকারি ঠিকাদারি কাজ বাগিয়ে নেওয়ার অভিপ্রায়। তদন্তকারী ও গণমাধ্যমের প্রতিবেদনে এই হত্যাকাণ্ডের সাথে মোইসের এবং মাদক ও অস্ত্র চোরাচালানের সাথে জড়িত বলে কথিত প্রভাবশালী ব্যক্তিদের মধ্যকার বিরোধের যোগসূত্রও উঠে এসেছে।
মোইসের পর থেকে হাইতিতে আর কোনো নির্বাচিত প্রেসিডেন্ট আসেননি। এই হত্যাকাণ্ড দেশটিকে গভীর রাজনৈতিক অস্থিরতার দিকে ঠেলে দিয়েছে এবং নিরাপত্তা সংকটকে আরও তীব্র করেছে, যার ফলে সশস্ত্র গ্যাংগুলো দেশের বিশাল অংশে তাদের নিয়ন্ত্রণ বিস্তার করতে সক্ষম হয়েছে।
মার্কিন কৌঁসুলিরা শুরুতে স্যাননের বিরুদ্ধে হাইতিতে বুলেটপ্রুফ ভেস্ট চোরাচালান-সংশ্লিষ্ট অভিযোগ এনেছিলেন এবং পরবর্তীতে অভিযোগের পরিধি আরও বাড়ান।
প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হয়েছিল যে, মায়ামির এই মামলায় স্যাননই হবেন সর্বশেষ অভিযুক্ত ব্যক্তি। কিন্তু আগস্ট মাসে মার্কিন কর্তৃপক্ষ আরও ৩০ জন সন্দেহভাজনের বিরুদ্ধে অভিযোগ দায়ের করে এবং হাইতির হেফাজত থেকে ১৮ জন অভিযুক্তকে যুক্তরাষ্ট্রে নিয়ে আসে।
হাইতি আগামী ডিসেম্বরে এক দশকের মধ্যে প্রথমবারের মতো প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের প্রস্তুতি নিচ্ছে; তবে মোইসের হত্যাকাণ্ডের পাঁচ বছরেরও বেশি সময় পার হওয়ার পরও লাগামহীন গ্যাং সহিংসতা ও দীর্ঘস্থায়ী দুর্নীতির কারণে একটি সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন অনুষ্ঠানের সম্ভাবনা নিয়ে সংশয় দেখা দিয়েছে।


































































