ঘরপোড়া গরু সিঁদুরে মেঘ দেখলেই ভয় পায়। মেঘনাপাড়ের মানুষের অবস্থাও অনেকটা তেমন। প্রতিবছর মা ইলিশ রক্ষার অভিযান আসে, নদীতে নিষেধাজ্ঞা জারি হয়, প্রশাসনের তৎপরতা বাড়ে, নৌযানে টহল চলে, জাল জব্দ হয়, মামলা-জরিমানা হয়। তারপরও অভিযানের পর যখন নদীতে ইলিশের দেখা কমে যায়, তখন স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন জাগে—এত আয়োজনের পরও আমরা কি সত্যিই ইলিশ রক্ষা করতে পারছি? যে সময়টাকে মা ইলিশ রক্ষার সময় বলা হচ্ছে, সেই সময়টিই যেন কোথাও কোথাও মা ইলিশ ধরার উৎসবে পরিণত হয়।
মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের ২৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬-এর প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী, ২৩ আশ্বিন থেকে ১৩ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ, অর্থাৎ ৮ অক্টোবর থেকে ২৯ অক্টোবর ২০২৬ পর্যন্ত মোট ২২ দিনকে ইলিশের প্রধান প্রজনন মৌসুম হিসেবে নির্ধারণ করা হয়েছে। এ সময়ে ইলিশ আহরণের পাশাপাশি পরিবহন, মজুত, বাজারজাতকরণ, ক্রয়-বিক্রয় ও বিনিময়ের ওপর নিষেধাজ্ঞা থাকবে। নিষেধাজ্ঞা জারি করা নিঃসন্দেহে প্রয়োজনীয়। কিন্তু শুধু নিষেধাজ্ঞা জারি করাই যথেষ্ট নয়; আসল পরীক্ষা হলো এর কার্যকর বাস্তবায়ন। কারণ, মা ইলিশ রক্ষার যে সময়টিকে প্রজননের নিরাপদ সময় হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে, সেই সময়েই যদি নদীতে অবৈধভাবে মাছ ধরা চলে, বাজারে নিষিদ্ধ মাছ ওঠে এবং নিষেধাজ্ঞা ভঙ্গকারীরা কোনো না কোনোভাবে পার পেয়ে যায়, তাহলে পুরো ব্যবস্থাটিই প্রশ্নের মুখে পড়ে।
কিন্তু প্রশ্ন হলো—এবারের অভিযান কি সত্যিই সফল হবে? নাকি প্রতি বছরের মতো এবারও অভিযান কাগজ-কলম, সভা-সমাবেশ, মাইকিং, কয়েকটি নৌ-অভিযান, জাল জব্দ এবং কিছু লোক দেখানো তৎপরতার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে? ইলিশের প্রজননের গুরুত্বপূর্ণ সময়ে মা ইলিশকে নিরাপদে ডিম ছাড়ার সুযোগ দিতে না পারলে ভবিষ্যৎ ইলিশসম্পদ ঝুঁকিতে পড়বে। অতীতের অভিজ্ঞতা আমাদের আশ্বস্ত করতে পারে না। অনেক সময় দেখা যায়, মা ইলিশ রক্ষার অভিযান চলাকালেই নদীতে অবৈধভাবে ইলিশ ধরার তৎপরতা থেমে থাকে না। একইভাবে জাটকা রক্ষার সময়ও নানা ফাঁকফোকর দিয়ে ছোট ইলিশ ধরার ঘটনা ঘটে।
চাঁদপুরের মেঘনা শুধু একটি নদী নয়; এটি হাজার হাজার মানুষের জীবন-জীবিকার অবলম্বন। হাইমচর, মতলব, চাঁদপুর সদরসহ মেঘনাপাড়ের মানুষের সঙ্গে ইলিশের সম্পর্ক বহু পুরোনো। জেলে মাছ ধরেন, আড়তদার মাছ কেনেন, শ্রমিক মাছ পরিবহন করেন, ব্যবসায়ী বাজারজাত করেন—ইলিশকে ঘিরে একটি বড় অর্থনৈতিক চক্র গড়ে উঠেছে। সরকারি তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩–২৪ অর্থবছরে বাংলাদেশে মোট মাছ উৎপাদন ছিল ৫০.১৮ লাখ মেট্রিক টন। এর মধ্যে ইলিশ উৎপাদন ছিল ৫.২৯ লাখ মেট্রিক টন। মৎস্য অধিদপ্তরের হিসাবে, দেশের মোট মাছ উৎপাদনের প্রায় ১২ শতাংশের সঙ্গে ইলিশ যুক্ত। একই তথ্য অনুযায়ী, ওই অর্থবছরে ইলিশের উৎপাদন আগের বছরের তুলনায় কমেছিল। তাই ইলিশ রক্ষা শুধু একটি মাছ রক্ষার কর্মসূচি নয়। এর সঙ্গে খাদ্য, কর্মসংস্থান, অর্থনীতি, নদীনির্ভর জনগোষ্ঠীর জীবন ও দেশের ঐতিহ্য জড়িয়ে আছে। নদীতে নিষেধাজ্ঞা থাকল, কিন্তু যদি অসাধু জেলেরা নির্বিঘ্নে মাছ ধরতে পারে; যদি অবৈধ জাল নদীতে নামতেই থাকে; যদি ধরা মাছ বাজারে পৌঁছে যায়; যদি মাছের ক্রেতা-বিক্রেতারা সক্রিয় থাকে—তাহলে শুধু নদীতে অভিযান চালিয়ে কাঙ্ক্ষিত ফল পাওয়া কঠিন। অভিযানের নিরপেক্ষতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করতে পারলে মা ইলিশ রক্ষা করা সম্ভব হবে।
সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো, ইলিশের ভরা মৌসুমেও ২০২৬ সালে চাঁদপুরের পদ্মা-মেঘনা মোহনায় কাঙ্ক্ষিত ইলিশ না পাওয়ার খবর এসেছে। জুলাই মাসে বিভিন্ন জাতীয় দৈনিক ও বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোরের প্রতিবেদনে জেলে ও ব্যবসায়ীরা নদীতে ইলিশ কম পাওয়ার কথা জানান। ইলিশ কমে যাওয়ার কারণ অনুসন্ধানে বিশেষজ্ঞ দলও মাঠে কাজ শুরু করে। এ অবস্থায় আমাদের শুধু ‘কতজন জেলে আটক হলো’—এই হিসাব করলেই হবে না। কেন ইলিশের বিচরণ কমছে, নদীর পরিবেশে কী পরিবর্তন হচ্ছে, প্রজননক্ষেত্র কতটা নিরাপদ, ইলিশের চলাচলের পথে কী ধরনের পরিবর্তন এসেছে—এসব প্রশ্নের উত্তরও খুঁজতে হবে। আরেকটি সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে চাঁদপুরের মেঘনায় ইলিশের বিচরণে ডুবোচর, নদীর নাব্যতা কমে যাওয়া এবং ইলিশের চলাচলের পথে পরিবর্তনের মতো বিষয় নিয়ে গবেষকদের উদ্বেগের কথা উঠে এসেছে।নদীর পরিবেশ, নাব্যতা, প্রজননক্ষেত্র, অভয়াশ্রম এবং ইলিশের চলাচলের পথ—সবকিছুকেই একসঙ্গে দেখতে হবে।
মেঘনায় ডুবোচর, নদীর নাব্যতা পরিবর্তন এবং অপরিকল্পিত বালু উত্তোলন নিয়েও উদ্বেগ রয়েছে। বাংলাদেশ মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউটের চাঁদপুর নদীকেন্দ্র থেকে মেঘনায় অপরিকল্পিতভাবে বালু উত্তোলন বন্ধে জেলা প্রশাসনকে চিঠি দেওয়ার খবর প্রকাশিত হয়েছে। গবেষকদের আশঙ্কা ছিল, এ ধরনের কর্মকাণ্ড ইলিশের বিচরণ ও অভয়াশ্রমের ওপর বিরূপ প্রভাব ফেলতে পারে।হাইমচরেও ২০২৬ সালে মেঘনা থেকে অবৈধ বালু উত্তোলনের ঘটনায় ড্রেজার জব্দ এবং কয়েকজনকে কারাদণ্ড দেওয়ার ঘটনা ঘটেছে। অর্থাৎ ইলিশ রক্ষা করতে হলে শুধু জালের দিকে তাকালে চলবে না; নদীর দিকেও তাকাতে হবে।
মা ইলিশ রক্ষায় প্রতিবছর অভিযান পরিচালিত হয়। জাটকা রক্ষার জন্যও আলাদা নিষেধাজ্ঞা থাকে। চাঁদপুরের মেঘনার মতলব উত্তর থেকে হাইমচরের চরভৈরবী পর্যন্ত ৭০ কিলোমিটার এলাকাকে জাটকা সংরক্ষণের গুরুত্বপূর্ণ এলাকা হিসেবে দীর্ঘদিন ধরে নজরদারির আওতায় রাখা হয়েছে। অভিযান চলার পরও যদি জাটকা নদী থেকে উঠে আসে বাজারে, তাহলে বুঝতে হবে কোথাও না কোথাও ব্যবস্থাপনায় দুর্বলতা রয়েছে। ২০২৬ সালে জাতীয় দৈনিকে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে চাঁদপুরের মেঘনায় অভিযান চলার পরও জাটকা নিধন অব্যাহত থাকার কথা উঠে এসেছে। স্থানীয়দের অভিযোগ ছিল, কখনো কখনো অভিযানের খবর আগেভাগে জেনে জেলেরা এড়িয়ে যান। একই প্রতিবেদনে মৎস্য কর্মকর্তাদের নিয়মিত অভিযানের তথ্যও দেওয়া হয়েছে। আরেক প্রতিবেদনে জাটকা নিধনের পেছনে মহাজন ও আড়তদারদের দাদন ব্যবসার ভূমিকার অভিযোগ উঠে এসেছে। সেখানে স্থানীয়দের পাশাপাশি একজন উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তাও বলেছেন, মহাজনের চাপে পড়ে জেলেরা মাছ ধরতে বাধ্য হন।
স্থানীয় পর্যায়ে বিভিন্ন সময়ে প্রভাবশালী ব্যক্তি, ব্যবসায়ী কিংবা রাজনৈতিকভাবে প্রভাবশালী মহলের ছত্রচ্ছায়ায় অবৈধ মাছ ধরার অভিযোগ ওঠে। অভিযোগ থাকলে তা তদন্ত করা এবং প্রমাণ পাওয়া গেলে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি। একজন দরিদ্র জেলে যদি নিষেধাজ্ঞা ভঙ্গ করে শাস্তি পান, অথচ একই অপরাধে প্রভাবশালী কেউ পার পেয়ে যান—তাহলে মানুষের মধ্যে আইন সম্পর্কে আস্থার সংকট তৈরি হবে। মা ইলিশ রক্ষার অভিযানকে সফল করতে হলে আইন প্রয়োগে কোনো পক্ষপাত চলবে না। জেলে হোক কিংবা ব্যবসায়ী, নৌকার মালিক হোক কিংবা আড়তদার—নিষেধাজ্ঞা ভাঙলে একই আইনি কাঠামোর মধ্যে আনতে হবে।
একজন প্রকৃত জেলে জানেন নদী কখন মাছ দেয়, কোথায় মাছ থাকে, কোন সময়ে ইলিশের বিচরণ বেশি। তাঁকে যদি ইলিশ রক্ষার অংশীদার করা যায়, তাহলে তিনি প্রশাসনের জন্য গুরুত্বপূর্ণ সহযোগী হতে পারেন। মেঘনায় নাব্যতা কমে যাওয়া, ডুবোচর তৈরি, নদীর স্বাভাবিক গতিপথে পরিবর্তন এবং অপরিকল্পিত বালু উত্তোলন—এসব বিষয় নিয়েও উদ্বেগ রয়েছে। বাংলাদেশ মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউটের পক্ষ থেকে মেঘনায় বালু উত্তোলন বন্ধে চিঠি দেওয়ার খবরও প্রকাশিত হয়েছে; সেখানে ইলিশের বিচরণ ও অভয়াশ্রম ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কার কথা বলা হয়। ইলিশ রক্ষার কর্মসূচিকে শুধু ‘অভিযান’ হিসেবে দেখলে চলবে না। প্রয়োজন সমন্বিত ইলিশ ব্যবস্থাপনা। নদী বাঁচাতে হবে। প্রজননক্ষেত্র রক্ষা করতে হবে। জাটকা রক্ষা করতে হবে। ক্ষতিকর জাল বন্ধ করতে হবে। অবৈধ বালু উত্তোলন বন্ধ করতে হবে। একই সঙ্গে জেলেদের বিকল্প জীবিকার সুযোগ বাড়াতে হবে।
৮ অক্টোবর থেকে শুরু হতে যাওয়া ২২ দিনের নিষেধাজ্ঞা তাই শুধু আরেকটি সরকারি অভিযান নয়; এটি একটি বাস্তব পরীক্ষা।প্রশ্ন হচ্ছে—এবার কি নদীতে নিয়মিত ও কার্যকর টহল থাকবে? অভিযান শুরুর আগে তথ্য ফাঁস ঠেকানো যাবে কি? নদীর পাশাপাশি আড়ত ও বাজারে নজরদারি থাকবে কি? অবৈধ জাল সরবরাহ ও ব্যবহার বন্ধ করা যাবে কি? নিষেধাজ্ঞা ভাঙার সঙ্গে কোনো প্রভাবশালী ব্যক্তি বা ব্যবসায়ী যুক্ত থাকলে তাঁর বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেওয়া হবে কি? মেঘনা আমাদের জীবন, আমাদের জীবিকা এবং আমাদের ঐতিহ্য। ইলিশ শুধু একটি মাছ নয়—এটি নদী, অর্থনীতি, সংস্কৃতি ও মানুষের জীবনযাত্রার সঙ্গে গভীরভাবে জড়িয়ে থাকা একটি সম্পদ। এবার প্রয়োজন শুধু অভিযান নয়—কার্যকর, স্বচ্ছ, নিরপেক্ষ ও জবাবদিহিমূলক ইলিশ ব্যবস্থাপনা।মা ইলিশ রক্ষার অভিযান শেষ হওয়ার পর নদীতে ইলিশের উপস্থিতিই হবে সবচেয়ে বড় মূল্যায়ন। এবার প্রশ্নের উত্তর কাগজে-কলমে নয়, দিতে হবে মেঘনার জলে।
সুধীর বরণ মাঝি, শিক্ষক, হাইমচর সরকারি মহাবিদ্যালয়, হাইমচর, চাঁদপুর।

































































