মঙ্গলবার ফ্রান্সে ব্যাপক বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে; শিক্ষক ও অভিভাবকরা হাই স্কুলের শিক্ষার্থীদের সাথে নিয়ে রাস্তায় নেমে আসেন। প্রধানমন্ত্রী সেবাস্তিয়ান লেকর্নুর মতে, গত কয়েক দশকের মধ্যে এটি ছিল শিক্ষার্থীদের সবচেয়ে সহিংস বিক্ষোভের দিন।
প্যারিস, স্ট্রাসবার্গ, রেন ও টুলুসসহ বিভিন্ন শহরে মিছিলের সময় সহিংস জনতাকে ছত্রভঙ্গ করতে পুলিশ কাঁদানে গ্যাস ও জলকামান ব্যবহার করে। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তথ্যমতে, ডজনখানেক শহরে আড়াই লাখেরও বেশি মানুষ মিছিলে অংশ নেয়, যদিও আয়োজকদের দাবি এই সংখ্যা ছিল ৪ লাখ ৫০ হাজার।
সোমবারের বিক্ষোভে এক কিশোর তার হাত হারায়। এই বিক্ষোভগুলো জনরোষের সর্বশেষ বহিঃপ্রকাশ; বসন্তকালীন প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের আগে দেশটিতে উগ্র ডান ও উগ্র বামপন্থী পপুলিস্ট দলগুলোর প্রতি সমর্থন উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে।
দুর্বল অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির মধ্যে সরকারি ঋণের বোঝা সামলানোর চাপে রয়েছে সরকার। এছাড়া, ২০২৪ সালের সংসদীয় নির্বাচনে প্রেসিডেন্ট এমানুয়েল ম্যাক্রোঁর মিত্ররা সংখ্যাগরিষ্ঠতা হারানোর পর থেকে বাজেট পাসের মতো মৌলিক কাজগুলো সম্পন্ন করতেও সরকারকে হিমশিম খেতে হচ্ছে।
লেকর্নু আইনপ্রণেতাদের জানান, সংঘর্ষে এ পর্যন্ত অন্তত ২১৫ জন কিশোর ও ৮৫ জন স্কুলকর্মী আহত হয়েছেন—যা “শিক্ষা ব্যবস্থার ওপর গত কয়েক দশকের মধ্যে সবচেয়ে বড় আঘাত”। তাঁর কার্যালয় জানায়, ৭০০-এর বেশি পুলিশ সদস্যও আহত হয়েছেন।
সম্প্রচারমাধ্যম বিএফএম (BFM)-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, মঙ্গলবার ম্যাক্রোঁ লেকর্নু ও অন্যান্য জ্যেষ্ঠ মন্ত্রীদের নিয়ে একটি জরুরি বৈঠক ডেকেছেন।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প মন্তব্য করেছেন যে, এই বিক্ষোভ ফ্রান্সে “নিয়ন্ত্রণহীন” অভিবাসনের প্রমাণ। তিনি ‘ট্রুথ সোশ্যাল’-এ লিখেছেন, “বিষয়টি স্কুল নিয়ে নয়, বরং ইসলাম একটি একসময়ের মহান দেশকে দখল করতে চাইছে—তা নিয়েই এই পরিস্থিতি।”
শিক্ষার্থীদের দাবির সাথে ধর্ম বা অভিবাসনের কোনো সম্পর্ক নেই; বরং তারা কর্মী ও তহবিলের ঘাটতির বিষয়টিতেই গুরুত্ব দিচ্ছে। মেরিন ল্য পেনের উগ্র ডানপন্থী দল ‘ন্যাশনাল র্যালি’ এই বিক্ষোভকে ফ্রান্সের অভিবাসন নীতির সাথে যুক্ত করেনি। মন্তব্যের অনুরোধে লেকর্নুর কার্যালয় কোনো সাড়া দেয়নি।
মার্সেই ও নঁত শহরে বিক্ষোভকারীরা হাতে তৈরি প্ল্যাকার্ড বহন করেন, যাতে লেখা ছিল—”রাষ্ট্র জাতীয় শিক্ষাব্যবস্থাকে হত্যা করেছে”। তুলুজে, শহরের মধ্য দিয়ে আয়োজিত এক পদযাত্রার সামনের সারিতে অভিভাবকরা একে অপরের হাত ধরে এগিয়ে চলেন।
প্যারিসের পুলিশ জানিয়েছে, রাজধানীতে নিরাপত্তা বাহিনীর সাথে প্রায় ৩০০ জনের—যাদের অধিকাংশই হুড বা মুখোশ পরা ছিল—সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে; তবে শহরের অন্যান্য এলাকায় বিক্ষোভটি মূলত বড় কোনো অপ্রীতিকর ঘটনা ছাড়াই সম্পন্ন হয়েছে। এ সময় বেশ কয়েকটি দোকানের সম্মুখভাগ ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, মঙ্গলবার ৪৮৮ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে এবং ৪৮ জন নিরাপত্তা কর্মী আহত হয়েছেন।
রক্ষণাবেক্ষণ সংক্রান্ত অভিযোগ
প্যারিসের সুবিধাবঞ্চিত শহরতলিগুলোতে সেপ্টেম্বর মাসে শিক্ষার্থীদের এই বিক্ষোভ শুরু হয় এবং পরবর্তীতে তা সারা দেশে ছড়িয়ে পড়ে।
শিক্ষার্থীরা স্কুলগুলোর মৌলিক রক্ষণাবেক্ষণ সমস্যা—যেমন পানির পাইপ চুঁইয়ে পড়া থেকে শুরু করে ইঁদুরের উপদ্রব—নিয়ে অভিযোগ জানিয়ে আসছে।
স্ট্রাসবার্গের এক শিক্ষার্থী, যিনি সম্প্রতি হাই স্কুল পাস করেছেন, সেই হুগো ভেটজেল বলেন, “ফ্রান্সে অভিজাত শ্রেণি এবং আমাদের মধ্যে বিশাল এক ব্যবধান রয়েছে।”
হাই স্কুল শিক্ষার্থীদের ইউনিয়ন জানিয়েছে, ফ্রান্সের অর্ধেকেরও বেশি হাই স্কুল অবরোধ করা হয়েছিল অথবা দিনের জন্য বন্ধ রাখা হয়েছিল। স্থানীয় কিছু শিক্ষা কর্তৃপক্ষ ক্লাস অনলাইনে নেওয়ার চেষ্টা করেছে।
মানবাধিকার গোষ্ঠী, শিক্ষার্থী এবং অভিভাবকদের সংগঠনগুলো কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে অপ্রাপ্তবয়স্কদের ওপর অতিরিক্ত বলপ্রয়োগের অভিযোগ তুলেছে। সরকারের দাবি, এই বিক্ষোভ আন্দোলনটি বহিরাগতদের দ্বারা প্রভাবিত বা ‘হাই-জ্যাক’ হয়েছে এবং কিছু জায়গায় তা সহিংসতায় রূপ নিয়েছে।
বিচার মন্ত্রণালয় সোমবার জানিয়েছে, সুনির্দিষ্ট কোনো অপরাধের অভিযোগে ১,৮০০-এরও বেশি মানুষের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে; এদের মধ্যে ১,৪৮৩ জনই অপ্রাপ্তবয়স্ক।
প্যারিসের উত্তর-পশ্চিম শহরতলি আরজঁতুইয়ের এক হাই স্কুল শিক্ষক ওমর স্লাউটি বলেন, “তারা তরুণদের ‘ভালো’ ও ‘খারাপ’ বিক্ষোভকারী হিসেবে ভাগ করতে চায়। যদি আবর্জনার পাত্রে আগুন না দেওয়া হতো, তবে সরকার হয়তো পিছু হটত না এবং বিদ্যমান সমস্যাগুলোর বিষয়ে সচেতন হতো না।”
প্রধানমন্ত্রী কর্তৃক সমাধানের প্রতিশ্রুতি
লেকরনু তাঁর মন্ত্রীদের শিক্ষার্থীদের প্রধান দাবিগুলো নিয়ে কাজ করার নির্দেশ দিয়েছেন। এসব দাবির মধ্যে রয়েছে—অনুপস্থিত শিক্ষকদের বদলি বা বিকল্পের ব্যবস্থা করা, সকাল ৮টা থেকে সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত দীর্ঘ স্কুল সময়ের বিষয়টি পর্যালোচনা করা এবং দুপুরের খাবারের বিরতি দীর্ঘ করার প্রয়োজনীয়তা খতিয়ে দেখা।
লেকরনু আরও জানান, সরকার স্কুলগুলোর পুরনো ভবন মেরামতের বিষয়টিও বিবেচনা করবে। তিনি মন্ত্রীদের অক্টোবরের শেষ নাগাদ এ বিষয়ে প্রাথমিক প্রস্তাবনা জমা দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন।
প্যারিসের হেলেন বুশে (Helene Boucher) স্কুলের বাইরে আয়োজিত এক প্রতিবাদ সমাবেশে অভিভাবক এমিলি লোম (Emilie Lhomme) বলেন যে, সরকারের কেবল কথার বুলিতে কাজ হবে না। তিনি বলেন, “এসব কথা শুনতে ভালোই লাগে, কিন্তু এতে আমাদের সন্তানদের দৈনন্দিন জীবনে কোনো পরিবর্তন আসবে না।”
শিক্ষা সংস্কার বাস্তবায়নের জন্য প্রয়োজনীয় বাড়তি অর্থ সংস্থান করা কঠিন হবে।
ক্রমবর্ধমান বাজেট ঘাটতি কমানোর জন্য সরকারের ওপর চাপ বাড়ছে। ফ্রান্সের ক্রমবর্ধমান ঋণ, ধীর অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি এবং সরকারি ব্যয় নিয়ন্ত্রণে অনীহার কারণে বিনিয়োগকারীদের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে, যার ফলে ঋণ গ্রহণের খরচ বেড়ে গেছে। গত সপ্তাহে ফ্রান্সের ১০ বছর মেয়াদী বন্ডের ইল্ড (yield) বা আয়-হার সাময়িকভাবে ৫ শতাংশ ছাড়িয়ে ২৪ বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছিল।
ফ্রান্সে ঋণ গ্রহণের খরচ বেড়ে যাওয়ার প্রভাব এখন বৃহত্তর ইউরো অঞ্চলেও ছড়িয়ে পড়তে শুরু করেছে; ইউরোর মান কমে যাওয়াটা নীতিনির্ধারকদের জন্য নতুন করে উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। তবে মঙ্গলবার অর্থমন্ত্রী রোল্যান্ড লেস্কিউর (Roland Lescure) বলেছেন, এক্ষেত্রে ইউরোপীয় কেন্দ্রীয় ব্যাংকের হস্তক্ষেপের কোনো প্রয়োজন নেই।
আগামী বসন্তের নির্বাচনে প্রেসিডেন্ট পদের দৌড়ে এগিয়ে থাকা কট্টর-ডানপন্থী, ইউরো-সংশয়বাদী ও পপুলিস্ট নেত্রী ল্য পেন নির্বাচিত হলে সরকারি ব্যয় ব্যাপক হারে ছাঁটাইয়ের পরিকল্পনা ঘোষণা করেছেন; বন্ড বাজারের সংকট ঘনীভূত হওয়ার প্রেক্ষাপটে তিনি এর মাধ্যমে নিজের আর্থিক নীতি-সংক্রান্ত বিশ্বাসযোগ্যতা তুলে ধরতে চাইছেন।
‘পিসা (PISA) ২০২৫’-এর তথ্য অনুযায়ী, ফ্রান্সে শিক্ষাখাতে ব্যয়ের হার মুদ্রাস্ফীতির হারের তুলনায় পিছিয়ে রয়েছে এবং সামগ্রিক পারফরম্যান্সের দিক থেকে দেশটির শিক্ষার্থীরা ওইসিডি (OECD) ভুক্ত অন্যান্য দেশের শিক্ষার্থীদের চেয়ে পিছিয়ে আছে।



































































