
এক অস্থির সময় পার করছি আমরা। কোথাও যেন কোনো সুবাতাস নেই। চারদিকে অনিশ্চয়তা, প্রতারণা, ভয়, হতাশা ও বঞ্চনার দীর্ঘ ছায়া। প্রতিদিনের সংবাদে খুন, ধর্ষণ, অপহরণ, যৌন সহিংসতা, আত্মহত্যা, ধর্মীয় গুজব ও অপব্যাখ্যা, ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের ওপর নির্যাতন, জমি ও রাষ্ট্রীয় সম্পদ দখল, বোমা বিস্ফোরণ কিংবা বোমা আতঙ্কের মতো ঘটনা আমাদের স্বাভাবিক জীবনকে প্রশ্নের মুখে দাঁড় করাচ্ছে। ক্রমেই জন্ম নিচ্ছে একটি মৌলিক প্রশ্ন—আমরা কি নিরাপদ? বিচারের দীর্ঘসূত্রতা এই আতঙ্ককে আরও গভীর করে। কোনো অপরাধের বিচার পেতে যদি বছরের পর বছর অপেক্ষা করতে হয়, যদি অপরাধী অর্থ, ক্ষমতা, প্রভাব কিংবা পরিচয়ের আড়ালে নিজেকে নিরাপদ রাখতে পারে, তাহলে আইনের শাসনের প্রতি মানুষের আস্থা কীভাবে গড়ে উঠবে? রাষ্ট্রের অন্যতম প্রধান দায়িত্ব নাগরিকের নিরাপত্তা ও ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা। কিন্তু আজ নিরাপত্তার প্রশ্নটি শুধু রাস্তাঘাটে সীমাবদ্ধ নেই। ঘর, কর্মক্ষেত্র, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, জমি-সম্পদ ও নাগরিক অধিকার নিয়েও মানুষ উদ্বিগ্ন। এমনকি মৃতের কবরও যখন অনিরাপদ হয়ে ওঠে, তখন সেটি বিচ্ছিন্ন অপরাধ নয়; এটি সমাজের গভীরে তৈরি হওয়া মূল্যবোধের সংকটের ইঙ্গিত। গত৮ মাসে ৯৫ কারখানা বন্ধ, কর্মসংস্থান হারিয়েছে ৬২ হাজার: সিপিডি।
সরকারি সেবার ক্ষেত্রেও কোথাও অনিয়ম, কোথাও ঘুষ, কোথাও দুর্নীতি, কোথাও পক্ষপাতিত্ব; কোথাও আবার নাগরিকের সঙ্গে অসৌজন্যমূলক আচরণ। রাষ্ট্রীয় সেবা পাওয়ার অধিকার যেন অনেক ক্ষেত্রে অনুগ্রহ পাওয়ার মতো হয়ে দাঁড়িয়েছে। অথচ মনে রাখতে হবে, রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান জনগণের জন্য। আমলাতন্ত্রের উদ্দেশ্য নাগরিককে নিয়ন্ত্রণ করা নয়, সেবা দেওয়া। সরকারি কর্মকর্তা জনগণের ওপর ক্ষমতা প্রয়োগের প্রতিনিধি নন; তিনি জনগণের অর্থে পরিচালিত রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থার একজন দায়িত্বশীল কর্মী। তাই সরকারি সেবায় দক্ষতা, স্বচ্ছতা, মানবিকতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা জরুরি। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে মাদকের বিস্তার, মব বা দলবদ্ধ জনতার দৌরাত্ম্য এবং কিশোর গ্যাংয়ের উত্থান। মাদক শুধু একজন মানুষকে ধ্বংস করে না; একটি পরিবারকে বিপর্যস্ত করে এবং একটি প্রজন্মের ভবিষ্যৎকে ঝুঁকির মধ্যে ফেলে। কিশোরদের অপরাধ, মাদক ও সহিংসতা থেকে দূরে রাখতে শুধু পুলিশি ব্যবস্থা যথেষ্ট নয়। পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, সমাজ ও রাষ্ট্র—সব পক্ষকে দায়িত্ব নিতে হবে। সামাজিক সম্পর্কেও ভাঙন ধরেছে। পারস্পরিক আস্থা ও সহমর্মিতা কমছে, বাড়ছে আত্মকেন্দ্রিকতা ও ব্যক্তিস্বার্থ। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে গুজব, অপপ্রচার, বিভ্রান্তিকর তথ্য ও চরিত্রহনন মুহূর্তের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ছে। মানুষ অনেক সময় সত্য যাচাইয়ের আগেই মিথ্যাকে বিশ্বাস করছে। একটি সমাজে যখন সত্যের চেয়ে মিথ্যা দ্রুত ছড়ায়, তখন শুধু তথ্যব্যবস্থা নয়, সামাজিক বিশ্বাসও ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
স্বাস্থ্য খাতেও মানুষের হতাশা রয়েছে। চিকিৎসা ক্রমশ ব্যয়বহুল ও বাণিজ্যিক হয়ে উঠছে। দরিদ্র অসুস্থ মানুষের কষ্ট বহুগুণ বেড়ে যাচ্ছে। রাষ্ট্রের দায়িত্ব এমন স্বাস্থ্যব্যবস্থা গড়ে তোলা, যেখানে অর্থের অভাবে কোনো মানুষ প্রয়োজনীয় চিকিৎসা থেকে বঞ্চিত হবেন না। শিক্ষাখাতেও রয়েছে নানা উদ্বেগ। একটি জাতির ভবিষ্যৎ নির্মাণের প্রধান কারিগর শিক্ষক ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। অথচ পর্যাপ্ত গবেষণার সুযোগ, শিক্ষকদের পেশাগত নিরাপত্তা ও কাজের স্বাধীনতা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। একজন শিক্ষক যদি নিরাপত্তাহীনতায় থাকেন কিংবা পেশাগত মর্যাদা নিয়ে অনিশ্চয়তায় থাকেন, তাহলে তাঁর কাছ থেকে কীভাবে একটি মুক্তচিন্তার, সৃজনশীল ও মানবিক প্রজন্ম আশা করা যায়? শিক্ষাকে শুধু পরীক্ষা ও সনদের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখলে জাতির চিন্তার জগতও সংকুচিত হবে।
২০২৪ সালের জুলাইয়ের আন্দোলন বাংলাদেশের সাম্প্রতিক ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। বৈষম্য ও অন্যায়ের বিরুদ্ধে মানুষের গণআকাঙ্ক্ষা, মর্যাদা ও ন্যায়বিচারের প্রত্যাশা এই আন্দোলনকে ব্যাপকতা দিয়েছিল। কিন্তু কোনো গণআন্দোলনের চেতনা কোনো ব্যক্তি, গোষ্ঠী বা প্রতিষ্ঠানের একক সম্পত্তি হতে পারে না। আন্দোলনের আকাঙ্ক্ষা যদি ক্ষমতার প্রতিযোগিতা, প্রতিশোধ, দখল কিংবা নতুন বৈষম্যের মধ্যে হারিয়ে যায়, তাহলে ক্ষতিগ্রস্ত হবে সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা। জুলাইয়ের চেতনা যদি সত্যিই বৈষম্যহীনতার চেতনা হয়, তবে সেখানে প্রতিশোধের চেয়ে ন্যায়বিচার, দখলের চেয়ে অধিকার, পক্ষপাতের চেয়ে সমতা এবং ক্ষমতার চেয়ে জনগণের জবাবদিহি অগ্রাধিকার পাওয়া উচিত।
জুলাই-পরবর্তী আইন ও জবাবদিহি নিয়েও বিতর্ক রয়েছে। এই বাস্তবতা আমাদের একটি মৌলিক শিক্ষা দেয়—ন্যায়বিচার ও জবাবদিহি হতে হবে ব্যক্তি বা গোষ্ঠীনির্ভর নয়, নীতিনির্ভর। অপরাধের বিচার হবে অপরাধের ভিত্তিতে; পরিচয়, দল বা রাজনৈতিক অবস্থানের ভিত্তিতে নয়।
রাষ্ট্রীয় সেবা ও উৎপাদন খাতের বেসরকারিকরণ নিয়েও নতুন করে ভাবতে হবে। বেসরকারি উদ্যোগ ও বিনিয়োগ অর্থনীতির জন্য প্রয়োজনীয় হতে পারে। কিন্তু জনসেবা ও জনসম্পদের এমন বেসরকারিকরণ কাম্য নয়, যার ফলে সাধারণ মানুষের প্রবেশাধিকার কমে যায় এবং সম্পদের সুফল সীমিতসংখ্যক ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর হাতে কেন্দ্রীভূত হয়। উন্নয়নের লক্ষ্য শুধু সম্পদ সৃষ্টি নয়; সেই সম্পদের সুফল মানুষের জীবনে কতটা পৌঁছাল, সেটিও বিবেচ্য। আমরা এমন উন্নয়ন চাই, যার ফলে মানুষের নিরাপত্তা বাড়বে; কৃষক উৎপাদনের ন্যায্য মূল্য পাবেন; শ্রমিক মর্যাদার সঙ্গে বাঁচবেন; শিক্ষার্থী মানসম্মত শিক্ষা পাবে; শিক্ষক নিরাপদ পরিবেশে জ্ঞানচর্চা করবেন; রোগী অর্থের অভাবে চিকিৎসা থেকে বঞ্চিত হবেন না; এবং একজন সাধারণ নাগরিক নিজের অধিকার নিয়ে রাষ্ট্রের সামনে দাঁড়াতে ভয় পাবেন না। আমাদের গভীরভাবে মনে রাখতে হবে—দেশ ভালো থাকলে আমরাও ভালো থাকব। দেশকে নিজের সন্তানের মতো ভালোবাসতে হবে। দেশের ক্ষতি মানে শেষ পর্যন্ত আমাদেরই ক্ষতি। রাষ্ট্রীয় সম্পদের অপচয় মানে আমাদের সম্পদের অপচয়। দুর্নীতি মানে আমাদের ভবিষ্যতের ক্ষতি। বিচারহীনতা মানে আমাদের সন্তানদের জন্য একটি অনিরাপদ সমাজ রেখে যাওয়া।
দেশ মানে মানুষ—আমাদের সন্তান, পরিবার, প্রতিবেশী, কৃষক, শ্রমিক, শিক্ষক, শিক্ষার্থী, চিকিৎসক, ব্যবসায়ী, সাংবাদিক, সরকারি কর্মকর্তা এবং কোটি কোটি সাধারণ নাগরিক। দেশপ্রেম শুধু জাতীয় দিবসে পতাকা উত্তোলন কিংবা দেশাত্মবোধক স্লোগানে সীমাবদ্ধ থাকতে পারে না। দেশকে ভালোবাসা মানে অন্যায় দেখলে প্রতিবাদ করা, দুর্নীতিকে প্রশ্রয় না দেওয়া, মিথ্যা না ছড়ানো, অন্যের অধিকারকে সম্মান করা এবং রাষ্ট্রীয় সম্পদকে নিজের সম্পদের মতো রক্ষা করা।
সবচেয়ে আশার কথা হলো—অপরাধী বা অপরাধপ্রবণ মানুষের সংখ্যা সমাজের অধিকাংশ নয়। অধিকাংশ মানুষই শান্তি চায়, নিরাপদে বাঁচতে চায় এবং সম্মানের সঙ্গে জীবন কাটাতে চায়। তাহলে আমরা কেন সামান্যসংখ্যক অপরাধী, দুর্নীতিবাজ, দখলদার, সন্ত্রাসী বা মাদক ব্যবসায়ীর কাছে মাথা নত করব? অপরাধীকে ভয় পাওয়ার চেয়ে আইনকে শক্তিশালী করা জরুরি। অন্যায়ের কাছে নত হওয়ার চেয়ে ন্যায়বিচারের পক্ষে দাঁড়ানো জরুরি।
আমাদের প্রয়োজন প্রতিশোধের রাজনীতি নয়—ন্যায়ের রাজনীতি। দখলের সংস্কৃতি নয়—অধিকারের সংস্কৃতি। ভয়ের সমাজ নয়—নিরাপত্তার সমাজ। মিথ্যার প্রচার নয়—সত্যের চর্চা। বৈষম্য নয়—সমতা। ক্ষমতার অহংকার নয়—জনগণের প্রতি জবাবদিহি।
রাষ্ট্রকে বদলানোর দাবি তোলার পাশাপাশি নিজেদেরও বদলাতে হবে। বিবেককে জাগাতে হবে, সামাজিক দায়িত্ববোধ ফিরিয়ে আনতে হবে এবং সত্য ও ন্যায়ের পক্ষে সামাজিক ঐকমত্য গড়ে তুলতে হবে। একটি দেশ শুধু সরকার দিয়ে বদলায় না; বদলায় তার নাগরিকদের সচেতনতা, সততা, সাহস ও দায়িত্ববোধ দিয়ে। অন্ধকার যত গভীরই হোক, পরিবর্তনের পথ বন্ধ হয়ে যায়নি। আমাদের সামনে এখনো সুযোগ আছে—একটি নিরাপদ, ন্যায়ভিত্তিক, বৈষম্যহীন, মানবিক ও সম্প্রীতির বাংলাদেশ গড়ে তোলার। সেই বাংলাদেশ, যেখানে মানুষ ভয় নিয়ে নয়, মর্যাদা নিয়ে বাঁচবে; যেখানে বিচার হবে প্রতিশোধের জন্য নয়, ন্যায়ের জন্য; যেখানে উন্নয়ন হবে কিছু মানুষের জন্য নয়, সবার জন্য। তবেই একদিন আমরা আমাদের সন্তানদের দিকে তাকিয়ে বলতে পারব—আমাদের জীবন শুধু বেঁচে থাকার মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না; আমরা একটি ভালো দেশ রেখে যাওয়ার জন্যও বেঁচেছিলাম।
সুধীর বরণ মাঝি, শিক্ষক, হাইমচর সরকারি মহাবিদ্যালয়, হাইমচর, চাঁদপুর।



































































