দক্ষিণ ইউক্রেনের রাশিয়ার নিয়ন্ত্রনে থাকা ওলেশকি শহরের বাসিন্দারা অবরুদ্ধ অবস্থায় অনাহারের মুখে পড়েছেন। খাদ্য ও পানি সংগ্রহের জন্য তাঁরা জীবন বাজি রেখে মাইনে ভরা (মাইন-বিছানো) রাস্তা ধরে ঘণ্টার পর ঘণ্টা পায়ে হেঁটে বা সাইকেলে করে যাতায়াত করছেন।
নিপ্রো নদীর পূর্ব তীরে যুদ্ধক্ষেত্রের সম্মুখসারির কাছে অবস্থিত এই শহর থেকে বেরিয়ে যাওয়ার প্রধান পথটি রাশিয়ার নিয়ন্ত্রণে থাকা এলাকার আরও গভীরে চলে গেছে। প্রত্যক্ষদর্শী, স্বজন, মানবিক সহায়তা সংস্থা এবং রয়টার্সের যাচাই করা ভিডিও ফুটেজ অনুযায়ী, এই পথজুড়ে ছড়িয়ে আছে পুড়ে যাওয়া গাড়ি এবং বিস্ফোরণে ঝলসে যাওয়া ধ্বংসাবশেষ। মাথার ওপর চক্কর কাটছে আক্রমণকারী ড্রোন।
বাসিন্দারা জানান, স্থানীয় একটি দোকানে সর্বশেষ মে মাসে খাদ্যসামগ্রী পৌঁছেছিল।
শহরের এক বাসিন্দা রয়টার্সকে বলেন, “ছয় মাস ধরে দোকানেই যাওয়া হয়নি, তাহলে আর ঘরে কী-ই বা অবশিষ্ট থাকতে পারে?” রুশ দখলদার বাহিনীর রোষানলে পড়ার ভয়ে তিনি নিজের নাম প্রকাশ না করার অনুরোধ জানান।
সম্প্রতি তিনি দক্ষিণ-পূর্ব দিকে প্রায় ২০ কিলোমিটার (১২.৫ মাইল) দূরে অবস্থিত রাদেনস্ক শহরে যাওয়ার চেষ্টা করেছিলেন। ফেরার পথে ল্যান্ডমাইন বিস্ফোরণে তিনি আহত হন।
তিনি বলেন, “এখান থেকে বেরিয়ে যাওয়ার কোনো নিরাপদ পথ নেই।” তিনি আরও জানান, কয়েক দিন আগেই একই পথে তিন ব্যক্তি নিহত হয়েছেন; স্থানীয়রা এই পথকে ‘মৃত্যুর পথ’ বলে অভিহিত করেন।
ওই নারীর বক্তব্যের সত্যতা রয়টার্স স্বাধীনভাবে যাচাই করতে পারেনি; তবে ওলেশকিতে চলমান মানবিক সংকট সম্পর্কে অবগত অন্যান্য প্রত্যক্ষদর্শী, কর্মকর্তা ও ত্রাণকর্মীদের তথ্যের সঙ্গে তাঁর বর্ণনার মিল রয়েছে।
মানুষ যে এসব ঝুঁকিপূর্ণ যাত্রার চেষ্টা করছে, তা থেকেই তাদের চরম অসহায়ত্ব ও মরিয়া হয়ে ওঠার বিষয়টি স্পষ্ট হয়।
ইউক্রেনের মানবাধিকার বিষয়ক ন্যায়পাল দিমিত্রো লুবিনেটস বলেন, “রাশিয়া প্রতিদিন বেসামরিক নাগরিকদের সামনে দুটি পথ খোলা রাখে: হয় থেকে যাওয়া—এবং অনাহারে মৃত্যুবরণ করা; অথবা এলাকা ছেড়ে যাওয়া—এবং ল্যান্ডমাইন বিস্ফোরণে প্রাণ হারানোর ঝুঁকি নেওয়া।”
তিনি আরও জানান, যারা শহর ছাড়তে ইচ্ছুক, তাদের জন্য কিয়েভ স্থানীয় পর্যায়ে যুদ্ধবিরতি ও নিরাপদ প্রস্থানের পথের প্রস্তাব দিয়েছিল; কিন্তু রাশিয়া সেই প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেছে।
ওলেশকিতে খাদ্য ও চিকিৎসা সামগ্রীর তীব্র সংকটের কথা স্বীকার করেছে রাশিয়া এবং জানিয়েছে তাদের সেনাবাহিনী তা সমাধানের চেষ্টা করছে। তবে এই সংকটের জন্য তারা ইউক্রেনকেই দায়ী করেছে এবং অভিযোগ করেছে, ইউক্রেন শহরে এসব সামগ্রী পৌঁছাতে বাধা দিচ্ছে।
‘তারা জানে তাদের পরিণতি নিশ্চিত’
ইউক্রেনের খেরসন অঞ্চলের ওলেশকি শহর—যার যুদ্ধপূর্ব জনসংখ্যা ছিল প্রায় ২৪ হাজার—সেখানে এখনও প্রায় ১,৭০০ বাসিন্দা (যার মধ্যে ৪৭টি শিশু রয়েছে) বসবাস করছেন বলে জানিয়েছেন ইউক্রেনে জাতিসংঘের মানবাধিকার পর্যবেক্ষণ মিশনের প্রধান ড্যানিয়েল বেল।
ইউক্রেনের ৩৪তম স্বতন্ত্র মেরিন ব্রিগেড ‘বরিসফেন’-এর শেয়ার করা এবং রয়টার্স কর্তৃক যাচাইকৃত ড্রোন ফুটেজে দেখা যায়, চার বছরেরও বেশি সময় ধরে চলা যুদ্ধ ও রুশ দখলের ফলে সেখানকার আবাসিক ও প্রশাসনিক ভবনগুলো ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে এবং পরিত্যক্ত অবস্থায় পড়ে আছে।
সেখানে বিদ্যুৎ, পানি বা ঘর উষ্ণ রাখার ব্যবস্থার কোনো নিশ্চয়তা নেই। শহরে আসা-যাওয়া এখন আগের চেয়ে অনেক বেশি বিপজ্জনক।
অঞ্চলের ইউক্রেন-নিয়ন্ত্রিত অংশে অবস্থানরত স্থানীয় সামরিক প্রশাসনের প্রধান তেতিয়ানা হাসানেঙ্কো ওলেশকিবাসী বাসিন্দাদের সাথে নিয়মিত যোগাযোগ রাখেন।
সেপ্টেম্বরের শেষের দিকে রয়টার্সকে তিনি বলেন, “তারা জানে যে তাদের পরিণতি নিশ্চিত। কথাগুলো বলা কঠিন, কিন্তু তারা জানে যে ক্ষুধা অথবা হামলার শিকার হয়ে তাদের মৃত্যু হবে।”
ইউক্রেনীয় বাহিনীর শহরটিতে সরাসরি প্রবেশের কোনো সুযোগ নেই। সাম্প্রতিক দিনগুলোতে ইউক্রেনীয় সেনাবাহিনী জানিয়েছে তারা ড্রোনের মাধ্যমে বাসিন্দাদের জন্য খাবার ফেলেছে। রয়টার্স স্বাধীনভাবে এই দাবির সত্যতা নিশ্চিত করতে পারেনি এবং কিছু বাসিন্দা এ বিষয়ে সংশয় প্রকাশ করে বলেছেন যে তারা এমন কিছু দেখেননি।
ইউক্রেনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আন্দ্রি সিবিহা বলেছেন, আগ্রাসী রাষ্ট্র হিসেবে এই মানবিক বিপর্যয়ের “পূর্ণ দায়ভার” রাশিয়ার ওপরই বর্তায়।
রাশিয়ার প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় এবং অধিকৃত খেরসনে রাশিয়ার বসানো কর্তৃপক্ষ এ বিষয়ে মন্তব্যের অনুরোধে কোনো সাড়া দেয়নি।
ক্ষুধাভীতি
ওলেশকিবাসী জানিয়েছেন, গত বছরের শেষের দিকে খাদ্য সরবরাহ অনিয়মিত হয়ে পড়েছিল, তবে মে মাসের পর পরিস্থিতির ব্যাপক অবনতি ঘটে।
এর আগে ইউক্রেনীয় স্বেচ্ছাসেবকরা সেখানে খাবার পৌঁছে দিতে এবং মানুষকে নিরাপদে সরিয়ে নিতে পারতেন। এরপর থেকে বাসিন্দারা মূলত স্থানীয়ভাবে প্রাপ্ত সম্পদের ওপর নির্ভর করে টিকে আছেন, কিন্তু শীত ঘনিয়ে আসায় সেই ব্যবস্থাও আর টেকসই থাকছে না।
ল্যারিসা নামের এক ইউক্রেনীয় নারী—যিনি ২০২২ সালের ফেব্রুয়ারিতে রাশিয়ার পূর্ণমাত্রার আগ্রাসনের পরপরই ওলেশকি থেকে পালিয়ে এসেছিলেন—লন্ডন থেকে রয়টার্সকে জানান তাঁর স্বামী এখনও সেখানে আছেন এবং ফুরিয়ে আসা খাদ্যসামগ্রী খেয়ে কোনোমতে টিকে আছেন। ৭২ বছর বয়সী এই নারী—যিনি স্বামীর নিরাপত্তার কথা ভেবে নিজের বা তাঁর স্বামীর পুরো নাম প্রকাশ করতে রাজি হননি—জানান যে, তাঁর স্বামী এখন কেবল শাকসবজি এবং খোলা আগুনে সেঁকা ঘরে তৈরি রুটি খেয়ে দিন কাটাচ্ছেন। তিনি যুদ্ধের আগেকার সেই আটা ব্যবহার করছেন যা অনেক আগেই নষ্ট হয়ে গেছে।
“মে মাস থেকে শুরু করে পুরো গ্রীষ্মকালজুড়ে তিনি এভাবেই চলছেন। কোনো ডিম, দুগ্ধজাত খাবার বা মাংস—কিছুই নেই,” তাঁর স্ত্রী বলেন। অবশিষ্ট সামান্য শস্যের সাথে ঘাস মিশিয়ে তিনি তাঁদের চারটি বিড়াল ও একটি কুকুরকে খাওয়ান।
লারিসা জানান, খাবারের সন্ধানে ওলেশকি থেকে রাদেনস্ক যাওয়ার রাস্তাটি ব্যবহার করতে তিনি তাঁর স্বামীকে “মানা” করেছেন; কারণ তাঁর মতে, এই পথ পাড়ি দেওয়াটা জীবন-মরণের এক জুয়া বা “রাশিয়ান রুলেট”-এর মতো বিপজ্জনক।
ইউক্রেনীয় ব্রিগেডের ধারণ করা ফুটেজে দেখা যায়, ওই পথের ধারে বহু যানবাহন পুড়ে ছাই হয়ে পড়ে আছে এবং পরিত্যক্ত অবস্থায় রয়েছে। রাস্তার দুপাশের ভবনগুলোও মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
লারিসা নিশ্চিত যে, সপ্তাহে দুবার যখন তাঁদের ফোনে সংক্ষিপ্ত কথা হয়, তখন তাঁর স্বামী তাঁর কষ্টের প্রকৃত চিত্রটি গোপন রাখেন।
শীতের আগমনের সাথে সাথে শসা, করজেট (এক ধরণের স্কোয়াশ) ও টমেটোর মতো স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত নিত্যপ্রয়োজনীয় খাবার ফুরিয়ে আসছে এবং অনাহারের আশঙ্কা বাড়ছে।
মাইন বিস্ফোরণে আহত ওই নারী বলেন, “বিনিময় করার মতো আর কিছুই অবশিষ্ট নেই। আমরা সবটাই খরচ করে ফেলেছি।”
গ্যাস সিলিন্ডার পাওয়া অসম্ভব হওয়ায় খোলা আগুনেই পানি ফুটিয়ে নিতে হচ্ছে। হাতের কাছে থাকা ওষুধগুলোর মেয়াদও উত্তীর্ণ হয়ে গেছে; আর তিনি দিনে মাত্র একবারই খাবার খাচ্ছেন—টমেটো ও লবণ কিংবা মধুর সাথে পাতলা একটি রুটি।



































































