
একটি রাষ্ট্র যখন ক্রমবর্ধমান দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থ হয়, সাধারণ নাগরিকের ক্রয়ক্ষমতা যখন প্রতিনিয়ত সংকুচিত হতে থাকে, তখন হঠাৎ জাতীয় বেতন স্কেল বৃদ্ধি করার প্রয়োজনীয়তা কতটুকু? দেশের সামগ্রিক আর্থিক অবকাঠামো যখন দুর্বল, বাজারব্যবস্থা যখন অস্থিতিশীল এবং ব্যক্তিজীবনের আয়-ব্যয়ের মধ্যে ভারসাম্যহীনতা বিরাজ করে, তখন রাষ্ট্রের এমন সিদ্ধান্তের অর্থনৈতিক যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠা খুবই স্বাভাবিক।
জাতীয় বেতন স্কেল পুনর্নির্ধারণের আগে সরকারের প্রধান বিবেচ্য হলো— দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক সক্ষমতা, মূল্যস্ফীতির পরিস্থিতি, নাগরিকদের প্রকৃত ক্রয়ক্ষমতা এবং নিম্ন আয়ের মানুষের জীবনযাত্রার মান। কেবল প্রজাতন্ত্রের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন বাড়িয়ে দিলেই যে দেশের অর্থনীতি সুসংহত হবে, এমন ধারণার কোনও ভিত্তি নেই।
ধরা যাক, একজন ব্যক্তির মাসিক আয় এক লাখ টাকা, অথচ তাঁর ব্যয় এক লাখ পাঁচ হাজার টাকা। অর্থাৎ প্রতি মাসে তাঁকে পাঁচ হাজার টাকা ঋণ করতে হচ্ছে কিংবা সঞ্চয় ভাঙতে হচ্ছে। অন্যদিকে আরেকজনের মাসিক আয় দশ হাজার টাকা এবং ব্যয় আট হাজার টাকা। তাঁর হাতে মাস শেষে দুই হাজার টাকা উদ্বৃত্ত থাকছে। প্রথম ব্যক্তির আয় দ্বিতীয় ব্যক্তির তুলনায় দশ গুণ বেশি হলেও আর্থিক নিরাপত্তার দিক থেকে দ্বিতীয় ব্যক্তির অবস্থান তুলনামূলকভাবে সুসংহত।
অবশ্য শুধু আয়-ব্যয়ের এই হিসাব দিয়ে কোনও ব্যক্তির সামগ্রিক কল্যাণ বিচার করা যায় না। কিন্তু উদাহরণটি একটি মৌলিক সত্য প্রকাশ করে : আয়ের পরিমাণের চেয়ে আয়ের বিপরীতে ব্যয়ের সামর্থ্য এবং ভবিষ্যতের আর্থিক নিরাপত্তার জন্য ব্যক্তিগত সঞ্চয় বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
একই যুক্তি জাতীয় অর্থনীতির ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। নাগরিকের আয় বাড়ানোর পাশাপাশি তাঁর প্রকৃত ক্রয়ক্ষমতা এবং সঞ্চয়ের সক্ষমতা নিশ্চিত করতে না পারলে অর্থনৈতিক উন্নয়নের সুফল বাস্তব জীবনে প্রতিফলিত হয় না।
নামমাত্র আয় বৃদ্ধি এবং প্রকৃত আয়ের পার্থক্য
অর্থনীতিতে নামমাত্র বা নামকা ওয়াস্তের আয় (Nominal Income) এবং প্রকৃত আয় (Real Income) পৃথক দুটি ধারণা। নামমাত্র আয় বলতে মুদ্রার অঙ্কে প্রাপ্ত অর্থের পরিমাণ বুঝায়। অন্যদিকে প্রকৃত আয় নির্ভর করে সেই অর্থ দিয়ে বাজার থেকে কতটুকু পণ্য কেনা এবং সেবা পাওয়া সম্ভব, তার ওপর। ধরা যাক, একজন কর্মচারীর বেতন ৫০ শতাংশ বৃদ্ধি পেলো। কিন্তু একই সময়ে তাঁর নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য, বাসাভাড়া, পরিবহন, চিকিৎসা ও অন্যান্য ব্যয় ৮০ শতাংশ বেড়ে গেলো। তাইলে আক্ষরিক অর্থে তার আয় বাড়লেও প্রকৃত ক্রয়ক্ষমতা কমে যাবে। অর্থাৎ বর্ধিত বেতন এই ব্যক্তির জীবনযাত্রার মান উন্নত করতে পারবেই না; বরং অধঃপতন শুরু হবে।
এখানেই জাতীয় বেতন স্কেল বৃদ্ধির অর্থনৈতিক তাৎপর্য বিচার করা প্রয়োজন। বেতন বৃদ্ধি ব্যক্তিজীবনে আর্থিক সমস্যার সৃষ্টির জন্য নয়। তবে দীর্ঘদিন ধরে মূল্যস্ফীতির কারণে কর্মচারীদের প্রকৃত আয় কমে গেলে বেতন পুনর্নির্ধারণের হয়তো প্রয়োজন হতে পারে। কিন্তু সেই সিদ্ধান্তের সঙ্গে উৎপাদন, রাজস্ব আয়, অর্থের জোগান, বাজারের সরবরাহ এবং মূল্যস্ফীতির সম্ভাব্য প্রভাব বিবেচনা করা অপরিহার্য।
কারণ অর্থের অঙ্ক বাড়ানো আর মানুষের প্রকৃত সম্পদ বাড়ানো এক বিষয় নয়। এই দুটো বিষয়ের মধ্যে ভারসাম্য (Equilibrium) তৈরি করা সার্বিক একটি দেশের সার্বিক অর্থনীতির সবচেয়ে জরুরি কাজ।
বেতন বৃদ্ধির সঙ্গে বাজারদরের সম্পর্ক
বাংলাদেশের বাজারব্যবস্থায় একটি দীর্ঘস্থায়ী সমস্যা হলো নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধি। বাজারে পর্যাপ্ত সরবরাহ থাকা সত্ত্বেও কখনও কখনও কৃত্রিম সংকট, অসাধু মজুতদারি, বাজার কারসাজি এবং অতিরিক্ত মুনাফার প্রবণতা সাধারণ মানুষের জীবনকে দুর্বিষহ করে তোলে। এ অবস্থায় বেতন বৃদ্ধির সিদ্ধান্ত নেওয়ার পাশাপাশি বাজার নিয়ন্ত্রণের কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করাও সরকারের প্রধান দায়িত্ব।
জাতীয় বেতন স্কেল বাড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে যদি অর্থের প্রবাহ বাড়ে, অথচ পণ্য উৎপাদন ও সরবরাহ এবং সেবার মান একই অনুপাতে না বাড়ে কিংবা আগের চেয়ে সীমিত হয়ে যায়, তবে অতিরিক্ত চাহিদাও মূল্যস্ফীতি সৃষ্টি করতে পারে। আবার ব্যবসায়ীরা যদি বাজারের পণ্য-সরবরাহের অভাবকে কাজে লাগিয়ে অতিরিক্ত মুনাফা অর্জন করতে থাকে, তাইলে মুদ্রাস্ফীতি আরও প্রকট হয়। বাংলাদেশের বাস্তবতায় পরের কথাটা সবচেয়ে বেশি দেখা যায়।
তবে বেতন বৃদ্ধির কারণে সব পণ্যের দাম স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাড়ে, অর্থনীতির এরকম কোনও সাধারণ নিয়ম নেই। বাজারদর নির্ভর করে উৎপাদন ব্যয়, আমদানি মূল্য, বিনিময় হার, জ্বালানি, পরিবহন, সরবরাহ এবং বাজারের প্রতিযোগিতাসহ বহু বিষয়ের ওপর। কিন্তু বাংলাদেশের ব্যাপারটি কোনও সাধারণ অর্থনৈতিক নিয়মের ধার ধারে না। এখানে বেতন স্কেল বৃদ্ধিসহ অতিবৃষ্টি, খরা, বন্যা, রাজনৈতিক অস্থিরতা— এর যেকোনও একটা ঘটলেই বাজারের নিত্যপণ্যের ওপর তার প্রভাব পড়বেই— এ যেন আমাদের একটি চিরাচরিত প্রথা (Trdition)!
তাই এখানে কেবল বেতন বাড়ানোর উদ্যোগ যথেষ্ট নয়; একই সঙ্গে বাজারের অসাধু প্রবণতা নিয়ন্ত্রণের কার্যকর করার আইনগত রূপরেখারও প্রয়োজন রয়েছে।
স্বাধীনতার পর থেকে এ পর্যন্ত বাংলাদেশে বেতন বৃদ্ধির ফিরিস্তি
স্বাধীনতার পর থেকে এ পর্যন্ত বাংলাদেশে সর্বমোট ৯ বার জাতীয় বেতন স্কেল (পে স্কেল) বৃদ্ধি বা সংশোধন করা হয়েছে। ১৯৭৩ সালে দেশের প্রথম জাতীয় বেতন স্কেল ঘোষণার পর থেকে সর্বশেষ ২০২৬ সালে নতুন বেতন স্কেল অনুমোদন দেওয়া হয়।
১ম পে স্কেল (১৯৭৩): সর্বনিম্ন বেতন ছিল ১৩০ টাকা এবং সর্বোচ্চ ২,০০০ টাকা।
২য় পে স্কেল (১৯৭৭): সর্বনিম্ন বেতন ২২৫ টাকা এবং সর্বোচ্চ ৩,০০০ টাকা।
৩য় পে স্কেল (১৯৮৫): সর্বনিম্ন বেতন ৫০০ টাকা এবং সর্বোচ্চ ৬,০০০ টাকা।
৪র্থ পে স্কেল (১৯৯১): সর্বনিম্ন বেতন ৯০০ এবং সর্বোচ্চ ১০,০০০ টাকা।
৫ম পে স্কেল (১৯৯৭): সর্বনিম্ন বেতন ১,৫০০ টাকা এবং সর্বোচ্চ ১৫,০০০ টাকা।
৬ষ্ঠ পে স্কেল (২০০৫): সর্বনিম্ন বেতন ২,৪০০ টাকা এবং সর্বোচ্চ ২৩,০০০ টাকা।
৭ম পে স্কেল (২০০৯): সর্বনিম্ন বেতন ৪,১০০ টাকা এবং সর্বোচ্চ ৪০,০০০ টাকা।
৮ম পে স্কেল (২০১৫): সর্বনিম্ন বেতন ৮,২৫০ টাকা এবং সর্বোচ্চ ৭৮,০০০ টাকা।
৯ম পে স্কেল (২০২৬): সর্বশেষ অনুমোদিত এই স্কেলে সর্বনিম্ন বেতন ২০,০০০ টাকা এবং সর্বোচ্চ ১,৫৬,০০০ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে, যা ১ জুলাই ২০২৬ থেকে কার্যকর করা হয়েছে।
বাংলাদেশের জাতীয় বেতন স্কেল মূলত সরকারি চাকরিজীবীদের জীবনযাত্রার মান সামঞ্জস্য করার একটি প্রশাসনিক প্রক্রিয়া মাত্র, যা দেশের সিংহভাগ সাধারণ মানুষের সামষ্টিক আর্থিক মুক্তি নিশ্চিত করতে কখনও পারেনি! ঐতিহাসিক সত্য হলো, প্রতিটি পে স্কেল বৃদ্ধির পেছনে অর্থনৈতিক বাস্তবতার চেয়ে ক্ষমতাসীন দলগুলোর রাজনৈতিক ও কৌশলগত সুবিধাই বেশি প্রাধান্য পেয়েছে।
আর এ দেশের বাস্তব চিত্র হলো— নতুন পে স্কেল ঘোষণার সঙ্গে সঙ্গেই বাজারে পণ্যের দাম বাড়ানোর একটি কৃত্রিম প্রতিযোগিতা শুরু হয়। এর সঙ্গে জ্বালানিসহ অন্যান্য খাতের আমদানি-নির্ভরতা, বাজার সিন্ডিকেটের দৌরাত্ম্য, দুর্বল প্রশাসনিক তদারকি এবং অসংগত মুদ্রা ও রাজস্বনীতি একীভূত হয়ে মুদ্রাস্ফীতিকে একটি দীর্ঘস্থায়ী রূপ দিয়েছে।
অর্থনীতির ভাষায় এটিই “ইনফ্লেশন এক্সপেক্টেশন” (Inflation Expectation) এবং “ক্রনিক ইনফ্লেশন” (Chronic Inflation)। যখন সাধারণ মানুষ ও ব্যবসায়ীরা ধরে নেয় যে ভবিষ্যতে পণ্যের দাম আর কমবে না, তখন তারা অগ্রিম দাম বাড়িয়ে দেয় এবং পণ্য মজুত করা শুরু করে।
সুতরাং বলতে দ্বিধা নেই যে, সুদূরপ্রসারী অর্থনৈতিক পরিকল্পনা ছাড়া কেবল রাজনৈতিক বিবেচনায় পে স্কেল পুনর্নির্ধারণ বাংলাদেশকে কোনও স্থায়ী অর্থনৈতিক মুক্তি দিতে পারেনি; বরং উপহার দিয়েছে একটি প্রাতিষ্ঠানিক ও দীর্ঘস্থায়ী মুদ্রাস্ফীতির দুষ্টচক্র।
জাতীয় বেতন স্কেল নাকি বার্ষিক ইনক্রিমেন্ট?
চাকরিজীবীদের বেতন বৃদ্ধির একটি স্বাভাবিক প্রক্রিয়া হলো বার্ষিক ইনক্রিমেন্ট। নির্দিষ্ট সময় পরপর বেতন বৃদ্ধির এই ব্যবস্থা বিদ্যমান থাকলেও দীর্ঘ সময় ধরে জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়ে গেলে পুরোনো বেতন কাঠামো পুনর্বিবেচনার প্রয়োজন দেখা দেয়। এটাও জাতীয় অর্থনীতির একটি স্বাভাবিক নিয়ম।
কিন্তু তারও একটা সীমা থাকা প্রয়োজন। প্রতিবার রাজনৈতিক বিবেচনায় জাতীয় বেতন স্কেল পুনর্নির্ধারণের পরিবর্তে একটি নিয়মতান্ত্রিক ও গবেষণাভিত্তিক বেতননীতি গ্রহণ করা অধিক যুক্তিসংগত।
প্রতিবছর মূল্যস্ফীতি, জীবনযাত্রার ব্যয় এবং উৎপাদনশীলতার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে ইনক্রিমেন্টের হার নির্ধারণ করা যেতে পারে। পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদি ব্যবধানে প্রয়োজন হলে পূর্ণাঙ্গ বেতন কাঠামো পুনর্গঠন করা যেতে পারে। এতে একদিকে কর্মচারীদের প্রকৃত আয় রক্ষার সুযোগ থাকবে, অন্যদিকে সরকারের ওপর হঠাৎ অতিরিক্ত ব্যয়ের চাপও তুলনামূলকভাবে নিয়ন্ত্রণযোগ্য হবে।
কিন্তু এদেশের নাগরিকগণ সম্ভবত জাতীয় বেতন স্কেল বাড়ানোর অপেক্ষায় থাকে। যাতে করে যে যার অবস্থান থেকে নিত্যপণ্য, সেবা, পরিবহন, শিক্ষা এমনকি বিনোদনের দাম পর্যন্ত বৃদ্ধি করতে পারে!
অন্যদিকে দেশের অধিকাংশ মানুষ সরকারি চাকরির বাইরে বিভিন্ন পেশা, ব্যবসা, কৃষি, শ্রম ও অনানুষ্ঠানিক অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে জীবিকা নির্বাহ করে। বেতন বাড়ালে তার সুফল এই একটা স্বল্পসংখ্যক চাকরিজীবী শ্রেণির মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে। রাষ্ট্রীয় পরিবর্তিত বেতন কাঠামোর সুফল অন্যদের কাছে পৌঁছায় না। অথচ মূল্যস্ফীতির প্রভাব তাঁদের ওপরও পড়ে। বিশেষ করে নির্দিষ্ট আয়ের বাইরে থাকা দিনমজুর, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী, কৃষিশ্রমিক ও নিম্ন আয়ের মানুষের জীবনযাত্রা আরও কঠিন হয়ে ওঠে।
তাই বেতননীতি প্রণয়নের সময় শুধু চাকরিজীবীদের স্বার্থ নয়, সমগ্র জনগোষ্ঠীর অর্থনৈতিক অবস্থার কথা বিবেচনায় রাখতে হবে।
শ্রমিকদের ন্যূনতম মজুরির প্রশ্ন
একইভাবে প্রতিটি শিল্পের ও কৃষি শ্রমিকদের মজুরি নির্ধারণের ক্ষেত্রেও প্রকৃত জীবনযাত্রার ব্যয় বিবেচনা করা অত্যন্ত জরুরি। একজন শ্রমিকের মাসিক আয় দিয়ে যদি বাসাভাড়া, খাদ্য, চিকিৎসা, যাতায়াত এবং পরিবারের অন্যান্য মৌলিক ব্যয় নির্বাহ করা সম্ভব না হয়, তবে তাঁর ন্যূনতম মজুরি পুনর্নির্ধারণ অবশ্যই প্রয়োজন। অর্থাৎ শ্রমিকের হাতে বেশি টাকা পৌঁছানোই শেষ কথা নয়; সেই টাকা দিয়ে তাঁর পরিবারের জীবনযাত্রা কতটা উন্নত হচ্ছে, সেটিই প্রকৃতপক্ষে বিবেচনার বিষয়।
কিন্তু মজুরি বাড়ানোর পাশাপাশি শিল্পের উৎপাদনশীলতা, মালিকপক্ষের ব্যয় নির্বাহের সক্ষমতা, শ্রমিকের জীবনযাত্রার ব্যয় এবং বাজারদরের সম্ভাব্য প্রতিক্রিয়াও বিবেচনা করতে হবে।
মুদ্রার অঙ্ক নয়, প্রকৃত সম্পদই অর্থনীতির ভিত্তি
মুদ্রা মূলত পণ্য ও সেবার বিনিময়ের একটি স্বীকৃত মাধ্যম। কাগজের নোটের ব্যবহারিক মূল্য সীমিত। তার অর্থনৈতিক মূল্য নির্ভর করে মানুষের আস্থা, রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি এবং বিনিময়যোগ্যতার ওপর। কোনও ব্যক্তির হাতে কোটি টাকা থাকলেও বাজারে প্রয়োজনীয় খাদ্যদ্রব্য না পাওয়া গেলে সেই অর্থ দিয়ে তার ক্ষুধা নিবারণ সম্ভব হবে না। অর্থাৎ মুদ্রার অঙ্ক যত বড়ই হোক, পণ্য ও সেবার প্রাপ্যতা ছাড়া তার প্রকৃত উপযোগিতা নাই।
এখানে একটি মৌলিক অর্থনৈতিক সত্য রয়েছে : মুদ্রার পরিমাণ বাড়ানো আর জাতীয় সম্পদ বৃদ্ধি করা এক নয়। জাতীয় সম্পদ বৃদ্ধি পায় উৎপাদন, প্রযুক্তি, ব্যবস্থাপনার দক্ষতা, প্রতিযোগিতায় টিকে থাকার পক্ষে গুণগত মানের শ্রম, সঠিক খাতে বিনিয়োগ এবং পণ্য ও সেবার প্রাপ্যতা বাড়ানোর মাধ্যমে।
অর্থনীতিতে মুদ্রাস্ফীতি (Inflation) বলতে সাধারণভাবে পণ্য ও সেবার সামগ্রিক মূল্যস্তরের ধারাবাহিক বৃদ্ধিকে বুঝায়। এর ফলে মুদ্রার ক্রয়ক্ষমতা কমে যায়। তাই রাষ্ট্রের অর্থনৈতিক সাফল্য কেবল মাথাপিছু আয় কিংবা মোট জাতীয় উৎপাদনের পরিসংখ্যানে সীমাবদ্ধ থাকতে পারে না। সাধারণ মানুষ তার আয় দিয়ে কতটুকু প্রয়োজন মেটাতে পারছে, সেটিই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। কেননা ব্যক্তি টাকা রোজগার করে নিজের চাহিদার বিপরীতে ব্যয় করতে। কিন্তু রোজগারকৃত অর্থ যদি চাহিদা মিটাতে ব্যর্থ হয়, তবে টাকা পয়সা কাগজ ও ধাতব চাকতি ছাড়া আরকিছু নয়।
রাষ্ট্রের দায়িত্ব ও ব্যষ্টিক অর্থনীতির নিরাপত্তা
রাষ্ট্রের অন্যতম দায়িত্ব হলো নাগরিকদের অর্থনৈতিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। ব্যক্তির আয়, ব্যয়, সঞ্চয়, বিনিয়োগ ও ভোগের মধ্যে একটি বাস্তবসম্মত ভারসাম্য প্রতিষ্ঠার অনুকূল পরিবেশ তৈরি করা রাষ্ট্রের অর্থনৈতিক নীতির গুরুত্বপূর্ণ অংশ। এখানে ব্যষ্টিক অর্থনীতি (Microeconomics) এবং সামষ্টিক অর্থনীতি (Macroeconomics)-এর পারস্পরিক সম্পর্ক অনুধাবন করা প্রয়োজন। ব্যষ্টিক অর্থনীতি ব্যক্তির আয়, ব্যয়, উৎপাদন, ভোগ এবং বাজারে সিদ্ধান্ত গ্রহণের বিষয়গুলো বিশ্লেষণ করে। অন্যদিকে সামষ্টিক অর্থনীতি জাতীয় উৎপাদন, কর্মসংস্থান, মূল্যস্ফীতি, রাজস্ব, মুদ্রানীতি এবং সামগ্রিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি নিয়ে কাজ করে।
এই দুটি অর্থনৈতিক ক্ষেত্র পরস্পর বিচ্ছিন্ন নয়। জাতীয় অর্থনীতির নীতিগত সিদ্ধান্তের প্রভাব শেষ পর্যন্ত ব্যক্তির জীবনেই প্রতিফলিত হয়। আবার কোটি কোটি ব্যক্তির অর্থনৈতিক সিদ্ধান্তও জাতীয় অর্থনীতির গতিপথ নির্ধারণে ভূমিকা রাখে। অতএব রাষ্ট্রের অর্থনৈতিক নীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ লক্ষ্য হওয়া উচিত নিম্ন আয়ের মানুষের জীবনযাত্রার মান উন্নয়ন, মৌলিক চাহিদা পূরণের সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং নিয়মিত সঞ্চয়ের সুযোগ সৃষ্টি করা।
একটি কল্যাণমুখী সার্বিক অর্থনীতির প্রকৃত পরিচয় সেখানে কতজন ধনী মানুষ রয়েছেন, তা দিয়ে নির্ধারিত হবে না। বরং সবচেয়ে কম আয় করা মানুষটি কতটা নিরাপদে জীবনযাপন করতে পারছেন, তার খাদ্য, বস্ত্র, বাসস্থান, চিকিৎসা, শিক্ষা ও ভবিষ্যৎ কতটা সুরক্ষিত, তা দিয়ে সেই অর্থনীতির মানবিক সাফল্য বিচার করা অধিক যুক্তিসংগত।
কর ফাঁকি, কালো টাকা ও রাষ্ট্রীয় দায়বদ্ধতা
বাংলাদেশের অর্থনীতির অন্যতম ক্ষত হলো কর ফাঁকি, কালো টাকা এবং লাগামহীন অর্থ পাচার। অনেক ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান প্রকৃত আয় গোপন করে বা ভুয়া অডিট রিপোর্টের মাধ্যমে কর এড়িয়ে যায়। এর পেছনে কর ব্যবস্থার জটিলতা, দুর্বল নজরদারি, দুর্নীতি ও আইনের অসম প্রয়োগ যেমন দায়ী, তেমনই জাতীয় পে স্কেল বৃদ্ধির ফলে সৃষ্ট মুদ্রাস্ফীতিরও একটি পরোক্ষ মনস্তাত্ত্বিক ভূমিকা রয়েছে। বর্ধিত জীবনযাত্রার ব্যয়ের অজুহাতে অনেকেই কর ফাঁকি দিয়ে অতিরিক্ত অর্থ হাতে রাখার প্রবণতা দেখায়।
রাষ্ট্র যদি মুদ্রাস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ এবং একটি ন্যায়সংগত কর ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করতে না পারে, তবে জাতীয় উন্নয়নের জন্য প্রয়োজনীয় রাজস্ব সংগ্রহ মারাত্মকভাবে বাধাগ্রস্ত হয়। কর প্রদানের ক্ষেত্রে নাগরিকদের আস্থার মূল ভিত্তি হলো রাষ্ট্রীয় ব্যয়ের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা। সাধারণ মানুষ যখন তাদের করের অর্থের সঠিক ব্যবহার দেখতে না পায়, তখন কর দেওয়ার প্রতি তাদের স্বতঃস্ফূর্ত আগ্রহ হারিয়ে যায়। সুতরাং কর ফাঁকি বন্ধে শুধু নাগরিককে চাপ দিলে চলবে না; রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থাকেও স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক হতে হবে।
রাজস্ব সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রা পূরণ না হলে শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও অবকাঠামো খাতে বড় ধরনের বাজেট ঘাটতি দেখা দেয়। ফলে সরকার বাধ্য হয়ে অভ্যন্তরীণ ও বৈদেশিক ঋণের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ে। আর এই ঘাটতি মেটাতে গিয়ে অতিরিক্ত ঋণ গ্রহণ এবং টাকা ছাপানোর ফলে মুদ্রাস্ফীতি আরও ফুলে ফেঁপে ওঠে। মূলত এই চক্রাকার খেলা বা অর্থনৈতিক দুষ্টচক্রের মধ্যেই ঘুরপাক খাচ্ছে বাংলাদেশের অর্থনীতি।
গবেষণাভিত্তিক অর্থনৈতিক নীতি কোথায়?
একটি দেশের অর্থনৈতিক নীতি প্রণয়ন কখনও অনুমান, রাজনৈতিক জনপ্রিয়তা কিংবা তাৎক্ষণিক সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভর করে চলে না। জাতীয় বেতন স্কেল পুনর্গঠন, ভর্তুকি প্রদান, করনীতি পরিবর্তন কিংবা নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের মূল্য নিয়ন্ত্রণ— প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তের আগে যথাযথ গবেষণার প্রয়োজন আছে। সরকারের এমন গবেষণা প্রতিষ্ঠান থাকা প্রয়োজন, যারা নিয়মিতভাবে বাজারের মূল্যস্তর, উৎপাদন ব্যয়, সরবরাহব্যবস্থা, মুদ্রাস্ফীতি, নাগরিকের প্রকৃত আয়, জীবনযাত্রার ব্যয় এবং বিভিন্ন অর্থনৈতিক সিদ্ধান্তের সম্ভাব্য প্রভাব বিশ্লেষণ করবে।
বিশ্বের উন্নত অর্থনীতিগুলোতে সরকারি নীতি প্রণয়নে পরিসংখ্যান, অর্থনৈতিক মডেল, গবেষণা এবং প্রভাব মূল্যায়নের গুরুত্ব রয়েছে। বাংলাদেশেও বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো, বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠান, বাংলাদেশ ব্যাংকসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান কাজ করছে। প্রশ্ন হলো, তাদের গবেষণালব্ধ ফলাফল কতটা রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্তে নিয়মিত প্রতিফলিত হয়?
সরকারের উচিত স্বাধীন গবেষণা প্রতিষ্ঠান ও বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর গবেষণাকে যথাযথ গুরুত্ব দেওয়া। কারণ গবেষণাবিহীন অর্থনৈতিক সিদ্ধান্ত অনেক সময় সাময়িক জনপ্রিয়তা তৈরি করলেও দীর্ঘমেয়াদে জাতীয় অর্থনীতির জন্য ক্ষতিকর হতে পারে।
উপসংহার : অর্থনৈতিক উন্নয়ন মানে নাগরিকের আর্থিক নিশ্চয়তা
একটি দেশের অর্থনৈতিক সাফল্য শুধু জাতীয় বাজেটের আকার, মুদ্রার পরিমাণ, মাথাপিছু আয় কিংবা সরকারি কর্মচারীদের বেতন বৃদ্ধির মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়. প্রকৃত সাফল্য হলো সাধারণ নাগরিকের জীবনযাত্রায় তার ইতিবাচক প্রতিফলন। যে দেশে একজন নিম্ন আয়ের মানুষ তার উপার্জন দিয়ে খাদ্য, বাসস্থান, চিকিৎসা ও অন্যান্য মৌলিক চাহিদা পূরণ করতে পারে, সন্তানদের শিক্ষা নিশ্চিত করতে পারে এবং মাস শেষে সামান্য হলেও সঞ্চয় করতে পারে, সেই দেশই প্রকৃত অর্থে কল্যাণমুখী অর্থনীতির দিকে এগিয়ে যায়। এক্ষেত্রে রাষ্ট্রের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব হলো নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের বাজার স্থিতিশীল রাখা, উৎপাদন ও কর্মসংস্থান বাড়ানো, ন্যায়সংগত মজুরি নিশ্চিত করা এবং নাগরিকের প্রকৃত ক্রয়ক্ষমতা রক্ষা করা।
বেতন বাড়ানোর আগে সরকারের ভাবা প্রয়োজন, সেই বর্ধিত অর্থের বিপরীতে বাজারে পণ্য ও সেবার পর্যাপ্ত সরবরাহ রয়েছে কি না, রাষ্ট্রের রাজস্ব সক্ষমতা কতটুকু এবং সম্ভাব্য মূল্যস্ফীতির চাপ সামাল দেওয়ার ব্যবস্থা কী। কারণ একজন কর্মচারীর হাতে অতিরিক্ত টাকা পৌঁছে দিয়ে পরদিন বাজারে তার ক্রয়ক্ষমতা কমিয়ে দেওয়ার মধ্যে প্রকৃত অর্থনৈতিক মুক্তি নেই।
মুদ্রার অঙ্ক বৃদ্ধি অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি নয়; প্রকৃত ক্রয়ক্ষমতা বৃদ্ধি, উৎপাদনশীলতা, আর্থিক নিরাপত্তা এবং নাগরিকের জীবনযাত্রার মানোন্নয়নই অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির প্রকৃত পরিচয়। রাষ্ট্রের নীতি হওয়া উচিত এমন একটি অর্থনৈতিক পরিবেশ প্রতিষ্ঠা করা, যেখানে নাগরিককে প্রতিনিয়ত জীবনধারণের ব্যয়ের সঙ্গে যুদ্ধ করতে হবে না। আয় ও ব্যয়ের মধ্যে বাস্তবসম্মত সামঞ্জস্য, সঞ্চয়ের সুযোগ এবং ভবিষ্যৎ জীবনের আর্থিক নিশ্চয়তা থাকবে।
অন্যথায় জাতীয় বেতন স্কেল যতবারই পুনর্গঠন করা হোক, মুদ্রার অঙ্ক যতই বাড়ানো হোক, সাধারণ মানুষের অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা দূর হবে না। রাষ্ট্রের প্রকৃত উন্নয়ন তখনই অর্থবহ হবে, যখন তার সুফল শুধু একটি নির্দিষ্ট পেশাজীবী শ্রেণির মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে সমাজের সর্বনিম্ন আয়ের মানুষটির জীবনেও পৌঁছাবে।
যে রাষ্ট্র নাগরিকের উপার্জন বাড়াতে পারে, কিন্তু সেই উপার্জনের ক্রয়ক্ষমতা ও আর্থিক নিরাপত্তা রক্ষা করতে পারে না, সে রাষ্ট্রের অর্থনৈতিক উন্নয়ন চিন্তা অসম্পূর্ণ এবং অনেক ক্ষেত্রে হঠকারিতাপূর্ণ।





















































