আমাদের দেশটা যেন ধীরে ধীরে টাকা পাচারের এক অদৃশ্য মেশিনে পরিণত হওয়ার ঝুঁকিতে পড়ছে। সুযোগ পেলেই, যেভাবে সম্ভব, বিপুল অর্থ দেশের বাইরে পাচারের অভিযোগ উঠছে। “পরিস্থিতি দেখে প্রশ্ন জাগে—টাকা পাচার বন্ধের উদ্যোগের পাশাপাশি কেন বারবার অর্থ বিদেশে সরিয়ে নেওয়ার অভিযোগ সামনে আসছে?” মনে হচ্ছে, টাকা পাচার বন্ধের পরিবর্তে কোথাও কোথাও যেন এক অঘোষিত প্রতিযোগিতা চলছে—কে কত বেশি অর্থ বিদেশে সরিয়ে নিতে পারে! টাকা পাচার বন্ধ এবং পাচারকৃত অর্থ দেশে ফিরিয়ে আনার জন্য আইন, প্রতিষ্ঠান ও নানা ধরনের ব্যবস্থা রয়েছে। কিন্তু এসব ব্যবস্থার কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে। শুধু আইন থাকলেই হবে না; আইনের যথাযথ প্রয়োগ, তদন্তের সক্ষমতা, সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের জবাবদিহি এবং কার্যকর প্রাতিষ্ঠানিক ও প্রশাসনিক সহযোগিতাও নিশ্চিত করতে হবে।
একটি দেশের অর্থনীতি শুধু তার জিডিপি, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ কিংবা মাথাপিছু আয় দিয়ে বিচার করা যায় না। দেশের অর্থ কোথায় যাচ্ছে, কীভাবে যাচ্ছে এবং সেই অর্থ দেশের মানুষের কল্যাণে কতটা ব্যবহৃত হচ্ছে—এসব প্রশ্নও সমান গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশে অর্থ পাচার ও অবৈধ আর্থিক প্রবাহ নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে আলোচনা চলছে। সাম্প্রতিক সময়ে সরকারি সংস্থাগুলোর কার্যক্রম, সন্দেহজনক লেনদেনের প্রতিবেদন এবং বিদেশে পাচার হওয়া সম্পদ উদ্ধারের উদ্যোগ এই সমস্যার ব্যাপকতা ও জটিলতাকে নতুন করে সামনে এনেছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের ২০২৪–২৫ অর্থবছরের বার্ষিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বিদেশে পাচার হওয়া অর্থ ও সম্পদ শনাক্ত, তদন্ত এবং দেশে ফিরিয়ে আনার জন্য Inter-Agency Task Force on Stolen Asset Recovery and Management পুনর্গঠন করা হয়েছে। এই টাস্কফোর্সের নেতৃত্বে রয়েছেন বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর এবং সমন্বয়কের দায়িত্বে রয়েছে বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিট—BFIU। প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, জাতীয়ভাবে গুরুত্বপূর্ণ ১১টি মানিলন্ডারিং মামলাকে অগ্রাধিকার দিয়ে যৌথ তদন্ত দল গঠন করা হয়েছে। এসব দলে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক), সিআইডি, কাস্টমস ইন্টেলিজেন্স ও BFIU কাজ করছে। বিদেশি কর্তৃপক্ষের কাছে Mutual Legal Assistance Request বা পারস্পরিক আইনি সহায়তার অনুরোধও পাঠানো হয়েছে।
দেশের সম্পদ যখন অবৈধভাবে বিদেশে চলে যায়, তখন বিনিয়োগ, কর্মসংস্থান ও উন্নয়নের সম্ভাবনা ক্ষতিগ্রস্ত হয়। রাষ্ট্র হারায় রাজস্ব, আর সাধারণ মানুষকে এর দীর্ঘমেয়াদি মূল্য দিতে হয়। ফলে ধনী-গরিবের বৈষম্য আরও বাড়তে পারে এবং সামাজিক অসন্তোষও তীব্র হতে পারে। অন্যদিকে, অর্থনৈতিক অপরাধ যখন শাস্তির বাইরে থেকে যায় কিংবা দীর্ঘদিন ঝুলে থাকে, তখন সমাজে একটি বিপজ্জনক বার্তা যায়—অবৈধভাবে সম্পদ অর্জন করলেও পার পাওয়া সম্ভব। এর ফলে মানুষের নৈতিকতা, মানবিকতা ও মূল্যবোধ দুর্বল হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়। ঘুষ, দুর্নীতি, প্রতারণা, চাঁদাবাজি, ছিনতাই, খুন এবং মব-সহিংসতার মতো অপরাধের বিস্তার ঠেকানোও তখন কঠিন হয়ে পড়ে। কারণ আইনের প্রতি মানুষের আস্থা দুর্বল হলে সামাজিক শৃঙ্খলাও দুর্বল হয়ে যায়। টাকা পাচারকে শুধু অর্থনৈতিক অপরাধ হিসেবে দেখলে চলবে না; এটিকে রাষ্ট্রের অর্থনৈতিক নিরাপত্তা, সামাজিক ন্যায়বিচার এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের অধিকার রক্ষার প্রশ্ন হিসেবেও দেখতে হবে।
BFIU-এর তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩–২৪ অর্থবছরে সন্দেহজনক লেনদেন ও কার্যক্রমের রিপোর্টের সংখ্যা আগের বছরের তুলনায় ২৩ শতাংশ বেড়ে ১৭,৩৪৫টিতে দাঁড়ায়। এর মধ্যে ১১,৭৩৬টি ছিল Suspicious Transaction Report (STR) এবং ৫,৬০৯টি Suspicious Activity Report (SAR)। ওই অর্থবছরে BFIU বিভিন্ন তদন্তকারী সংস্থার কাছে ১১৪টি Financial Intelligence Report পাঠায়।আরও সাম্প্রতিক ২০২৪–২৫ অর্থবছরের BFIU তথ্য আরও বড় চিত্র তুলে ধরে। ওই অর্থবছরে সন্দেহজনক আর্থিক কার্যক্রম ও লেনদেনের রিপোর্ট পাওয়া যায় ৩০,১৯৯টি, যা আগের অর্থবছরের তুলনায় ৭৪ শতাংশ বেশি। এর মধ্যে ২০,৫২৪টি STR এবং ৯,৬৭৫টি SAR। BFIU বলেছে, রিপোর্ট বৃদ্ধির পেছনে উন্নত নজরদারি, প্রযুক্তির ব্যবহার, আর্থিক প্রতিষ্ঠানের সচেতনতা এবং অনলাইন জুয়া, ডিজিটাল হুন্ডি, ক্রিপ্টোকারেন্সি ও বৈদেশিক মুদ্রা লেনদেনের মতো নতুন ঝুঁকিও ভূমিকা রেখেছে।
বাংলাদেশ থেকে ২০০৯ থেকে ২০২৩ সাল পর্যন্ত ১৫ বছরে আনুমানিক ২৩৪ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের অবৈধ আর্থিক প্রবাহ ঘটেছে বলে অর্থনীতি নিয়ে গঠিত শ্বেতপত্র প্রণয়ন কমিটির প্রতিবেদনে অনুমান করা হয়েছে। বাংলাদেশি মুদ্রায় এর পরিমাণ প্রায় ২৭ থেকে ২৮ লাখ কোটি টাকা। বিভিন্ন গণমাধ্যমের প্রতিবেদনে শ্বেতপত্রের এই তথ্য উঠে এসেছে। বাণিজ্যের আড়ালেও অবৈধ অর্থ স্থানান্তরের ঝুঁকি রয়েছে। বিভিন্ন গবেষণা ও বিশ্লেষণে দেখা গেছে, আমদানি-রপ্তানির মূল্য নিয়ে কারসাজি বা trade misinvoicing-এর মাধ্যমে বিপুল অর্থ দেশের বাইরে চলে যাওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়। ২০১৩ থেকে ২০২২ সাল পর্যন্ত এক দশকে বাংলাদেশ থেকে বাণিজ্য-সংশ্লিষ্ট অবৈধ আর্থিক প্রবাহের পরিমাণ আনুমানিক ৬৮ দশমিক ৩ বিলিয়ন মার্কিন ডলার বলে Global Financial Integrity-এর গবেষণায় গবেষণায় উঠে এসেছে।অন্যদিকে, বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিটের (BFIU) তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালের জুলাই থেকে ১৫ মে ২০২৫ পর্যন্ত সাড়ে ১০ মাসে ২৭ হাজার ১৩০টি সন্দেহজনক লেনদেনের রিপোর্ট (STR) পাওয়া যায়, যা আগের অর্থবছরের তুলনায় প্রায় ৭৯ শতাংশ বেশি। তবে সন্দেহজনক লেনদেনের রিপোর্ট পাওয়া মানেই অর্থপাচার প্রমাণিত হওয়া নয়; এগুলো মূলত সম্ভাব্য ঝুঁকির সংকেত, যা পরবর্তী তদন্ত ও যাচাইয়ের প্রয়োজন নির্দেশ করে।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো দেশকে ভালোবাসার শিক্ষা। আর দেশকে ভালোবাসার শিক্ষা শুধু মুখে নয়—কাজে, সততায়, দায়িত্ববোধে এবং আইনের প্রতি শ্রদ্ধায় প্রকাশ করতে হবে। দেশের সম্পদ রক্ষা করা, কর ও আইন মেনে চলা, দুর্নীতিকে প্রত্যাখ্যান করা, সরকারি সম্পদকে নিজের সম্পদের মতো রক্ষা করা এবং অন্যের অধিকারকে সম্মান করাও দেশপ্রেমের অংশ। এই শিক্ষা পরিবার থেকে শুরু করে বিদ্যালয়, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয় এবং কর্মক্ষেত্রে ছড়িয়ে দিতে হবে। সরকারি ও বেসরকারি—সব প্রতিষ্ঠানেই সততা, স্বচ্ছতা, জবাবদিহি ও নাগরিক দায়িত্বের চর্চা বাড়াতে হবে। দুর্নীতির বিরুদ্ধে সামাজিক প্রতিরোধ গড়ে তুলতে হবে। আইনের শাসনের বিকল্প নেই। আইন সবার জন্য সমান হতে হবে এবং আইনকে তার নিজস্ব গতিতে চলতে দিতে হবে। কেউ অর্থ, ক্ষমতা, পরিচয় বা প্রভাব ব্যবহার করে আইনের প্রয়োগে বাধা সৃষ্টি করলে তার বিরুদ্ধেও আইনানুগ ব্যবস্থা নিতে হবে। অপরাধ প্রমাণিত হলে প্রচলিত আইনে উপযুক্ত ও কার্যকর শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে।
সময় দ্রুত ফুরিয়ে যাচ্ছে। সময়ের দাবি হলো—টাকা পাচারের পথগুলো কার্যকরভাবে বন্ধ করতে হবে। পাচারকৃত অর্থ উদ্ধারের ব্যবস্থা শক্তিশালী করতে হবে এবং অর্থনৈতিক অপরাধের বিরুদ্ধে সামাজিক ও প্রাতিষ্ঠানিক প্রতিরোধ গড়ে তুলতে হবে। অবৈধভাবে বিদেশে অর্থ স্থানান্তরের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের বিষয়ে নিরপেক্ষ ও পেশাদার তদন্ত নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে পাচারকৃত অর্থ শনাক্ত, জব্দ ও আইনানুগ প্রক্রিয়ায় দেশে ফিরিয়ে আনার সক্ষমতা বাড়াতে হবে। অর্থ পাচারের উৎস যদি ঘুষ, দুর্নীতি, অবৈধ ব্যবসা, সরকারি অর্থ আত্মসাৎ বা অন্য কোনো অপরাধ হয়, তাহলে মূল অপরাধের তদন্ত ও বিচারও নিশ্চিত করতে হবে।
আমরা এমন একটি বাংলাদেশ চাই, যেখানে অবৈধ সম্পদ অর্জন গৌরবের বিষয় হবে না; বরং সততা, পরিশ্রম ও ন্যায়সংগত উপায়ে অর্জিত সাফল্যই হবে সম্মানের পরিচয়। যেখানে দেশের অর্থ দেশের মানুষের কল্যাণে ব্যবহৃত হবে, বিদেশে পাচার হয়ে অদৃশ্য হবে না।
সুধীর বরণ মাঝি, শিক্ষক, হাইমচর সরকারি মহাবিদ্যালয়, হাইমচর, চাঁদপুর।


































































