অনেক চিন্তা ভাবনার পর সিদ্ধান্তে এলাম, না আর নয় হাড় কাঁপানো শীতে, আর আকাশ থেকে ঝড়া শুভ্র কনার স্নো পড়ার হাত থেকে বাঁচতে হলে আর এই রাজ্যে (নিউ ইয়র্ক) থাকতে না হলে অন্য রাজ্যে চলে যেতেই হবে। তাই কাল-বিলম্ব না করে “চল্লাম মন শ্রী বৃন্দাবন“।
ঠান্ডার রাজ্য থেকে এলাম গরম আবহাওয়া আর ঝিরি ঝিরি মৃদু মন্দ হাওয়া যে রাজ্য, সে রাজ্যেই । সেখানে আমাদের মাতৃভূমির মত ফল- ফলালি পাওয়া যায় প্রচুর পরিমানে। বলাবাহুল্য বলতে গেলে তারই আকর্ষণে। এখন যে রাজ্যে বসবাস করছি সেটা খুবই উত্তম, চারিদিকে পাম গাছ আর নারকেল গাছ দিয়ে ঘেরা চতুর্দিক। আর আমার বাড়ীর পিছনে লেক আর ফোয়ারা, সেই ফোয়ারায় সূর্যের আলোতে রংধনুর (রামধনু) সৃষ্টি হয় তখন দেখতে লাগে চমৎকার, সেখানে নানান ধরনের পাখীর কলতানে মুখরিত হতে দেখা যায় আর এখানকার পানিতে প্রচুর পরিমানে মাছ, তবে সেই মাছের ধরারও একটা নিয়ম রয়েছে সেটা হলো কমপক্ষে ৬”( ছয়) ইঞ্চির নীচে হলে নেওয়া যাবে না, যদি কর্তৃপক্ষ টের পায় তাহলে জরিমানা গুনতে হয় সুতারাং শৌখিন মাছ শিকারিরা যতই ছিপ দিয়ে মাছ ধরুক না কেন তাদের খুব সাবধান ও সতর্কতায় থাকতে হয়। সামনে আছে বিরাট একটি খাল (ক্যানেল) সেখানে কুমির দেখা যায়, সাপও যে দেখা যায় না তা কিন্তু নয় আর আছে উভচর প্রাণী এগুয়ানা কুমিরের মত দেখতে, সে গুলিও মাঝে মধ্যে উকি মারে। তাদের খাবার ঘাস লতা- পাতা, তারপরও সেই লেকে পরিচ্ছন্ন পানি প্রবাহিত হয় আর পিছনে নয়নাভিরাম ফোয়ারার টল টলয়মান পানি শান্ত ভাবে বয়ে যায়। তাহলে মানেটা দাঁড়ালো এই যে, এখানে আমরা সুখে- দুঃখে চোখ, মন দেহকে সার্থক করতে পারি ঠিক তেমনি জীবনের পরিপূর্নতা ও সফলতা খুঁজে পাওয়ার চেষ্টা করি।
আর যাই হোক এখানে ছেড়ে আসা স্টেটের মত খুব একটা কোলাহল নেই, নেই কোন ব্যাস্ততা তারপরও বলবো যে যেখানে মানিয়ে নিতে পারে তার কাছে সেই স্টেটই ভাল। এবার আসল কথায় আসি – আমি যে বাড়ীটির স্বত্বাধিকারী সেই বাড়ীটি কিনেছিলাম এক জার্মানী ভদ্রলোকের কাছ থেকে, আসলে এটা ছিল তার মেয়ে আইরিনের বাড়ি। সে অনেক দিন আগের কথা, তার বাবা জোসেফ সাগর পাড়ি দিয়ে সব পেয়েছির দেশে এসেছিল পড়াশুনা করতে, সুযোগ পেয়েছিল হার্ভাড ইউনিভার্সিটিতে পড়ার, সেখানেই এক কৃষ্ণাঙ্গ ছাত্রীর সাথে তার ভাব হয়, আর এই ভাব থেকেই প্রনয় এবং প্রনয় থেকে ভালবাসা আর তার শেষ পর্যায়ে বিবাহ।
তাদের ছিল সুখের সংসার। বছর না ঘুরতেই মা সিসার কোল জুরে এলো আইরিন। বাবা- মায়ের আদরের দুলালী। পড়াশুনা শেষে তারা ফিরে যায় জার্মান, সিসা তাদের একমাত্র মেয়ে আইরিনকে নিয়ে তার জন্মন্থান যুক্তরাস্ট থেকে স্বামীর পৈত্রিক ভিটায় জার্মানীতে চলে এলো। দীর্ঘ ২৩ বছর সুখে শান্তিতে বসবাস করলেও হঠাৎ একদিন সিসা শপিংমল থেকে ফেরার সময় গাড়ী দূর্ঘটনায় মৃত্যুর মুখে ঢলে পড়ে। পরবর্তিতে জোসেফ তাদের একমাত্র মেয়েকে কোল পিঠে করে বড় করে চলছিল, এরমধ্যে আইরিন পড়ালেখার জন্য তার নানীর কাছে থেকে যুক্তরাস্টে পড়তে চাইছিল অতএব বাবা তার মেয়ে আইরিনের অনুরোধ উপেক্ষা করতে না পেরে অবশেষে তাকে রাজী হতে হলো।
বছর ঘুরতে না ঘুরতেই নানীও কঠিন রোগে মারা গেলে তখন বাবা তার মেয়ের জন্য একটি বাড়ি কিনে দেয়। তারপর থেকেই আইরিন সেই বাসায় বসবাস করছিল। এর আগে সে ডালাস থেকে ফ্লোরিডায় চাকুরীর সুত্রে বদলী হয়ে চলে এসেছিল এবং বাবার কেনা বাড়ীতেই থাকছিলো। কিন্তু আইরিনের ভাগ্যই খারাপ। তার বাবা জোসেফ হঠাৎ একদিন ফোন পেয়ে জানতে পারে তার মেয়ে অসুস্থ হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে। এই খবর পেয়েই বাবা তড়িঘড়ি করে যুক্তরাষ্ট্রে চলে এলো। ডাক্তার জানালো একেবারে শেষ স্টেজে তাই মনে হয় তাদের কিছু করার আছে বলে মনে হয় না। আইরিন ভুগছিল লিভার ক্যান্সারে। বেশ কিছুদিন চিকিৎসার পর আইরিন সবাইকে রেখে চিরতরে হারিয়ে গেলো পৃথিবীর মায়া কাটিয়ে। বাবা যেহেতু আর এখানে থাকবে না বলে মেয়ের বাড়ি বিক্রি করার জোর চেস্টা করলো কিন্ত অনেকে ক্রয় করতে চাইলেও বাড়ি বিক্রি করতে দিলো না ম্যানেজমেন্ট কারণ তারা যে কাউকেই এই কমিউনিটিতে থাকার অনুমতি দেয় না। এখানে থাকতে হলে কত গুলি শর্ত পূরণ করতে হয়, যেহেতু কেউ এই শর্ত পূরন করতে পারছিল না তাই বাড়ি বিত্রয়ও করা যাচ্ছিল না।
আমার গিন্নি তার বোনের বাড়িতে বেড়াতে এসে এই বাড়ীটি পচ্ছন্দ করে ফেলে এবং সেটি কেনার জন্য আমার কাছে জানায় অতএব শর্ত পূরণ করার জন্য আমার ছেলে তন্ময় সব কাগজ পত্র জমা দেয় এবং কর্তৃপক্ষ তা গ্রহণ করে। তখন আর বাড়ি কিনতে কোন সমস্য হলো না। আইরিন ছিল তার মায়ের মত, তার গায়ের রং ছিল কালো আর ছিল কোকরানো চুল। তার বাড়ীটি সে খুব সুন্দর করে সাজিয়ে ছিল, বলতেই হবে তার রুচির কোন অভাব ছিল না, সে অসুস্থ হলে তার মামা জর্জিয়া থেকে ভাগ্নির কাছে শরীর খারাপের খবর পেয়ে এসেছিল এবং থাকছিল তার ভাগ্নির বাসাতেই। এখানে বলে রাখা ভাল আইরিন ছিল অবিবাহিত তাই বসবাস করতো একাই। ঐ যে আইরিন হাসপাতালে গেলো আর তার নিজ বাসাতে ফিরে আসা হলো না।
আমরা নতুন বাসায় আসার পর আমাদের মত করে সাজালাম। বেশ কিছু দিন পর আমরা খাবার খেতে এসে লক্ষ্য করলাম আমাদের প্রিয় প্লেট (থাল) টি আর পাওয়া যাচ্ছে না, কোথাও আর খুঁজে পেলাম না, অন্য দিকে লিখতে গিয়ে আমার চশমা খুঁজে পেলাম না, পেলাম নাতো পেলামই না। পরে আমরা হারানো জিনিষ গুলির কথা ভুলেই গেলাম। সপ্তাহ খানেক পরে হঠাৎ দেখলাম সেই হারানো প্লেটটা তার জায়গা মতই আছে। আরও মজার ব্যাপার হলো ঐ দিনই সোফার এক কোনে উকি দিচ্ছিল আমার চশমাটি। এরকম কাকতালীয় ভাবে হারানো দুইটি জিনিষ ফিরে আসায় সেটা ছিল আমাদের ভাবনার বাইরে।
কিন্তু কি ভাবে প্লেট আর চশমা দুইটি আপনা – আপনি আসলো সেটা ভেবেই পেলাম না। কয়েকজনকে বলায় তারা বল্লো, নিশ্চয়ই তোমাদের বাসায় অশরীরি আত্মা আছে। আবার কেউ বল্লো, সে গুলি যায়গা মতই ছিল, আপনারা দেখতে পাননি মনে হয় আপনারা তখন “কালার ব্লাইন্ড“ হয়ে পড়েছিলেন বলে দেখা জিনিষ দেখতে পাচ্ছিলেন না। আবার কেউ বল্লো, সেটা ছিল আপনাদের মনের ভুল। যাই হোক যেটাই হোক ঘটনা ঘটেছিল, ঘটনাটি সত্য ছিল।


























































