ইউক্রেন যুদ্ধে ইউরোপীয় ইউনিয়নের সম্পৃক্ততার অভিযোগ তুলে, রাশিয়ায় থাকা নিজেদের সম্পদের ব্যবস্থাপনার অধিকার থেকে বিদেশি মালিকদের বঞ্চিত করার সর্বশেষ পদক্ষেপে রাশিয়া বিশেষ করে ইউরোপীয় কোম্পানিগুলোকে লক্ষ্যবস্তু করেছে—এমনটাই জানিয়েছেন সরকারি ও কোম্পানি-সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো।
চলতি মাসেই রাশিয়া সুইস খাদ্যপণ্য জায়ান্ট ‘নেসলে’ (Nestle), জার্মান পাইকারি বিক্রেতা প্রতিষ্ঠান ‘মেট্রো এজি’ (Metro AG) এবং ফরাসি খুচরা বিক্রেতা প্রতিষ্ঠান ‘ওশঁ’ (Auchan)-এর সম্পদ সাময়িক ব্যবস্থাপনার আওতায় নিয়ে এসেছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক সরকারের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা, যিনি এই পদক্ষেপগুলো সম্পর্কে সরাসরি অবগত, রয়টার্সকে বলেন, “এখন অসম বা পাল্টা ব্যবস্থা (asymmetric measures) গ্রহণের সময় এসেছে। তারা কী ধরনের পদক্ষেপ নিচ্ছে এবং কী ধরনের নিষেধাজ্ঞা আরোপ করছে, তা নিয়ে তাদেরই ভাবা উচিত।”
পরবর্তী লক্ষ্যবস্তু হিসেবে কোন কোম্পানিগুলো থাকতে পারে এবং ইতালীয় ব্যাংক ‘ইউনিক্রেডিট’ (UniCredit) ও অস্ট্রিয়ান ঋণদাতা প্রতিষ্ঠান ‘রাইফেইসেন’-এর (Raiffeisen) রুশ শাখাগুলোকে সাময়িক ব্যবস্থাপনার আওতায় আনা হতে পারে কি না—এমন প্রশ্নের জবাবে ওই কর্মকর্তা বলেন, “তাদের ভয় পেতে দিন।”
রাশিয়ার করপোরেট খাতের আরেক সূত্র—যিনিও নাম প্রকাশ না করার শর্তে কথা বলেছেন—ইউরোপীয় কোম্পানিগুলোর বিরুদ্ধে অভিযোগ করেন যে, তারা ইচ্ছাকৃতভাবে রাশিয়ায় তাদের শাখাগুলোর উন্নয়ন বাধাগ্রস্ত করছে, যার ফলে শেষ পর্যন্ত রাশিয়ার অর্থনীতির ক্ষতি হচ্ছে।
রাশিয়ায় কার্যক্রম পরিচালনাকারী বিদেশি ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা এখন কমে আসছে; এমন একটি ইউরোপীয় কোম্পানির এক ঊর্ধ্বতন ব্যবস্থাপক রয়টার্সকে জানান, ইউরোপীয় ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলো আশা করেছিল নিকট ভবিষ্যতে বিদ্যমান পরিস্থিতি বা ‘স্ট্যাটাস কো’ (status quo) বজায় থাকবে।
মঙ্গলবার ক্রেমলিন জানায়, রাশিয়ার বিরুদ্ধে “সরাসরি যুদ্ধক্ষেত্রে বৈরী কার্যকলাপে এসব ‘অবন্ধুত্বপূর্ণ’ দেশগুলোর ক্রমবর্ধমান সম্পৃক্ততার” কারণেই এই সিদ্ধান্তগুলো নেওয়া হয়েছে। তবে তারা ইঙ্গিত দেয় যে, এই পদক্ষেপগুলো “ফেরতযোগ্য” বা পরিবর্তনযোগ্য।
ক্রেমলিনের মুখপাত্র দিমিত্রি পেসকভ সাংবাদিকদের বলেন, “আপাতত, এই সিদ্ধান্ত পরিবর্তনের কোনো কারণ আমরা দেখছি না। সংলাপ বা পরিস্থিতি সংশোধনের প্রচেষ্টার আহ্বান জানিয়ে কোনো যৌক্তিক কণ্ঠস্বরও আমরা শুনতে পাচ্ছি না।”
ইউরোপীয় ইউনিয়ন যুদ্ধ অবসানে ব্যর্থতার জন্য রাশিয়াকে দায়ী করে আসছে। তাদের মতে, প্রকৃত শান্তি আলোচনায় অংশগ্রহণের কোনো বাস্তব ইচ্ছা মস্কোর নেই। গত সপ্তাহে তারা ৩ হাজারেরও বেশি ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের ওপর নিষেধাজ্ঞা নবায়ন করেছে। ইউরোপীয় কোম্পানিগুলোর বিরুদ্ধে রাশিয়ার সর্বশেষ পদক্ষেপের বিষয়ে তারা তাৎক্ষণিক কোনো মন্তব্য করেনি।
ইউরোপ কর্তৃক পরিচালিত যুদ্ধ
সামরিক অভিযানে ইউরোপীয় দেশগুলো কীভাবে জড়িত, সে বিষয়ে পেসকভ কোনো প্রমাণ বা বিস্তারিত তথ্য দেননি। তবে রুশ কর্মকর্তারা এর আগে অস্ত্র সরবরাহ (যার মধ্যে ইইউ-তে ড্রোন উৎপাদন অন্তর্ভুক্ত), লক্ষ্যবস্তু নির্ধারণে সহায়তা এবং গোয়েন্দা তথ্য প্রদানের মতো বিষয়গুলোর কথা উল্লেখ করেছেন। মঙ্গলবার পররাষ্ট্রমন্ত্রী সের্গেই লাভরভ বলেন, “আপনারা যদি স্বীকার করেন যে আপনাদের অস্ত্র আমাদের বিরুদ্ধে ব্যবহৃত হচ্ছে এবং আমরা সেগুলো ধ্বংস করছি—তবে একে আপনারা যা-ই বলুন না কেন—আমার কোনো সন্দেহ নেই যে এটি ইউরোপের পক্ষ থেকে আমাদের বিরুদ্ধে চালানো একটি যুদ্ধ।”
ইউক্রেন যুদ্ধের জেরে রাশিয়ার প্রায় ২১০ বিলিয়ন ইউরো (২৩৮ বিলিয়ন ডলার) সমমূল্যের রাষ্ট্রীয় সম্পদ জব্দ করা এবং ইউরোপ ও অন্যান্য পশ্চিমা দেশে রুশ কোম্পানিগুলোর সম্পদের ওপর বিধিনিষেধ আরোপের জন্যও রাশিয়া ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) সমালোচনা করেছে।
দীর্ঘ সময় ধরে চলা এই যুদ্ধে ইউক্রেনের কট্টর সমর্থক হিসেবে পরিচিত ইইউ রাশিয়ার বিরুদ্ধে ইউরোপীয় ভূখণ্ডে হামলার অভিযোগ এনেছে; পাশাপাশি কিছু সরকারি ও গোয়েন্দা কর্মকর্তা ভবিষ্যতে রাশিয়ার আগ্রাসনের আশঙ্কার কথাও তুলে ধরেছেন। তবে মস্কো এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছে।
রুশ বার্তা সংস্থা ‘তাস’ (TASS)-এর তথ্য অনুযায়ী, যুদ্ধ শুরুর পর থেকে রাশিয়া বিদেশি কোম্পানির সাথে সংশ্লিষ্ট ১৩৫টি প্রতিষ্ঠানে অন্তর্বর্তীকালীন প্রশাসন বা ব্যবস্থাপনা ব্যবস্থা চালু করেছে। এর মধ্যে অধিকাংশই ইইউ-ভুক্ত দেশগুলোর কোম্পানি—যার মধ্যে রয়েছে ফরাসি খাদ্যপণ্য প্রস্তুতকারক প্রতিষ্ঠান ‘ড্যানোন’ (Danone) এবং ডেনিশ বিয়ার প্রস্তুতকারক ‘কার্লসবার্গ’ (Carlsberg)।
সাম্প্রতিক এই পদক্ষেপগুলোর আগে, রুশ আইনি প্রতিষ্ঠান ‘এনএসপি’ (NSP) ক্ষতিগ্রস্ত পশ্চিমা কোম্পানির সংখ্যা ২২টি বলে উল্লেখ করেছিল। ‘অ্যাসোসিয়েশন অফ ইউরোপিয়ান বিজনেসেস’-এর সর্বশেষ বার্ষিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, রাশিয়ায় তাদের সদস্য কোম্পানির সংখ্যা কমে ৩৩০-এ নেমে এসেছে, যা আগের বছর ছিল ৪০০।
যুক্তরাষ্ট্রের কোনো বড় কোম্পানি রাশিয়ায় এ ধরনের পদক্ষেপের শিকার হয়নি; তবে ছোট কিছু প্রতিষ্ঠান—যেমন মার্কিন প্রাইভেট ইকুইটি ফান্ড ‘এনসিএইচ ক্যাপিটাল’ (NCH Capital), যাদের রুশ ব্যবসার মধ্যে কৃষি-সম্পদও অন্তর্ভুক্ত—সেগুলোকেও অন্তর্বর্তীকালীন প্রশাসনের আওতায় আনা হয়েছে।
রাশিয়ায় অবস্থিত ‘আমেরিকান চেম্বার অফ কমার্স’-এর তথ্যমতে, চলতি বছর রাশিয়ায় কার্যক্রম পরিচালনাকারী মার্কিন কোম্পানির সংখ্যা প্রায় ৩০০। ইউক্রেনে শান্তি ফিরে আসার পর সেখানে ব্যবসায়িক সুযোগ-সুবিধা নিয়ে রাশিয়া ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে আলোচনা চলছে।


































































