স্পেনের প্রধানমন্ত্রী পেদ্রো সানচেজ সোমবার ২৯ নভেম্বর আগাম নির্বাচনের ঘোষণা দিয়েছেন। গত সপ্তাহে ব্যাপক বিক্ষোভের মুখে বিভক্ত পার্লামেন্ট সরকারের গুরুত্বপূর্ণ আবাসন সংক্রান্ত ডিক্রিগুলো প্রত্যাখ্যান করার পর নিজের জনসমর্থন বা ম্যান্ডেটকে শক্তিশালী করার লক্ষ্যে তিনি এই পদক্ষেপ নিলেন।
এই আগাম নির্বাচন সানচেজের জন্য একটি অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ বাজি; কারণ প্রায় সব জনমত জরিপেই তাঁর সোশ্যালিস্ট পার্টি পিছিয়ে রয়েছে। নির্বাচনে পরাজয় ঘটলে ইউরোপের হাতেগোনা কয়েকটি বামপন্থী সরকারের একটির পতন ঘটবে—এমন এক সময়ে যখন পুরো অঞ্চলজুড়ে উগ্র ডানপন্থীরা অভূতপূর্ব সাফল্য পাচ্ছে এবং ইউরোপের ভোটারদের একটি বড় অংশ মধ্যপন্থী অবস্থান থেকে সরে আসছে।
তবে চতুর রাজনীতিবিদ হিসেবে পরিচিত সানচেজ বারবারই প্রমাণ করেছেন যে, যারা তাঁকে আগেই হিসাবের বাইরে ফেলে দিয়েছিল, তাদের চমকে দেওয়ার ক্ষমতা তাঁর রয়েছে।
টেলিভিশনে দেওয়া এক ভাষণে সানচেজ বলেন, “আমাদের জনগণের সমর্থন নতুন করে আদায় করতে হবে। আমাদের সংগঠিত হতে হবে এবং পার্লামেন্টে অনেক বড় প্রগতিশীল সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করতে হবে—এমন এক সংখ্যাগরিষ্ঠতা যা আমাদের স্বার্থান্বেষী মহলের বাধা কাটিয়ে উঠতে, নতুন সামাজিক অগ্রগতি সাধন করতে এবং স্পেনের রূপান্তরের প্রক্রিয়া অব্যাহত রাখতে সহায়তা করবে।”
প্রধানমন্ত্রী স্বীকার করেছেন যে তিনি ভুল করেছেন এবং নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি পুরোপুরি রক্ষা করতে পারেননি। তিনি বলেন, “আমি এও জানি যে সেই সামাজিক সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশের একটি অংশ আজ অসন্তুষ্ট।” তবে তিনি স্পেনকে “উন্মুক্ততা, সামাজিক ন্যায়বিচার এবং পরিবেশগত দায়বদ্ধতার দুর্গ” হিসেবে টিকিয়ে রাখার লড়াই চালিয়ে যাওয়ার অঙ্গীকার করেন।
এই ঘোষণার পর স্পেনের শেয়ার বাজারের প্রধান সূচকটি (ব্লু-চিপ ইনডেক্স) অপরিবর্তিত ছিল এবং সরকারি বন্ডের দরও মোটামুটি স্থিতিশীল ছিল।
প্রধান বিরোধী দল ‘পিপলস পার্টি’ (পিপি) ‘এক্স’ এ দেওয়া এক পোস্টে লিখেছে—”অবশেষে” (AT LAST)। দলটির নেতা আলবার্তো নুনেজ ফেইজো সোমবারই পরে একটি সংবাদ সম্মেলন করবেন বলে কথা রয়েছে। বর্তমান পার্লামেন্টের মেয়াদকালের বেশিরভাগ সময় ধরেই রক্ষণশীলরা সানচেজের প্রতি পার্লামেন্ট ভেঙে দিয়ে আগাম নির্বাচনের আহ্বান জানিয়ে আসছিল।
প্রগতিশীল ও চতুর নেতা
ফিলিস্তিনের রাষ্ট্রস্বীকৃতি থেকে শুরু করে বহুপাক্ষিক প্রতিষ্ঠানের সুরক্ষা এবং “প্রযুক্তি খাতের অলিগার্ক” বা প্রভাবশালী করপোরেট শক্তির বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নেওয়ার মতো প্রগতিশীল বিষয়গুলোতে দৃঢ় ভূমিকা রেখে সানচেজ বিশ্বজুড়ে আলাদা পরিচিতি পেয়েছেন—যদিও দেশে একের পর এক বিপর্যয় ও কেলেঙ্কারির কারণে তাঁর অবস্থান দুর্বল হয়ে পড়েছিল।
সম্প্রতি আবাসন সংকট মোকাবিলার প্রস্তাবগুলো তাঁকে কিছুটা চাঙ্গা করেছিল; প্রস্তাবগুলো বেশ ভালো সাড়া পেলেও শুক্রবার ডানপন্থী আইনপ্রণেতারা তা প্রত্যাখ্যান করেন, যার ফলে সারা দেশে আবাসন অধিকারকর্মীরা ব্যাপক বিক্ষোভ শুরু করেন। জনমত জরিপ অনুযায়ী, স্পেনে পিপি (PP)-র নেতৃত্বে এবং ভক্স (Vox)-এর সমর্থনে একটি জোট সরকার গঠনের সম্ভাবনাই সবচেয়ে বেশি। এর ফলে একনায়ক ফ্রান্সিসকো ফ্রাঙ্কোর মৃত্যুর পর গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের পর প্রথমবারের মতো কোনো কট্টর-ডানপন্থী দল কেন্দ্রীয় সরকারের অংশ হতে যাচ্ছে।
অথচ, সংখ্যাগরিষ্ঠ সরকার গঠনের মতো পর্যাপ্ত ভোট কখনোই না পাওয়া সত্ত্বেও, সানচেজ চরম বামপন্থী থেকে শুরু করে বিচ্ছিন্নতাবাদী ডানপন্থী—এমন সব ভিন্নমতাবলম্বী দলকে নিয়ে বেশ কিছু ভঙ্গুর ও আপাতদৃষ্টিতে অসম্ভব জোট গঠন করে টানা আট বছর বা তিন মেয়াদে ক্ষমতায় টিকে ছিলেন।
কিন্তু জোটসঙ্গীদের মধ্যে ক্রমবর্ধমান বিভাজনের কারণে তৃতীয় মেয়াদে সরকার খুব কমই আইন পাস করতে পেরেছে এবং ২০২৩ সালের পর থেকে কোনো বাজেটও পাস করতে ব্যর্থ হয়েছে; অথচ এই সময়েও স্পেনের অর্থনীতি উন্নত বিশ্বের অন্যতম সেরা পারফরম্যান্সকারী অর্থনীতি হিসেবে নিজের অবস্থান ধরে রেখেছে।
ভক্স-এর নেতা সান্তিয়াগো আবাসকাল সতর্ক করে বলেছেন, ডানপন্থীদের পক্ষে জনমত জরিপের ফলাফল ইতিবাচক হওয়া সত্ত্বেও নির্বাচনের চূড়ান্ত ফলাফল অনিশ্চিত হতে পারে। তিনি টিভি চ্যানেল ‘অ্যান্টেনা ৩’-কে বলেন, “২০২৩ সালেও জরিপগুলো একই কথা বলেছিল, কিন্তু শেষ পর্যন্ত সানচেজ তার সব সহযোগীকে নিয়ে সংখ্যাগরিষ্ঠ সরকার গঠন করতে সক্ষম হয়েছিলেন।”
**প্রতিদ্বন্দ্বীর পতন**
মারিয়ানো রাজয়ের দল পিপি (PP)-র অভ্যন্তরে বড় ধরনের দুর্নীতির কেলেঙ্কারির জেরে তাকে ক্ষমতাচ্যুত করার প্রক্রিয়ায় নেতৃত্ব দেওয়ার পর সানচেজ ক্ষমতায় বসেন। তবে গত এক বছরে সানচেজের নিজের দল ‘সোশ্যালিস্ট পার্টি’-র জ্যেষ্ঠ সদস্যদের বিরুদ্ধেও দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছে। এর ফলে দলের জনপ্রিয়তা—যা তার পুরো মেয়াদজুড়ে ২৬ থেকে ৩১ শতাংশের মধ্যে ওঠানামা করছিল—তা আরও কমে গেছে।
প্রতিকূল পরিস্থিতি সত্ত্বেও, আঞ্চলিক ও স্থানীয় নির্বাচনে বড় ধরনের পরাজয়ের পর তিনি সংসদে বিভিন্ন দলের একটি শিথিল জোটের সমর্থন আদায় করে ২০২৩ সালে দ্বিতীয়বারের মতো চার বছরের জন্য ক্ষমতায় বসেন।
সমর্থন পাওয়ার বিনিময়ে কাতালান স্বাধীনতা-পন্থী নেতাদের জন্য অত্যন্ত বিতর্কিত এক সাধারণ ক্ষমার (অ্যামনেস্টি) প্রতিশ্রুতি দিয়ে তিনি এই সাফল্য অর্জন করেছিলেন; অনেক ভোটার এখনও সেই পদক্ষেপটিকে স্পেনের ঐক্যের সাথে বিশ্বাসঘাতকতা হিসেবে মনে রেখেছেন এবং ক্ষোভ প্রকাশ করেন।
সানচেজ শুরুর দিকে বেশ কিছু পদক্ষেপের জন্য প্রশংসা কুড়িয়েছিলেন। এর মধ্যে ছিল মাদ্রিদের বাইরে একনায়ক ফ্রাঙ্কোর নিজের তৈরি সমাধিসৌধ থেকে তার দেহাবশেষ সরিয়ে নেওয়া এবং শ্রম আইন সংস্কার—যার ফলে বেকারত্বের হার গত প্রায় দুই দশকের মধ্যে সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমে এসেছে। ২০১৮ সালের জুন মাসে অভিবাসী-উদ্ধারকারী জাহাজ ‘অ্যাকোয়ারিয়াস’ এবং এর ৬২৯ জন যাত্রীকে আশ্রয় দেওয়ার ঘোষণা দিয়ে তিনি শুরুতেই একজন মানবতাবাদী ও অভিবাসন-বান্ধব নেতা হিসেবে নিজের অবস্থান সুদৃঢ় করেন; অথচ ইতালি ও মাল্টা—উভয় দেশই জাহাজটিকে তাদের বন্দরে ভিড়তে দিতে অস্বীকৃতি জানিয়েছিল।
ইউরোপের অন্যান্য দেশ যখন বিদেশি আগন্তুকদের বিষয়ে তাদের নীতি কঠোর করেছে, তখন সানচেজ ধারাবাহিকভাবে যুক্তি দিয়ে আসছেন যে, অভিবাসন স্পেনের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি বজায় রাখার জন্য অপরিহার্য। তাঁর মতে, নির্মাণ, কৃষি ও আতিথেয়তার মতো গুরুত্বপূর্ণ খাতগুলোর শ্রমের ঘাটতি পূরণ এবং দেশটির চাপের মুখে থাকা সমাজকল্যাণ ব্যবস্থাকে সচল রাখার জন্য প্রয়োজনীয় রাজস্ব জোগাতে অভিবাসন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
সাম্প্রতিক সময়ে, চীনের দিকে ঝুঁকে পড়ার পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বাধীন ‘জিডিপির ৫ শতাংশ পর্যন্ত প্রতিরক্ষা ব্যয় বৃদ্ধির’ দাবি মেনে নিতে তাঁর অস্বীকৃতি মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প এবং ইউরোপের কিছু নেতাকে উদ্বিগ্ন করে তুলেছে; কারণ ওই নেতারা আশঙ্কা করছেন, এর ফলে ইউরোপীয় জোট চীনা পণ্যে প্লাবিত হতে পারে।
পরামর্শক প্রতিষ্ঠান ‘ফ্রিমার্কেট করপোরেট ইন্টেলিজেন্স’-এর প্রেসিডেন্ট ও অর্থনীতিবিদ লরেঞ্জো বার্নালদো দে কুইরোস-এর মতে, আবাসন সংক্রান্ত পদক্ষেপগুলো এই সমাজতান্ত্রিক নেতার সামনে একটি বিরল সুযোগ এনে দিয়েছে—যার মাধ্যমে তিনি নিজেকে একটি সংগঠিত বামপন্থী শক্তির নেতা হিসেবে তুলে ধরতে পারছেন এবং একই সঙ্গে সেউতায় অভিবাসী সংকট ও দুর্নীতির কেলেঙ্কারির মতো রাজনৈতিকভাবে ক্ষতিকর বিষয়গুলো থেকে মনোযোগ সরিয়ে নিতে পারছেন।
দে কুইরোস বলেন, “এটি একটি সুবর্ণ সুযোগ। তিনি যদি দ্রুত নির্বাচনের ডাক না দেন, তবে (ওই বিষয়গুলো) আবারও আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে ফিরে আসবে।”

































































